• হরিদাস পাল  কাব্য

  • আজ ২০শে জুলাই - কল্লোল

    Kallol Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    কাব্য | ২০ জুলাই ২০২১ | ২৩১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ২০ জুলাই, ১৯৭৪

    বেলা ১টা নাগাদ পৌঁছে গেছিলাম কার্জন পার্কে। সে এক উৎসবের মেজাজ সারা পার্কটাকে ছেয়ে ফেলেছে। জায়গায় জায়গায় গোল হয়ে বসে গেছে গানের দলগুলো। এখানে অরণি তো ওখানে মাস সিংগার্সের বন্ধুরা। ওদিকে উত্তরপাড়ার ইউনিট থিয়েটারের (যারা ‘হচ্ছেটা কী’ আর ‘লাশ বিপণি’ করত) বন্ধুরা নাটকের একটা বিশেষ অংশের মুভমেন্টগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছে। এদিকে আরএকজন একটা আশ্চর্য মূকাভিনয় করে দেখাচ্ছে - প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে সামনের দিকে কিন্তু আসলে পেছনে হাঁটছে - ইন্দিরার ‘প্রগতিশীলতার’ আসল চেহারা। বিশাল একটা ভিড় সেখানে অভিনেতাকে সাবাশি দিচ্ছে। এই সামনে দৌড়ের ভঙ্গি করে পেছনে হাঁটা, এরই নাম ৯০-এ মাইকেল জ্যাকসনের ‘মুন ওয়াক’। আমি আজও সেই অভিনেতার নাম জানি না। প্রচুর রংবেরং-এর ব্যানার, পোস্টারে, সেদিনের কার্জন পার্ক একদম মেলার মাঠ।

    মিছিল শুরু হলো। রানী রাসমণি রোডের দিকে যাবে মিছিল তারপর এসপ্ল্যানেড ঘুরে, ধর্মতলা স্ট্রিট হয়ে, বৌবাজার, কলেজ স্ট্রিট দিয়ে শ্যামবাজার।

    তখন কার্জন পার্কের ভিতর দিয়ে একটা বাঁধানো রাস্তা ছিল, যেটা এসপ্ল্যানেড ইস্ট থেকে রানী রাসমণি রোডে যেত। সেই রাস্তা দিয়ে মিছিল এগুচ্ছে। আমি নৈহাটি থেকে আসা একটা গানের দলের পাশেপাশে হাঁটছি। ওরা একটা দারুণ গান গাইছিল - আমরা সূর্য সেনা / আমরা অগ্নিবীণা / আসুক প্লাবন চেতনায় / মাথা নীচুর আগে / যেন রক্তে আগুন জাগে / মুক্তির পথে ঠিকানা। একদম কুচকাওয়াজি মেজাজে বাঁধা এই গানটা ওরা বারবার গাইবে, ফলে মিছিলে হাঁটতে হাঁটতেই গানটা শিখে নেওয়া যাবে, এই আশায় ওদের সাথে সাথে চলছিলাম। হঠাৎ দেখি আমাদের দলটার থেকে মিছিলের সামনের অংশ অনেকটা এগিয়ে গেছে। এমন হয়। মিছিলের সামনের লোকেরা বেশি তাড়াতাড়ি হাঁটলে এরকম ফাঁক তৈরি হয়ে যায়। আমি তাই দৌড়ে মিছিলের সামনের দিকে যাচ্ছিলাম, ওদের বলতে -একটু আস্তে হাঁটো। মিছিলের মুখের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছি, আচমকা কানে এল তমালদার তীক্ষ্ণ গলায় হাঁক - মিছিইইইইল দৌড়াআআআও ...।

    সেই আশ্চর্য ডাক যেন ভেসে এল যুগান্তের ওপার হতে। আর ঠিক তারপর সারা মিছিল সমস্ত গান আর স্লোগান ছেড়ে একসাথে গর্জে উঠল, এক লহমায় ফেলে আসা সাত সাত বছর পার করে - নকশাআআআলবাড়ি লাল সেলাম। সারা কার্জন পার্ক জুড়ে ফেটে পড়ছে আগুন পাহাড়, ঝলসে যাচ্ছে এসপ্ল্যানেড। ঝড়ের কেন্দ্র তখন রানী রাসমণি রোডের ইডেনের দিকের প্রান্তে।

    পাগলের মত দৌড়চ্ছি সামনের দিকে। সামনে একটা প্রিজন ভ্যান, প্রাগৈতিহাসিক হিংস্রতার মতো দাঁড়িয়ে আছে, দেবর্ষিকে পেটে নিয়ে। ওর মাথা তাক করে আছে কাপুরুষ ধাতব নল। প্রিজন ভ্যান ঘিরে ধরেছে লাভাস্রোত। লাথির পর লাথি হয়ে আছড়ে পড়ছে লাভাস্রোতের ঢেউ ভ্যানের গায়ে। হাজারটা বজ্রকে লজ্জা দিয়ে হাঁক পাড়ছে মিছিল - বোলরে কমরেড/হামলা বোল/তানকে সিনা/হামলা বোল/জোরসে বোল/হামলা বোল/পুলিস কুত্তা পে/হামলা বোল/ফিরসে বোল/হামলা বোল/আরে ডরতা কিউউউউঁ/হামলা বোল ...। হাতে হাত ধরে আগুনের মালা ঘিরে ধরেছে ভ্যানটাকে। ভ্যানের সামনে-পেছনে-ডাইনে-বাঁয়ে রাস্তা জুড়ে মিছিল শুয়ে পড়েছে। দেবর্ষির মাথা তাক করা ধাতব নল কাপুরুষদের দুপায়ের ফাঁকে নেতিয়ে পড়েছে।

    সামনে পুলিশের লাইনে ক্রমশ সংখ্যা বাড়ছে। হঠাৎ একসময় ধেয়ে এল তারা। শুয়ে থাকা বন্ধুদের ওপর নেমে আসছে লাঠি আর বুট, রক্তে ভেসে যাচ্ছে রানী রাসমণি রোড, কার্জন পার্ক - ছিটকে পড়ছি বন্ধুরা। একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় ছিটকে পড়েছি নালা পেরিয়ে ভবানীপুর ক্লাবের গেটে। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দেখি এপিডিআরের মিছিলে আলাপ চেনা মুখ ভেসে যাচ্ছে রক্তে - সে চেঁচিয়ে বলল, কমরেড, সত্যযুগে জীবনদাকে খবর দিন। দৌড়চ্ছি ভবানীপুর মাঠ পেরিয়ে, তারকাঁটার বেড়া ডিঙ্গিয়ে, মনুমেন্ট ছাড়িয়ে, ধর্মতলার মোড় চিরে, স্টেটসম্যান হাউস ডানে রেখে সত্যযুগ অফিসে। আমার পেছনে ফেলে আসা কার্জন পার্কে পুলিশের বুটের তলায় রক্তাক্ত হচ্ছে গান - সাথীদের খুনে রাঙ্গা পথে দ্যাখো - হায়নার আনাগোনা ...

    সেদিন -

    প্রথম দেখা হয়েছিলো বোধহয়
    পথসভায় বৌবাজারের মোড়ে।
    চিলের ডাকের তীক্ষ্ণ গলায় তুমি
    বরানগর কাশীপুরের মা ।
    মিছিল থেকে মিছিল ঘুরে ঘুরে
    তোমার গলায় স্লোগান উত্তাল
    আছড়ে পরে ধর্মতলা স্ট্রিটে
    রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি চেয়ে।
    গোপন মিটিং ছাপাখানার ঘরে
    বিশে জুলাই ভিয়েৎনামের দিনে
    মিছিল হবে গানের কবিতার
    শূণ্য থেকে শুরুর জেদী ডাক।
    সেদিন তুমি বজ্র মুঠিতে
    ধরেছিলে আমার করতল
    লাঠির মুখে দাঁড়িয়ে একসাথে
    দিয়েছিলাম হামলা বোলের ডাক।
    আঘাত আঘাত পাহাড় ভেঙ্গে নামে
    তুমি আমায় আড়াল করেছিলে।
    ঝটকা দিয়ে তোমায় বুকে তুলে
    লাফিয়ে পার রাস্তা ও ফুটপাথ।
    রাতে হরিণঘাটার ফাঁকা বুথে
    ক্লান্ত মাথা তোমার কাঁধে ঝুঁকে
    হঠাৎ রক্ত জমাট ঠোঁটে নামে
    গ্রেনেড হয়ে তোমার চুম্বন।
  • বিভাগ : কাব্য | ২০ জুলাই ২০২১ | ২৩১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
ছাদ - Nirmalya Nag
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 122.164.18.53 | ২০ জুলাই ২০২১ ১৩:৩৫495961
  • মব ফ্রেনজি সত্যি একটা উদ্ভট জিনিস। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন