• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  পুজো ২০১০

  • সর্প ভয় ও প্রেম

    মাহবুব পিয়াল
    ইস্পেশাল | পুজো ২০১০ | ০১ অক্টোবর ২০১০ | ১৪৫ বার পঠিত
  • 'খা খা বখ্যিলারে কাঁচা ধইরা খা/ তর শত্তুর রে খা তর সতীনরে খা...."। লোক পালা 'অরূণ বরুণ কিরণ মালা'র মত সাপ নিয়ে এমন কাহিনী ও গানের অভাব নেই বাঙালীর জীবনে। রাস্তার ধারে জমে ওঠা কোন মজমায় কান পাতলেই আজো শোনা যায় সর্প বশীকরণের কল্পিত যাদু ভরা দেশ "কামরূপ কামাখ্যা' কে নিয়ে ক্যানভাসারদের না না গাল গল্প। মনসা দেবী ও তার ভক্ত সর্পকূলের কথা ওরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করে। মনে হতে পারে সাপের কাহিনী শুনিয়ে মানুষকে আকর্ষণ করার এ এক সহজতম পন্থা। বেদেনীদের কন্ঠশ্রুত "দারুণ বিষে খাইল লখাইরে/ রেহেবেদীর কি হইলরে' গানের সাথে সাপের খেলা সবাইকে চমকিত করে। যাযাবর বেদে বেদিনীরা দেশজুড়ে সাপের খেলা দেখিয়ে ও বিশ নামানোর না না গল্প শুনিয়ে মানুষের সর্প বিশ্বাস ও প্রেম আরও উস্কে দেয়। 'বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না' -র এত জনপ্রিয়তাই বলে দেয় এতে কোন চিন্তার জোগান রয়েছে। অন্যদিকে, এখন ঢাকার জানজটে আটকে পড়া যে কোন যাত্রীর কাছে বেদেনীদের সাপ দেখিয়ে ভীতি সৃষ্টি অন্যধারণারও জন্ম দেয় ।

    অনেক অঞ্চলেই কৃষকরা আজো ধান কাটতে গিয়ে ভুলে ধান গাছে ঝুলে থাকা সাপের মাথা না কেটে ফেলে এই নিয়ে আতঙ্কে থাকে। ওদের ধারণা দেহহীন সাপের মাথা রাতের বেলা এসে কামড়ে দেবে; এমন ভয়ের শেষ নেই। স্থানীয় জনগোষ্ঠী সর্বদাই নানান জাতের সাপ ও ওদের আচরণ সম্পর্কে সচেতন। ধুৎরাজ, শঙ্খিনী, সুতানালী, ফানক, ধারাইশ, জিংলাপুরা, ঘরফরি, মাইট্টা, ধুরা প্রভৃতি সাপের কোনটা কোথায় থাকে, কোনটার বিষ আছে, কোনটার নেই এসব ওদের জানা। ডোরা (ধুরা) সাপের বিষ নেই। কিন্তু সাধারণের ধারণা এই সাপে কাটা মানুষ গোবরে পা রাখলে বিষে আক্রান্ত হয়। এমন গল্পও প্রচলিত আছে, ডোরা সাপ গোবড়ে বিষের ভান্ড রেখে জলে নেমে ছিল। কিন্তু ফিরে এসে বিষটুকু আর ফেরত পায়নি। সেই থেকে ডোরা সাপের বিষ গোবড়েই রয়ে গেছে। সাপ সম্পর্কে এমন অজস্র ধারণা আজো প্রচলিত রয়েছে।

    নি:শ্ছিদ্র বাসর ঘরে লখিন্দরকে সাপে কাটার কাহিনী আজো মানুষের মনে দাগ কেটে আছে না না কারণে। জিইয়ে রেখেছে সর্পভীতিও। সর্পদেবী মনসার পুঁজোয় দেখি অংশগ্রহণে জাত পাত কিংবা ধর্মের কোন বালাই থাকেনা। এর মূলে শুধুই কি সর্পভীতি? না আরও কিছু কারণ রয়ে গেছে? ভাবনার অন্ত নেই।


    নব্বইয়ের গোড়ার দিকে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার মগডোলা গ্রামে। কৃষকেরা সেখানে জমে ওঠা আসরে রাতভর সাপের কাহিনী শুনিয়েছিল। বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী ও মনসার আদিষ্ট সাপের ছেআঁবলে চান সওদাগরের পুত্রদের করুণ পরিণতির কথা ভাসান গানে গেয়ে সেদিন সবার চোখ ছল ছল করে উঠেছিল। এখনো কানে ভেসে আসে ওদের গান:

    মইলানা মইলানাগো পতি বাসর করলা খালি
    রাইত পোহাইলে বলবেগো লোকে বেউলা অইল রাঢ়ি গো
    আমার পতি কেন মইল

    সেই আসরের সবাই ছিল মুসলমান। আমার মনে হচ্ছিল শধু সর্পভীতিই নয় জীবনের কান্নাকেও ওরা ভাসানের সঙ্গে সঙ্গে জাগিয়ে তুলেছিল।


  • কয়েকবছর পরের কথা। তখন টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানার চারাণ গ্রামে থাকি। গ্রামের পাশেই সাপাই নদী। সাপের মত জাগায় জাগায় বেঁকে গেছে বলে এ নদীর নামও সাপাই। ঘোর বর্ষায় একদিন দেখি নৌকা করে গান গেয়ে যাচ্ছে একদল লোক। দলের একজন পুরুষকে দেয়া হয়েছে নারীর বেশ। আরেকজনের মুখেও বেশ রঙ চঙ মাখানে। ঘাটে নেমে ওরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে নেচে নেচে গান গাইছিল। ভাসান গানের সাথে লোক নৃত্যের তালে তাল মেলাচ্ছিল ছেলে বুড়ো যুবা যুবতীরা। গানের কথা ছিল এমন:

    তুমি জাগো জাগো আমার পতি
    কেমনে যাইব নাগো আমি ভাল বাইন্না পাড়া দিয়া
    বাইন্না পাড়ার লোকেগো জানি বলবে বেউলা কান্‌ঞ্‌চা চুলের রাঢ়ী

    গানের ভাবের সাথে কেউ কেউ মাটিতেও গড়াগড়ি খাচ্ছিল। এভাবে ভাসান গেয়ে ওরা বাড়ি বাড়ি থেকে চাল ভিক্ষা নিল। জানতে পারলাম এই দলের সবাই মুসলমান কৃষক। বেহুলার সাজ নেয়া মধ্যবয়স্ক এক কৃষক জানালেন সংগৃহিত চাল ডিম ও অর্থ ওরা তুলে দেবে ওদের গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে। শ্রাবণ সংক্রান্তিতে মনসার পুজোয় তাদের এ সংগ্রহ ব্যয় হবে। নিজেরা পুজো না করলেও জলে ও ডাঙায় সাপের হাত থেকে মুক্তি পেতেই ওদের এই কর্মকান্ড। অতিসম্প্রতি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জেও একই নিদর্শণ লক্ষ্য করি।

    শুধু কি মনসা পূজো? পঞ্চ নাগের পুজাও এখানে আজো প্রচলিত। অতি নম্প্রতিও কিশোরগঞ্জের নিকলীতে দেখেছি মনসার মূর্তির সাথে পঞ্চ নাগের বিগ্রহ নিয়ে বাড়ি ফিরছে লোকজন। তিতাসের মালেআ কিংবা অন্যান্য অঞ্চলের কৈবর্ত্য ছাড়া মুসলমান মাঝিরাও গঙ্গা দেবির পুজা করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বুড়ি নদীর তীরে প্রায় আঠার বছর আগে দেখা এমন এক গঙ্গা পূজার কথা আজো মনে পরে। । মাঝিরা বদর পীরের শিরনি দেয়। ওরা কথিত জিন্দাপীর খোয়াজেরও ভক্ত। কিন্তু মুসলমান মাঝিরা এভাবে পুরুত ডাকিয়ে পুজো করছে এমন দেখিনি। ওদের কাজকারবার সব জলে। এত কিছু করেও জলে অশরীরী আত্মা ও সাপের হাত থেকে মুক্তি পেতেই ওরা গঙ্গা পুজার আয়োজন করে। মৌসুমের শুরুতে শুধু মাঝিরাই নয় মেছোরাও চিনি লবণ জলে ঢেলে গঙ্গা দেবীকে তুষ্ট করতে চায় জলে নিরাত্তার আকাঙ্খায়। লোকাচারের এমন অসখ্য নিদর্শন রয়েছে।

    বাঙালীর জীবন, চিন্তা ও মননে সাপের বিচরণ অপ্রতিরোধ্য। শধু বাংলা কেন? নাগ নাগিনীর কাহিনীপ্রীতিকে এক ভারতবর্ষীয় প্রপঞ্চ রূপেই মেনে নেয়া যায়। দক্ষিণ কিংবা উত্তর ভারতীয়, বলিউড এমন কি ঢালিউডী ছবির কাহিনীতেও নাগনাগিনীর প্রাধান্য সেকথাই প্রমান করে। সর্পীনির দেহ সুষমার সাথে কাম-কামিনীর প্রতীকী প্রকাশ বিশ্ব জুড়েই বিদ্যমান। কিন্তু গাঙেয় অববাহিকার এই জনপদের মত কোথাও সাপের অবস্থান এত বৈচিত্র ধারণ করেনি। এখানে সর্পভয় ও প্রেম পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে।

    ছবি- মোল্লা সাগর
  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ০১ অক্টোবর ২০১০ | ১৪৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ~ | 2405:201:8005:9947:cdd6:1ed3:e4b8:bbb | ২৫ জুলাই ২০২১ ২৩:১৯496096
  • ~

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন