• হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  •  প্রমিথিউসের মশালধারী দুই আলোকযাত্রী(পর্ব ১) - সমীর ঘোষ   

    Samir Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ১৫ মে ২০২১ | ৩৫৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • পর্ব ১ |

     মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে বাংলা হারাল প্রমিথিউসের মশালধারী দুই আলোকযাত্রীকে। একজন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক স্মরজিৎ জানা ও  অন্যজন  মরণোত্তর দেহ ও অঙ্গদান আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্রজ রায়। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্মরজিৎ জানা আশির দশকেই ‘উৎস মানুষ’-এর মত পত্রিকার পাতায় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন মানুষের নানা  প্রথাগত ধ্যানধারণা নিয়ে। যৌনকর্মীদের অধিকারের জন্য কিছু করে দেখানোর লড়াইয়ের পথিকৃৎ তিনিই। অন্যদিকে সব কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে বাংলায় দেহদান, অঙ্গদান আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি হিসেবে আজীবন আলোর পথযাত্রী হিসেবে থেকেছেন ব্রজ রায়।

    স্মরজিৎ জানা

     

    সারা ভারতে যৌন কর্মীদের নিয়ে আন্দোলনে গবেষক চিকিৎসক স্মরজিৎ জানার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ  ছিল বলে মানা হয়। তাঁকে বলা হয় ‘‌ফাদার অফ সেক্স ওয়ার্কার্স মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্মরজিৎ জানার হাত ধরেই সোনাগাছিতে ১৯৯৫ সালে তৈরি হয় যৌনকর্মীদের সম্পূর্ণ নিজস্ব সংগঠন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি। বিভিন্ন যৌনরোগ আটকাতে এবং বিশেষত যৌনপল্লিতে এইচআইভি সংক্রমণ রোধে তাঁর নেতৃত্বে প্রথমে সোনাগাছি এবং পরবর্তীতে রাজ্যের অন্যান্য যৌনপল্লিতে শুরু হয় সচেতনতা শিবির। দেশের অন্যান্য রাজ্যেও  সচেতনতা শিবির তৈরি করেন তিনি।   

     সেইসঙ্গে যৌনকর্মীদের স্বাবলম্বী করতে একদিকে যেমন তাঁর উদ্যোগে সমবায় তৈরি সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয় তেমনি তাঁদের সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফেরানোর উদ্যোগ নেন তিনি। সমাজে যৌনকর্মীরাও যাতে সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ সুবিধা পান, সেজন্যই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।  সমাজ, যৌনকর্মী এবং তাঁর ভাবনা নিয়ে পরে আসছি। আমাদের কম বয়সে, আশির দশকে গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সেই সবকিছুকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়ার সে সময়ে অনেকটাই আলোকিত করেছিল ‘উৎস মানুষ’ পত্রিকা। যা করে চলেছিল  অন্ধ কুসংস্কার,ধর্মীয় ভণ্ডামি, জ্যোতিষের বুজরুকির বিরুদ্ধে সজোরে  থাপ্পর কষানোর কাজ। ‘উৎস মানুষ’-এর পাতায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে  আমাদের ভুল ধারণাকে ভেঙে খান খান করে দিয়েছিলেন  স্মরজিৎ জানা। গাদাগাদা পয়সা দিয়ে কেনা  ফর্সা হওয়ার ক্রিম  থেকে  যন্ত্রণার মলম, কাশির সিরাপ থেকে  হজমির ওষুধ নিয়ে কি ধরনের ধাপ্পাবাজি চলে বিভিন্ন লেখালিখিতে তার পর্দাফাঁস করে  দিয়েছিলেন। বিভিন্ন কৌটো ভর্তি শক্তি, বোতল বন্দি এনার্জি যে আসলে  বিজ্ঞাপনের ধাপ্পাবাজি  তা 'প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয়' সিরিজে দিনের আলোর মত পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন তিনি।  শুধুমাত্র  উৎসমানুষ পত্রিকার লেখক ও সংগঠক হিসাবে নয়, ড্রাগ একশন ফোরামের আন্দোলনে, ভোপালের গ্যাসপীড়িতদের আন্দোলনের সমর্থনেও স্মরজিৎ জানা ছিলেন অক্লান্ত সৈনিক।

      

    ৭০-৮০-র দশকে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনে  যুক্ত হওয়া স্মরজিৎ জানা নব্বইয়ের দশকে  যুক্ত হয়ে পড়েন সোনাগাছির যৌনকর্মীদের  ক্ষমতায়নের কাজে । তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি।এই উদ্যোগের পেছনে তাঁর ভাবনা, লক্ষ্য নিয়ে অনেকেই সহমত হন নি।এই  সময় তাঁর সঙ্গে  পুরানো  কিছু বন্ধুর  মতপার্থক্যও হয়।

    একটা সময় একদিকে  মালকিনের ভয়, অন্যদিকে পুলিশ আর স্থানীয় দাদাদের দাপটে রীতিমতো নিজের স্বাস্থ্য তুচ্ছ করেই রোজগারের কাজ চালিয়ে যেতে হত  যৌনকর্মীদের। নিষিদ্ধপল্লিতে মারণ ব্যধি এইডস-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি নাবালিকা পাচার, যৌনকর্মীদের অধিকার দাবিদাওয়া বুঝে নেওয়ার লড়াই শুরু হয় তাঁর তৈরি দুর্বারের  তার হাত ধরেই।  স্মরজিৎ জানা দাবি তোলেন যৌনপেশাকেও আর পাঁচটা পেশার মতো স্বীকৃতি  দিতে হবে। সামনে আসে ‘গতর খাটিয়ে খাই শ্রমিকের অধিকার চাই’ শ্লোগান।

    আর এতেই গেল গেল রব ওঠে।আলোচনা- সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।প্রশ্ন ওঠে বেশ্যাবৃত্তিকে কি ভাবে শ্রমিকের অধিকারের  আইনি স্বীকৃতি দেওয়া যাবে। আইনি স্বীকৃতি পেলে আজ আমার বাড়ির মেয়ে,কার তাঁর বাড়ির বউ এ কাজে আসতে চাইলে কিভাবে ঠেকানো যাবে? দেহ ব্যবসার মত অতি প্রাচীন,ঘৃণ্য পেশাকে কেন স্মরজিৎ জানা আইনি স্বীকৃতি  দিতে চাইছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। অনেকে অভিযোগ করেন স্মরজিৎ জানা আসলে উন্নত বিশ্বের ভোগবাদী দুনিয়ার দালালি করছেন। ২০০৫ সালের অগষ্ট মাসে উৎস মানুষ পত্রিকা ‘যৌনদাসী না যৌনশ্রমিক’ শিরোনামে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। তাতে অনেকেই  স্মরজিৎ জানার এমন উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেন। কিন্তু নানা সমালোচনাতেও দমে যান নি তিনি। সারা ভারতে যৌন কর্মীদের নিয়ে আন্দোলনে গবেষক চিকিৎসক স্মরজিৎ জানার ভূমিকা  অন্য মাত্রা পেয়েছে। কো–অপারেটিভ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, পরিচয়পত্র,চিকিৎসা ইত্যাদির ঘেরাটোপে পাল্টে গেছে যৌনকর্মীদের অধিকারের ভূবন।

     আর এখানেই স্মরজিৎ জানা অন্য অনেকের থেকে আলাদা। এক কথায় পথ প্রদর্শক। নতুন কিছু করে দেখানোর মানুষ।দেহ ব্যবসার আইনি স্বীকৃতি ঠিক কি ভুল সে তর্ক জারি থাকবে, কিন্তু সোনাগাছি প্রোজেক্ট যে অনেক দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অনেক মহিলাকে ঘুরে দেখানোর পথ দেখিয়েছে  তাতে কোনও দ্বিমত নেই। আজকের সমাজ হারাল সেই সমাজেরই চোখ,কান খুলে জাগিয়ে তোলা একজন মশালধারীকে।


    পর্ব ১ |
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৫ মে ২০২১ | ৩৫৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anindita Roy Saha | 160.202.36.180 | ১৫ মে ২০২১ ২০:৪১106032
  • এই আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত থাকুক তাঁর উত্তসূরীদের হাত ধরে। দূর্বার গতিময় হোক , আরো এগিয়ে চলুক আলোর অভিমুখে। পথিকৃৎ মানুষটিকে সহস্র নমন। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন