• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  ইদের কড়চা  ইদের কড়চা

  • বরকত নামে কেউ একজন ছিল এই শহরে

    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    ইস্পেশাল | ইদের কড়চা | ১৩ মে ২০২১ | ৭৩৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ফোনটা পেয়েই এই সাত-সকালে বের হতে হলো। জিরো পয়েন্টে একটা ডেড-বডি পাওয়া গেছে। আপাতত এটুকুই জানতে পেরেছি। সাব-ইন্সপেক্টর কল করে জানালেন বিষয়টি। এ আর নতুন কী! প্রথম প্রথম এ-ধরনের সংবাদ শুনে বেশ ঘাবড়ে যেতাম, মনটা বিষিয়ে উঠত, আবার এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদও জেগে উঠতো ভেতরে ভেতরে। এখন হই বিরক্ত— সময়মতো না ঘুমাতে পারার বিরক্ত; খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম ঠিকঠাক না হওয়ার জন্য বিরক্ত, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দিতে না পারার কারণে বিরক্ত।
    গিয়ে দেখি একঝাঁক মানুষ জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারও কারও চোখ থেকে ঘুমের ঘোর তখনো কাটেনি। কেউ কেউ বেরিয়েছিল হাঁটাহাঁটি করতে, লাশটা দেখে সংগত দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে গেছে। সবার দৃষ্টি খানিকটা ওপরে। জিরো পয়েন্টের মাঝামাঝি পরিত্যক্ত পোলের সাথে গলাই দড়ি পেঁচিয়ে ঝুলে আছে মাঝবয়স্ক এক লোক। লোকটির কাঁধে বসে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে একটি কাক। এতগুলো লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। নিজেকে নিরাপরাধ প্রমাণ করার জন্যই কিনা কা-কা-কা করেই যাচ্ছে; কিংবা ঘটনার সাক্ষী দিচ্ছে কি সে?
    আমাদের পরিভাষায় লোকটার নাম এখন ডেড-বডি। বোঝা গেল কেউ মেরে এখানে টাঙিয়ে রেখেছে। খুনিরা মাঝে মধ্যে পাবলিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে এ-ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়— কখনো আবার শরীর থেকে হাত-পা-মাথা আলাদা করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ছড়িয়ে দেয়। একবার আমাকে সেরকম একটা কেস সামলাতে হয়েছিল— শরীর মেলাতে মেলাতে হয়রান। মাথাটাই পাওয়া যায় না। শরীর দেখে সরকারি পক্ষের একটা পরিচয় দাঁড় করানো হলো, কিন্তু মাথা পেয়ে দেখা গেল বিরোধীদলের লোক। পুরা কেসটাই উল্টে গেল।
    পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে করতে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম জনতার দিকে। জনগণ জানে এ-ধরনের পরিস্থিতিকে কী করতে হয়— সবাই একপা সরে শিশুর মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সবার মুখে একই উত্তর— আমি কী জানি, আমি তো মাত্রই দাঁড়ালাম এখানে— বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না। আমার একটাই প্রশ্ন, ঝুলন্ত ডেড-বডিকে কেউ চেনে কিনা? সবাই আরও একবার ঝুলন্ত দেহটা দেখে নিয়ে এমন একটা ভাব করল যেন এই প্রথম তারা লোকটিকে দেখছে। এই শহরের উপস্থিত জনতা ওকে কখনো দেখেছে বলে মনে করতে পারল না। মানে বহিরাগত বলে ধরে নেয়া যায়। অন্য কোনো জেলার মানুষ তুলে এনে খুন করে এখানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
    বডিটা নামানোর ব্যবস্থা করা হলো। পোস্টমর্টেমের পর মৃত্যু কীভাবে এবং কতক্ষণ আগে হয়েছে সেটা জানা যাবে। তবে তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কে মারল, কেন মারল, সেটা বের করতে বেশ বেগ পোহাতে হবে। আদৌ ঠিকঠিক সব পাবলিককে জানাতে পারব কিনা এখনই বলা যাচ্ছে না। লোকটিকে প্রথম ধাক্কায় স্থানীয় জনগণ যখন চিনতে পারেনি, আমিও শহরে আছি কম দিন হলো না, ছিঁচকে চোরের গুরু থেকে রাঘব-বোয়াল পর্যন্ত চেনা; তাদের কেউ বলে মনে হচ্ছে না যখন, তখন কেসটা সহজ হবে না বলেই মনে হচ্ছে। এখন আমাদের বের করতে হবে লোকটি কোন দলীয় বা মতাদর্শীয়।
    ডেড-বডিটা থানায় নেওয়া হলো। এরই ভেতর খবরটা শহর থেকে রাষ্ট্র হয়েছে। কাগজ ও টেলিভিশনের রিপোর্টাররা এসেছে। ওরা যা বলতে চায়, আরও একজন খুন হয়েছে, মানে প্রশাসন আরও একজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
    এখন পর্যন্ত লাশটির দাবি নিয়ে কেউ আসেনি। পরিবার কিংবা চেনা জানা কেউ থাকলে কিঞ্চিৎ জেরা হয়ে যেত। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম লোকটি এই শহরের বাসিন্দা না, খুনিরা অন্য কোথাও থেকে তুলে নিয়ে এসে এখানে লটকিয়েছে। কিন্তু এরই মাঝে এক মুদির দোকানদারের কাছ থেকে জানা গেল লোকটি তার দোকান থেকে তেল-ডাল জাতীয় নিত্যদরকারী এটাসেটা কিনত। মাসিক কেনা। এও বলল, লোকটি নাকি কখনো কোনো কিছু নিয়ে দামদর করেনি। এ পর্যন্তই। অর্থাৎ লোকটি এই শহরেরই।
    টিভি চ্যালেনগুলো খবরের ফাঁকে ফাঁকে, স্ক্রলে জানিয়ে দিয়েছে রাজশাহী শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে একটা অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবারে এমনিতেই সংবাদ কম থাকে। একটা পেলে ওটাই টেনে লম্বা করে মিডিয়াকর্মীরা, তার ওপর বিভাগীয় শহরের ঘটনা, তাই একটি বেশিই ফোকাস পাচ্ছে। খুনিরা এত হিসাব করে খুন করেছে কিনা বলা যাচ্ছে না। মিডিয়া আপাতত খবর প্রচারের বাইরে কিছু করেনি। বিশেষ কেউ হলে এতক্ষণে টক-শো শুরু হয়ে যেত। আমাকে লাইভ সংযোগে দেখা যেত। খুনের আলামত প্রকৃতি যাই হোক, কথা আমাকে একইরকম বলতে হবে, জনগণের অজানা নয় সেসব, তবুও ওরা ডাকবে। এখন পর্যন্ত খুব একটা হইচই হয়নি। অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার— বিষয়টা এ দেশের জনগণের খেতে খেতে অরুচি এসে গেছে। তবে অজ্ঞাত লাশকে কী করে জনগণকে খাওয়াতে হয় তা এ-দেশের একটা শ্রেণির ঠিকই জানা! পরদিন শহরজুড়ে শুরু হলো সরকার-বিরোধীদের জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি। তাদের ভাষ্যে, যাকে খুন করা হয়েছে, সে তাদেরই কর্মী। এ-হত্যা ক্ষমতাসীন দলের লোকদের কাজ। আমরা প্রশাসনের লোকজন ২৪ ঘণ্টায় যা করতে পারিনি বিরোধী দল নিমেষে তাই করে দেখাল— লোকটির আতাপাতা সব বের হয়ে এলো ওদের মিছিল ধরে। নাম বরকত। বরকত মিয়া কিংবা আলী। আপাতত যাচাইবাছাই না করে আমাদের সেটা মেনে নেওয়া উচিৎ হবে না। যেহেতু সরকার-বিরোধীদের ভাষ্য, আমাদের চেষ্টা থাকবে বিপরীত কিছু বের করার। এখন এটা রাজনৈতিক ইস্যু। ঘটনা যাই হোক, বিরোধীদলের বিকল্প ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে হবে, ওপরের নির্দেশ, নির্দেশ খাতাকলমে না এলেও এটুকু বুঝে নেয়ার মতো জ্ঞান আমাদের হয়েছে।
    জনগণকে আবার ভরসা কম। হুজুগে পড়তে সময় লাগে না। ‘প্রচারেই প্রসার টাইপে’র নীতিতে তারা বিশ্বাসী। এরইমধ্যে ফেসবুকে একটা ছেলে ছবিসহ পোস্ট দিয়েছে— ‘কোটাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে প্রাণ হারাতে হলো নিরপরাধ এই ভাইকে!’ ছবিতে দেখা যাচ্ছে জিরোপয়েন্টে কোটা-সংস্কার পক্ষের আন্দোলন থেকে কেউ একজন সেলফি তুলছেন, দূর থেকে সেলফি ক্যামেরার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে লোকটি; মানে আলোচ্য বরকত। হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে দর্শক, পাশ কাটিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আপাতত এটাকেই ‘ইস্যু’ করে তুলেছে একটা চক্র। তারা শেয়ারের পর শেয়ার দিয়ে ফেসবুক গরম করে ফেলেছে। যে ছেলে পোস্টটি দিয়েছে তার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ করা চলে। তার বিরুদ্ধে এরই ভেতর ৫৭ ধারায় একটা মামলা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে ঘটনাটি এখন আমাদের সম্ভাব্য সবগুলো অ্যাঙ্গেল থেকে সামলাতে হবে।

    তৃতীয় দিন শহরে সরকার-বিরোধী জোটের হরতাল।
    ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত টক-শো পর্যন্ত গড়াল।
    ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এমপি মহোদয় মিডিয়াতে বললেন, আমাদের সরকার যখন নানান দিক থেকে সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই জনগণের কাছে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে সরকার-বিরোধী চক্র এই খুন করে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের অপচেষ্টা করছে। দেশের জনগণ তাদের এই কূটচাল ধরতে পেরেছে। বাংলার জনগণকে আর ওরা দিনেদুপুরে এইভাবে বোকা বানাতে পারবে না। জনগণ জানে কারা এ ধরনের জঘন্য ও ঘৃণ্য কাজ করতে অভ্যস্ত। বরকত আমাদেরই লোক। সে আজ সরকার-বিরোধী চক্রের রাজনীতির শিকার। এই বক্তব্যের পর থেকে বরকত সরকারিদলের লোক হিসেবে আমাদের খাতায় চলে এলো।


    সরকারি পক্ষের এই মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সরকার-বিরোধী নেতারা দেশবাসীকে জানিয়ে দিলেন, সরকার তাদের ব্যর্থতা থেকে জনগণকে মুখ ফেরাতে চাইছে। দেশ এই মুহূর্তে নানান সংকটের মধ্যে আছে, সেদিক থেকে জনগণকে ফিরিয়ে আনতেই সরকারের এই নতুন ইস্যুর আমদানি। দেশের জনগণ বোঝে, তাদের বোকা বানাতে গিয়ে সরকার নিজেই আজ বোকা বনে গিয়েছে। এ সরকারের পতন আজ জনগণের দাবি। তারা আবারও জোর দিয়ে বলল, বরকত তাদেরই লোক।
    রাজনীতিবিদরা যখন মাঠে নামেন, আমাদের তখন সক্রিয় দর্শক বনে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আমরা তখন নোট নিতে থাকি। এই নোট মানে টাকার নোট না, খাতার এন্ট্রি। পাশাপাশি উপরের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমাকে বলা হলো গোপনীয়তা রেখে বরকতের যাবতীয় বৃত্তান্ত বের করতে। খুনিদের পরিচয় তো বটেই। এসব ক্ষেত্রে ফাইন্ডিংস যাই হোক সেটা সরাসরি মিডিয়া বা পাবলিকের কাছে পৌঁছানো ঠিক না। সবদেশেই প্রশাসনের কাজকর্মের একটা একটা গোপন অংশ থাকে। আমার উচিত হবে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রেখেই বরকত-কেসের বাদবাকি অংশ তুলে ধরা।
    বরকতের বাড়ি শিরোইল। শহর থেকে অল্প কিছু দূরে। বাড়ি বলতে ছোট্ট দুটো ঘর। থাকে দূর-সম্পর্কের এক ফুফু ও তার দশ বছরের নাতি। বরকতই চালাত এই সংসার। সে মাইল দশেক দূরে কাটাখালি বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। বরকতের কোনো শত্রু ছিল কিনা জানতে চাইলে ফুফু কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘বরকুত আমার মা-মরা সেলি। আমারই কোলে-বুকে মানুষ। শত্রু তো মেলা দূরের কথা, ভাল করি কেউ তাকে চিনতুকই না!’ মহল্লার লোকদেরও একইভাষ্য— বরকতের মতো ভালো মানুষ এই মহল্লায় দুটো নেই। বুঝলাম, এসব কথায় আমাদের খুব একটা সুবিধা হবে না। সে যে ভালো মানুষ ছিল এ কথার বাইরে কারো কিছু জানা নেই বরকত সম্পর্কে। যাকে কেউ জীবনে একটা চড়ও মারেনি, তাকে কেউ খুন করতে পারে— এ কথা কেউ চিন্তায় করতে পারছে না। কেউ কেউ এমনও বলল, লোকটির নাম যে বরকত ছিল তা তার মৃত্যুর পরেই জানল তারা। এলাকার অনেকে ভাদু বলেও ডাকত তাকে।
    বরকতের কর্মস্থল পর্যন্ত আমাদের যেতে হলো। এখানেও সেই একই কথা— বরকত ভালো লোক ছিল, ‘সাতেও ছিল না, পাঁচেও না’ টাইপের— লোকজনের ভাষ্য শুনে মনে হলো আমরা বরকতের চরিত্র-সনদ নিয়ে বেড়াচ্ছি!
    জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে প্রথম উঠল কথাটা। আমাদের এ কয়দিনে একবারও মাথায় আসেনি। সাব-ইন্সপেক্টর বলল— স্যার, আত্মহত্যার কেস নাতো? আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানালেন— বরকত আত্মহত্যা কেন করতে যাবে? সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ ছিল। হ্যাঁ, বৌ পালিয়েছে অন্য একজনের সাথে— সেও মেলা বছর, কিন্তু সেটা তো আর এতদিন পর আত্মহত্যার কারণ হতে পারে না! পুরুষ মান্ষের বৌ জুটতে কতক্ষণ!
    বরকত যে আত্মহত্যা করছে সেটা আমিও মনে করি না। ব্যক্তিগত সংকট বা হতাশা থেকে কেউ আত্মহত্যা করলে নিজের বাড়িতে করবে, এভাবে শহরের সেন্ট্রাল পয়েন্টে কেউ আত্মহত্যা করে নাকি? ঘরের সিলিংফ্যানে ঝুলে মরলে বা ঘুমের বড়ি খেয়ে বিছানায় পড়ে থাকলে আমাদের এতদূর এগুতে হতো না।
    পুরো শহর চষে বরকতের জীবনবৃত্তান্ত বিশেষ কিছু জানা গেল না। কবে এসএসসি পাশ করেছে, ফলাফল কি ছিল, এরকম নথিভুক্ত তথ্য পেতে সময় লাগল না; কিন্তু ওর রাজনৈতিক বিশ্বাস, খুন হওয়ার কোনো একটা ভ্যালিড কারণ, কিছুই পেলাম না আমরা। যা জানা গেল তা থেকে তার খুনিদের চরিত্র আন্দাজ করা মুশকিল। একটা মানুষ এই শহরে জন্ম থেকে জীবনের মাঝ বয়স অবধি পার করে দিল অথচ কেউ তার কোনো খোঁজ রাখেনি। বেঁচে থাকতে যে মানুষটার কোনো অস্তিত্ব ছিল না সমাজে, আজ মৃত্যুর পর সেই মানুষটাই টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে উঠেছে। এখন সবাই জানতে চায় বরকতকে। সামনে নির্বাচন, বরকত-ইস্যুকে একটা কার্যকরী অস্ত্র বানাতে চায় সরকার-বিরোধী জোট। প্রধানমন্ত্রী বরকতের অসহায় পরিবারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থসহযোগিতা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। এই কেস আর বেশিদূর টানা ঠিক হবে বলে মনে হচ্ছে না। একটা কারিশমা আমাদের করতেই হবে। আমরা ফের হাজির হলাম বরকতের বাড়িতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় অলরেডি বলে ফেলেছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনির পরিচয় উন্মোচন করা হবে। বাড়ি সার্চ করে তন্নতন্ন করে ফেললাম আমরা— বরকতের সাথে কাদের যোগাযোগ ছিল জানা দরকার। এরই ভেতর বরকতের জঙ্গিতৎপরতা ছিল কিনা, এটা নিয়েও কথা উঠতে শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত ভালো মানুষ পরিচয়টাকে এখন আমাদের সন্দেহ করার সময় হয়েছে।
    অতিরিক্ত ভালো মানুষ এদেশে আর কেউ আছে নাকি? থাকলে নিশ্চয় তার কোনো মতলব আছে! আমাদের ভেতর থেকেই একজন বললেন।
    তা ঠিক, মতলববাজরাই এখন ভালো মানুষ হয়— অন্যজন সায় দিলেন।
    স্যার একটা কবিতার বই পেলাম— ‘শেষের কবিতা’। কয়েকঘণ্টা সার্স করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা ছেঁড়া বই আমার হাতে দিয়ে একজন বলল। এমন আগ্রহ নিয়ে বলল যেন কবিতার বই তো না, বোমা পেয়েছে!
    কবিতার বই না। উপন্যাস। অন্য একজন মৃদু হাসি দিয়ে বলল।
    আপনার পড়া মনে হচ্ছে? বইটার বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটা ধারণা নেওয়া দরকার ভেবে আমি জানতে চাইলাম।
    না স্যার; চাকরির পরীক্ষার সময় জেনেছি। নামে কবিতা আছে বলে সবসময় আমরা কাব্যের ঘরে টিক দিতাম। বলল সে। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসের নাম কবিতা দেওয়াতে কত লোকের যে চাকরি হলো না স্যার! কথাটা মশকরার মতো শোনালেও খুব সিরিয়াস বলে মনে হলো তাকে।
    একটা কবিতার বই, সরি উপন্যাস, আর অনেক দিনের পুরোনো একটি ডাইরি পাওয়া গেল। বইটার প্রচ্ছদের অংশবিশেষ এবং কিছু পাতা তেলাপোকায় খেয়েছে। ডায়েরির পাতাগুলোরও খসে পড়ার দশা। ডায়েরি-বই দুটোই সাথে নিলাম। গাড়িতে সময় কাটানোর ছলে ডায়রির পাতাগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। লোনা-ভ্যাপসা একটা গন্ধ। পৃষ্ঠাগুলো খালি। লেংচিয়ে লেংচিয়ে দুয়েকটি পৃষ্ঠায় সংসারের হিসাব কষা। শেষের দিকে একটা পৃষ্ঠায় এসে চোখ আটকে গেল। বাচ্চা ছেলের মতো অক্ষরের পর অক্ষর বসিয়ে লেখা : ‘আমিও চাই সকলে জানুক আমাকে। জানুক বরকত বলে কেউ একজন ছিল এই শহরে।’ এইটুকুই। তারিখ ২০শে এপ্রিল। ঘটনার আগের রাত। তার মানে, হাতের লেখা বরকতের হলে, কেসটা আত্মহত্যার। ইঙ্গিতটা সেরকমই। হয়তো সাধারণ মানুষের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ফেলতে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে ওর ভেতরে, দ্রোহ জেগে উঠেছে অবচেতন থেকে। তাই পরিকল্পিতভাবে বেছে নিয়েছে এই আত্মহননের পথ। এ ধরনের প্রবণতা থেকে মানুষ ক্রিমিন্যালও হয়ে যেতে পারে। একবার আমেরিকায় একজন সিরিয়াল কিলার হয়ে যায়। অখ্যাত সাধারণ একজন মানুষ ‘খ্যাত’ হওয়ার জন্য বেছে বেছে সমাজের বিখ্যাত মানুষদের খুন করতে থাকে। যদি বরকতের ক্ষেত্রে সেইরকম প্রবণতা কাজ করে থাকে, তবে শালা সফলও হয়েছে। মনে মনে ভাবি আমি। আবার আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। যদি ঠিকও হয়, এ সত্য দেশবাসীর সামনে উন্মোচন করা যাবে না। ঘটনার এ পর্যায়ে এসে খুব হাস্যকর শোনাবে। এমনিতেই মানুষের মুখে মুখে প্রবাদের মতো দাঁড়িয়ে গেছে— ‘পুলিশ কিনা পারে!’ এরচেয়ে আমাদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য অনেক কাজের হবে কেসটি অনন্তকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা; অথবা রাজপথ থেকে যে কাউকে তুলে এনে খুনি সাজিয়ে একটা পাবলিক-সমাধান টানা। কিংবা অন্যকিছু করা— সংগত কারণেই এখানে সেটা গোপন রাখা হলো।
  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ১৩ মে ২০২১ | ৭৩৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ১৪ মে ২০২১ ২১:১০105979
  • গল্পটা এখান থেকে যে কোনো দিকে গড়াতে পারে। হতে পারে মেলোড্রামা, গোয়েন্দা গল্প বা রাজনৈতিক আখ্যান। 


    একজন নেহাত সাধারণকে তার মৃত্যুর পর লাশকাটা টেবিলে তুলে যেন ছুরির নিচে ছানবিন করে দেখা হচ্ছে। 


    ভালো লাগলো। 

  • Yashodhara Ray Chaudhuri | 103.50.81.162 | ১৫ মে ২০২১ ১২:৪৪106008
  • অসামান্য একটা লেখা। প্রথম লাইন থেকে শেষ লাইন অব্দি পড়িয়ে নেওয়া লেখা।  অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশের গল্প মনে পড়ায়। ধন্যবাদ এটার জন্য

  • বিপ্লব রহমান | ২১ মে ২০২১ ০৫:৪৮106221
  • পাকা হাতের লেখা,  রুদ্ধশ্বাসে পড়তে হয়। ক্লাইম্যাক্স পিকে ওঠার আগেই গল্প শেষ করার মুন্সিয়ানা আছে। ব্রাভো!

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন