• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • দেবেশ দা

    Siddhartha Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮১৭ বার পঠিত | ২ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • দেবেশদা 


    --- সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় 


      দেবেশদার কাছে প্রথমবার  যাই -- বাগুইহাটির সেই বল্মীক আবাসনে  -- আমার প্রথম বই " দ্রিঘাংচুর দিগ্ দর্শন " এর " দুটি খন্ড নিয়ে।  সেদিনের দুটি... না... তিনটি ঘটনার কথা কখনও ভুলবো না।  


    এক । 


    রবিবারের সকাল।  সারা রাস্তা জুড়ে বাজার বসেছে।  আবাসনটি খুঁজে পেতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল।  একটি মনিহারি দোকানে জিজ্ঞেস করেও হদিস  মিলল না। 


    পাশেই একটি সাইকেল সারাইওয়ালা একমনে কাজ করছিলেন।  একমনে যে কাজ করছিলেন না... বুঝলাম তখনই।  আমার দিকে প্রায় না তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন -- " দেবেশবাবুর কাছে যাবেন ?  ওই যে বাঁদিকে... ওই বাড়িটা... সাইডে গেট... চারতলায় । " 


    দুই । 


    পৌছলাম ওনার দ্বারে। এগিয়ে এলেন উনি। পরিচয় দিলাম।  দেবেশদা বললেন , 


    " খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়েছে তো ?  " 


    আমি বলেছিলাম -- 


    "নাহ , তেমন কিছু হয়নি। স্টলিয়ারনি লেনে ঢুকে  রাসকোলনিকভের মত গুনে-গুনে তেরটি ধাপ উঠে  ডানদিকে তাকালাম।


    দেখলাম সারি সারি ছবি।  তার মাঝেই দেখলাম -- এক্কেবারে যেন শম্ভু মিত্র মশাইয়ের ফোটোগ্রাফ  ।  বুঝলাম ঠিক  বাড়িতেই এসেছি।  " 


    আমার পাশে বসে স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে হো হো করে হেসে উঠলেন।  


    শ্রবণযন্ত্রটিকে ঠিক করে নিয়ে  বললেন -- " আপনি বুঝি অরুণ সোমের " ক্রাইম এ্যান্ড পানিশমেন্ট " র অনুবাদটি পড়েছেন ? "


    -- "হ্যাঁ । আপনার লেখা ভূমিকাটিও । সেখান থেকেই তো বললাম...।  একটা কথা বলি? .... 


    আপনার পুরোনো দিনের  ছবিগুলি কিন্তু সত্যি শম্ভু মিত্র-র মতো !  " 


     -- " উনিও তাই বলতেন ।  " 


    দেবেশদা কি একটু লজ্জা পেলেন ?  


    আমাকে চা ইত্যাদি  দিতে বলে ভিতর ঘরে গেলেন। 


    তিন।  


    পরিচারিকা অর্চনাদি চা-রসগোল্লা দিয়ে যেতে না যেতেই , অন্তঃপুর থেকে দেবেশদা ডাকাডাকি শুরু করলেন তাকে।


     " ওই লাল টুলটার ওপর দাঁড়াও... ওই দিকে... আরেকটা এদিকে আছে... "। 


    হাসিমুখে বাইরে এলেন। হাতে দুখানি বই। ভারি মিষ্টি হেসে বললেন -- " এই দেখুন আপনার  বই দুটো। আছে তো আমার কাছে ।  একটা সুশীল ( সাহা) দিয়ে গিয়েছিল... আর একটা আমি জোগাড় করে নিয়েছি। পেন্সিলে দাগ দিয়ে দিয়ে পড়েছি। এই যে...। " 


    আমার বই ! ...দেবেশ রায় ! ... সেই 


    ' লেখকের লেখক '! 


     কথা বলতে পারিনি।  বলুন তো , কথা বলা যায় ?  


     প্রণাম করতে গিয়ে দেখি , পা দুটি বেশ ফুলেছে । একটু ডাক্তারি করলাম । রক্ত পরীক্ষা করিয়ে দরকার হলে প্রোটিন একটু বেশি  খাওয়ার কথা বললাম। 


    উনি বললেন --


    "  এবার বুঝলাম , কেন ডাঃ সিদ্ধার্থ  লিখেছেন লেখকের নামে। ওটা না লিখলেও চলতো কিন্তু।  " 


                   ★★


     সাক্ষাতে, দীর্ঘ  ই-মেলে এবং কদাচিৎ  দূরাভাষে আলাপ বেড়েছিল । আমার বিস্ময়ও ।  দেবেশদা সম্পাদিত


     " সেতুবন্ধন " পত্রিকার জন্য লেখা চেয়েছেন। পড়ে জানিয়েছেন --" ভাল লাগল "।  


    আমি ধন্য হয়েছি বারবার। 


    কখনও যোগাযোগ করতে দেরি হলে মেল করেছেন  -- 


    " আপনার সাড়া না পেয়ে দুঃখ হয়েছে ।  " 


    দেবেশদা ! 


                ★★


     আর একদিন । 


    ভালো চা পছন্দ করতেন দেবেশদা।  একবার স্বাতী ( গুহ) এনে দিয়েছিল দারুণ এক চা ।  দেবেশদা বললেন  -- " পান করে দেখুন। এই চা কিন্তু  একেবারে 'হট শ্যাম্পেন ' !  জানিনা, অর্চনা কি বানিয়েছে । " 


    ইতিমধ্যে ওনার আরেক পুরোনো কর্মচারী,  ঝাড়ুদার বংশী এসে উপস্থিত। দেবেশদা বললেন -- " ও  আমার মালিও বটে।  ছাদের টবগুলোর যত্ন আত্তি করে।  " 


    আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম  -- " একে বংশী তায় মালি !  নাম পাল্টে বনমালী করে দিন । 


     অর্চনা , বনমালী -- আপনি যথার্থ দেবলোক সৃষ্টি করেছেন , দেবেশ দা !  " 


    ঝোঁকের মাথায় কথাগুলো বলে ফেলেই  আমি মাথা নিচু করে ফেলেছিলাম।  নিজেকে গভীর তিরস্কার করেছিলাম এমন চাপল্যর জন্য।


     আর উনি?  সেই তিস্তাপারের দেবোপম মানুষটি কি করলেন ?  


     হো হো করে হেসে উঠে বললেন -- 


    " ডাক্তারিটা ছেড়ে দিন। লিখুন। লিখুন।  ধারাবাহিক লিখবেন  ?  "  


    --- " ডাক্তারি করে কিছু হয়নি, দেবেশদা।  কিন্তু লেখার সেই ক্ষমতাও যে নেই । " 


    উনি হাসলেন। সেই পরিচিত আস্কারা দেওয়া হাসি।  


    -- " তিনবার লিখবেন।  প্রথমবার , কালির কলমে।  দ্বিতীয়বার , চোখের কলমে।  


    তৃতীয়বার ,  মনের কলমে। 


    সেই লেখা কখনও ব্যর্থ হয়না।  " 


                      ★★


     শ্রী দেবেশ রায়ের সাহিত্য প্রজ্ঞা , সৃষ্টিশীলতা, হৃদকলমের ছলাৎছল ....  এমনতর বিষয়গুলি নিয়ে লেখার কোন ক্ষমতা বা দুঃসাহস এই অর্বাচীন  অলেখকের কখনও ছিল না , হবেও না। 


    কিন্তু নিজের এই অন্তরকথাগুলি যে এত তাড়াতাড়ি বলতে হবে --- ভাবিনি। কক্ষনও ভাবিনি। 


                 ★


    আমার সাড়া না পেয়ে দুঃখ পাওয়ার মতো হাতেগোনা  মানুষ  আরও একজন কমে গেছেন ।

  • বিভাগ : ব্লগ | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮১৭ বার পঠিত | ২ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Kausiki Bhattacharya | 42.110.129.204 | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ১৫:৫৫101148
  • অসাধারণ 

  • সুদেষ্ণা মৈত্র | 115.96.77.152 | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬:০৩101150
  • ভালো।  বেশ ভালো।

  • Pallab Kumar Chatterjee | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬:৩০101151
  •  এই অনবদ্য স্মৃতিচারণের থেকে মস্ত পাওনা এই তিনবার লেখার চাবিকাঠি।  কালির কলমে, চোখের কলমে আর মনের কলমে। 
    দেবেশ রায়কে একবারই দেখেছিলাম শিলচরে, সালটা বোধহয় ১৯৯১। তখন সদ্য 'তিস্তাপাড়ের বৃত্তান্ত' আকাদেমি পেয়েছে। টাউন হলে আলোচনা চক্রের পরদিন 'রাবীন্দ্রিকী'র কর্ণধার রূপক দামের বাসায় চা-চক্রে আড্ডা দিতে এলেন। আমি ছিলাম প্রায় নীরব দর্শক মাত্র। 

  • santosh banerjee | ২১ ডিসেম্বর ২০২০ ১৮:৪০101252
  • এমন একটা মানুষ নীরবে থাকলেন।..নীরবে কাজ টি করলেন।..আর একেবারে নীরবে চলে গেলেন !! কর্পোরেট লেখক হয়ে ওঠা হয়নি তো !!তাই !! এই পোড়া দেশে ওনারা কেন জন্মান ??কেন ? আক্ষেপ না , রাগ হয় !!আমার যাঁরা এখনো বেঁচে আছি ....মানে শ্বাস নিচ্ছি ....আসুন  না ,  ওনাকে নতুন করে জানি ।..জানার চেষ্টা করি !!!

  • নীলোৎপল সরকার | 103.26.200.18 | ১৫ মে ২০২১ ১৮:১৯106030
  • আমার এক আত্মীয়া, আমার ভাইঝির শাশুড়ি, শ্রীলেখা ভৌমিক, জলপাইগুড়ির মেয়ে। 


    জাঁক করে বলতেন, আমি দেবেশ রায়ের সহপাঠী


    অনেকদিন আগে, দেশ শারদ সংখ্যায়  পড়েছিলাম -- আপতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে, এই নামে গল্প, লেখক দেবেশ রায়। 


    দুজনেই প্রয়াত। গল্পটা ভুলিনি আজও ! 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন