• বুলবুলভাজা  পড়াবই  বই পছন্দসই

  • ঘরোয়া আড্ডার মেজাজে শোনানো গানের কিস্‌সা

    শুভদীপ সাহা
    পড়াবই | বই পছন্দসই | ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২৮৯ বার পঠিত | রেটিং ৩ (১ জন)
  • প্রত্যেক গানের এক বা একাধিক গল্প থাকে। কখনও তা লিখিত হওয়ার গল্প, কখনও সুরারোপের, কখনও-বা পরিবেশনের। আবার যেসব গান কিংবদন্তি হয়ে যায় সেগুলি ঘিরে গড়ে ওঠে নানা কাহিনি। তেমনই গল্পের সমাহারে তৈরি একটি বই। পড়লেন শুভদীপ সাহা


    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তর লেখা বইটি হাতে নেওয়ামাত্র স্পষ্ট হয়ে যায় তার উপজীব্য কী। নামেই পরিষ্কার—‘ভুলবে সে গান যদি: চেনা অচেনা গানের গল্প’। নানা গানের হারিয়ে যাওয়া নানা গল্প। আর গল্প শুনতে-পড়তে কার না ভালোলাগে?

    এই ভাবুন না, বিশ্ববিখ্যাত ‘জিঙ্গেল বেল্‌স’ (ক্রিসমাস সং) বা ‘টম অ্যান্ড জেরি’র থিম মিউজিক সহ নানা এপিসোডে আবহসংগীত, এ তো আমাদের বহুল পরিচিত। কিন্তু কেমন লাগবে এদের তৈরি হওয়ার ইতিহাস, সেই সময়ের শরিক হতে?



    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট্‌স প্রদেশের মেডফোর্ড শহরে যে ট্যাভার্ন-এ ‘জিঙ্গল বেল্‌স’ গানটি রচিত হয়েছিল তার দেয়ালে লাগানো ফলক।

    লেখক খুব সচেতন ভাবেই ‘একাডেমিক গবেষণার তত্ত্বতালাশে’ যাননি। অনেকটা ঘরোয়া আড্ডার মেজাজে বেঁধেছেন তাঁর লেখাগুলোকে। কোনো গল্পের ফেরে যেমন চুপ করে থেকেছি বহুক্ষণ, চেনা গানের কাছে ফিরে গেছি সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে, আবার কোনো গল্প পড়ে রাত একটায় বন্ধুকে ফোন করেছি, গল্প শোনাব বলে। নিপুণ কলমে হালকা চলার ছন্দে বাঁধা গল্পগুলো তথ্যসমৃদ্ধ করেছেন, যদিও তথ্যের ভারে ইতিহাস ক্লান্ত হয়নি, গল্পেরা তার মজলিশি আড্ডায় মনোগ্রাহিতা হারায়নি লেখার মুনশিয়ানায়।

    কোন্‌ সময়কালকে লেখক ধরেছেন বলা মুশকিল! একদিকে যেমন পুরাণের গল্পকথার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গানের গল্প, তেমনই সমসময়ের গানের প্রসঙ্গও বইয়ের বিষয়বস্তু। আজাদ হিন্দ ফৌজের অলিখিত ‘জাতীয় সংগীত’ বা সরদারি বেগমের পাশাপাশি নরেনের কাছে রামকৃষ্ণর গান শোনা এবং ‘Kali, The mother’ তৈরির গল্প উঠে আসে। উঠে এসেছে সামাজিক ইতিহাস। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে যখন ‘নারা’ ওঠে ‘অনলহক’ সেই ‘অন-অলহক’ বা ‘আমিই সত্য’তে কীভাবে মিশে যায় উপনিষদের ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’ বা বাইবেলের ‘revelation’–এর ‘I am He’… উঠে আসে গান ! প্রতিবাদের মশাল হয়ে।

    গান তো প্রতিবাদেরই অঙ্গ। ‘বিদ্রোহী গান প্রেমেরই গান!’

    গান তো আদতেই রূপকথা। সত্যি রূপকথা। নয় বলুন? যখন জেনেছিলাম ‘কেশরিয়া বালম’, ‘দরবারি কানাড়া’ বা ‘বিলাসখানি তোড়ি’র ইতিহাস, ভাটিয়ারের কোমল রেখাবের মতো সুরেলা এই ইতিহাস আমায় ছুঁয়ে গেছিল, ছুঁয়ে গিয়েছিল জীবনের ক্লান্তিহীন বিষণ্ণতাকে। এই গল্পগুলোর সাথে পথ চলতে চলতে আদিম মানুষের মতো হেঁটে বেড়িয়েছি পুরানো দিল্লির ইদগাহ রোডের কোনো গলিতে, যেখানে ইতিহাস এখনও জেগে উপমহাদেশের একমাত্র মহিলা সানাইবাদকের সুর শুনবে বলে! ইতিহাস একা জেগে থাকে। সুখীও নয়, দুঃখীও নয়। অসীম এবং চিররহস্যের এই অতীত ঘেরাটোপে যে নির্বাণ হয় না, তা কেবল স্মৃতি আছে বলেই না!

    এই স্মৃতিকেই উসকে দিয়েছেন লেখক। ইতিহাস খুঁড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকের মতোই আমাদের কাছে উপস্থিত করেছেন একের পর এক আশ্চর্য ‘দাস্তান’! ইতিহাসের ঋণ চুকিয়েছেন। ১৩ বছরের অকালপ্রয়াত (নাকি হত) মাস্টার মদন, বিস্মৃতি দিয়ে আমরা আবার খতম করেছি যাঁকে, যাকে শুনবেন বলে আমির খান, কে এল সায়গল সহ শাস্ত্রীয় সংগীতের বিখ্যাত মানুষেরা অপেক্ষা করতেন, লেখক আমাদের নিয়ে গেলেন সেই ঠিকানায়। আমাদের এই গরিব দেশে যেমন সংগীতকাররা ‘সালাম’ পান না, বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যান বনরাজ ভাটিয়া বা অজিত বর্মনেরা, এই বই, কোথাও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।



    অকালপ্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী মাস্টার মদন

    এখানে শুনুন তাঁর কণ্ঠে একটি গান



    সুরের টানে সুর মিলে যায়। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের ‘যব ছোড় চলে লখনউ নগরি’ তাই এস্রাজে মিলে যায় রবীন্দ্রনাথে। ‘যাবো না গো যাবো না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে/ এই নিরালায়…।’ নিরালায় সঙ্গী হয়ে থেকে যায় কিছু সুরের রেশ, থেকে যায় গল্পগুলো। কিছু চিঠি। সময়ের চিঠি। একান্ত ব্যক্তিগত অনুভবে। আমরা কেউ কেউ সেই চিঠি পাই, পড়ি। কেউ কেউ সেই চিঠি দেখেও দেখি না। এড়িয়ে যাই।


    আরও পড়ুন
    মালিক - Chayan Samaddar



    ‘আজ জানে কি জ়িদ না করো’-র মতো গান, শুধু গানের ইতিহাস নয়, গানের চোরাস্রোতে লুকোনো গল্প বলে এই বই। বিস্মৃতির অনাদরে আমরা যা হারিয়েই ফেলতে বসেছিলাম…

    এই বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন বিতান চক্রবর্তী। আদিম সুরের মতো ‘ছিমছাম’ প্রচ্ছদ তাঁর। চোখের আরাম দেয়। ঋত প্রকাশনী এই বইটি ছেপেছেন। আমরা ‘পকেটবুক’ বলতে যে আকার বুঝি, ঠিক সেই আকারে বইটিকে বেঁধে তাঁরা সহজেই ভ্রমণসঙ্গী করে তুলেছেন এই বইটিকে।

    এই বইয়ের প্রাককথন লিখেছেন প্রখ্যাত সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র। জানিয়েছেন তাঁর ভালোলাগা; যা উপরি পাওনা এই বইয়ের সাথে।

    গান শুনতে ভালোলাগে যাঁদের, যাঁদের ভালোলাগে গল্প শুনতে, এই দুই ‘সম্প্রদায়ের’ পাঠক-পাঠিকারই ভালোলাগবে এই বই। আর কে বলতে পারে, নতুন কোনো গানের সঙ্গে আলাপ হয়ে যাবে না এই বই পড়ে?




    ভুলবে সে গান যদি: চেনা অচেনা গানের গল্প
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    ঋত প্রকাশনী
    মুদ্রিত মূল্য: ২২৫ টাকা
    প্রাপ্তিস্থান: কলেজস্ট্রিট: দেজ, দে বুক স্টোর, আদি দে বুক, কথাশিল্প, ধ্যানবিন্দু


    বইটি অনলাইন কেনা যেতে পারে এখানে

    বাড়িতে বসে বইটি পেতে হোয়াটসঅ্যাপে বা ফোনে অর্ডার করুন +919330308043 নম্বরে।


    গ্রাফিক্স: স্মিতা দাশগুপ্ত

    এই বিভাগের লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে 'পড়াবই'এর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
  • বিভাগ : পড়াবই | ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২৮৯ বার পঠিত | রেটিং ৩ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • manimoy sengupta | ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ ১২:৩৩101075
  • ফোনে অর্ডার দেওয়া যাচ্ছেনা। ফোন বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন