• হরিদাস পাল  আলোচনা  স্বাস্থ্য

  • মন কি বাত 

    Dr. Koushik Lahiri লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | স্বাস্থ্য | ০৯ ডিসেম্বর ২০২০ | ৪৮৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কেউ কোভিড আক্রান্ত হয়ে হেল্পলাইনে ফোন করলে, সরকারি এম্বুলেন্স পৌঁছে যাচ্ছে বাড়িতে,আগে থেকে ড্রাইভারের নাম্বার এসে যাচ্ছে এসএমএসে ,তারপর অসুস্থ মানুষটিকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেওয়া, সম্পূর্ণ নিখরচায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা করানো এবং অবশেষে ছুটির পর বাড়ি পৌঁছে দেওয়াও হচ্ছে !


    কোনো প্রথম বিশ্বের দেশ নয়, এই আপাত অবিশ্বাস্য  ঘটনাগুলো ঘটছে  আমাদের দেশে, আমাদের রাজ্যে !


    অনেকে অনুযোগ করছেন, এই পুরো সময়টা, রোগীর সঙ্গে বাড়ির যোগাযোগ করা যাচ্ছে না!


    অন্যদিক থেকে যদি দেখি, তবে বুঝতে পারবো, কোন আত্মীয় স্বজন (অনেক সময়ে তাঁরাও আক্রান্ত) বা তথাকথিত পেশেন্ট পার্টি ছাড়াই কিন্তু চিকিৎসাটা যথাযথ এবং যথাসাধ্যই হচ্ছে !


    হয়ত ব্যাপারটা বেশ ভয়ের, শীতল, যান্ত্রিক এবং হ্যাঁ, নৈর্ব্যক্তিক !


    কিন্তু কার্যকারীও তো বটে ! অচেনা, অজানা, অসহায় সাধারণ নাগরিককে সরকার নিজের ব্যাবস্থাপনায়, দায়িত্ব নিয়ে ডোরস্টেপ টু ডোরস্টেপ পরিষেবা দিচ্ছেন, বিনা শুল্কে এ অভিজ্ঞতা আমাদের আগে হয়েছে কি ?


    অনাত্মীয় সরকারি এম্বুলেন্সের ড্রাইভার আই ডি হাসপাতালে বৃদ্ধ অশক্ত অসুস্থ দম্পতিকে পৌঁছে দিয়ে বলছেন, চিন্তা করবেন না ম্যাডাম, আমি বাইরেই আছি, দুজনে ভর্তি হয়ে গেলে একটা ফোন করে দেবেন !


    আর অসুবিধে হলে, জানাবেন, চলে আসবো!


    দেখেছি আগে ?


    অথবা রাত এগারোটার পর একা বৃদ্ধ রোগীকে নিয়ে মেডিক্যাল কলেজের দিকে যাবার সময় সরকারি এম্বুলেন্সের ড্রাইভার বৃদ্ধের বাড়িতে অসুস্থ আত্মীয়কে ফোন করে বলছেন


    -রিপোর্টের হার্ড কপিটা লাগবে স্যার, ভর্তির সময়, ওটা তো ওনার কাছে নেই, আপনি রিপোর্টটা আমার মোবাইলে হোয়াটস্যাপ করে দিন, আমি ম্যানেজ করে নিচ্ছি ...


    শুনেছি কোনোদিন ?


    না !


    কিন্তু এই সব যে কল্পকথা নয় সরকারি প্রচারও নয়, সেটা উপলব্ধি করলাম নিজের কোভিড হবার পর !


    একটি কর্পোরেট হাসপাতালের ল্যাবরেটরি তে  পজিটিভ হবার কিছুক্ষণ পরেই প্রথম ফোনটা আসল  স্বাস্থ্য ভবন থেকে । 


    সেই শুরু !


    তারপর কখনো স্বাস্থ্যভবন, কখনো স্বাস্থ্য দফতর আবার কখনো বা পুরসভা !


    হোম কোয়ারান্টাইনের দিনগুলিতে রোজ সরকারের পক্ষ থেকে ফোন করে খোঁজ খবর নেওয়াটা আমাকে অভিভূত করেছে !


    যথাযথ কথোপকথন। কখনো যান্ত্রিক, কখনো বেশ আন্তরিক !


    প্রতিবারেই আলাদা পুরুষ বা মহিলা কণ্ঠ, ভদ্র, মার্জিত ভাবে  জানতে চাইছেন, আজ কেমন আছি !


    খুব গায়ে পড়া গলায় না হলেও যথেষ্টই উষ্ণ, আন্তরিক স্বরে !


    -কেমন আছেন আজ ? কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো ? ওষুধ পত্র খাচ্ছেন তো নিয়মিত ? প্রেশার, শ্যুগারের সমস্যা ছিল না কি কোনদিন ? বাড়ির অন্যরা ঠিক থাকে আছেন তো ?


    এই প্রশ্নগুলি ছাড়াও যে কথাটায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম


    - একটু রেস্টে থাকুন কদিন, পুষ্টিকর খাবার খান, জল খান বেশি করে, মাথাটা হালকা রাখুন আর হ্যাঁ ভালো ভালো সিনেমা দেখুন আর গল্প-কবিতার বই পড়ুন !


    দেখবেন সময়টা সুন্দর কেটে যাবে !


    এর পরেও আছে !


    -কেমন আছেন স্যার ? কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো ? নামগুলো একটু কনফার্ম করে নি স্যার !


    বাড়ির দরজায় দুজন রুগ্না মাঝবয়েসী মহিলা, মুখে মাস্ক, পরণে আটপৌড়ে শাড়ি !


    ওঁরা এসেছেন কর্পোরেশন থেকে 


    -জ্বর আসছে না তো স্যার ? নিঃশ্বাসের কোনো অসুবিধে?  বাড়ির অন্যরা ঠিক আছেন তো ? আজ আপনাদের কতদিন হলো যেন ?


    কথা বলছেন আর খাতায় লিখে নিচ্ছেন মনোযোগ দিয়ে ।


    -ছেলে তো নেগেটিভ , ও সাবধানে আছে তো ? ওকে একটু ক্লোরোকুইন দিয়ে যাই ?


    ঘাড় নাড়ি।


    তার পর কাঁধের ঝোলায় খোঁজাখুঁজি শুরু, নেই !


    -সে কি রে ! শেষ হয়ে গেলো, এ রাম! আমরা স্যার এখুনি দিয়ে যাচ্ছি চিন্তা করবেন না !


    তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠুন স্যার সবাই মিলে ।


    আপনা থেকেই দুহাত জোড় হয়ে গেলো বুকের কাছে !


    অজান্তেই আমার ঠোঁট নড়ে উঠলো, ফিসফিস করে বললাম 


    -আপনারাও ভালো থাকুন দিদি, সাবধানে থাকুন !


    ওঁরা ততক্ষণে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছেন! আমার কথা ওঁদের কানেও পৌঁছলো না !


    এটা আলাদা করে কোনো রাজ্য সরকারের করে প্রশংসা করছি না !


    সারা দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই কম বেশি একই ছবি !


    একটা তৈলাক্ত মেশিনের মত অবিরাম, অক্লান্ত কাজ করে চলেছেন চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, ড্রাইভার, পুলিশ, সাফাইকর্মী, শিক্ষক !


    সারা দেশ এক অদৃশ্য বাঁধনে বাঁধা !


    আমাদের মধ্যেই ছিল এই নিয়মানুবর্তিতা, এই শক্তি, আমরা জানতামই না !


    দুর্গাপুজো, কালীপুজো পেরিয়ে, একটু একটু করে ছন্দে ফিরছে সব কিছু। 


    রুজিরুটির জন্য অজস্র মানুষ রোজ ফের গণপরিবহণ ব্যবহার করছেন , শারীরিক দূরত্ব বিধি সেখানে বিলাসিতা, অবাস্তবও !


    প্রথম ঢেউ আমরা পেরিয়ে গিয়েছি, দ্বিতীয় ঢেউ কবে আসবে, সুনামি হবে কি না জানি না !


    রোগটা নতুন, রোগলক্ষণ নির্দিষ্ট নয়, চিকিৎসা নিয়ে কোনো ঐক্যমত্য নেই, কার্যকরী আর নিরাপদ প্রতিষেধক এখনও নিশ্চিত ভাবে হাতে আসে নি , অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়, ব্যক্তিগত ভাবেও কেউ ভালো নেই কিন্তু তবু সারা দেশ লড়ছে !


    রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক এতরকমের বিভাজনের মধ্যে একটা একশো আটত্রিশ কোটির গরীব দেশ এক হয়ে লড়ছে !


    এই অবিশ্বাস্য, ঐতিহাসিক  লড়াইটাই ভ্যাকসিন !


    সামাজিক নৈকট্যের এই আন্তরিক আদানপ্রদানটাই প্রতিষেধক !


    করোনা একদিন চলে যাবে, কিন্তু আমার দেশের মানুষের এই অদৃষ্টপূর্ব লড়াইটা একটা  আত্মবিশ্বাস বুকের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে যাচ্ছে যে , আমরা পারি !


    আর করোনা যতবড় দানবই হোক না কেন, 


    আমরা জিতব!


    জিতবই !


    কৌশিক লাহিড়ী

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৯ ডিসেম্বর ২০২০ | ৪৮৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন