• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ভ্রমণ  শনিবারবেলা

  • দখিন হাওয়ার দেশ - ৫

    অরিন বসু
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ১৭ অক্টোবর ২০২০ | ৩৯৮ বার পঠিত
  • ৪.৫/৫ (২ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • আওতেরোয়ার জন্ম

    “না তাফিতো-ও-তে-রাঙি
    তে ইনা কা হেকে
    হে টাঙাটা!
    কোইয়া কো মাউই আহুরাঙি,
    কো মাউই উই মাকিহোই
    কো মাউই মাকাওয়েরাউ
    হে টাফিটো! হে টিপুয়া! হে আতুয়া! হে টাঙাটা!”

    (আর তারপর, পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীকে একজন পুরুষমানুষ উপহার দিলেন!
    তার নাম রাখলেন ‘দুর্নিবার’, যে সর্বদা অনুসন্ধানে রত,
    মাউই,
    যার মাথার খোঁপায় সহস্র সুতোর মালা!
    সে সুপ্রাচীন! অবিনশ্বর! ঈশ্বর! মানুষ! )


    (সূত্র: https://www.freeimages.com/photo/maori-carving-1-1437656)

    মাউই-এর যেদিন জন্ম হয়েছিল, সেদিন সূর্য ওঠেনি | এমনকি শোনা যায়নি পাখির ডাক, আর দখিন হাওয়ার শনশন আওয়াজ। মাটি আর আকাশ শুধু গোঙিয়েছে, কালো মেঘ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। ঈশ্বরের উপহার মাউই, সে যে জন্মেছে মৃত অবস্থায় |

    মাউই-এর মৃতবৎসা মা, তরঙ্গা, শোকে অস্থির হয়ে সদ্যোমৃত শিশুটিকে সমুদ্রের শৈবালে মুড়ে সাগরে ভাসিয়ে দিলেন। তারপর সাগরের দেবতা টাঙারোয়ার কাছে আকুল প্রার্থনা করলেন তিনি যেন শিশুটির প্রতি নজর রাখেন, সূর্যদেবকে অনুনয় করলেন তিনি যেন তার যাত্রাপথ সর্বদা আলোকিত করে রাখেন, পবনদেবের কাছে মিনতি করলেন যেন তিনি তাঁর সন্তানকে হাওয়ায় হাওয়ায় এগিয়ে নিয়ে যান।

    তারপর ঢেউয়ের নিরন্তর ওঠাপড়ার মাঝে মাউই কোথায় মিলিয়ে গেল।

    তরঙ্গার বিদায়গাথা শুনতে পেয়ে সমুদ্রের দেবতা টাঙারোয়া জেলি ফিশ, সমুদ্রের ফেনা, আর সমুদ্রের শৈবালকে পাঠিয়ে দিলেন শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য | তারা তাকে নিয়ে গেল শিশুটির পূর্বপুরুষ টামানুই-টে-রা’য়ের দেশে | সেখানকার লোক শিশুটিকে বাঁচিয়ে তুলল। তারপর টামানুই মাউইকে অদেখা জগতের কত রহস্যই না শেখালেন। মাউই পাখিদের সঙ্গে কথা বলতে শিখল, পাখিরা তাকে দিল ওড়ার ক্ষমতা। মাছেরা তাকে দিল শ্বাস, মাছেদের সঙ্গে সে সাঁতার কেটে বেড়াত। হাওয়া তাকে দিল স্বর, মাটি তাকে দিল আপন পরিচয়, তারারা তাকে দিল দিকনির্ণয়ের ক্ষমতা, আর আকাশের কাছে সে পেল উচ্চাভিলাষ। যখন সে বড়ো হল, একদিন টামানুইয়ের সঙ্গে তার যুদ্ধ হল, সে-যুদ্ধে তার বজ্রের মতন দণ্ড দিয়ে সে আঘাত করল টামানুইকে, টামানুই পড়ে গেলেন। এখন মাউই হল নেতা। তখন টামানুই মাউইকে বললেন, “দ্যাখো, তুমি তো পৃথিবীকে টাঙারোয়ার দেওয়া উপহার। এবারে তুমি নিজেকে নিজে খুঁজে পাও, যাও বেরিয়ে পড়ো, সর্বত্র তোমার নাম প্রচারিত হোক মাউই-টিকি-টিকি-আ-তরঙ্গা বলে।”

    মাউই গুরু টামানুইকে আলিঙ্গন করলেন।

    তার পর দিন যখন সূর্য উঠল, ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল আকাশে আকাশে, মাউই শেষবারের মতন টামানুইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তারপর বাজপাখির রূপ ধারণ করে রাঙিনুইয়ের মুক্ত আকাশে উড়ে চললেন। টানে নামে দেবতা যেখানে চারটি স্তম্ভ দিয়ে আকাশ ধারণ করে রেখেছিলেন, মাউই সেখানে এসে দেখলেন কয়েকজন যুবক নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতির মতন কী খেলা খেলছে | এমন সময় তাদের কাছে একজন মাঝবয়সী নারী এলেন ও তাদের ডাকলেন, “মাউই-মুয়া, মাউই-রোতো, মাউই-ওয়াহো, মাউই-পায়ে!” নাম শুনে মাউই বুঝলেন যে এই তাঁর জন্মস্থান, তিনি তাঁর বাড়ি খুঁজে পেয়েছেন। মাউই সেই যুবকদের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাদের মা তাদের নাম ধরে ডেকে মাথা গুনতে গিয়ে চারজনের জায়গায় পাঁচজন দেখে বার বার ভুল করছেন, তারপর ভারী বিরক্ত হয়েছেন দেখে মাউই গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ালেন।
    “কে তুমি?” মা জিজ্ঞাসা করলেন।
    “মাউই টিকিটিকি আ তরঙ্গা” (“তরঙ্গার ছেলে আমি মাউই”), মাউই বললেন।
    “আমার ওই নামে কোনো সন্তান নেই”, তরঙ্গা জবাব দিলেন।
    তখন মাউই তাঁর জন্মবৃত্তান্ত, সমুদ্রপথে তাঁর যাত্রা, টামানুইয়ের কাছে মানুষ হওয়া, তাঁর মা আর পরিবারের সন্ধানের সব কথা বিস্তারিত ভাবে বললেন, তরঙ্গা সব শুনে বুঝতে পারলেন মাউই তাঁরই সন্তান, তাঁর কনিষ্ঠ সন্তান, যাকে তিনি ভেবেছিলেন মৃত, সে তাঁর কাছে ফেরত এসেছে।
    মাউই তাঁদের সঙ্গে থাকতে লাগলেন।

    —-

    “উইরি আনা তে কাউওয়াই রারো।
    কোইয়া তে কাউওয়াএ টাঙাটা।
    টাউ পুমাউ আনা তে কাউওয়াএ রুঙা।
    কোইয়া তে কাউওয়াএ তাফিতো।”

    (চোয়ালের নীচের দিকের হাড়টুকুই শুধু নড়ে। এই সচলতা পুরুষের ধর্ম, চোয়ালের নীচের হাড় সেই ধর্মের অস্থিবিশেষ।
    চোয়ালের উপরের দিকের হাড় স্থির থাকে। এই স্থির থাকা প্রকৃতির ধর্ম, চোয়ালের উপরের হাড় সেই ধর্মের অস্থিবিশেষ।)

    মাউইয়ের দিদিমা মুরিরাঙাফেনুয়া। তাঁর নাম শুনলেই দাঁতে দাঁত লেগে যায়, এমনি তাঁকে লোকে ভয় পেত। বৃদ্ধা অন্ধ, থাকতেন গ্রাম থেকে বহু দূরে, অন্তেবাসী যাকে বলে, কিন্তু জাদুবিদ্যা যা জানতেন। একটু ফিসফিস করেছেন কী আকাশ থেকে পাখি টুপ করে খসে পড়ে যাবে, নদী যাবে শুকিয়ে। লোকে বলত, মুরিরাঙাফেনুয়ার ওই আশ্চর্য ক্ষমতার শক্তি ছিল তাঁর চোয়ালের হাড়ে। মাউই ঠিক করল, দিদিমার চোয়ালের হাড় তার চাই। নানা ফন্দিফিকির করে সে চোয়ালের হাড় আয়ত্ত করল, দেবার সময় দিদিমা তাকে শুধু চোয়ালের হাড়টুকুই দিলেন না, তাকে পূর্বপুরুষদের কাহিনিও শোনালেন। সে গল্প চোয়ালের উপরের হাড়ের রহস্য, যার পরিপ্রেক্ষিতে আর সব কিছু সচল, কেবল সে শুধুই স্থির।

    মাউই এখন স্থানকালপাত্রের অতীত।

    সেই চোয়াল পেয়ে মাউই করল কী, সে এবার সূর্যকে বাঁধতে চলল। সূর্যকে বাঁধা কি সহজ কাজ, সে কী দ্রুত আকাশে বিচরণ করে, থাকে কি থাকে না। যাই হোক, মাউই আর তার দাদারা মিলে টামা-তে-রা (সূর্যদেব)-কে বেঁধে ফেলল।

    “তোমার আকাশ দিয়ে যাতায়াত বাপু একটু ধীরে সুস্থে করো তো!” সূর্যকে চোয়ালের হাড় দিয়ে এক ঘা দিয়ে মাউই বলে। আমাদের আরও একটু আলো দাও দিকি। বলে, আর চোয়ালের হাড়ের বাড়ি মারে সূর্যকে।

    সূর্য বেচারা আর কী করে, এবার থেকে সে খুব ধীরে ধীরে আকাশ বেয়ে রাঙির সামনে পাড়ি দিয়ে পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যেতে লাগল, আকাশ থেকে মাটি তে!

    মাউই আনলেন রৌদ্রভরা দিন!

    আগুন থাকে আকাশে (সূর্য), আগুন থাকে মাটির গভীরে।

    (নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় বহু উষ্ণ প্রস্রবণ, গিজার দেখা যায়, মাটির অভ্যন্তরের আগুন যেন উঠে আসে মাটির ওপরে। রোতোরুয়া নামে একটি জায়গায় উষ্ণ প্রস্রবণের একটি উপত্যকা রয়েছে, তার কথা পরে লিখব)

    আকাশের আগুনের পর মাউই ঠিক করল এবার সে মাটির আগুন মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনবে। মাহুইকা তার পূর্বসূরী, মাহুইকার ছেলেপিলেরা সব আগুনের লেলিহান শিখা। মাহুইকা যখন দেখলেন মাউই তাঁর সবকটা ছেলেকে, মানে আগুনের শিখা নিভিয়ে ফেলছে, রেগে ‘আগুন’ মাহুইকা করলেন কী, একটা মস্ত আগুনের শিখা ছুড়ে দিলেন মাউই-র দিকে তাকে মারার জন্য। মাউই দে দৌড়। মাউই দৌড়য়, তাকে ধাওয়া করে আগুনের শিখা। মাউই মাছ হয়ে হ্রদের মধ্যে প্রবেশ করলেন, অমনি সে আগুনের দাপটে হ্রদ টগবগ করে ফুটতে লাগল। মাউই তখন পেঁচার রূপ ধরে উড়ে গেলেন, আগুন তাঁর পিছু নিল। তখন তিনি বাজপাখি হয়ে উড়ে গেলেন, আগুন কি তাঁকে ছাড়ে? সেও চলল পিছু পিছু।

    কী আর করেন মাউই? তখন তিনি হাওয়া আর বৃষ্টির দেবতা তাফিরিমাতেয়াকে আহ্বান করলেন। অমনি আকাশ কালো করে এল বৃষ্টি, ঝরে পড়তে লাগল মাহুইকা আর তার লেলিহান শিখা রূপ ছেলের মাথায়। তারা আর তখন করে কী, মাকোমাকো গাছের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিল।

    সেই থেকে প্রকৃতির আগুন গাছের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, আর মানুষ তাকে তার ইচ্ছামতন ব্যবহার করতে পারে।

    (এই রূপ কল্পনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ আমার মনে হয়, নিউজিল্যান্ডে অরণ্যের সমারোহ, এবং এখনও বহু জায়গায় ঘরবাড়ি গরম করে রাখার জন্য কাঠ জ্বালানি রূপে ব্যবহার করা হয়। মাওরিরা নিজেরা তো অবশ্যই নানান রকম গাছের ও জ্বালানি কাঠের সন্ধান করতই তাদের আমলে। এই যে লোককথা, রূপকথা, ব্যাবহারিক জীবন একাকার করে দেখা, এই ব্যাপারটা মাওরি বা নিউজিল্যান্ড জনজীবনে মস্ত প্রভাব ফেলেছে। তা ছাড়া নিউজিল্যান্ডের আপাত শান্ত, অপেক্ষাকৃত ধীরলয়ের জীবন যেন কোথাও মাউই আর সূর্যের সংঘাতকে বারংবার মনে পড়িয়ে দেয়।)

    “টেনেই টে টুয়াহু,
    টেনেই টে আহুরেওয়া,
    আহুরেওয়া টাকেটাকে,
    আহুরেওয়া টিকিটিকি!
    টাকোটো মাই কো টে ইকা-আ-মাউই হেই টুরাঙওয়াই ওয়াই এ!”

    (এইটা আমার চাতাল, এইটা আমার বাড়ির দাওয়া,
    আমি এই পৃথিবীর, তাঁর গর্ভসঞ্জাত!
    এইটা আমার দাঁড়াবার জায়গা, আমি মস্ত মাউই মাছ!)

    মাউই ঘুমোতে ভারী ভালোবাসে কিনা, তার দাদারা তাই যখন মাছ ধরতে যেত, মাউই যাবে কি না জিজ্ঞাসা করলেই মাউই বলত, না না, তোমরা বরং খাবারের সন্ধান করো গিয়ে, ঘুমই আমার প্রধান খাবার। তাই দাদারাও আর বলে না, মাউইও আর মাছ ধরতে যায় না। একদিন হঠাৎ সে দাদাদের জিজ্ঞাসা করল, আমাকে মাছ ধরতে নিয়ে যাবে? দাদারা বলে, “না, তুই বরং ঘরে শুয়ে থাক, তোকে মাছ ধরতে যেতে হবে না।” কোনোদিনই আর তাকে নেয় না। মাউই যাবার কথা জিজ্ঞাসা করলেই বলে, “তুই ব্যাটা পাজি, তোকে নিয়ে যাব না।”

    তো একদিন মাউই ভোর হবার আগে দাদাদের মাছধরার নৌকোটাতে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। দাদারা মাছ ধরে একটি দ্বীপে নোঙর করতে যাবে, এমন সময় মাউই বেরিয়ে পড়ল।
    দাদারা বলে, “এইরে, মাউই এসেছে, চল এবার নৌকো নিয়ে বাড়ি যাই, মাউইকে রেখে আসি। মাউই শুনে এমন সব মন্ত্র পড়তে শুরু করল যে দাদারা যতই নৌকো নিয়ে চলে কূল আর দেখতে পায় না। তখন মাউই-র দাদারা স্থির করল, আবার সেই পুরোনো জায়গাটাতে ফেরত যাবে, মাউইকে না হয় নৌকোয় রেখেই মাছ ধরবে।

    যত যায়, মাউই তত বলে আরও একটু চলো, আরও সমুদ্রের গভীরে চলো, একটা জায়গায় চলো, সেখানে প্রচুর মাছ পাবে। একটা জায়গায় তটরেখা দেখা গেল বটে, কিন্তু মাউই বলে আরও গভীরে চলো। যেতে যেতে যেতে এক জায়গায় মাউই তাদের থামতে বলে বলল, দাদা, মাছ ধরার টোপ বার করো, এবার মাছ ধরি।

    দাদারা বলে, “দ্যাখ মাউই, তুই যখন সবজান্তা, তুই বরং নিজে নিজে টোপ বার কর!”

    রেগে গিয়ে মাউই করল কী, তার দিদিমার দেওয়া চোয়ালের হাড় দিয়ে নিজের মাথা থেকে রক্ত বার করে হাড়ে মাখিয়ে টোপ তৈরি করে সমুদ্রে ছুড়ে দিল। দিয়ে কীসব মন্ত্র পড়তে লাগল। দাদারা অবাক হয়ে দেখল, শান্তসমুদ্র কীরকম যেন অশান্ত হয়ে ফুলে ফেঁপে উঠল। নৌকো টলমল, দাদারা ভয়ে কাঁপছে, কেবল মাউই অবিচল হয়ে মন্ত্র পড়ে চলেছে।

    এমন সময় দেখা গেল একটা প্রকাণ্ড মাছ, তার মাথা আর লেজের কূলকিনারা পাওয়া যায় না, দিগন্তে বিলীন। তাদের নৌকো টাঙারোয়া (সমুদ্রের) উত্তাল জলে যে এতক্ষণ দুলছিল, সে এখন শান্ত হয়ে সেই প্রকাণ্ড মাছের পিঠে অবস্থিত।

    মাউই বলল, “আমি এবার চললাম। এমন আশ্চর্য একটা উপহারের জন্য ঠাকুরদের ধন্যবাদ জানিয়ে দিই গিয়ে। তবে দেখো, মাছটার কোনো ক্ষতি কোরো না, এ বড়ো পবিত্র মাছ!”

    মাউই দৃষ্টিপথের বাইরে যাওয়া মাত্রই দাদারা হামলে পড়ল মাছটার ওপর। একবার খুঁচিয়ে দেখে, ছুরি বার করে মাছটার গায়ে আঘাত করে, নিজেদের মধ্যে মাছের মালিকানা নিয়ে মারামারি, সে এক বিশ্রী কাণ্ড!
    মাছটা গোঙায়, উথালপাথাল করে, লেজে আছাড় মারে। মাছের গা থেকে রক্ত বেরিয়ে গা বেয়ে রক্তের নদী বয়ে যায়। মাউই যখন ফেরত এল, এসে দেখে মাছটা তখন মৃত, আর মৃত সেই মাছের গায়ে একটা দ্বীপ, তার গায়ের রক্ত আর ছিঁড়ে যাওয়া চামড়া থেকে পাহাড়, নদী, নালা, উপত্যকার জন্ম হয়েছে। মাউইয়ের দাদারা লজ্জায় মাথা নীচু করে রইল। মাউই তাকিয়ে রইল তার নতুন মাছ-রূপী দ্বীপটির দিকে।
    এই সেই নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপ।
    মাউইয়ের মাছ।



    মাছের মাথাটায় ওয়েলিংটন (নিউজিল্যান্ডের রাজধানী), লেজটায় উত্তর দিকের জায়গাগুলো। মাঝখানে যে নীলরঙের লেকটা দেখতে পাচ্ছেন, সেইটা লেকটা উপো, মাছের পেটের কাছে।

    কেউ কেউ বলেন, মাউইয়ের নৌকোটি দক্ষিণ দ্বীপ।


    (http://www.backpack-newzealand.com/mapofsouthisland.html)

    সমুদ্রের গভীর থেকে টে আইকা এ মাউই (মাউইয়ের মাছ)-কে তুলে এনে মাউই মাওরিদের জন্য দাঁড়াবার জায়গা (তুরাঙাওয়াইওয়াই) করে গেছেন। কালক্রমে তার সমুদ্রবিহারী উত্তরাধিকারীরা প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যখন দাঁড়াবার জায়গা খুঁজে পেয়েছে, তারা সবাই মাউইয়েরই উত্তরাধিকারী, আমাদের সকলের পূর্বসূরী মাউই, এই আমাদের অধিকার!

    “আহুরাঙি তে তু
    হে তাউ আহুরাঙি
    কোইয়া তে তুআহু ও মাউই-আহু-টিকিটিকি”

    (ধরিত্রীর বুকে পা রেখে আকাশে রেখে মাথা
    আমি দাঁড়িয়েরই।
    এদেশ আমার পূর্বসূরী মাউইয়ের
    যিনি আমাদের দেখিয়েছেন আমাদের পক্ষে কী না সম্ভব”)

    আওতেরোয়া নিউজিল্যান্ডের জন্মকাহিনি Chris Winitana তাঁর Legends of Aotearoa-তে এইভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন [১]। ধান ভানতে শিবের গীতের মতন গল্পটা লিখলাম এই জন্য যে এই লোককথা বলুন, কাহিনি বলুন, এর মধ্যে মাওরিদের চোখ দিয়ে নিউজিল্যান্ডের আত্মার কথা ধরা পড়েছে। এতে সালতামামির হিসেব নেই, সমুদ্র পেরিয়ে এসে অধিকার আরোপ করার গল্প নেই, আছে একটা আধ্যাত্মিক রূপকথা। এই রূপকথার আখ্যানের সঙ্গে আমি বাংলার লোককথার মিল খুঁজে পাই। সে তুলনায় ইউরোপীয় নাবিকের নতুন দ্বীপ ‘আবিষ্কার’ কৃত্রিম। ইউরোপীয় বলুন, ইংরেজ বলুন, তাদের বর্ণনায় নিউজিল্যান্ডের এই অকৃত্রিমতা, সে যে সমুদ্রে থেকে উত্থিতা এক মহালোক, এই ব্যাপারটাই নেই। অথচ, এই ব্যাপারটিকে খেয়ালে না রাখলে নিউজিল্যান্ড দেশটাই যে অধরা থেকে যায়। ব্যাপারটা শুধুই চোখ ধাঁধানো সুন্দর দেশের নয়, সেদেশের আত্মাটিকে স্পর্শ করার একটা জায়গা থাকা চাই।

    আমার নিউজিল্যান্ড পরিক্রমার পরবর্তী পর্যায়গুলোতে ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে এই ব্যাপারগুলোকে অনুধাবন করব।

    [১]: ক্রিস উইনিটানা, অ্যান্ডি রাইসিনগার: লিজেন্ডস অব আওতেরোয়া।
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৭ অক্টোবর ২০২০ | ৩৯৮ বার পঠিত
  • ৪.৫/৫ (২ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Jayanta Bhattacharya | ২০ অক্টোবর ২০২০ ১৭:৩৬98688
  • আহা! কি গদ্য! রূপকথার জন্যই যেন এমন গদ্যভঙ্গিমা তৈরি হয়েছে। সমুদ্রের সফেন উচ্ছ্বাস, রৌদ্রের এলায়িত বিস্তার, কল্পনার যাদু প্রভাব - সব মিলেজুলে এক অসামান্য আখ্যান।

    "মাউই দৃষ্টিপথের বাইরে যাওয়া মাত্রই দাদারা হামলে পড়ল মাছটার ওপর। একবার খুঁচিয়ে দেখে, ছুরি বার করে মাছটার গায়ে আঘাত করে, নিজেদের মধ্যে মাছের মালিকানা নিয়ে মারামারি, সে এক বিশ্রী কাণ্ড!

    মাছটা গোঙায়, উথালপাথাল করে, লেজে আছাড় মারে। মাছের গা থেকে রক্ত বেরিয়ে গা বেয়ে রক্তের নদী বয়ে যায়। মাউই যখন ফেরত এল, এসে দেখে মাছটা তখন মৃত, আর মৃত সেই মাছের গায়ে একটা দ্বীপ, তার গায়ের রক্ত আর ছিঁড়ে যাওয়া চামড়া থেকে পাহাড়, নদী, নালা, উপত্যকার জন্ম হয়েছে। মাউইয়ের দাদারা লজ্জায় মাথা নীচু করে রইল। মাউই তাকিয়ে রইল তার নতুন মাছ-রূপী দ্বীপটির দিকে।
    এই সেই নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপ।"

     
    কি বলি এই আখ্যান রচয়িতাকে? আদর! 
  • aranya | 162.115.44.103 | ২০ অক্টোবর ২০২০ ২০:১৯98694
  • সুন্দর। ভাল লাগল মাউই-এর আখ্যান 

  • Prativa Sarker | ২১ অক্টোবর ২০২০ ১১:৩৩98717
  • মাউইয়ের ভাষাও মাউইয়ের মতোই, স্বচ্ছ আর সুন্দর। জনজাতির ভাষা কতো সরল হয়। আমরা ভেতরের চিন্তা লুকিয়ে রাখবার জন্য তাকে অযথা জটিল করি ! 

    ইন্টারেস্টিং, খুব ইন্টারেস্টিং লাগল লেখাটা। আগের পর্বগুলো পড়ে ফেলি। 

  • Atoz | 151.141.85.8 | ২৩ অক্টোবর ২০২০ ০০:১১98787
  • এই লেখাটার প্রতিটা পর্ব মনোযোগ দিয়ে পড়ছি। কিন্তু এই মহাকাব্যিক লেখা টুকরো টুকরো পড়ে তৃপ্তি হয় না, বই আকারে পেলে মিঠে শীতের ছুটির দুপুরে পিঠে রোদ্দুর নিয়ে ছাদে মাদুর পেতে বসে একসঙ্গে পড়লে তৃপ্তি হয়। খানিকটা করে পড়া আর খানিকটা করে আকাশে তাকিয়ে এক রূপকথার দেশকে মনে মনে দেখা।
    সাগ্রহ প্রতীক্ষায় রইলাম।

  • Atoz | 151.141.85.8 | ২৩ অক্টোবর ২০২০ ২৩:৩০98827
  • পরের পর্ব কবে আসবে?

  • অরিন | ২৪ অক্টোবর ২০২০ ০১:২৩98830
  • ধন্যবাদ Atoz, লেখা প্রতি সপ্তাহে শনিবার প্রকাশ করে। প্রথম দিকে বেশ কয়েকবার iregular ছিলাম, এখন চেষ্টা করি নিয়ম করে পাঠাতে। এই সপ্তাহে একজন বিস্মৃত ভারতীয়কে নিয়ে লেখা। আজকেই আসবে মনে হয় । 

  • Atoz | 151.141.85.8 | ২৪ অক্টোবর ২০২০ ০৩:১৮98831
  • আফ্রিকার ভিন্ন দেশের লোক / রূপ / উপকথাগুলোও এরকম আশ্চর্য সুন্দর। ভীষণভাবে প্রাকৃতিক ধরণের অথচ তারই মধ্যে সূক্ষ্ম বুননের মতন মিশে আছে আধ্যাত্মিকতা ।  

  • অরিন | ২৪ অক্টোবর ২০২০ ০৩:৩৪98832
  • শুধু মাওরি লোককথা নিয়েই একটা গোটা সিরিজ হতে পারে, লিখে শেষ করা যাবেনা। আমাদের ছোটবেলায় কেন যে পড়িনি এসব। 

  • Atoz | 151.141.85.8 | ২৪ অক্টোবর ২০২০ ০৪:১৬98834
  • মাউই এর একটা গল্প খুব প্রিয় আমার। সেই গল্পে ছিল দড়ির ফাঁস দিয়ে সূর্যকে ধরে আস্তে চলতে বাধ্য করার গল্প, যাতে বারো ঘন্টার দিন পাওয়া যায়। মাউই এর  বৌ হিনা নিজের চুল কেটে দিয়েছিল দড়ি বানাতে, দেবতার আশীর্বাদে ঐ চুল ছিল এমন, যা আগুনে পোড়ে না। ঃ-)

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন