• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ভ্রমণ  শনিবারবেলা

  • দখিন হাওয়ার দেশ - ৭

    অরিন বসু
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ০৭ নভেম্বর ২০২০ | ৮৯৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • আট নম্বর তার


    আমরা দেশ দেখতে বেরিয়েছি. দেশের কথাই যদি ওঠে তো বঙ্কিমচন্দ্রের ভাব ধার করে বলতে হয় তাতে কেবলই নদী, পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র, জলপ্রপাত, এমনকি পুরাণ, আখ্যান বোঝায় না, দেশের মানুষের মধ্যেই অন্তর্নিহিত আসল দেশ। আমরা কিনা নিউজিল্যান্ড দেখতে বেরিয়েছি, আজকে নিউজিল্যান্ডারদের দেখব। নিউজিল্যান্ডের মানুষকে কিউয়ি বলতে পারেন, মাওরি পাকিহা (শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের মাওরিরা যেভাবে সম্বোধন করেন) নির্বিশেষে। আজ না হয় জনাকয়েক কিউয়ির সঙ্গে একটু আলাপ পরিচয় হোক।

    আমার পাশের বাড়িটি পিটসাহেবের বাড়ি। পিটসাহেবের ৭০ বছরের ওপর বয়স, পেটানো চেহারা, এখনও বৎসরান্তে নদীতে, লেকে, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মাছ ধরতে যান। পিটসাহেব নিউজিল্যান্ডের সাবেকি মানুষের প্রতিভূ।

    পিটের বাড়ির সামনে খুব সামান্য একচিলতে ফাঁকা জমি, সেখানে পরিপাটি করে ঘাস ছাঁটা, বাড়ির সামনের লন দিয়ে হেঁটে বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়ালাম। সদর দরজাটি উন্মুক্ত। এখন বিকেল সাড়ে চারটে, বাড়ির ভেতর থেকে ভেড়ার মাংসের রোস্ট রান্নার গন্ধ ভেসে আসছে। দরজা খোলা, সাহেব মনে হয় বাড়ি নেই। পায়ের কাছে একটি কুকুর ঘোরাঘুরি করছে, এসে আপনাকে শুঁকে চলে গেল। বাড়িটির পিছন দিকে, যেখানে লনটি গিয়ে শেষ হয়েছে, একটি গ্যারেজ, সেটিও দেখছি খুলেই রাখা আছে। সেখান থেকে রেডিওয় গানের সুর ভেসে আসছে, আর টুক টুক করে হাতুড়ি পেটার শব্দ। এবাড়িতে পিট একাই থাকেন। পিটমশাই তার মানে গ্যারেজে রয়েছেন। এদিকে বাড়ির সদর দরজা খোলা, যে কেউ বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে, চোর ছ্যাঁচড়ের ভয় নেই ভদ্রলোকের? আমরাই তো না জানিয়ে চলে এলাম। ভদ্রলোককে গিয়ে একবার না হয় দেখে আসি।

    গ্যারেজের মধ্যে পিট একমনে একটি রকিং চেয়ার তৈরি করছেন। চেয়ারটি পাইনকাঠ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে, পাইনকাঠের মিষ্টি গন্ধে চারদিকটা ম ম করছে। আমরা গিয়ে পিট বলে নাম ধরে ডাকতে চমকে উঠে আমাদের হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “পিট, কেমন আছেন? কী করছেন? ইনি আমার বন্ধু, নিউজিল্যান্ড দেখতে বেরিয়েছেন, ভাবলাম আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে আনি।” পিট হাসলেন, তারপর হাত বাড়িয়ে আপনার সঙ্গে করমর্দন করে নিজের পরিচয় দিলেন, আপনিও। কুশল বিনিময়ের শেষে পিট বললেন, “নাতির দু-বছর বয়স হবে, তার জন্য নিজের হাতে রকিং চেয়ার তৈরি করছি।” এই বলে রকিং চেয়ারটি দেখালেন। পাইনকাঠের রকিং চেয়ার, এখনও তৈরি চলছে। হাতুড়ির আওয়াজ মানে পেরেক মারছিলেন। ঘরটিতে নানারকমের ছোটোবড়ো যন্ত্রপাতি ছড়ানো ছেটানো, তার মধ্যে একমনে সাহেব কাজ করে চলেছেন। বললেন, “এই যে চেয়ারটা তৈরি করছি, এর কাঠ কিছুটা কিনে আনা, আর কিছুটা একটা পাইন গাছ বহুদিন আগে কেটেছিলাম ঘর গরম করার জ্বালানি করব বলে, তার থেকে কেটেকুটে ঠিকমতো সাইজ করে নিলাম। মাঝখানে একদিন চেয়ারটা তৈরি করতে গিয়ে একদিন দেখি পেরেক কম পড়েছে, তখন হাতের কাছে আট নম্বর তার ছিল, খানিকটা কেটে পেরেকের মতন করে তৈরি করে নিলাম, দেখি দিব্যি কাজ করছে।” আমরা বললাম, “মশাই পারলেন?” বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে করে ফেলা যাবে!”, তারপর কথায় কথায় নানারকম প্রসঙ্গ এল। এর মাঝে পিট বললেন, “আসুন মশাইরা, বাড়ির পেছনের বাগান আর আরও কী কী বানিয়েছি সব ঘুরিয়ে দেখাই।

    দেখে শুনে আপনি তো তাজ্জব। লোকটি করেছে কী? বাগানে ঘুরতে ঘুরতে দেখেন কী, পুরোনো একটা সিঙ্ক ছিল, সেটাকে ফেলে দেওয়াই উচিত ছিল, তা না করে তা দিয়ে দিব্যি ফুলগাছের টব করেছেন। বাড়ির ভেতরে একটা আদ্যিকালের সাদাকালো টিভির খোলে মাছের অ্যাকোয়ারিয়াম। এজিনিস যে কোথাও থেকে কিনেছেন মনে হল না। জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, নিজের হাতেই সব কিছু করে নেন, বাপঠাকুরদার আমল থেকে এদেশে ওইরকম হয়ে আসছে।
    আপনি বললেন, “এ যা দেখালেন মশাই, একেবারে ম্যাকগাইভারের (আশির দশকে মার্কিন টিভি সিরিয়ালে এক আমেরিকানকে দেখা যেত যিনি যন্ত্রপাতির তোয়াক্কা না করে হাতেকলমে কাজ করতেন) হদ্দমুদ্দ!” শুনে তিনি বললেন, “তা বটে! তবে কী জানেন, ওইটেই আমাদের জাতধর্ম। রাস্তায় দেখেননি, গাড়ির পেছনে ট্রেলার ভরতি করে জ্বালানি কাঠ নিয়ে গাড়ি চলেছে? এ জিনিস আপনি বিলেত আমেরিকায় দেখতে পাবেন কি? মনে হয় না, আমরা কিউয়িরা সব ব্যাপারে একটু হাতেকলমে নিজে করে দেখতে ভালোবাসি! আমার দাদা একবার আমায় ক্রিসমাসে একখানা চেন-স (মেশিন চালিত করাত) উপহার দিয়েছিল, ভাবুন দিকি।
    তা আপনি ঠিকই বলেছেন, ম্যাকগাইভার মশাই কিউয়ি না হয়ে যান না, আমেরিকানরা নির্ঘাত এখানে এসে ফিলিম তুলে আমেরিকান বলে চালিয়েছে। তবে কী জানেন, ম্যাকগাইভারের যেমন সুইস আর্মি নাইফ আর ডাকট টেপ, আমাদের তেমনি আট নম্বর তার। ও দিয়ে যে কী না হয়।”
    বলে যোগ করলেন, “তবে আজকাল আর সেরকম আট নম্বর তার মার্কা স্পিরিট কোথায়? ম্যানুয়ালের তোয়াক্কা না করে জিনিসপত্তর সারিয়ে ফেলার লোকই বা কই? হায়, কোথায় এযুগের বার্ট মানরোরা?”

    বার্ট মানরো (১৮৯৯ - ১৯৭৮) থাকতেন নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপের দক্ষিণতম প্রান্ত, ইনভারকারগিলে, যে জায়গার কথা কেউই প্রায় জানে না। ভদ্রলোকের একটি ১৯২০ সালের মডেলের আমেরিকান ইন্ডিয়ান ব্র্যান্ডের মোটর সাইকেল ছিল। সেটিকে নিজের বাড়ির গ্যারেজে নিজের মতো করে খেটে খুটে আধুনিক বানিয়ে নিয়েছিলেন; কাজটি করতে তাঁর বছর কুড়ি লাগে। আমেরিকার ইউটা রাজ্যে বোনেভিল সল্ট ফ্ল্যাট নামে একটি জায়গায় মোটর বাইক রেসিং প্রতিযোগিতা হয়; ভদ্রলোক নিজের হাতে তৈরি ওই মোটর বাইক, সে মোটর বাইকের বয়স তখন ৪৭ বছর, তাঁর নিজের বয়স ৬৭, এই বয়সে ১৯৬৮ সালে বোনভিল ফ্ল্যাটে মোটর বাইকের স্পিড রেস আদ্যিকালের মোটর বাইকে চড়ে জিতেছিলেন, এবং অদ্যাবধি ৬৭ বছর বয়সি বৃদ্ধের করা সে রেকর্ড অটুট রয়েছে। যে মোটর বাইক বড়ো জোর ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল গতিতে যেতে পারত, তাকে সারিয়ে নিয়ে ২০০ মাইল ঘণ্টায় ওই বয়সে ছেলেছোকরাদের সঙ্গে লড়ে চালিয়ে নিয়ে জিতে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়! এনাকে নিয়ে রজার ডোনাল্ডসন ‘The World’s fastest Indian’ নাম দিয়ে একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র করেন। তা বার্ট মানরো হলেন যাকে বলে সাবেকি কিউয়ি স্পিরিটের প্রতিভূ।

    আর আট নম্বর তার?

    আট নম্বর তার আসলে একটি মানসিকতা, একটি মানসিক গঠন বলতে পারেন। কিউয়িদের মানসিক গঠন বোধহয়। খুব সামান্য জিনিসপত্র দিয়ে যতটুকু কাজ সারার সেরে নেওয়ার ক্ষমতা। এই জায়গাটাতে আমি আমাদের ভারতীয় মানসিকতার মিল খুঁজে পাই, আজকাল আবার তাকে অনেকে “জুগাড়” (ইং: Jugaad) নামে অভিহিত করে থাকেন। তবে কিউয়ির ‘Number eight mentality’ আর জুগাড় ঠিক একও নয়। সেভাবে দেখলে আট নম্বর তার একটা আট-গেজ বা চার মিলিমিটার বেড়ের তার বই কিছু নয়, এমনকি ১৯৬৭ সালের আগে অবধি (যে বছর বার্ট মানরো বোনেভিল ফ্ল্যাট রেস জিতে রেকর্ড গড়লেন) সে তার এদেশে আমেরিকা থেকে আমদানি করা হত। এদেশ যেহেতু অনেকটা কৃষি আর পশুপালনের ওপর আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল, জমির বেড় দেবার জন্যই সে তার ব্যবহার করত লোকে। সেখান থেকে আট নম্বর তারের বহুধা ব্যবহারের গল্প এতটাই যে সে লোকসংস্কৃতির জায়গা নিল কীভাবে?

    আমি একবার পিটকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “হ্যাঁ মশাই, এই যে আট নম্বর তার বলেন, জমির বেড়া দেওয়া ছাড়া ও আর কোন্‌ কাজেকম্মে লাগে?”
    আমার শহুরে বুদ্ধির বহর দেখে, পিট হা হা করে হাসলেন, বলেন, “আরে মশাই, আজ ও জিনিস না থাকলে দেখতেন এঅঞ্চলের অর্ধেক ওয়াশিং মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কারণ ওয়াশিং মেশিনের স্প্রিং খারাপ হয়ে গেলে আট নম্বর তারই ভরসা যে তাকে পাকিয়ে স্প্রিং-এর মতো করে আমরা মেশিন সারাই করি।”
    “ব্যস?”
    “আহা তা কেন, বালতির হাতল, ফিউজ, মায় গিটারের তার অবধি ও তার দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যায়!”

    এই চিন্তাভাবনার ধারাটি অমনই। একটা যুগে যখন সব কিছু একবার ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার পশ্চিমি সংস্কৃতি প্রায় সর্বত্র দেখা যায়, এখনও কিছু কিছু সমাজ রয়েছে যেখানে পুরোনো জিনিস, পুরোনো সব কিছু একেবারে ত্যাজ্য হয়নি।
    এদেশের এই উদ্ভাবন করার সংস্কৃতির আর-একজন প্রতিনিধি হলেন জন ব্রিটেন (John Britten, ১৯৫৫-১৯৯৫)। ভদ্রলোক নিজের গ্যারেজে একেবারে গোড়া থেকে একটি অভিনব মোটর বাইক তৈরি করেন, ১৯৯৪ সালের আমেরিকার ডেটোনা সার্কিটে সে মোটর বাইক জাপানি, ইতালিয়ান বাঘা বাঘা কোম্পানির ডিজাইন করা মোটর বাইককে পিছনে ফেলে জিতে সাড়া জাগিয়ে দেয়।


    (জন ব্রিটেনের ডিজাইন করা মোটর বাইক, যা ডেটোনা ১৯৯৪ সালে জিতে সাড়া জাগিয়ে ফেলে, সূত্র: https://www.bikeshedtimes.com/the-home-made-bike-that-conquered-the-world-the-britten-v1000/)

    এই নানা জিনিসের উদ্ভাবনের ইতিহাসটিও যখন ভেবে দেখি বেশ পুরোনো! দুনিয়ার লোকচক্ষুর অগোচরে একটি ছোট্ট দেশের মানুষেরা কত না কিছু করেছেন। আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের কথা ধরুন, যিনি প্রথম অ্যাটম ভেঙে টুকরো করে তার চরিত্র দেখালেন (১৯১১)। তারপর ধরুন ওষুধ দেবার প্লাস্টিকের ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ, এও নিউজিল্যান্ডের উদ্ভাবকের হাত ধরে আমরা পেয়েছি। সমুদ্রের ধারে ছোট্ট শহর টিমারু, সেখানে কলিন মারডোক নামে এক পশু-চিকিৎসক ১৯৫৬ সালে এর উদ্ভাবন করেন। যেমন ধরুন জগিং: আর্থার লিডইয়ারড নামে জনৈক অ্যাথলেটিকসের কোচ জগিং-এর জনক, ১৯৬০ সালে পিটার স্নেল এবং মারি হ্যালবার্গ রোম অলিম্পিকে সোনা জেতার পরে জগিং নিয়ে হই-চই পড়ে যায় অ্যাথলেটিকস মহলে, এখন সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয়। তারপর স্যার উইলিয়াম (‘বিল’) হ্যামিলটনের আবিষ্কৃত হ্যমিলটন জেট বোট ধরুন। এখানকার বহু নদী অপেক্ষাকৃত অগভীর, সেখানে প্রপেলার দেওয়া নৌকো চলে না, হ্যামিলটন উদ্ভাবন করলেন জেট বোট, জলের তোড়ে সে নৌকোয় অগভীর নদী, খরস্রোতা নদীতে পাড়ি দেওয়ার জন্য। এই যে নানা দেশে পাবলিক টয়লেট দেখতে পাওয়া যায়, যে টয়লেট নিজে নিজেকে পরিষ্কার রাখে, এরও আবিষ্কার নিউজিল্যান্ডে (exeloo)। হাল আমলে গ্লেন মার্টিনের তৈরি জেট প্যাক (ব্যক্তিমানুষ নিজে যাতে উড়ে যেতে পারে) আজকাল বিভিন্ন দেশে দুর্গম স্থানে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে।

    এখন, এর কোনোটাই রেডিও, টেলিভিশন, গাড়ি, আবিষ্কারের মতন বিশাল কিছু নয় যদিও রাইটভাইদের চেয়ে ৯ মাস আগে ৩১ মার্চ ১৯০৩ সালে রিচার্ড পিয়ারস (১৮৭৭ - ১৯৫৩) আকাশে কিছুক্ষণের জন্য হলেও একটি মেশিন উড়িয়ে ছিলেন বলে জনশ্রুতি। সে যাই হোক, একটি সুদূর, কম জনসংখ্যার দেশে মানুষ নিজের প্রয়োজনে উদ্ভাবনী ক্ষমতার ও আগ্রহের প্রদর্শন দীর্ঘদিন ধরে করে চলেছে, এটিও নেহাত তুচ্ছ নয়। এই নতুন জিনিসের প্রতি আগ্রহ এবং উৎসাহ আমার চোখে অন্তত দেশটির মানুষের পরিচিতি।

    যে কথাটা দিয়ে শুরু করেছিলাম, এক-একটি দেশের মানুষের এক-একরকম চিন্তাভাবনা, এক-একরকমের দেশীয় চরিত্র। তার কিছুটা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে অবশ্য হতে পারে। নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে যেমন, সমুদ্রে ঘেরা দ্বীপভূমি, তারও পরে সে যাকে বলে দুনিয়ার প্রায় সবচেয়ে একপ্রান্তে থাকা দেশ, কাছের জায়গা বলতে অস্ট্রেলিয়া, সেও নয় নয় করে হাজার চারেক মাইলের বেশই বই কম নয়। নিকটতম স্থলভাগ বলতে আন্টার্কটিকা, সে অঞ্চলে মানুষ থাকা না থাকা প্রায় সমান, না হলে উত্তরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, যারা নিউজিল্যান্ডের ওপর নির্ভরশীল, এবং আরও কম জনসংখ্যার দেশ। অতএব, দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ড শুধু প্রান্তিকই নয়, দুর্গমও বটে। তা ছাড়া মানুষের দেশে কালে সমাজ গড়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখবেন, এখানে মানুষের পদধূলি এবং সমাজ বিস্তার খুব বেশই হলে ত্রয়োদশ শতকের বেশি নয়, যে কারণে ইতিহাসের পর্যালোচনায় নিউজিল্যান্ড নবীনতম দেশ। এত সব ব্যাপারের কয়েকটি তাৎপর্য রয়েছে।

    এদেশে নৌকোয়, জাহাজে করে যারা প্রথম যুগে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছে তারা যে একরকমের অসমসাহসী ডাকাবুকো, বলা চলে, কারণ তারা প্রায় সকলেই নিজের ইচ্ছের বশে দুরন্ত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দূর দেশ থেকে এখানে এসে থেকেছে। এদের চরিত্রাবলি কি বিশেষ রকমের? তা ছাড়া, এদেশ সাংঘাতিক রকমের নির্জন এবং অনুষ্ণ। বন-জঙ্গলের অভাব নেই, তবে সেইসব অরণ্যে বন্যপ্রাণী বলতে শুধুই পাখি, তাদের মধ্যেও আবার সবাই উড়তে পারে না। মাওরিরাই প্রথম কুকুর নিয়ে আসে, এ ছাড়া এখানের বনে জঙ্গলে সাপখোপ নেই, হিংস্র চতুষ্পায়ী জন্তু-জানোয়ার নেই।

    জায়গার তুলনায় মানুষ অপ্রতুল। প্রায় সর্বত্র সবুজ, সজীব, উর্বর জমি, চাষবাস আর মেষপালন করে তাঁদের দিব্যি কেটে যায়। তার ওপর নিউজিল্যান্ড একটি প্রকৃতপক্ষে ওয়েলফেয়ার স্টেট, একসময় (১৯৬০-৭০-এর দশকে) খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেল দেশে মোট ১৫০ জন মানুষ বেকার, তাতেই মানুষজন আঁতকে উঠেছিল। এখন অবিশ্যি সে সংখ্যা ১ লক্ষের কাছাকাছি। ছড়ানো ছেটানো কম জনসংখ্যার দেশ হওয়ার জন্য আপনাকে সচরাচর নিজের কাজ নিজের হাতেই করে নিতে হবে। একটা সময় পর্যন্ত যেহেতু অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য বাইরের দেশের ওপর নির্ভর করতে হত, কাজেই নিজের হাতেকলমে কাজ করে নেওয়া, আত্মনির্ভর হওয়া কিউয়ি লোকের মজ্জাগত।

    কিউয়ি মানুষ সম্বন্ধে একটা কথা প্রায়ই শুনবেন, তারা আর যাই জানুক না কেন, কোন্‌ কাজটা করা একেবারে অসম্ভব বা তাদের সাধ্যের বাইরে, সেইটা একেবারেই জানে না, না হয় মানে না। যে কারণে সম্ভব অসম্ভব বিবেচনা না করেই সে অনেক সময় ঝাঁপিয়ে পড়ে।

    এ কি অবিমৃষ্যকারিতা? নাকি উদ্ভাবনার উন্মাদনা? কে জানে।

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৭ নভেম্বর ২০২০ | ৮৯৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ০৮ নভেম্বর ২০২০ ১২:৩১99757
  • আট নম্বর তারের কদর করা ভারতীয় শহুরেদের মধ্যে দুরবিন দিয়ে খুঁজতে হবে। বিশেষ করে টেকিরা সবসময়ই সময়ের অভাবে ভোগে। বরং গ্রামে পলিটেকনিক পাসেদের মধ্যে নানা উদ্ভাবন দেখেছি। তবে কিউয়িদের এই উন্মাদনা  সহজে তৃপ্ত ভাতঘুম দেওয়া বাঙালির অজানাই থেকে যাবে বোধহয়। 


    লেখার ভঙ্গি ঈর্ষণীয়। 

  • Ramit Chatterjee | ০৮ নভেম্বর ২০২০ ১৫:৪৬99765
  • আজকাল এক বার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া, মেড ইন চায়নার যুগে, ছোটো বাড়ি দেখলেই ভেঙে ফ্লাট তুলে দেওয়ার সময়ে, সবুজকে গলা টিপে মারার কালে ও ধোঁয়া তে ফুসফুস রুদ্ধ করে দেওয়ার এই মুহূর্তে নিউজিল্যান্ড সত্যিই এক মুক্ত বাতাস বয়ে নিয়ে আসে। আশা করি দেশটা ভবিষ্যতে ও যেন এরকমই থাকে।

  • Kaktarua | 4.14.166.20 | ১৩ নভেম্বর ২০২০ ২২:৪৭100143
  • এই series টা পড়তে বেশ ভালো লাগছে ।নর্থ আমেরিকান রাও খুবি হ্যান্ডস অন হয় ।মনে হয় যেখানেই কায়িক শ্রম অপ্রতুল বা কস্ট বেশি সেখানেই এটা হয়ে থাকে। এখানেও পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি নিজেরাই হাত লাগিয়ে বানিয়ে ফেলে। রেনোভেশন ওয়ার্ক তো লোক ডেকে করানোর একেবারেই চল নেই। আমরা দেশীরাই এ ব্যাপারে সব চেয়ে অজ্ঞ। তবে "রিসাইক্লিং" করতে নর্থ আমেরিকান রা ভালো বাসে না। সব টান মেরে ফেলে দাও তেই বেশি অভ্যস্ত। 

  • অর্জুন | 43.231.243.130 | ২৫ নভেম্বর ২০২০ ২২:৩৬100656
  • সময় নিয়ে পড়ব । 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন