এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  summer24

  • ফকির ফয়জুল্লাহ - তৃতীয় পর্ব

    মুরাদুল ইসলাম
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১২ এপ্রিল ২০২৪ | ১৭৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)

  • ছবি: জ্যোতিষ্ক দত্ত



    অধ্যায় পাঁচ


    আশরাফ আলী খান সকালে উঠানে বসে রান্না বান্না দেখছিলেন। তাদের আসা উপলক্ষে রান্না হচ্ছে, পুরো গ্রামের লোককে খাওয়ানো হবে। বড় বড় ডেগচিতে রান্না হচ্ছে, উঠানে গর্ত করে চুলা তৈরি করা হয়েছে।

    আশরাফ আলী খান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পাইপ টানছিলেন।

    চাকরকে দিয়ে খবর পাঠালেন যেন দেখে আসে চানতারা বানু অর্থাৎ যিনি ম্যাডাম নামে পরিচিত, তিনি ঘুম থেকে উঠেছেন কি না। তার সাথে কথা বলা দরকার। তাকে একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে ডেকে এনেছেন। কথাবার্তা বলে বুঝে নেয়া দরকার এই ডেকে আনা ভুল হয়েছে কি না।

    চানতারা এসে দেখলেন আশরাফ আলী খান একদৃষ্টিতে আগুনের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন।

    আশরাফ আলী খান তাকে দেখতে পেয়ে মুখ থেকে পাইপ বের করে হাসিমুখে বললেন, বসেন আপনি। শুনেছি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এখন ভালো বোধ করছেন?

    চানতারা সামনের চেয়ারে বসে বললেন, হ্যাঁ, সামান্য মাথা ঘুরে গিয়েছিল, আর কোন সমস্যা হয় নি।

    আশরাফ আলী খান বললেন, আমি কৃতজ্ঞ আপনার কাছে। আমার চিঠি পেয়েই আপনি চলে এসেছেন।

    চানতারা বললেন, আপনার মত গুণী মানুষ আমাকে স্মরণ করেছেন এতেই আমি আনন্দিত হয়েছি। কোন উপকার করতে পারলে আরও ভালো লাগবে।

    আশরাফ আলী বললেন, আসলে জানেনই তো আমি খুব ব্যস্ত মানুষ। এই গ্রামে আসা হল অনেক বছর পরে। ব্যবসা ও রাজনীতির কারণে সবদিকে খেয়াল রাখা সম্ভব হয় না। রাজনীতি খুব ঝামেলার জিনিষ জানেন তো?

    চানতারা হেসে বললেন, তা তো অবশ্যই।

    আশরাফ আলী বলতে থাকলেন, লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে দায়িত্ব, দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব, আমার এতোসবের ইচ্ছা ছিল না। চায়ের ব্যবসায় নামব বলে সব গুছিয়ে এনেছি। এর মধ্যে অতিরিক্ত রাজনৈতিক চাপ নেয়া কঠিন। এরই মধ্যে এইসব উদ্ভট পারিবারিক ঝামেলা হচ্ছে। শুরুটা বেশ আগে, মাঝে কয়েকবছর বন্ধ ছিল। অনেক ধরণের বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়েছি, ডাক্তার, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। আপনাকে নিয়ে বেশ লেখালেখি, কথাবার্তা হচ্ছে। শুনেছি আপনি পুলিশকেও সাহায্য করেছেন?

    চানতারা বললেন, আমার যা সাধ্য তা করে থাকি।

    আশরাফ আলী পাইপে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, আপনাকে চিঠি পাঠানোর আগে আমি ওখানকার পুলিশের সাথেও কথা বলেছি। তারা আপনার খুব প্রশংসা করলেন। আমার মনে হল, আপনি হয়ত ব্যাপারটার কোন এক সমাধান দিতে পারবেন।

    চানতারা বললেন, আপনি নির্দ্বিধায় আমাকে বলতে পারেন। আমার সাধ্যে থাকলে আমি অবশ্যই সাহায্য করব।

    আশরাফ আলী বললেন, শুরুটা হয়েছিল আমার মেয়ের জন্মের পরে। আমার একটাই মেয়ে। ওর যখন তিন চার বছর বয়স তখন একদিন আমাদের ঢাকার বাসার উঠানে খেলছিলো। এক ঝলসানো নীল আলো এসে ওর মাথার উপর ঘুরতে থাকে। এরপর মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায়।

    যখন জ্ঞান ফিরে তখন থেকে কোন কথা বলে না। কোন শব্দও উচ্চারণ করে না মুখ দিয়ে। দেশ বিদেশের অনেক ডাক্তার, সাইকিয়াট্রিস্ট দেখালাম। তারা যা বললেন তার সারকথা এই, মেয়েটার কোন শারীরিক সমস্যা নেই। সে শুনতে পায়। কিন্তু হয়ত হঠাৎ শক পেয়ে কোনভাবে তার কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে।

    আপনি কি আমার মেয়েটাকে দেখেছেন? ওর নাম হাসনাহেনা।

    চানতারা বললেন, হ্যাঁ, তাকে দেখেছি। আপনার স্ত্রীর সাথেও কথা হয়েছে।

    আশরাফ আলী তার পাইপ মুখে নিয়ে একটানা কয়েকটা টান দিলেন। এরপর ধোঁয়া ছাড়লেন।

    বললেন, আমার কোম্পানির নাম এই মেয়েটারই নামে। মেয়েটা যে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলল এটা আমার এক বড় দুঃখ। আপনি এই ব্যাপারে আমাকে যদি সাহায্য করতে পারেন তাহলে অনেক বড় উপকার হবে। কিন্তু আপনাকে এভাবে চিঠি দিয়ে গ্রামে নিয়ে আসার পেছনে প্রধান কারণ আরেকটা।

    চানতারা তীক্ষ্মভাবে আশরাফ আলীর দিকে তাকিয়ে শুনছিলেন তার কথাগুলো।

    আশরাফ আলী বলে যেতে লাগলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে আবার সে নীল আলো আমার মেয়েটাকে ঘিরে ধরেছিল। সেদিনও সে ছিল ঢাকার বাসার উঠানে। ওর মা খবর পেয়ে খুব দ্রুত নামতে যায় এবং পা হড়কে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়। রক্ত বের হয় নি কিন্তু জ্ঞান হারিয়ে ছিল।

    এরপর থেকে সে অদ্ভুত আচরণ করছে। কলকাতার একজন বড় ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। উনার পরামর্শমতই কিছুদিনের জন্য এই গ্রামে আসা। এখানে এসে যদি তার মনের কোন পরিবর্তন হয়।

    অর্থাৎ, আপনাকে এই দু'টি ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে। বের করতে হবে এগুলি কেন হচ্ছে, এবং এর সমাধানই বা কী।

    চানতারা বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করব। কিন্তু উনার অদ্ভুত আচরণটা কি অনেক বিষয়ে তিনি কথা বলছেন যেগুলি তার কখনোই জানার কথা না?

    আশরাফ আলী মুখ থেকে পাইপ বের করে বললেন, আপনি জানলেন কী করে?

    চানতারা সামান্য হাসলেন। বললেন, আমার সাথে উনার কথা হয়েছে।

    কাজের লোক এসে চা দিয়ে গেল।

    আশরাফ আলী বললেন, এখানে থাকতে কোন প্রয়োজন বা অসুবিধা হলে চাকর বাকরদের বলবেন। আপনার ফরমাশের জন্য আমি কয়েকজনকে বলে রেখেছি, তারা আপনার আশেপাশেই থাকবে।

    চানতারা বললেন, আপনি এ ব্যাপারে কোন চিন্তা করবেন না।

    আশরাফ আলী একটু থেমে গিয়ে বললেন, আপনি কীভাবে কাজ করেন আমি জানি না। ঝাড়ফুঁক, জাদু টোনা ইত্যাদির ব্যাপারে কখনো আগ্রহ হয় নি, আবার অবিশ্বাসও যে ছিল এমন না। সব কিছু নিয়ে ভাবার, এক্সপ্লোর করার সময় বা ইচ্ছা সবার হয় না। আমাদের পরিবারেরই ছেলে, তালাশ মাহমুদ, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন করে, পুরাতত্ত্ব নিয়ে কাজ করে, নানা কিছু করে, লেখালেখি করে, সে যেভাবে আপনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সেরকম আমি ভাবি না।

    চানতারা হেসে বললেন, আপনি ওরকম ভাবলে আমাকে আমন্ত্রণ জানাতেন না।

    আশরাফ আলী, হ্যাঁ, ঠিক তাই। কিন্তু কথাটা আপনাকে বলে রাখলাম। তালাশকেও আসতে বলেছি। সে এখন কোথায় জানি না। কিন্তু চিঠি পাওয়ামাত্র চলে আসবে। আশা করি এতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না।

    চানতারা বললেন, না, অসুবিধা কীসের! উনি আমার বিরুদ্ধে লেখতেই পারেন। আমি মনে করি যারা সত্য জানে না তাদের কাছে সত্যটাকে মিথ্যা মনে হয়।

    আশরাফ আলী বললেন, এটা ভালো বলেছেন। আপনার ব্যাপারে তপুর সাথে, তালাশ মাহমুদ বাইরের নাম, আমি তপুই ডাকি, আমার সাথে তার আপনার ব্যাপারে একবারই কথা হয়েছিল। কবে ঠিক মনে নেই। সেবার শয়তানের লেখা বাইবেল নিয়ে আপনি একটা সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন, আপনি বলেছিলেন প্রাচীন সেই বইটি এই দেশে আছে...

    চানতারা যোগ করলেন, পুরো বই না, বইয়ের হারিয়ে যাওয়া অংশ।

    আশরাফ আলী বলতে থাকলেন, হ্যাঁ, সেই হারিয়ে যাওয়া অংশ। শয়তানের লেখা বাইবেল, কোডেক্স গিগজের হারিয়ে যাওয়া অংশ এই দেশে আছে, এটা আপনি বলার পর এ নিয়ে বেশ কথাবার্তা হয়েছিল। তখন তপুর সাথে আপনার ব্যাপারে কথা হয়। আপনি বলেছিলেন, এই অংশে অভিশাপ আছে, যারা এটির অমর্যাদা করবে বা অন্যায়ভাবে দখল করবে, তাদের শাস্তি হবে। সত্যি আপনি এটা বিশ্বাস করেন?

    চানতারা বললেন, অবশ্যই। যারা অন্যায়ভাবে দখল করেছে, বা অযোগ্য কারো হাতে পড়লে সে শাস্তি পায়। শুধু এই বই না, আরও অনেক বইতে এমন অভিশাপ ছিল।

    আশরাফ আলী বললেন, ইন্টারেস্টিং!

    তিনি পাইপ টানতে থাকলেন। তার চোখ চানতারা বানুর মুখের দিকে। তিনি মুখের অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করছেন।

    চানতারা কিছুক্ষণ থেমে একদৃষ্টিতে তাকালেন চায়ের কাপের দিকে।

    তারপর আস্তে করে বললেন, আপনার ধারণা ভুল। আপনি মনে করছেন আগেকার দিনে প্রিন্ট মেশিন ছিল না, বই কপিকারক লোকেরা বই কপি করত, এবং ভুল হলে যেহেতু এরা মৃত্যুদণ্ডের মত কঠোর শাস্তি পেত, তাই তারাই এসব অভিশাপ লিখে রেখেছিল, যাতে অন্যেরা ভয় পায়, এবং তারা নিজেরা নিরাপদ থাকে। এটা যৌক্তিক মনে হলেও ভুল। অভিশাপ সত্যি হয়। আর এই বই কোন মানুষের লেখা না, সত্যি সত্যি এটা স্বয়ং শয়তানের লেখা।

    চানতারা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন।

    আশরাফ আলী মুখ থেকে পাইপ বের করেছেন। তিনি স্তব্ধ হয়ে গেছেন।

    কাজের লোকটা ভেবেছিল চানতারা উঠেছেন হয়ত তার কিছু লাগবে। সে দ্রুত এসে বলল, ম্যাডাম কিছু লাগবে?

    চানতারা টেবিলে থাকা চায়ের কাপ দেখিয়ে বললেন, এই কাপের চা যেন কেউ না খায়, ফেলে দাও।

    আশরাফ আলীকে বললেন, খান সাহেব, আমি এখন যাই। পরে কথা হবে।

    চানতারা চলে গেলেন বাড়ির দিকে। তার মাথা ধরেছে।

    আশরাফ আলী অবাক হলেও মেলাতে চেষ্টা করলেন এই মহিলা কীভাবে তার মনের কথা বুঝতে পারল। একে কি তিনি আন্ডার এস্টিমেট করেছেন? একসময়ে কংগ্রেস করেছেন, এখন মুসলিম লীগের নেতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোন প্রধান শিক্ষা পেয়ে থাকলে সেটা হল, কাউকে কখনো আন্ডারএস্টিমেট করতে নেই। এই ভুল তিনি করতে চান না।

    কিন্তু মহিলা বুঝল কীভাবে? এরকম যদি সে সব বুঝে ফেলে, অতিপ্রাকৃতিক কোন ক্ষমতাবলে, তাহলে তো এর সাথে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই। প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা বলে ফেলাই যুক্তিসংগত।



    অধ্যায় ছয়


    আশরাফ আলী খান যখন এসব চিন্তা করছিলেন তখন কাজের লোক এসে বলল, হুজুর মসজিদের ইমাম আপনের লগে দেখা করতে চান।

    আশরাফ আলী বিরক্ত হলেন। কিন্তু সকাল বেলায় ফিরিয়ে দেয়া ঠিক হবে না ভেবে বললেন, আসতে বলো।

    সাদা কুঁচকানো পাঞ্জাবী ও নীল রঙের টুপি পরা ইমাম কেরামত মোল্লা এলেন। এসে আশরাফ আলী খানের পা ছুঁয়ে সালাম করলেন।

    আশরাফ আলী বললেন, থাক থাক। বসো। তুমি কতদিন ধরে আছো এখানে?

    কেরামত মোল্লা বিনয়ের সাথে বললেন, চার বছর স্যার। আপনি আসছেন শুনে আপনারে দেখতে আসলাম। স্যার আপনারা আমাদের মাথার মণি। দেশের গর্ব। আল্লাহ বলেছেন গুণী মানুষের সাথে থাকতে। গুণী মানুষের সাথে থাকলে গুণের আছর পড়ে।

    আশরাফ আলী মুখে বিরক্তির ভাব দেখালেও মনে মনে খুশি হলেন ইমামের কথা শুনে। চানতারা বেগম তাকে একবারও স্যার ডাকে নি। কথাবার্তায় অতিরিক্ত বিনয় দেখায় নি। নেতা হিসেবে এই দুই জিনিষ এতো বেশি পান যে, এগুলি বেশিক্ষণ না পেলে অস্বস্তি হয় এখন।

    আশরাফ আলী বললেন, ইমাম তুমি বেশি কথা বলো। কাজের কথায় আসো। কোন কারণ ছাড়া তো আসো নাই। কারণ কী বলো?

    কেরামত মোল্লা মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, হুজুর কারণ কিছুই না। আপনারে দেখাটাই মূল বিষয়। তবে গেরামে একটা বড় ঝামেলা হইছে, আপনি হয়ত শুনছেন। মাতবর সাব এক লোকরে জায়গা দিছেন গ্রামে, সে আল্লা খোদা মানে না। শয়তানের পূজা করে।

    আশরাফ আলী বিরক্ত হয়ে বললেন, কী বলো না বলো? শয়তানের পূজা করে মানে কী?

    কেরামত মোল্লা বলেন, সত্যি স্যার। এই লোক মড়ার মাথার খুলির ভিতরে রক্ত নিয়া খায়। সারা রাইত শয়তানরে ডাকে। অনেকে দেখছে।

    আশরাফ আলী বললেন, তো তারে বের করে দাও।

    কেরামত মোল্লা বলেন, সেইখানেই তো ঝামেলা স্যার। একবার মাতবর সাব অসুখে পড়ছিলেন যে, দুই বছর আগে, ওই সময় এই লোক নাকি তারে বাঁচাইছিল। নাউজুবিল্লাহ। বাঁচানির মালিক আল্লাহ, মারার মালিক আল্লাহ। যারা ভিন্ন কথা বলে এরা শিরক করে।

    আশরাফ আলী গম্ভীর মুখে বললেন, হুম।

    তার মাথায় তখন ভিন্ন চিন্তা খেলছে। এই ইদ্রিস আলী অনেক সেয়ানা হয়েছে। একে শায়েস্তা করার এক সুযোগ মিললে মন্দ হয় না। তবে পরক্ষণেই আশরাফ আলী ভাবেন, এসব ছোট কাজ, এলাকার পলিটিক্স, এসবে অংশ নেয়া মানে গায়ে ময়লা লাগানো। এত ছোট কাজে জড়ানোর সময় তার নাই।

    কেরামত মোল্লা বলতে থাকলেন, স্যার, মাতবর সাব ওই বুড়ারে জায়গা দিছিলেন। তিনি ওরে সরাইবেন না। এইদিকে ওরে না সরাইলে গেরামে কখন কী মুসিবত আসে। আপনেরা জমিদার, আপনে একটা ব্যবস্থা নেন।

    আশরাফ আলী বললেন, দেখো ইমাম, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এসব করার সময় আমার নাই। আমি অল্পদিনের জন্য আসছি, একটা কাজে।

    কেরামত মোল্লা বলেন, কিন্তু স্যার আমাদের কী হবে? গেরামের লোকদের কী হবে?

    আশরাফ আলী বললেন, তুমি গ্রামের লোকদের বুঝাও। তোমরা এক হয়ে তো কিছু একটা করতে পারো।

    কেরামত মোল্লা বলেন, মাতবর সাবরে যে সবে ভয় পায়... আপনি যদি পিছে থাকেন আমাদের স্যার…

    আশরাফ আলী বললেন, সে পরে দেখা যাবে কেরামত। এখন তুমি যাও। পরে আবার কথা বলব।

    আশরাফ আলী চেয়ার থেকে উঠলেন।

    এই সময়ে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

    কেরামত মোল্লা লাফিয়ে এসে পড়লেন আশরাল আলী খানের পায়ে। দুই হাতে পা ধরে বললেন, স্যার আপনি আমাদের লিডার, আমার জীবনের একটা খায়েশ আপনে পুরা করেন।

    আশরাফ আলী প্রথমে হতচকিত এবং পরে বিব্রত হলেন। মাঝবয়েসী একটা লোক এভাবে হঠাৎ করে পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে ভাবা যায় না।

    আশরাফ আলী বললেন, আরে কর কী, কী হয়েছে, আমারে আগে বলবে তো, আশ্চর্য!

    আশরাফ আলী পা ছাড়ালেন, এবং জিজ্ঞেস করলেন, বলো তোমার কি খায়েশ? যার জন্য এই ভাবে পায়ে লাফিয়ে পড়লে?

    হাত কচলে কেরামত মোল্লা বললেন, স্যার আমাদের অনেকদিনের স্বপ্ন স্যার। আমি কতদিন ভাবছি আপনার সাথে দেখা করে বলব। কিন্তু সাহস করতে পারি নাই। দেখা দুয়েকবার হইছে কিন্তু বলতে পারি নাই।

    আশরাফ আলী বললেন, বলো কেরামত, সময় কম।

    কেরামত মোল্লা বললেন, স্যার, আপনার দাদার বাপেরা সেই পবিত্র ইরান থেকে আসছিলেন, আল্লার নবীর বংশের হাত ধরে আসা এক কুরান আছে আপনার কাছে আমি জানি। ওই পবিত্র জিনিষ একবার আমি দেখব স্যার, আপনি আমার এই খায়েশটা পুরা করেন।

    আশরাফ আলী ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়লেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ফলে সেই রাগ বাইরে বের হল না। ভালো রাজনীতিক হতে হলে যে কয়টা বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করতে হয় তার একটা হল, কেউ যেন মুখ দেখে ধরতে না পারে আপনি কী ভাবছেন, রেগে আছেন না খুশি হয়েছেন।

    আশরাফ আলী কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। তিনি কেরামত মোল্লার সাহস থেকে অবাকও হয়েছেন।

    চার বছর আগের এক ঘটনার কথা মনে হল। তখন একবার গ্রামে এসেছিলেন কয়েকদিনের জন্য। তখনকার ইমাম লোকটাও এভাবে দেখা করতে এসেছিল।

    এসে বলেছিল, হুজুর একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি। ফিরায়ে দিবেন না।

    আশরাফ আলী বললেন, বলেন কী প্রস্তাব।

    ইমাম বলেছিল, হুজুর, আপনি সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। এলাকায় আসলে আপনি যদি মসজিদে সালাত আদায় করেন তাহলে এলাকার লোকেরা সালাতে আসার আগ্রহ পাবে। আমার অনুরোধ আপনি মসজিদে এসে আমাদের সাথে সালাত আদায় করেন।

    আশরাফ আলী তখন অবাক হয়েছিলেন লোকটার সাহস দেখে।

    লোকটা বলছিল, আপনি হয়ত ভাবছেন দুই পয়সার ইমাম কীভাবে এত সাহস পেল আপনাকে নামাযের দাওয়াত দেয়ার। আল্লার নবীরা কত রাজা বাদশা ফেরাউনদের দাওয়াত দিয়েছেন, কষ্টভোগ করেছেন, সেসবের তুলনায় আপনি তো একজন মুমিন বান্দা, আমাদের লিডার। কিছু মনে করবেন না স্যার।

    আশরাফ আলী বলেছিলেন, আমি আপনার কথায় খুশি হয়েছি। আপনি আজ আমার এখানে খেয়ে যাবেন, এটা আপনার প্রতি আমার অনুরোধ।

    লোকটাকে ভালো ভাবে খাওয়ানো হয়েছিল।

    কিন্তু তার অনুরোধ তিনি রাখেন নি, এবং দুই মাস পরে আশরাফ আলী লোকটাকে গ্রামের ইমামতির চাকরি থেকে সরিয়ে ফেলেন।

    আশরাফ আলীর একবার মনে হল, এই ঘটনাটি কেরামত মোল্লাকে বলবেন, যাতে সে বুঝতে পারে তিনি কেমন মানুষ।

    কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন এটা ঠিক হবে না। তিনি কেমন মানুষ এটা যত কম লোক জানবে তত ভালো।

    আশরাফ আলী কেরামত মোল্লাকে বললেন, যা বলেছ, তা আর কখনো বলবে না। এসব কথা বেশি লোক জানলে সমস্যা। যদি কখনো সময় হয় তোমাকে দেখাব।

    কেরামত মোল্লা বললেন, কিন্তু স্যার, এই কথা তো গেরামে সবাই বলে।

    আশরাফ আলী বিরক্তি চেপে বললেন, সবার বলা আর তোমার বলা এক না ইমাম। সবাই আমার কাছে দেখতে আসে নি। বেশি কথা না বলে এখান থেকে যাও। আমার উপর ভরসা রাখো। সময় হলে তোমাকে দেখাব। আর, সময় থাকলে কিছুক্ষণ থেকে রান্নাবান্না দেখো। রান্না হলে একেবারে খেয়ে যাও।

    আশরাফ আলী উঠে চলে গেলেন।

    চাইলে তিনি কেরামত মোল্লাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু এর বদলে একটা দায়িত্ব দিয়ে তাকে গুরুত্ব দিলেন। কারণ তিনি কাজের লোক চিনতে পারেন। ভালো রাজনীতিবিদ হতে হলে এটা আরেক অপরিহার্য গুণ। মানুষের চোখ দেখে ধরে ফেলতে হয় একে দিয়ে কাজ হবে কি না। কেরামত মোল্লা একজন কাজের লোক। তার চোখ চঞ্চল।




    ক্রমশ... ... ... (আগামীকাল)




    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ১২ এপ্রিল ২০২৪ | ১৭৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন