• জলদাপাড়া অভয়ারণ্য

    শমীক
    ভ্রমণ | ২৫ এপ্রিল ২০০৭ | ৪৬ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • তখন থার্ড ইয়ার। শীতের ক্ষুদ্রতম ছুটিকে দীর্ঘতম এক্সটেনশন দিয়ে জনতা সব চলে গেছে বাড়ি। হপ্তা দুয়েক হল কাঞ্চনও আর চোখের সামনে দেখা দেয় না। ঘন কুয়াশায় মুড়ে যাচ্ছে তরাই। অলস দিন ফুটে ওঠবার আগেই চা বাগানের গা বেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সন্ধ্যে।

    পয়লা জানুয়ারি। প্রচন্ড ঠান্ডা। প্রায় ২ ডিগ্রির কাছাকাছি। হস্টেলের মেটালের খাটে শোওয়া এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। চারশো জনে ভরে থাকা জে সি বোস হলে তখন আমরা মাত্র সাতজন। আরও দশজন আঠাশে ডিসেম্বর চলে গেছে সান্দাকফু ট্রেকিং করতে। আড়াই হাজার টাকা খরচা করার মত ক্ষমতা ছিল না বলে যাই নি। বাকি ছজনের বেড়ানোটা বিড়ম্বনা সম বলে যায় নি।

    কিন্তু পায়ের তলায় সর্ষে ছড়িয়ে দিলে সে বিড়ম্বনা উড়ে যেতে কতক্ষন? বাড় খেয়ে গেল ছজনের পাঁচজন। সান্দাকফু যাওয়া না হোক, জলুর মধ্যেই কোথাও যাওয়া যাক না! জলদাপাড়া?

    রাখাল চন্দ্র মাতাল ওরফে দেবদাস দে, ইনফো দিল, ওখানে টুরিস্ট লজ বুক করতে গেলে শিলিগুড়ি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে গিয়ে বুকিং করে আসতে হয়। ফান্ডা নিতে যাওয়া হল খনির বাড়িতে। খনির বউ রক্তিমা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ক্লার্ক।

    বাই দ্য ওয়ে, খনি হল আমাদের ক্যাম্পাসের ডাক্তার। তা, রক্তিমা আমাদের তেমন কোনও তথ্য দিতে পারল না। অতএব আমরা ছজন, জাস্ট অনুমানে ভর করে চেপে বসলাম একটা হাসিমারা-গামী বাসে।

    জলপাইগুড়ির কোনও লোকাল বাসে ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের ছেলে পুরো ভাড়া দেয় না। ফিফটি পার্সেন্ট। সেটা জলপাইগুড়ি শিলিগুড়ি রুটের কন্ডাক্টররা জানে। তাই পাঁচ টাকার বেশি ভাড়া নিত না, এমনকি ভাড়া বেড়ে যখন দশ থেকে এগারো হয়ে গেল, তখনও। কিন্তু হাসিমারা রুটের কন্ডাক্টর সে সব মানবে কেন?

    অতএব বাওয়ালি। ভাড়া দেবই না। কী করবি কর।

    জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের এলাকাটার নাম মাদারিহাট। মাদারিহাট পৌঁছে খুব ল্যাদ লাগল। এই তো সবে বাসে উঠলাম, এখনই নামব? থাক। পেদো বলল হাসিমারা থেকে সামান্য দূরেই জয়গাঁও, ভূটান বর্ডার। একটুর জন্য বিদেশযাত্রা মিস করব? স্রেফ গন্ডার দেখার আশায়?

    হাসিমারা থেকে সামান্য দূরত্বে জয়গাঁও। দু টাকা বাসভাড়া। একটাকা দিলাম। দুপুর বারোটায় জয়গাঁও।

    সামনেই অপূর্ব কারুকাজ করা ভূটান গেট। ঠিক সেখান থেকেই সমতল থেকে, বলা নেই, কওয়া নেই, আচমকা রাস্তা চড়াই হয়ে উঠে গেছে। ভূটান পাহাড়ের ওখান থেকেই শুরু, একেবারে আচমকা।

    এলাকাটা বাঙালি ভুটিয়াতে ছড়াছড়ি, ঐ ঠান্ডাতেও ছোটো স্কার্টের মত ভুটানি পোষাক পরে ক্ষুদে চোখের গম্ভীর এবং হাসিখুশি ভুটিয়ার দল সাইকেলে স্কুটারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    ভূটানের দিকে জায়গাটার নাম ফুয়েন্টশেলিং। টুকটুক করে পাহাড়ের ওপর উঠে গেলাম। অনেকটা। আস্তে আস্তে লোকালয় কমে এল। চারদিকে কেবল লম্বা লম্বা পাইন গাছ, আর তীব্র ঠান্ডা হাওয়ায় পত্‌পত্‌ করে উড়ে বেড়ানো লম্বা লম্বা বৌদ্ধ পতাকা। রংবেরংয়ের।

    কে কে যেন ছিলাম? সবার নাম মনে পড়ছে না, আমি, মাতাল, পেদো, ও হ্যাঁ, রংবাজ ছিল। রংবাজ, সুমন দুয়ারি। সুমনই প্রথম দেখাল, পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, একটা মনাস্ট্রি। হনহনিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম মনাস্ট্রি। বড় সুন্দর। ফুলেফুলে ঢাকা বুদ্ধমূর্তি। সামনে একটা বিশাল ধম্মচক্র। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। ভেতরে কথা বলা নিষেধ। একজন লামা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জানিয়ে দিলেন।
    তারপর আবার বেরোলাম। পেদোর ইচ্ছে হল একজন লামাকে নিয়ে ফটো তুলবে, রামপুরহাটে ফিরে গিয়ে দেখাবে সবাইকে।

    সামনেই এক বয়স্ক লামা ঘুরছিলেন, তাঁকে ইশারায় আর ভাঙা ইংরেজিতে অনুরোধ করতেই এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। পোজ দিয়ে বেশ কটা ছবি তুললেন। আলাপ করলেন। খুব গর্বের সঙ্গে জানালেন, তিনি লেখাপড়া জানা। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছেন। প্রথমে মনে হল, ভুল শুনছি। কিন্তু লামার মুখের দিকে তাকিয়ে কোনও মিথ্যে কথা বলার লক্ষণ দেখলাম না। অপার্থিব সরল মুখ। কে জ ¡নে, কোন প্রত্যন্ত ভূটানি গ্রামের ছেলে কোন ছোটবেলা থেকে এই মনাস্ট্রিতে সারাজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। আবার নেমে এলাম ফুয়েন্টশেলিংয়ের সমতলে। ড্রুক জ্যম জেলি তৈরির কারখানা দেখলাম বাইরে থেকে, একটা কুমীর প্রকল্প আছে, দেখলাম তাও, পাশেই একটা সিনেমাহল, ভূটানেই পড়ে, সেখানে চলছে গোবিন্দার ছোটে সরকার।

    ফিরে এলাম জয়গাঁও। বিকেল সাড়ে চারটে বাজে। সারাদিন খাওয়া হয় নি। একটা পাইস হোটেলে ঢুকে গোগ্রাসে খেলাম। হিসেব করে দেখলাম, সকালে হস্টেল থেকে বেরনোর পর এখনও পর্যন্ত খরচা হয়েছে সাঁইত্রিশ টাকা মাত্র। মাত্র সাঁইত্রিশ টাকায় ফরেন ট্যুর।

    লোকাল বাসে ফেরত হাসিমারা। এবার মাদারিহাটে নামতেই হবে। নইলে জলদাপাড়া আর দেখাই হবে না।

    মাদারিহাটে দুটো ট্যুরিস্ট লজ আছে। অভয়ারণ্যের বাইরেরটার নাম মাদারিহাট ট্যুরিস্ট লজ, ওটা সাধারণের নাগালে। অভয়ারণ্যের ভেতরের এলাকাটার নাম হলং, সেখানে আছে হলং ট্যুরিস্ট লজ, বড়লোক ট্যুরিস্ট আর সর্বহারাদের জন্যে। সর্বহারা বলতে, জ্যোতি বসু অ্যান্ড কোং। সেই সব জাতীয় পশু এলে লাখ টাকা দিয়ে বুকিং করা থাকলেও বুকিং ক্যানসেল হয়ে যাবে। আমরা নামলাম মাদারিহাটের মোড়ে। প্রথমে মাদারিহাট লজে অ্যাপ্রোচ। বিশাল এলাকা জুড়ে লজ, উঁচু কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। আর কাঠের তৈরি উঁচু লগের ওপর বানানো লজ একেকটা। কাঠের সিঁড়ি। অফিসঘরে বলল, এক রাত্তির থাকা খাওয়া দুশো পঁচাত্তর টাকা। পারহেড। ইল্লি আর কি! ভূটান ঘুরে এসে, অন্তত আমার পকেটে তখন একশো তেষট্টি টাকা মাত্র। বাকিদের অবস্থাও তথৈবচ। বললাম, খাব না। বললাম, স্টুডেন্ট। কোনও কিছুতেই ভবি ভুলল না। শুধু লজিং হয় না, থাকতে গেলে খেতেই হবে, আর স্টুডেন্ট কনসেশন কিছু নেই।

    নিরুপায়। পেদো বলল, শালা, মেয়ে তো নই, এখানেই কোনও না কোনও দোকানে রাত কাটিয়ে নেব। কী আর হবে? চল দেখি, জায়গা জুটে যাবে। বলা খুব সোজা। কিন্তু ও সব এক্সপিরিয়েন্স গল্পের বইতেই দেখা যায়। দুটো মিষ্টির দোকান মিষ্টি কথায় হাঁকিয়ে দিল, তারপর আর এগোতে না এগোতেই লোকালয় শেষ, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বাজে, মনে হচ্ছে যেন গভীর রাত, কোনও দোকান খোলা নেই, রাস্তায় আলো নেই।

    মাতাল বলল, চ' দেখি আবার লজে যাই। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি। না হলে আমার কাছে ক্যাশ আছে, হয়ে যাবে ছজনের। পরে মিটিয়ে দিস। আবার গেলাম লজে। এবং আশ্চর্য ব্যাপার, এবার অভাবনীয় ভাবে 'মাল নেমে' গেল। ডর্মিটরি পাওয়া যাবে। চারজনের বেড আছে, ওরা দুটো এক্সট্রা ম্যাট্রেস লাগিয়ে দেবে, কেবল পারহেড একশো পঁচিশ করে নেবে। খাওয়া দেবে না। খাওয়া নিজের দায়িত্ব। পাগ্‌লা ক্ষীর খা! গুড় দিয়ে রুটি, চিনি দিয়ে চা! জল না চাইতেই মেঘ। হইহই করে ঢুকে পড়লাম ডর্মিতে। কাঠের ঘরে সেই প্রথম থাকা। লাগেজ রাখতে না রাখতেই একজন এসে বলল, চা খাবেন? চা খেলাম। রাত তখন সওয়া আটটা। ম্যানেজার বললেন, গেট কিন্তু রাত দশটায় বন্ধ হয়ে যায়, খেয়ে দেয়ে ফিরতে হলে দশটার আগে, নইলে সারারাত বাইরে।

    তথাস্তু বলে তো বেরিয়ে এলাম। কিন্তু কোথায় খাবো?

    অ্যাডভেঞ্চারই বটে। পয়সা বাঁচানোর লক্ষ্যে খেয়াল ছিল না যে এটা জলপাইগুড়ির একটা ইন্টিরিয়র গ্রাম, সন্ধ্যে সাতটার মধ্যে সমস্ত দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যেতে আমরা নিজের চোখে দেখে এসেছি। তবু যদি কিছু পাওয়া যায়। উদ্দেশ্যহীন ভাবে খানিক ঘুরলাম মাদারিহাটের রাস্তায়। এবং হ্যাঁ, আশাতীত ভাবে পেয়ে গেলাম একটা গুমটির দোকান। সাধারণ অবস্থায় হয় তো সে দোকানের দিকে এগোতামই না, কিন্তু ক্ষিদের জ্বালায় লক্ষ্যও করলাম না, দোকানে দুটো পাঁড় মাতাল ছাড়া অর কেউ নেই, তাদের মধ্যে একজন দোকানদার। কী আছে? রুটি আর মাংস। যে সে মাংস নয়, শুওরের মাংস। তখন বয়েস কুড়ি, কোনওদিন পর্ক খাই নি, অতএব বেশ একটা নিষিদ্ধ উত্তেজনা আছে চিকেন মাটন বাদে যে কোনও রকমের মাংসের প্রতি। চল্‌ পাগলা। চার পাঁচটা করে রুটি খাবার পরে যখন ক্ষিদেটা একটু মরল, টের পেলাম মাংসটা মোটেই ভাল খেতে নয়, এবং ভাল করে সেদ্ধও নয়। বই পড়া বিদ্যে অনুযায়ী আমাদের পেটে এতক্ষণে ফিতেকৃমি চলে গেলেও যেতে পারে। কিন্তু কে আর ওসবের কেয়ার করে? পেট ভরে আধসেদ্ধ শুওরের মাংস আর আধপোড়া রুটি খেলাম। পেদোর এইবার প্রেম পেয়ে গেছে। সে চৈতালিকে ফোন করবেই। রাত তখন নটা চল্লিশ। পেদো বলল, তোরা লজে ফিরে যা, আমি ফোন বুথ খুঁজে ফোন করে দশটার ভেতরেই ফিরব।

    অগত্যা, আমরা ফিরে এলাম। রাত দশটা বেজে গেল, পেদোর দেখা নেই। শেষমেশ, গার্ডকে বলে কয়ে গেট খুলে আমরা বেরোলাম আবার। জলদাপাড়ায় রাত দশটা মানে, গভীর রাত। চারদিক শুনশান, কেবল লজের জেনারেটরের শব্দ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই। বেশিদূর যাওয়ার দরকার হল না, দু পা এগোতেই দেখি হন্‌হন্‌ করে পেদো আসছে, আমাদের দেখেই হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, শালা, খুব জোর বেঁচে গিয়েছি, দুটো লোক আমার পিছু নিয়েছিল। মানে? বলে কী? পেদোর কাছ থেকে শুনলাম ঘটনা। ফোন করে ফেরার পথে দুটো পথচারীকে ওভারটেক করার সময়ে পেদো ওভারহিয়ার করে, তারা বলাবলি করছে, 'এই জানিস, ইঞ্জিন কলেজের কয়েকটা ছেলে এখেনে এসেছে, থাকার জন্য দোকানঘরের চাতাল খুঁজছিল।' অন্যজন তখন বলে নাকি, 'তবে তো ভালো মওকা, নিশ্চয়ই ওদের কাছে ভালো টাকাপয়সা থাকবে, কলকাতার ছেলে' ... তখনি পেদোকে দেখে ওদের একজন ফিসফিস করে নাকি বলে, 'এই দ্যাখ দ্যাখ, ওদের একখান ছেলে এইটা' । পেদো তখন অর্ধেক হেঁটে অর্ধেক দৌড়ে এগোতে থাকে, লজের কাছাকাছি আসার পরে সেই লোকদুটো বুঝতে পারে আমরা বাইরে রাত কাটাবো না, তখন সরে যায়।

    কী যে বিপদ হতে পারত, কে জানে, তবে বেঁচে গেছিলাম।

    ক্লান্ত, বিধ্বস্ত আমরা বিছানায় জাস্ট ধপ্‌ধপ্‌ করে উপুড় হয়ে পড়েছি, এমন সময়ে দরজায় টোকা। লজের ম্যানেজার। পুরো জামাই আদর যাকে বলে। ঢুকেই বলেন, তোমরা কি কাল হাতির পিঠে চেপে জঙ্গল ঘুরতে যাবে? পারহেড চল্লিশ টাকা লাগবে। জাস্ট ভদ্রতা করে ম্যানেজারকে ফেলে চুমু দিলাম না। বলে কী? থাকার জায়গা জুটছিল না, আবার হাতির পিঠে চড়ে জলদাপাড়া দেখা? দেখব না মানে? ম্যানেজার বললেন, সাড়ে পাঁচটায় হাতি হলং ট্যুরিস্ট লজ থেকে স্টার্ট করবে, এখান থেকে পাঁচটায় জিপ ছাড়বে, তোমাদের বাহাদুর পৌনে পাঁচটায় ডেকে দেবে, রেডি হয়ে নিও। এটা মিস করলে কিন্তু পরের হাতি বিকেল তিনটের আগে খালি নেই। পয়সা দাও। ম্যানেজার চলে যেতে আমরা পুরো হুলা হুলা নৃত্য শুরু করলাম, কোথায় গেল তখন সমস্ত ক্লান্তি। কাঠের ঘর, কাঠের মেঝে, জানতাম না, পাশের ঘরেই এক সায়েব আছেন, হঠাৎ শুনি, দরজার বাইরে কেউ ইংরেজিতে কিছু বলছে, অনেকটা গায়ত্রী মন্ত্র পড়ার মতন শোনাচ্ছে ঘরের ভেতর থেকে। মাতাল দরজা খুলে দেখে এক লালমুখো খুব বিরক্ত ভাবে বাইরে দাঁড়িয়েই বলে চলেছে, কাল ওর শিলিগুড়ি থেকে ফ্লাইট আছে, ওর ঘুম দরকার, আমরা যদি দয়া করে হইহুল্লোড় কম করি তো ও ঘুমোতে পারে। তখন আমরা কেউ ইংরেজিতে কথা বলতে পারতাম না। মাতাল কোনওমতে ওকে ওকে, সরি সরি, গুডনাইট বলে সায়েবকে কাটালো। অ্যালার্ম লাগিয়ে আমরা ঘুমোতে গেলাম।

    বাহাদুরকে ডাকতে হয় নি। আমরা নিজেরাই উঠে পড়েছিলাম সাড়ে চারটেয়। জানুয়ারির তিন তারিখ, তাপমাত্রা তখন শূন্যের কাছাকাছি।
    বাহাদুর চা দিয়ে গেল। অমৃত লাগছিল তখন। ধরাচূড়ো পরে পাঁচটার আগেই আমরা রেডি। আ হা:। সিনিমায় যেমুন দেখা যায়, হুডখোলা জিপ। হইহই করেচেপে বসলাম। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় চোখ খুলে রাখা দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

    বেশি দূর না, মাত্র চার কিলোমিটার। গাড়ি এসে দাঁড়াল হলং ট্যুরিস্ট লজের সামনে। তিনতলা বাংলো, কাঠের তৈরি, নীল সাদা রং করা, দেখলেই বোঝা যায় বড়লোকেদের জন্য তৈরি। এবং, অবশ্যই সর্বহারাদের জন্য। লজের সামনে একটা উঁচু খাম্বা, খানিকটা ওয়াচ টাওয়ারের মত, লোহার সিঁড়ি লাগানো, ওপরে রেলিং দেওয়া। অন্ধকার তখনও ঘন, চারপাশে শুধু গাছগাছালি, তাতে করে অন্ধকার আরও মিশমিশে লাগছে।

    খানিক বাদেই হাতি এসে হাজির। হাতি নয়, হাতিনী। মা-হাতি, সাথে একটা পুচকি হাতির ছানা। কী যে মিষ্টি দেখতে, এর পিঠেও লোক চাপাবে নাকি? সারা গায়ে বড় বড় লোম ভর্তি, ফোক্‌লা মুখ, এসেই কচি খোকা শুঁড় দিয়ে মায়ের পা জড়িয়ে ধরল। মা-ও শুঁড় দিয়ে ছানাকে একটু আদর করে নিল। এবার আমরা সেই ওয়াচ টাওয়ারের ওপর উঠলাম। হাতি এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল তার পাশে। মাহুতের সাহায্যে আমরা দিব্যি চড়ে গেলাম হাতির পিঠে। নোংরা কম্বলের ওপর লাল কাপড় বিছিয়ে তৈরি হাওদা। সামনে হাতির টাকে বসে মাহুত, হাতে অঙ্কুশ। সেই অঙ্কুশের সাইজ দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমার মাথায় ওটা আলতো করে ছোঁওয়ালেই আমার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটবে।

    যাত্রা হল শুরু। পাথরের বোল্ডারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পাতলা ঝোরার ওপর দিয়ে ছপছপিয়ে চলল হাতি, পাশে পাশে ছানা। একটু এগোতেই দেখি আকাশের একটা দিক ফরসা হয়ে এল, আর ... হ্যাঁ, সূর্যোদয়। ঘন জঙ্গলের ভেতরে সূর্যোদয় দেখারও একটা আলাদা ব্যাপার আছে, তাও হাতির পিঠে। চারপাশের গাছের পাতাপত্তর চোখে মুখে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে, ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে হিমশীতল শিশিরের ফোঁটা। মাঝে মাঝে হাতি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, ছানা শুঁড় তুলে চুকচুক করে একটুখানি করে মায়ের দুধ খেয়ে নিচ্ছে। আবার মাহুতের অঙ্কুশের বাড়ি খেয়ে মাতৃস্নেহ ভুলে ডিউটি পালন। এতটুকু বিরক্তি নেই।

    এক ঘন্টারও বেশি ঘুরলাম জঙ্গলে। বাঁদর দেখলাম, ময়ূর দেখলাম, বুনো শুওরও দেখলাম, কিন্তু গন্ডার দেখা হয় নি। ওটা লাকের ব্যাপার। কপালে না থাকলে গন্ডার মেলে না। অত সকালে বোধ হয় গন্ডাররা ঘুম থেকে ওঠে নি। লেট রাইজার সব!

    তারপরে আবার হলংয়ে ফেরৎ। সকাল সাতটায়।

    জঙ্গলের মধ্যে সূর্যোদয় দেখারও একটা আলাদা বিউটি আছে। ভিজে ভিজে গাছের পাতারা মুখ মাথায় বুলিয়ে যাচ্ছে, কনকনে ঠান্ডা, জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে উঠল লাল রংয়ের বিশাআল বড় সূর্য। মাহুত মাঝে মাঝেই ঐ জাম্বো অঙ্কুশ নিয়ে হাতিনীর মাথায় মারছে, আর হাতিনী তার কথা শুনছে। কী করে যে ঐ মার হাতিনী সহ্য করছিল, কে জানে! ... খোকা হাতি মাঝে একটুখানি চুকচুক করে মায়ের দুধ খেল, তার জন্য আমরা দশ মিনিটের ব্রেক পেলাম।

    সাতটায় হলংয়ে ফেরৎ এলাম। এসে জানলাম, যে জিপে আমরা এসেছিলাম, তার নাকি অ্যাক্সেল ভেঙে গেছে, সারাতে গেছে, সেরে এলে আমরা ফেরৎ যেতে পারব। কে জানে, আমাদের অ্যাবসেন্সে কোনও হাতি এসে বসেছিল কিনা জিপে! কিন্তু জলদাপাড়ার মত জায়গায় জিপ যদি অ্যাক্সেল পাল্টাতে যায়, সে সেই দিনই ফিরবে কিনা তার কী গ্যারান্টি?

    চার কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে ফিরলাম, কারণ জলপাইগুড়ির বাস হলংয়ের ওপর দিয়ে গেলেও স্টপেজ মাদারিহাটেই।

    এর পর অবশ্য গল্প আর বিশেষ কিছু নেই, সেদিন অনেক রাতে হস্টেল ফিরেছিলাম, কারণ মালবাজারের কাছে এসে জানা গেল কোন বাসে নাকি ডাকাতি হয়েছে তাই রুটে সমস্ত বাস বন্ধ, মাল থেকে রিক্‌শাভ্যানে করে কোন একটা জায়গায়, সেখান থেকে ট্রেকারে করে ময়নাগুড়ি। ময়নাগুড়ি থেকে বাস ধরে জলু ক্যাম্পাস।

    ফিরে এসে হিসেব করলাম। টোটাল খরচ একশো সত্তর টাকা। একশো সত্তরে বিদেশ ভ্রমণ।
  • বিভাগ : ভ্রমণ | ২৫ এপ্রিল ২০০৭ | ৪৬ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত