• হরিদাস পাল  অপর বাংলা

  • হাজং উৎসব : প্যাঁক খেলা

    বিপ্লব রহমান লেখকের গ্রাহক হোন
    অপর বাংলা | ০৫ আগস্ট ২০২০ | ৩৪২ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার

  • বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গারো পাহাড়ের কোলে নেত্রকোনা জেলার বিরিশিরির সীমান্ত আদিবাসী গ্রাম সুসং দূর্গাপুরে হাজং জনজাতির মানুষ মেতে উঠেছেন ঐহিত্যবাহী ‌‌‘প্যাঁক খেলা’ উৎসবে। নারী-পুরুষ-শিশু সকলেই একে অপরকে পলি-কাদা মাখিয়ে খুশীতে মাতোয়ারা।


    হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে নেচে-গেয়ে অনাবিল আনন্দ, হাসি, তামাশায় সকলে বিভোর। কাদা মেখে কিম্ভুতকিমাকার একেকজন। হাসি আর কণ্ঠস্বর দিয়েই চিনে নিতে হয় পরস্পরকে।


    ‘প্যাঁক খেলা’ শেষে কাদা মেখেই নরম কাদায় বপন শুরু হয় ধান। এমনই সরল-সুন্দর-ঐতিহ্যময় হাজাং আদিবাসী জীবন।


    ‘হা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, টিলা বা পাহাড়। এক সময় পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের বসবাস ছিল বলে তাদের নামকরণ হয় ‘হাজং’। এ দেশের শেরপুর, রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হাজংদের বাস। এছাড়া গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের ভাওয়াল গড়ে এবং সুনামগঞ্জে অল্প কয়েক পরিবার হাজং বাস করেন। নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে আনুমানিক সাড়ে আট হাজার হাজং পরিবার আছেন।



    হাজংদের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব ভাষা, রীতিনীতি, সংস্কৃতি, বয়ন, পোশাক-পরিচ্ছদ। শান্তিকামী হাজাংরা অধিকাংশই পেশায় কৃষিজীবী, ধর্মান্তারিত হয়ে খ্রিষ্টান।  


    হাজংদের ‘প্যাঁক খেলার’ মতো কক্সবাজার-পটুয়াখালির রাখাইনদের রয়েছে আরেক ঐতিহ্যবাহী পানি-খেলা উৎসব-- সাংগ্রেং। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমারাও পানি খেলার আয়োজন করেন, তারা একে বলেন-- সাংগ্রেই পোয়ে।  সেটি অবশ্য বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণের ভিন্ন এক উৎসব। আর বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলে বসবাসকারি গারো বা মান্দি জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে বীজ বপনের উৎসব ‘রঞ্চুগালা’ ও নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগালা’। আর চাকমাদের বর্ষ বরণ ও বর্ষ বিদায় উৎসবের নাম ‘বিঝু’। ত্রিপুরারা তাদের চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবকে বলেন ‘বৈসুক’। সাঁওতাল আদিবাসীর রয়েছে নবান্ন উৎসব ‘সোহরাই বাহা’ ও বৃক্ষ বন্দনা ‘কারাম’ উৎসবের ঐতিহ্য। তবে সে সব ভিন্ন প্রসঙ্গ।   


    ছোট্ট জনজাতি হাজংদের রয়েছে হাজং বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, টংক আন্দোলন এবং ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৪৬-৫০ সালের টংক আন্দোলনের শহীদ রাশমনি হাজং এখনো হাজংদের কাছে দেবীর সমান। ওই বিদ্রোহের নেত্রী কুমুদিনী হাজং এখনো জীবন্ত কিংবদন্তি। জমিদারদের অন্যায্য খাজনা আদায়ের বিরুদ্ধে সেই সময় রাজ সেনার বিরুদ্ধে তিনি কৃষকদের বিরত্বপূর্ণ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।


    টংক ছিল সে সময় ফসলের মাধ্যমে জমিদারদের খাজনা প্রদানের একটি শোষণমূলক প্রথা। নিখিল ভারত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মনি সিংহ ১৯৩৭ সালে টংক প্রথা উচ্ছেদ, টংক জমির খাজনা স্বত্ব, জোত স্বত্ব, নিরিখ মতো টংক জমির খাজনা ধার্য, বকেয়া টংক মওকুফ, জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ ইত্যাদি দাবিতে টংক আন্দোলন সংগঠিত করেন।


    ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথার বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত টংক আন্দোলন চলে। ‘পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহন ও প্রজাস্বত আইন ১৯৫০’ এর বলে সকল টংক কৃষককে তার দখলীকৃত জমির স্বাভাবিক মালিক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।


    ______


    ছবি  (c)  : বিপুল হাজং, দূর্গাপুর, বিরিশিরি, নেত্রকোনা।


    ______


    সংযুক্ত : বিঝু ফেগ ডাকে, বিঝু বিঝু...


    সাংগ্রেং : সাগরপারের আদি রাখাইন উৎসব


    একটি প্রায় বিলুপ্ত আদিবাসী উৎসব

  • বিভাগ : অপর বাংলা | ০৫ আগস্ট ২০২০ | ৩৪২ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ০৫ আগস্ট ২০২০ ১২:৫৪95927
  • এইসব উৎসবকেই স্বাগত। এরা প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের অচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এদের পাশে ডিজে খচিত আলোকমালা সজ্জিত শহুরে উৎসবগুলি নেহাতই হুল্লোড়।

  • বিপ্লব রহমান | ০৬ আগস্ট ২০২০ ১৬:১৬95967
  • অনেক ধন্যবাদ দিদি। তোমার মন্তব্য সব সময়ই উৎসাহব্যঞ্জক        

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত