• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • অন্ধকারে এক বিবেকী কন্ঠস্বর

    রঞ্জন রায়
    আলোচনা | বিবিধ | ২৯ জুন ২০০৮ | ২৮৩ বার পঠিত
  • এই সপ্তাহে সমস্ত চ্যানেলে একটাই খবর। রোজ অফিসে ট্রেনে বাসে নিত্যযাত্রীদের কথোপকথনে একটাই খবর।
    ২৫ জুনের পরে সরকার থাকবে কি যাবে। তার সঙ্গে একটি প্রশ্ন সবার মুখেমুখে: ভারতকে আমেরিকার সঙ্গে প্রস্তাবিত নিউক্লিয়ার সন্ধিপত্রে হস্তাক্ষর করা উচিৎ কি না?

    যুযুধান দুই পক্ষই জনতাকে বোঝাতে ব্যস্ত। কেউ বলছেন এই সন্ধিতে লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। পারমাণবিক জ্বালানি আমাদের পরম্পরাগত জ্বালানির চেয়ে অনেক মাহাংগা। তাছাড়া এত কাঠখড় পুড়িয়েও এই ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের মোট চাহিদার মা&#৩৪৭; ৬% যোগান দিতে পারবে। আর লোকসান? বিদেশনীতিতে আমেরিকার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলে ওর সকল কুকর্মের দোসর হতে হবে। হয়তো একদিন শক্তিশালী আমেরিকার পায়ে নিজেদের প্রতিরক্ষাও বাঁধা পড়ে যাবে।

    অন্যপক্ষ বোঝাচ্ছেন যে এত ভয়ের কিছু নেই। গরমের দিনে ৬% বিজলী সাপ্লাই কম হলে ত্রাহি ত্রাহি পড়ে যায় কি না? তাহলে ৬% কে নিয়ে এত হেলাফেলা করার কি আছে? আর আমেরিকা নিয়ে বামেদের অবস্থা যেন ষাঁড়ের সামনে লালকাপড় দোলানো, তক্ষুণি নর্তন-কোঁদন শুরু হয়ে যায়। আজকের আমেরিকা অত খারাপ নয়। ভিয়েৎনাম যুদ্ধ তো ৩৫বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। আজকের আমেরিকা অনেক ভব্যসভ্য। এই দ্যাকো,--একজন কালো মানুষকে প্রায় রাষ্ট্রপতি বানিয়ে ফেল্লো বলে। তিনি আবার হনুমানের মূর্তি সঙ্গে রাখেন। আর জ্বালানী-টালানির কড়াক্রান্তি হিসেব ছাড়ো দিকি! আমেরিকার সঙ্গে দোস্তি করলে ভারতের জগৎসভায় ভাবমূতি Ñ কতখানি উজ্বল হবে সে খেয়াল রাখ। ইরাক যুদ্ধ? ওটা ভুল হয়েছিল। এটা তো মানবে? তুমিও মানছ আমিও মানছি , বুশও মানছে। তবে আতংকবাদের বিরুদ্ধে মিলেমিশে লড়াইয়ে ওরা এখন পাকিস্তানকে ছেড়ে আমাদের সঙ্গে নেবে। এমন সুযোগ ছাড়া যায়! নিজের ছেলেকে আমেরিকা পাঠানোর সুযোগ পেলে তো লুফে নেবে!

    আমি এবার একলা হয়ে গেলাম। ঘরে-বাইরে- অফিসে। সবাই ইরাককে একটা ভুল মনে করে ভুলে যেতে চায়। যদিও রোজ ওখানে ইরাকি ও আমেরিকান মারা যাচ্ছে। সবাই বুশকে মাথামোটা কিন্তু মনটা সাদা ভালো ছেলে বলতে চায়। সবাই পয়সাওলা এমন সরল ছেলেকে জামাই করতে চায়। যেন পাড়ার মাস্তান স্কুল কি ক্লাবঘরের জন্যে চাঁদা দিলে তাকে ছেলের অন্নপ্রাশনে নেমন্তন্ন করতে হবে! এ'ব্যাপারে আমার কিছু বন্ধু, যারা আজ আমেরিকায় দু'পয়সা করে খাচ্ছে, বেশি অগ্রণী।

    এমন মন-খারাপ করা দিনে হাতে এল একটি চটি বই--- নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের ২০০৫ এর নোবেল প্রাইজ লেকচার, "" আর্ট, ট্রুথ অ্যান্ড পলিটিকস্‌'' নামে। এবার আমার চমকানোর পালা।

    ১৯৩০ এ ইহুদি পরিবারে জন্মানো এই বৃটিশ নাট্যকার ও পরিচালককে আমরা প্রথম যৌবনে কলাকৈবল্যবাদি বলে এড়িয়ে
    গেছি, নাক সিঁটকেছি। আমার মনে আছে ১৯৬৮তে ব্রেখ্‌ট সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার স্থাপনাকালে (এতে উৎপল দত্তের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ও ছিলেন) " এপিক থিয়েটার ' পত্রিকায় কভারের ভেতরে ঘোষণাপত্রে লেখা ছিলো-- অ্যাবসার্ড থিয়েটারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। ফলে ইওজেন ইওনেস্কো, অসবোর্ন,হ্যারল্ড পিন্টারদের বিপরীত শিবিরে আমাদের অবস্থান গোছের এমনি কিছু। ব্যস, আমার আর পিন্টার পড়ার উৎসাহ ছিল না।

    কিন্তু ৭৫বছর বয়সে নোবেল পেয়ে এই বক্তৃতা ! আমার সবকিছু উল্টেপাল্টে দিলো।"" আমি মুগ্‌দ্ধ, উড়ে গেছো, ফিরে এসো চাকা''।
    উনি চাইছেন প্রেসিডেন্ট বুশের স্পীচ লিখে দিতে যাতে শ্রীমান চুল আঁচড়ে টেলিভিসনের সামনে দাঁড়িয়ে আমেরিকান জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। বয়ানটা এইরকম হওয়া উচিৎ।
    "" God is good. God is great.My god is good. Bin Laden's God is bad. His is a bad God. Saddam's God was bad, except he didn't had one. He was a barbarian. We are not barbarians. We don't chop people's heads off. We believe in freedom. So does God. I am not a barbarian. I am the democratically elected leader of a freedom-loving democracy. We are a compassionate society. We give compassionate electrocution and compassionate lethal injection. We are a great nation. I am not a dictator. he is. And he is. They all are. I posses moral authority. You see this fist? This is my moral authority. And don't you forget it.''

    এহ বাহ্য। উনি শুরু করলেন এই বলে যে ১৯৫৮য়ে ওনার বক্তব্য ছিল কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে -সেটা বলা বেশ কঠিন। একটা জিনিস একই সঙ্গে সত্যি-মিথ্যে দুটোই হতে পারে। সন ২০০৫য়ে দাঁড়িয়েও উনি ঐ বক্তব্যকে ঠিক মনে করছেন--কিন্তু শুধু আর্টের ব্যাপারে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে মনে করেন এই দৃষ্টিকোণ অচল। "' নাগরিক হিসেবে আমাকে প্রশ্ন করতেই হবে: সত্যি কি আর মিথ্যে কি?''

    এরপর নাটকের ভাষা ও তার ব্যঞ্জনা নিয়ে কথা বলতে বলতে উনি চলে এলেন রাজনীতির ভাষায়। বল্লেন যে আজ পর্য্যন্ত উপলব্ধ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এটা বলা যায় যে অধিকাংশ রাজনীতিকরা সত্যের চেয়ে ক্ষমতার অন্বেষণে ব্যস্ত। ওদের ক্ষমতায় বহাল থাকার জন্যে এটা জরুরী যে জনতা অজ্ঞ থাকুক। সত্যিকথা না জানুক। ফলে আমাদের ঘিরে থাকে এক সর্বব্যাপী মিথ্যের জাল, বিশাল ঢপ যা আমাদের গেলানো হয়।
    নিজের বক্তব্যের সমর্থনে উনি এলেন সমসাময়িক ঘটনায়।
    "" প্রত্যেক নাগরিক জানে-ইরাক আক্রমণের নৈতিক ভিত্তি হল সাদ্দামের এমন ভয়ংকর সব অস্ত্রশস্ত্র যা দিয়ে মাত্র ৪৫মিনিটের মধ্যে ব্যাপক ধ্বংসলীলা সংঘটিত করা যায়। আমাদের বিশ্বাস করানো হোল এটা সত্যি। কিন্তু এটা সত্যি নয়। আমাদের গেলানো হোল ইরাকের আল-কায়দার সংগে ঘনিষ্ঠতা আছে আর ৯/১১ র নিউ ইয়র্কের মৃত্যুতাণ্ডবের কিছু জিম্মেদারি ইরাকেও বর্তায়।

    আজ জানি ওটা মিথ্যে। বলা হল ইরাক বিশ্ব শান্তির পথে কাঁটা। বলা হল এটা সত্যি। আজ জানি ওটা সত্যি ছিল না।''

    তবে সত্যি কি? ""The truth is to do with how the United States understands its role in the world and how it chooses to embody it''.

    এবার উনি বলছেন যে বর্তমান আমেরিকান পররাষ্টনীতিকে বুঝতে হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে ওর গতিপ্রকৃতিকে একবার অন্তত: চোখবোলানো দরকার। ওনার হিসেবে সেইসময়ের সোভিয়েট ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ঘটা বর্বরতা,বিরোধী কন্ঠস্বরের দমনপীড়ন এগুলো ভালভাবে ""ড্‌কুমেন্টেড অ্যান্ড ভেরিফায়েড''।
    কিন্তু, "" US crimes in the same period have only been superficially recorded, let alone documented, let only acknowledged as crimes, at all. i believe this must be addressed and that the truth has considerable bearing on where the world stands now.''

    কোন দেশে খোলাখুলি হামলা করাটা কৌশল হিসেবে আমেরিকার খুব একটা পছন্দসই ছিল না। ওর কায়দা ছিল " লো ইন্টেন্সিটি কনফ্লিকট।' low intensity conflict means that thousands of people die but slower than if you dropped a bomb on them in one fell swoop.

    যখন কোন জনগোষ্ঠীকে মেরে তক্তা করে দেয়া হচ্ছে, আর মিলিটারি ও বড় কর্পোরেশন নামধারী তোমার বন্ধুরা ক্ষমতায় জাঁকিয়ে বসেছে, তখন তুমি ক্যামেরার সামনে যাও আর বলতে থাক-- গণতন্ত্র বিজয়ী হয়েছে। ঐ বছরগুলোতে এইটাই ছিলো ইউ এস বিদেশনীতির চেনা চেহারা।

    এরপর উনি ওনার বক্তব্যের সমর্থনে নিকারাগুয়ার ঘটনা তুলে ধরেন।
    "" নিকারাগুয়ায় বর্বর সামোজা একনায়কতন্ত্রকে আমেরিকা ৪০বছর ধরে সমর্থন দিয়ে এল। তারপর নিকারাগুয়ান জনতা স্যান্ডিনিস্তাদের নেতৃত্বে এক জনপ্রিয় অভ্যুত্থানে ওদের ক্ষমতাচ্যুত করল।
    স্যান্দিনিস্তারা কোন ধোয়া তুলসীপাতা ছিল না। কিন্তু ওরা ছিল সভ্য, বুদ্ধিমান ও যুক্তিবাদী । ওরা চাইছিলো এক ভ্‌দ্র, স্থায়ী বহুত্ববাদী সমাজ। মৃত্যুদন্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় হাজার হাজার গরীব চাষী মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এল। এক লক্ষের চেয়ে বেশি লোক জমি পেল। দু'হাজার স্কুলবাড়ি বানানো হল। এল নি:শুল্ক শিক্ষা ও নি:শুল্ক স্বাস্থ্য পরিষেবা। শিশুমৃত্যুর দর কমল এক তৃতীয়াংশ আর দেশ থেকে দূর হল পোলিও।
    ""-- কিন্তু আমেরিকা ভয় পেল যে যদি নিকারাগুয়াকে সোশ্যাল ও ইকনমিক ন্যায় পাওয়ার কাঠামো ঠিক করতে দেয়া হয় তাহলে ওর প্রতিবেশি রাজ্যগুলিও নে' নিয়ে প্রশ্ন তুলবে আর ওকেই অনুসরণ করবে। কাজেই প্রেসিডেন্ট রীগান বল্লেন-- নিকারাগুয়া একটি টোটালিটেরিয়ান কারাগার। আর এই প্রচার লুফে নিল মিডিয়া ও বৃটিশ সরকার।
    কিন্তু স্যান্ডিনিস্তা সরকারের আমলে ডেথ স্কোয়াড ছিলো না। বা নিয়মমাফিক সৈনিক বর্বরতার কোন প্রমাণ নেই।
    ষ্‌দের হাতে কোন পাদ্রী মারা যায় নি। ওদের মন্ত্রীসভাতেই তিনজন পাদ্রী ছিল। আসলে টোটালিটেরিয়ান বন্দীশালা ঠিক পাশেই,
    এল সালভাদোর ও গুয়াতেমালায়। গুয়তেমালার গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারকে আমেরিকা সেই ১৯৫৪তেই টেনে নামায়। একের পর এক মিলিটারি ডিক্টেটরশিপের শিকার হয় আনুমানিক প্রায় দু'লক্ষ লোক।
    বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা জেসুইট পাদ্রীদের মধ্যে ছয় জন সান সালভাদোর এর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ১৯৮৯তে খুন হলেন। খুন করলো আমেরিকার ফোর্ট বেনিং জর্জিয়ায় প্রশিক্ষিত এক ব্যাটালিয়ন। আনুমানিক প্রায় ৭৫০০০ লোক মারা যায়। কেন ওরা মরলো? কারণ ওরা বিশ্বাস করেছিলো এক উন্নত জীবন সম্ভব আর সেই জীবনকে পেতে হবে। এই বিশ্বাসই ওদের কমুনিষ্ট বলে মার্কা মেরে দিলো। ওরা মরলো কারণ ওরা প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছিলো আর
    প্রশ্ন করছিলো স্থিতাবস্থা নিয়ে,--- অন্তহীন দারিদ্র্য , রোগ, অপমান-অত্যাচার এই সব নিয়ে।
    নিকারাগুয়ার ট্র্যাজেডি অত্যন্ত তাৎপর্য্যপূর্ণ এইজন্যে যে এটা আমেরিকার বিশ্বের আঙ্গিনায় নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবনাচিন্তার একটা ভাল উদাহরণ।

    ১৯৮০র শেষে পিন্টার লন্ডনে আমেরিকান এমব্যাসির এক বৈঠকে হাজির। এজেন্ডা ছিল আমেরিকান কংগ্রেসের নিকারাগুয়ার সরকারের বিরুদ্ধে "কন্টরা'দের লড়াইয়ে অর্থসাহায্য বাড়ানো নিয়ে। নিকারাগুয়ার পক্ষে বলতে গিয়ে ফাদার

    মেটকাফ বল্লেন-- আমার "পারিশ' নিকারাগুয়ার উত্তরভাগে একটা স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এইসব বানিয়ে বেশ শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিলো। কিন্তু ক'মাস আগে কন্টরাদের এক হামলায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলো। ওরা নার্স ও টিচারদের ধর্ষণ করলো, ডাক্তারদের জবাই করলো। ওরা বর্বর। আমেরিকান সরকার যেন এই আতংকবাদী সংগঠন কে আর সাহায্য না করে।

    আমেরিকান দূতাবাসের তরফ থেকে রেমন্ড সেজ বল্লেন-- ফাদার, একটা কথা বলি--- যুদ্ধে সবসময় নির্দোষ
    লোকজনেরই ভোগান্তি হয়।

    হলে নেমে এল হিমঘরের নিস্তব্ধতা। সত্যি, নির্দোষেরাই সদাসর্বদা শাস্তি পায়!

    শেষে কেউ একজন বল্লো-- কিন্তু এখানে তো নির্দোষেরা যে বর্বরতার শিকার তার পেছনে রয়েছে আপনার সরকারের বরদহস্ত। তাহলে কি এক সার্বভৌম রাষ্টের নাগরিকদের ওপর সংঘটিত এই হত্যা ও ধ্বংসলীলার সমর্থনের অপরাধে আপনার সরকারকে দোষী বলা যাবে না?

    এরপর পিন্টারদের দূতাবাস ছেড়ে বেরিয়ে আসা ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিল না।
    সেইসময় প্রেসিডেন্ট রীগান বলছিলেন--- "" The contras are moral equivalent of our Founding Fathers''.

    আমেরিকা শেষমেশ স্যান্ডিনিস্তা সরকারকে টেনে নামালো। ফিরে এলো জুয়াঘর, বিদায় নিল ফ্রি হেল্‌থ, ফ্রি এডুকেশন। গণতন্ত্র জয়ী হল। "" But this "policy' was by no means restricted to Central America. It was coducted throughout the worl. And It was conducted as if it never happened.

    ইন্দোনেশিয়া,গ্রীস, উরুগুয়ে থেকে শুরু করে ১৯৭৩ এর চিলি। আমেরিকার প্রত্যক্ষ সমর্থনে দক্ষিণপন্থী মিলিটরি একনায়কত্বের হাতে হাজারে হাজারে লোক মরতে লাগলো।
    Did they take place? And are they in all cases attributable to American foreign policy? The answer is yes, they did take place and they are attributable to American foreign policy. But youi wouldn't know it.

    এ'সব কক্ষণো ঘটেনি। কিছুই কখনো ঘটেনি। এমনকি যখন এসব ঘটছিলো, তখনো ঘটছিলো না। এতে কারো কিচ্ছু আসে যায় না। এসব কোন ব্যাপারই নয়। যদিও আমেরিকার অপরাধ সিস্টেম্যাটিক, কন্‌স্‌টান্ট, ভিসিয়াস। কিন্তু খুব কম লোকই এ'নিয়ে বাস্তবে কিছু বলছে।

    আসলে আমেরিকা ভারি চালাক ফিরিওয়ালা। এর সবচেয়ে বিক্কিরি হয় "" আত্মরতি''।মন দিয়ে শোন কেমন করে সমস্ত প্রেসিডেন্টের বক্তৃতাতেই "" দি আমেরিকান পিপল্‌'' শব্দবন্ধটি ব্যবহৃত হয়। যেমন "" I say to the American people it is time to pray and to defend the rights of the American people and I ask the American people to trust their president in the action he is about to take on behalf of the American people.''

    এই খানে ভাষা অত্যন্ত চাতুরীর সংগে ব্যবহর করা হয়েছে চিন্তাশক্তিকে শত যোজন দূরে রাখতে। ভাবা-টাবার কোন দরকার নেই। নিশ্‌চিন্ত হয়ে পিঠের নীচে তাকিয়া লাগিয়ে আরাম কর।

    "" আজকে আমেরিকা আর লো ইনটেনসিটি কনফ্লিক্ট নিয়ে মাথা ঘামায় না। আজকে ও জাতিসংঘকে পাত্তাই দেয় না। কোন তোয়াক্কা করে না আন্তর্জাতিক আইনকানুনকে, বা বিবেকী বিরোধী কন্ঠস্বরকে,-- এসব ওর কাছে নিবীর্য, অপ্রাসংগিক ব্যাপার। ওর আছে পেছন পেছন ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ব্যা-ব্যা করা বেচারা গ্রেট বৃটেন!''

    এবার পিন্টারের গলায় ফুটে ওঠে ক্রোধ, ফেটে পড়ে ধিক্কার।
    "" আমাদের নৈতিক অনুভূতির হোল টা কি? আমাদের কখনও ওসব বালাই আদৌ ছিল কি? " বিবেক' বলে শব্দটিকে আমরা কি আজকাল একেবারে বিসর্জন দিয়েছি? সব কিছু কি একেবারে মরেগেছে? একবার গুয়াতানামো বে' র দিকে তাকাও। শ'য়ে শ'য়ে লোককে তিনবছর ধরে বিনাবিচারে আটকে রাখা হয়েছে। কোন আইনী পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। কেউ উকিল দিতেও পারছে না। জেনেভা কনভেনশনের মুয়ে আগুন। এই Ï&#৩৪৭;²মিনাল আউটরেজ এর দোষী দেশটি আবার নিজেকে "" মুক্তদুনিয়ার নেতা'' বলে!

    কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলে বস্তুটি এই অন্যায় শুধু যে সহ্যই করছে তা' নয়, এ'নিয়ে আদৌ কোন কথা বলছে না। ব্লেয়ার কেন চুপ? না, আমেরিকা বলে দিয়েছে গুয়াতানামা বে নিয়ে বল্লে সেটা ""আনফ্রেন্ডলি অ্যাক্ট'' হবে। কাজেই ব্ল্যেয়ারের মুখে কুলুপ্‌ আঁটা।

    ইরাকিঅভ্যুত্থানের আগেই আমেরিকান বোমা ও মিসাইলে অন্তত: একলক্ষ ইরাকি মারা গেছে। ঐ লোকগুলো মুছে গেলো। ওরা শূন্য হয়ে গেল। ওদের নথিবদ্ধ করা হয় নি। আমেরিকান জেনারেল টমি ফ্রাঙ্কস বল্লেন-- উই ডোন্‌ট্‌ ডু বডি কাউন্টস্‌।

    কত লোককে মারলে কাউকে গণহত্যাকারী এবং যুদ্ধাপরাধীর শিরোপা দেয়া যাবে? ওয়ান হান্ডেড থাউজ্যাণ্ড? তাহলে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট অফ জাস্টিসের কাঠগড়ায় বুশ ও ব্লেয়ারকে তোলা হোক।

    ( এই বাঙালীর মনে পড়ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের রবীন্দ্রনাথকে--'' মহাকাল সিংহাসনে সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে। যেন ধিক্কার হানিতে পারি----।)

    কিন্তু পিন্টার শুধু ধিক্কার হেনে থেমে যান না। উনি আমাদের মনে করিয়ে দেন আজ্‌কে আমেরিকার আছে ৮০০০ সক্রিয় নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডস্‌। তার মধ্যে ২০০০ মাত্র পনেরো মিনিটের সতর্কবার্তা পেলে ছুটে যাবে। বৃটিশ ও নিজের নিউক্লিয়ার মিসাইল ট্রাইডেন্ট কে উন্নত করার কথা ভাবছে। কিন্তু এসব কার দিকে তাগ করা হবে? ওসামা বিন লাদেন? তুমি? আমি? জো ডোকস? চায়না? প্যারিস? কে জানে? আমি জানি না।

    তবে এটা ঠিক জানি যে হাজার হাজার পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র সঞ্চয় করা নিয়ে এই শিশুসুলভ উন্মত্ততা বর্তমান আমেরিকার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি। এটা জানি যে আজ বিশ্বের ১৩২ দেশে আমেরিকার ৭০২ মিলিটারি ইনসটলেশন আছে।

    শেষ করার সময় উনি বলেন -একজন লেখকের জীবন সব সময় কাঁটায় ঘেরা। এ'নিয়ে কান্নাকাটি করার কিছু নেই। তুমি নিজে রাস্তা বেছে নাও আর চলতে থাক। কোন আশ্রয় নেই, নেই কোন সুরক্ষা। হ্যাঁ, মিথ্যে বলা শুরু কর-ও'সব পেয়ে যাবে। তবে তখন তুমি আর লেখক থাকবে না, হবে পলিটিশিয়ান।
    আমার বিশ্বাস সমস্ত বাধা-বিপত্তির মধ্যে আমাদের জীবন ও সমাজের সত্যিকে খোঁজার জন্যে চাই এক fierce intellectual determination. " If such a determination is not embodied in our political vision we have no hope of restoring what is so nearly lost to us the dignity of man''.

    মিস্টার হ্যারল্ড পিন্টার, প্রথন যৌবনের ঔদ্ধত্যে আপনাকে অবজ্ঞা করেছি। আজ অমি নতজানু। পঁচাত্তর বছর বয়সে নোবেলের প্রাইজ গ্রহণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে কাঠগড়ায় তুলতে যে নৈতিক সাহস লাগে তার মূল্যায়ন আমার সাধ্যের অতীত। শেষ করছি ঐ বক্তৃতায় উল্লেখিত আপনারই লেখা ""ডেড'' বলে কবিতটির ক'টি ছত্র দিয়ে।

    Where was the dead body found?
    Who found the dead body?
    Was the dead body dead when found?
    How was the dead body found?
    Who was the dead body?
    Was the dead body naked or dressed for a journey?

    Who made you declare the dead body dead?
    Did you declare the dead body dead?
    How well did you know the dead body?
    How did you know the dead body was dead?

    Did you wash the dead body?
    Did you close both its eyes?
    Did you bury the body?
    Did you leave it abandoned?
    Did you kiss the dead body?
    ---------------------------*********-------------------

    জুন ২৯, ২০০৮

     

  • বিভাগ : আলোচনা | ২৯ জুন ২০০৮ | ২৮৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন