• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক

  • মহামারী, কোয়ারেন্টাইন ও দেশকাল - পর্ব ৪

    দীপঙ্কর দাশগুপ্ত
    ধারাবাহিক | ২৫ জুলাই ২০২০ | ১০০৪ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • লন্ডনের পানীয় জলে দূষণের মাত্রা। ঊনবিংশ শতকের ব্যঙ্গচিত্র। সৌজন্য: ওয়েলকাম কালেকশন



    মহামারী ঠেকাতে ব্রিটিশ বণিকের টাকায় হাওড়া ও কলকাতায় গড়ে উঠেছিল ওলাবিবির মন্দির

    টাইমস লিটেরেরি সাপ্লিমেন্টের (টি এল এস) সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে করোনাকে অভিহিত করা হয়েছে বড়লোকের আমদানি করা অসুখ বলে। যে সংক্রমণ মূলত ছড়িয়ে পড়েছে বিমানযাত্রীদের মাধ্যমে — “a rich man’s disease, an aeroplane import” — যার দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে দরিদ্র, অসহায় মানুষদেরই। তবে শুধু করোনাই বা কেন? আমাদের দেশে এখন যে রোগের ভাইরাস বহন করে এনেছেন বিমানযাত্রীরা, অতীতে তেমনই জাহাজের নাবিক, বিদেশি সওদাগর বা ব্রিটিশ সৈন্যের মাধ্যমে একের পর এক রোগ থাবা বসিয়েছে মহামারীর ভয়াল চেহারায়। আর বছরের পর বছর ধরে তার অকারণ খেসারত দিতে হয়েছে আম জনতাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও করোনা-সংক্রমণে আজ সমাজের সর্বস্তরে সঞ্চারিত হয়েছে তীব্র আতঙ্ক আর সংশয়ের পরিবেশ। কাজেই পরাধীন যুগে বা তারও আগে যখন আধুনিক চিকিৎসার বিকাশই ঘটেনি তখন রোগের প্রাদুর্ভাব ও মহামারীর হানা যে মানুষকে কতটা ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এলোপ্যাথি ওষুধ, ভ্যাকসিন এসব তো অনেক পরের কথা, নিরীহ, সাধারণ মানুষ রোগকে দেখেছে দৈব রোষের প্রতিফলন হিসেবে। আর উপায়ান্তর না পেয়ে সঙ্কট থেকে মুক্তি খুঁজেছে দৈব স্তুতিতে। পরিবারে কারও রোগ হলে মানুষের ধারণা ছিল, তা যেন ভগবানের অভিশাপ আর গ্রামের পাড়া-পড়শির কাছে ছিল তা চূড়ান্ত বিড়ম্বনা।


    বোলনায় ১৫২৭ সালে কলেরা ঠেকাতে প্রার্থনা। ১৮৭৩ সালে পোল্যান্ডে কলেরার প্রকোপ ঠেকাতে প্রার্থনা

    ওলা-ওঠা বা কলেরা এবং “মায়ের দয়া” বা গুটি বসন্তের কবল থেকে পরিত্রাণ পেতে অবিভক্ত বঙ্গে চিরাচরিত কাল থেকে মানুষ আরাধনা করে আসছে ওলাবিবি এবং শীতলা দেবীর। অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় ব্রিটিশ চিকিৎসক এন সি ম্যাকনামারা তাঁর রিপোর্টে প্রথম ‘ওলা-ওঠা’ শব্দটির উৎপত্তির কথা তুলে ধরেন। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায়, জঙ্গলের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে এক বৃদ্ধা দেখেন একটি শিলাখন্ডকে ওলাবিবি হিসেবে পুজো করা হচ্ছে। ওলা-ওঠা রোগ থেকে রেহাই পেতে ওলাবিবিকে তুষ্ট করার জন্যে দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা দলে দলে হাজির হন ওই জঙ্গলে প্রিয়জনের আরোগ্য কামনায়। প্রাথমিক ভাবে মুসলিমদের আরাধ্য মনে হলেও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই অসুখের সময় ওলাবিবির শরণাপন্ন হতে দ্বিধা করেন না। সাধারণ মানুষের কাছে ওলা-ওঠা যে কতটা ভয়াবহ এ থেকেই তার আঁচ পান ম্যাকনামারা। ইন্ডিয়ান মেডিকেল গেজেটে প্রকাশিত একটি হিসেবে জানা যায় ১৮১৭ থেকে ১৮৩১ সালের মধ্যে শুধু অবিভক্ত বঙ্গে এক কোটি ৮০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়েছিল কলেরায়। মৃতদের মধ্যে এক বিরাট অংশ ছিল ব্রিটিশ সেনা। তবে তার আগেও প্রতি বছর হাজারে হাজারে মানুষ মারা গেছে কলেরায়। কলেরার আতঙ্ক ইউরোপিয়ানদের মধ্যেও যে কতটা জাঁকিয়ে বসেছিল তার চমকপ্রদ সাক্ষ্য মেলে পৃথক এক ব্রিটিশ সরকারি নথিতে। ১৭২০ সাল নাগাদ জনৈক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ডানকান ওলাবিবি মন্দির তৈরি করার জন্যে দিয়েছিলেন চার হাজার টাকা। হাওড়ার শিবপুর অঞ্চল তখন ছিল গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলে ওলাবিবি রূপে পূজিত পাথরের ঢিপিকে ডানকানের টাকায় তৈরি হওয়া মন্দিরে স্থানান্তরিত করে শিলাখন্ডটির ওপরে এক দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী কালে শিবপুরে বন কেটে বসতের প্রসার ঘটলে স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় ওলাবিবির মন্দিরের জনপ্রিয়তা লোকমুখে আরও ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন মন্দিরটি মর্যাদার সঙ্গে টিঁকে রয়েছে তো বটেই সেই সঙ্গে আধুনিক হাওড়ার ওলাবিবিতলা লেন মন্দিরের নামের ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছে। শুধু হাওড়াতেই নয়, তার বছর তিরিশেক বাদে ১৭৫০ সালে ডানকান কলকাতার খিদিরপুরেও ওলাবিবির দ্বিতীয় একটি মন্দির তৈরি করান ছ’ হাজার টাকা দিয়ে। আজকের দিনে হিসেব করলে দুটি মন্দিরের পিছনে ডানকানের দেওয়া অর্থের পরিমাণ ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি।


    হাওড়ায় সেই প্রাচীন ওলাবিবি মন্দির। সৌজন্য: দি টেলিগ্রাফ

    কলেরা রোগটাকে ব্রিটিশেরা যমের মতো ভয় করত এবং যথারীতি ব্রিটিশ শাসকেরা কলেরা সংক্রমণের জন্যে পরাধীন দেশের মানুষের অত্যন্ত ঢিলেঢালা অভ্যাস ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে দায়ী করেছিলেন। অথচ ব্রিটিশ সেনাদের মাধ্যমেই কিন্তু রোগটা এদেশে মহামারীর চেহারা নিয়েছিল। কলেরার অস্তিত্ব যে ভারতে ছিল না তা নয়। প্রাচীন সংস্কৃত চিকিৎসা শাস্ত্র সুশ্রুত সংহিতায় ‘বিসূচিকা’ রোগের উল্লেখ রয়েছে যদিও চরক সংহিতা এ ব্যাপারে নীরব। ১৫১২ সালে পুরীতে ‘বিসূচিকা’র প্রাদুর্ভাবের কথা রয়েছে চৈতন্যচরিতামৃতে। তারও নয় বছর আগে ১৫০৩ সালে কালিকটের রাজার সেনাবাহিনীর ২০ হাজার সৈন্যের কলেরায় মৃত্যুর কাহিনীর কথা লিখেছেন পর্তুগিজ পর্যটক গ্যাসপার কোরিয়া। তবে তখনকার দিনে জনঘনত্ব এবং বাণিজ্যিক সংযোগের বহর কম থাকায় রোগটি দেশ জুড়ে সংক্রমণ ঘটাতে পারে নি। এর পরে হুগলির সপ্তগ্রাম বন্দরে বাণিজ্যের রমরমার সময় ওলন্দাজ পর্যটকদের বিবরণে ডায়েরিয়ার মতো মারাত্মক পেটের রোগের কথা জানা যায়। দেশের মানুষ রোগটিকে বিসূচিকার থেকে আলাদা গোত্রের বিবেচনা করায় উদ্ভব হল নতুন শব্দের — ওলা-ওঠা। ১৭৭৯ সালে কলকাতায় কলেরার প্রাদুর্ভাবের কথা জানিয়েছিলেন ফোর্ট উইলিয়ামে ভারতের প্রথম প্রধান বিচারপতি এবং মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির পরোয়ানায় সই করা স্যার এলিজা ইম্পে যিনি নিজেও বছরে দু-একবার কলেরার মৃদু সংক্রমণে ভুগতেন। পরবর্তী কালে ১৮৪২ সালের ১ জুন বাংলার রেনেসাঁর অন্যতম পথিকৃৎ ডেভিড হেয়ারের মৃত্যু হয়েছিল কলেরায়। শরৎচন্দ্রের ‘পন্ডিতমশাই’ উপন্যাসে ‘বিসূচিকা’ এমন প্রবল ভাবে উপস্থিত যে কলেরা রোগটিই সেখানে এক শক্তিশালী চরিত্রে রূপায়িত।


    কলেরার আক্রমণ থেকে ব্রিটেনকে রক্ষা করছেন জন বুল। ১৮৩২। সৌজন্য: ওয়েলকাম কালেকশন

    কলেরা রোগটি যে আদতে ব্রিটিশরাই এদেশে পাইকারি হারে আমদানি করেছিল তার প্রমাণ মেলে ভারতের প্রথম গভর্নর জেনেরাল ওয়ারেন হেস্টিংসের লেখাতেই। ১৭৮১ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মেজর স্কটকে জানান, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি দল কলকাতা থেকে ইস্ট কোস্ট ধরে মাদ্রাজের দিকে এগিয়ে চলার সময় ওড়িশার গঞ্জামের কাছে ভয়াবহ কলেরায় আক্রান্ত হয়। কাছাকাছি হাসপাতালে তাদের ভর্তি করা হলেও শুধু ২২ মার্চ একদিনেই ৫০০ সৈন্যের মৃত্যু হয়। তাদের থেকে রোগটি ছড়ায় স্থানীয় গ্রামবাসীদের মধ্যেও। ব্রিটিশ ভারতে নতুন রেলপথ ও সড়ক নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চলাচল ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় কলেরার প্রাদুর্ভাবও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল লন্ডনও রেহাই পায় নি এর কবল থেকে। ১৮৩১ সালে ব্রিটেনে প্রথম কলেরা মহামারীর প্রকোপে মৃত্যু হয় ৩০ হাজার মানুষের। আর সেই সূত্রেই ‘নতুন’ এই রোগের কারণ ও প্রতিকারের খোঁজে পাগলের মতো বিতর্ক ও বিশ্লেষণের হিড়িক পড়ে যায়। রোগটির চরিত্র বোঝার জন্যে দশ বছরে শুধু লন্ডনেই কলেরা-সংক্রান্ত ৭০০ টি বই প্রকাশিত হয়। কলেরা কি ছোঁয়াচে? নাকি বায়ু দূষণ বা গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের আবহাওয়ার তাপমাত্রাই কলেরার সংক্রমণের জন্যে দায়ী? ব্রিটিশ চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও প্রশাসকদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ প্রচলিত ছিল বছরের পর বছর ধরে। ১৮৪০ এর দশকে রানি ভিক্টোরিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক জন স্নোর বিশ্বাস ছিল পূতিগন্ধময় বায়ুর দূষণ থেকেই ছড়ায় কলেরা রোগ।


    ঔপনিবেশিক বঙ্গে কলেরা বিশেষজ্ঞ ব্রিটিশ চিকিৎসক চার্লস ম্যাকনামারা চয়ন করেছিলেন “এশিয়াটিক কলেরা” শব্দটি। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল কলেরার উৎপত্তি ভারতেই। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক, সমাজ সংস্কারক ও ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর দি কালটিভেশন অব সায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ মহেন্দ্র লাল সরকার এই ব্রিটিশ মতবাদের তীব্র বিরোধিতা করেন। দি ক্যালকাটা মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে কলকাতার স্যানিটারি ও পুর অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের গাফিলতিগুলি স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ভিক্টোরিয় আমলের গোড়ায় ব্রিটেনে যেমন নোংরা, আবর্জনায় ভরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ছিল, অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের শুরুতে কলকাতার অবস্থাও তেমনই খারাপ থেকে ততোধিক খারাপের দিকে চলেছে। না আছে আবর্জনা সাফাই করার সংগঠিত ব্যবস্থা, না আছে উপযুক্ত নিকাশি ব্যবস্থা, না আছে পানীয় জল সরবরাহের কোন উদ্যোগ। ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে লটারি কমিটির উদ্যোগে নগরের স্যানিটারি ব্যবস্থার কিছু উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল ঠিকই, তবে তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয় নি। ১৮৩৬ সালে লটারি কমিটির উদ্যোগের সমাপ্তি ঘটে এবং শহরের অবস্থা হয়ে ওঠে শোচনীয়। অধিকাংশ রাস্তা কাঁচা, চারপাশে খোলা, নোংরা নর্দমা। লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অনুমোদনের পর পরীক্ষামূলক ভাবে কলকাতায় ভূগর্ভস্থ নিকাশি ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল ১৮৫৮ সালে।


    ভারতীয় কলেরার বিরুদ্ধে লন্ডনে সতর্কবাণী

    আর খুব সীমিত ভাবে ১১ হাজার ১৬৪ টি বাড়িতে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ চালু হয়েছিল ১৮৭০ সালে। তখন এজন্যে খরচ হয়েছিল ৬৫ লক্ষ টাকা। পানীয় জল সরবরাহের বিষয়টি ছিল খুব তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, চার্লস ম্যাকনামারা কিন্তু বিশ্বাস করতেন, কলেরা একটি জল-বাহিত রোগ। ১৮৬৬ সালে চালু হওয়া ইন্ডিয়ান মেডিকেল গেজেট ম্যাকনামারার সমর্থনে এগিয়ে এলেও ওই মতবাদ ছিল স্যানিটারি কমিশনারের সরকারি মতের বিরোধী। কলেরার কারণ নির্ণয়ে তখন আন্তর্জাতিক মহল তোলপাড়। কনস্টান্টিনোপলে ওই একই সালে আয়োজিত তৃতীয় আন্তর্জাতিক স্যানিটারি সম্মেলনে মূল আলোচ্য বিষয়ই ছিল কলেরা। তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্ম হয় নি, আন্তর্জাতিক স্যানিটারি সম্মেলনই সে সময় রোগ ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অনুঘটকের ভূমিকা পালন করত। এই বিতর্কিত আবহেই ঘৃতাহুতি দিয়ে ইন্ডিয়ান মেডিকেল গেজেটের ডিসেম্বর ১৮৬৬ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কলেরা নিয়ে ভারতীয় ও ব্রিটিশ চিন্তাধারার ফারাকগুলি তুলে ধরা হয়। ক্যালকাটা অপথালমিক হসপিটালের সার্জন হলেও ম্যাকনামারার গবেষণা ছিল কলেরা নিয়ে। কিন্তু স্যানিটারি কমিশনারের মতের বিরোধিতা করায় ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গবেষণার সুযোগ না দিয়ে আমন্ত্রণ জানালেন জার্মান ব্যাকটেরিওলজিস্ট রবার্ট কখকে। ১৮৮৪ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে তৈরি হল প্রথম মেডিকেল ল্যাবরেটরি। সেখানেই সহজ গবেষণায় কখ সন্ধান পেলেন কলেরা রোগ সৃষ্টিকারী ‘ভিবরিও কলেরি’ জীবাণুর।

    এর আগে ব্রিটিশ ডাক্তাররা কলেরার চিকিৎসায় উপযুক্ত দাওয়াই নিয়ে কম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন নি। ১৮১৭ সালে যশোরে কলেরার প্রকোপে অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ডাঃ টাইটলার রোগীদের দিতেন ক্যালোমেল (মারকিউরাস ক্লোরাইড) আর আফিম। ইউরোপিয়ান ফার্মাকোপিয়ায় এগুলি ছিল সে সময় আশ্চর্য ওষুধ। তা সত্ত্বেও সাহেব ডাক্তারদের নজর কিন্তু পড়েছিল ভারতীয় আয়ুর্বেদের ওপরেও। ১৮১৮ সালে ত্রিবাংকুরে কলেরা হানা দিলে সেখানকার বৈদ্যরা সব পালিয়েছিলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, রোগটি তাঁদের অজানা এবং এর কোন ওষুধ তাঁরা জানেন না। মাদ্রাজের স্টাফ সার্জন হে-র রিপোর্টে এই ঘটনার কথা জানা যায়। হে কিন্তু হাল ছাড়লেন না। তিনি বৈদ্যদের সরাসরি ফিরিয়ে এনে তাঁদের মনে সাহস জোগালেন, তাঁদের সরকারি চাকরিতে বহাল করে নির্দেশ দিলেন, প্রাচীন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থগুলি থেকে কলেরার সাদৃশ্য-যুক্ত রোগ-লক্ষণ নির্ণয় করে উপযুক্ত প্রতিষেধক বের করতে হবে। ‘চিন্তামণি’র মতো আয়ুর্বেদিক গ্রন্থে উল্লেখিত ‘সীতাঙ্গ’ বা ‘বিধুমারবিসূচি’র সঙ্গে কলেরার কিছু সাদৃশ্য পাওয়া গেলেও বৈদ্যরা কিন্তু কলেরা-আক্রান্ত একজনকেও বাঁচাতে পারলেন না। এর প্রায় শতবর্ষ পরে ১৯০২ সালে পন্ডিত গোপালচারলু কোট্টাকালের আশপাশে কলেরা বিপর্যয় ঠেকাতে নিজের উদ্ভাবিত ‘বিসূচিকারী’ বটিকা প্রয়োগ করলেন আর তাতেই এল নাটকীয় সাফল্য। প্রাণ রক্ষা পেল অগুনতি মানুষের আর আয়ুর্বেদকে তিনি স্ব-মহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন। তার কয়েক বছর আগেই ১৮৯৮ সালে গোপালচারলু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ম্যাড্রাস আয়ুর্বেদিক ল্যাবরেটরির। দেশে সেটিই প্রথম আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল যেখানে রোগীদের ভর্তি করে চিকিৎসা করা হত। এই অসামান্য সাফল্যে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আয়ুর্বেদিক ওষুধের বৃহত্তর বাণিজ্যেরও সূচনা হল কলেরার মতো একটি মহামারীকে কেন্দ্র করেই। পরাধীন যুগে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে পাশ্চাত্য চিকিৎসার পাশাপাশি দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতিও যে মর্যাদার আসন অধিকার করল জাতীয় চেতনার প্রসারের নিরিখে সেও বড় কম কথা নয়।


    ১৯০৯ সালে গোপালচারলুর কলেরা রোগ বিনাশক বটিকার বিজ্ঞাপন


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৫ জুলাই ২০২০ | ১০০৪ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন