• টইপত্তর  অন্যান্য

  • " তোর বাবা তো মাস্টার? " গদগদ উত্তর হ্যাঁ। " কি করে তোর বাবা?" ক্লাস ভরা সবার সামনে সঙ্কুচিত হয়ে উত্তর দিয়েছিল ছেলেটি-" ভ্যান চালায়।" এক বৈষম্যের স্কুলযাত্রা।

    Saikat Mistry লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | ১৮ জুন ২০২০ | ৬৭০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন
  • আমাদের আশেপাশে যত মানুষ আছে, যত সময় যায় দেখতে দেখতে তার চেয়েও বেশি মানুষ নেই হয়ে যায়।স্কুল ছেড়ে আসারপর আর একবার গিয়েছিলাম।দরকারে।তারপর আর যাইনি।যাওয়ার দরকারও হয়নি।ফলে তারা একপ্রকার স্মৃতি থেকে নেই হয়ে গেছে।স্মৃতিতে থাকার কোন কারণ আছে বলেও মনে হয়না আর।পথেঘাটে কারো সাথে যে দেখা হয়,তেমন একটাও নয়।মাঝে মাঝে সামাজিক মাধ্যমে দুয়েকজনের সাথে কথা।এই পর্যন্ত।
    অনলাইন ক্লাস এবং বৈষম্য নিয়ে ভাবছিলাম কিছুদিন ধরে। কথা হচ্ছিল কয়েকজনের সাথে।তারা সকলেই সংবেদনশীল। লকডাউনে চালকিনতে যাদের হিমসিম খেতে হয়,স্মার্টফোন থাকলেও যে তারা নেটের নিরবচ্ছিন্ন যোগান বজায় রাখতে পারবেন,সেই আশা রাখা কষ্ট কল্পনা।বাস্তবে পারেননি অনেকেই।ফলত, অনলাইনে তাদের বাড়ির অনেকেই অংশনিতে পারিনি।এই বৈষম্য চরমে উঠবে,স্কুল খোলার পর।মার্কসের রকমারি ধরণ,মূল্য বুঝিয়ে দেবে - কার বাবা কত বৃত্তশালী।
    আমাদের ছাত্রাবস্থার স্কুলটি যে অঞ্চলে অবস্থিত, সেখানে একটা নার্সারি স্কুল আছে।সেই নার্সারি স্কুলের গরিষ্ঠরাই আমাদের কৈশোরের স্কুলে ভর্তি হতো।এখনও হয় বোধহয়।অ্যাডমিশন সহ, সবকিছুতেই তাদের অগ্রাধিকার ছিল।স্কুলেও তারা নিজস্ব বৃত্তে ঘোরা ফেরা করতো। আজও সেই ধারাটি একই খাতে বয়ে চলেছে কিনা জানি না।আমরা বাইরে থেকে যারা পড়তে যেতাম, তারা এই বৃত্তের বাইরে থেকে গেছি।স্কুলের সুখকর স্মৃতির সঞ্চয় তেমন হয়নি।ফলে স্কুলের স্মৃতি যত ক্ষয় হয়েছে,স্বস্তিও হয়েছে ততটাই।শিক্ষকরা ছিলেন অনেকেই প্রবীণ।স্থানীয়।প্রধান শিক্ষকও তাই।স্থানীয় ছাত্রদের অভিভাবকেরা অনেকেই তাঁদের পরিচিত ছিল।ফলত স্থানীয়দের প্রতি তাদের অতিরিক্ত স্নেহের প্রকাশ প্রায়ই লক্ষ্য করত অন্যরা। স্থানীয় ছাত্রদের সেই বৃত্তের বাইরে যে তাঁরাও বেরতে পারতেন এমটা মনে হয়নি,আজও মনে হয় না।
    সামজিক মাধ্যমেই একজন সহপাঠীর সাথে বুড়িছুঁয়ে থাকার মতো করে ক্ষীণ যোগাযোগটি আজও রয়ে গেছে।কর্মসূত্রে তাকে বাইরে থাকতে হয়।তার সাথে কথা হচ্ছিল বছর বারো পর।নেই হয়ে যাওয়া স্মৃতিটা উসকে উঠল তারপর।

    ক্লাস চলছে।ষাটজন ছাত্র। কি ক্লাস চলছে, নাই বা বললাম।গমগমে গলায় শিক্ষক একজনকে প্রশ্ন করলেন -" তোর বাবা অমুক সাহা না? অমুক ফার্মেসি তোদের না?" ছেলেটি কৃতার্থ হয়ে মাথা নাড়ল।আর একজনকে প্রশ্ন করলেন -" তোর বাবা তো মাস্টার"।সেও গদগদ ভাবে মাথা নাড়ে। বিশেষ নার্সারি স্কুলের থেকে আসা প্রায় সকলেই,ভদ্দরবৃত্ত বাড়ির সন্তান।তার বাইরেও অনেকে আসত।একজনকে বেছে নিয়ে দাঁড়করালেন তিনি- " কিরে তোর বাবা কি করে?" চুপ করে থাকে ছেলেটি।উনষাটটি চোখ তাঁর দিকে অপলক স্থির।আবার তার গলা শোনা যায়-" কি রে?" সে সঙ্কুচিত ভাবে বলে- " ভ্যান চালায়", অন্যকেউ সঙ্কুচিত হয়ে জানায়-" বাবা দোকানে কাজ করে।" কারো জবাব-" বাবা নেই।" তারপর প্রশ্ন ছুটে আসত-" তাহলে?" ভাবটা এমন তাহলে কিভাবে চলে টলে? কাচুমাচুপনা ছেলেটির হয়ত উত্তর থাকত " মামাবাড়ি "বা অন্যকিছু।তারপরই কাউকে তুলে দিতেন।তার বাবা ব্যাঙ্কার।জবাব দিত সে।
    আমার সহপাঠী মনে করিয়ে দিল ঘটনাটা।বাংলা রেপিড রিডারের বই না আনলে পিটতেন আরেকজন শিক্ষক। বইটা কিনতে হতো।পর পর তিনদিন বই না আনায় মাস্টারমশাইয়ের মার খেয়ে পিছনে বসে কাঁদছিল সে।প্রশ্ন করেছিল আমার সহপাঠীটি -" কি রে কাঁদছিস কেন?" " মার খেলে কাঁদব না?" উত্তর ছিল তার।কেন বই আনেনি সে? উত্তরে বলেছিল - তার বই নেই।"কেন বই নেই? " এই প্রশ্নে তার জবাব ছিল-" মা বই কিনে দিতে পারেনি। " আসলে বই কেনার মতো পয়সা ওর মায়ের ছিল না।
    দরিদ্র বলতে তারা অনেকে বুঝত পূজায় জামা না হওয়া বা কম জামা হওয়া।আসলে খেতে না পাওয়া,থাকার মতো আশ্রয় না পাওয়া যে ভারত আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে,সহপাঠী হয়েও সেখবর অনেকের কাছে পৌঁছায় না।মাস্টারমশাইরাও জানেন না অনেকে।জানতে চাননা।সেই না জানা বা বিস্মৃত হওয়াগুলো আরও দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিদিন টের পাই।
    শামসের নগর,যোগেশগঞ্জ প্রাথমিক স্কুলে বছরে একবার যাই।আমার এক আত্মীয়া পড়ান।খালি পায়ে হেঁটে আসে অনেকে।সহজপাঠের " বসে খায় ক্ষীর খই" উচ্চারণ করলে,ওরা জানতে চায় ক্ষীর কি? চেষ্টা করে সে একবার ক্ষীর পৌঁছে দিয়েছিল ওদের কাছে।এটা ওটা ওদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা হয়।খুশি হয় ওরা।বাকিরা হিসেব কষেন। সুন্দরবনের কাছে পড়ান আর একজন।দুর্যোগের খবর পেয়ে ছুটে গেছেন তাদের কাছে।রাতে ছাত্রদের গল্প শোনান।রোজ।সবাই অপেক্ষা করে থাকে।ভালো লাগে।স্কুল জীবনের কৈশরের স্মৃতি নেই হয়েছে।তবে এমন কিছু স্মৃতি সেই নেইকে ভারিয়ে তোলে।
    ইন্ডিয়ার বাইরে হেঁটে চলেছে ভারত।আর সেই ভারতের অগণন শৈশব- কৈশোর। লকডাউন পর্বে পশ্চিমাঞ্চলে আটকে ছিলাম।তিন চারজন জন কিশোর এসেছিল।দুপুরে।আমার দুপুরের সংস্থানের সব খাবারটুকু দিয়েও সামলে উঠতে পারছিলাম না।তবু ভাগকরে নিয়ে ওদের সাথে কথা বলছিলাম।একজন" তৃতীয় ক্লাসে" পড়ে।জিজ্ঞেস করেছিলাম- " স্কুলের নাম কি?" অনেকদিন সে স্কুলে যায়নি।তাই স্কুলের নাম তার মনে নেই।অকপট বলেছিল কিশোরটি।চমকে উঠেছিলাম।
    অনলাইনে ক্লাস চলে।নিত্যনতুন স্কুলের ডিপি বদলায়।অ্যাসাইনমেন্টের পাহাড় জমে ওঠে।গুগল ফর্মে প্রশ্ন উত্তর চলে।অপরদিকে, স্কুলের নাম ভুলে,ভরদুপুরে খাবারের খোঁজে হেঁটে চলেছে অগণিত শৈশব।হেঁটে চলেছে আমার ভারতবর্ষ।একি লকডাউন না এক বৈষম্যের অন্তহীনযাত্রা?
  • বিভাগ : অন্যান্য | ১৮ জুন ২০২০ | ৬৭০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন
আরও পড়ুন
তেজ - Mahua Dasgupta
আরও পড়ুন
কাঠাম - Rumela Saha
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Jhuma Samadder | ১৮ জুন ২০২০ ১৬:৪১732240
  • ইন্ডিয়ার বাইরে  হেঁটে চলে  ভারত। আমরা তাদের  দেখতে পাই না। দেখতে চাই না। 

  • S | 2405:8100:8000:5ca1::739:d5f0 | ১৮ জুন ২০২০ ১৬:৪৮732241
  • আসলে দেখতে চাই না।
  • Saikat Mistry | ১৮ জুন ২০২০ ২৩:১৩732242
  •  হ্যাঁ।আমরা দেখতে চাই না।

  • একলহমা | ১৯ জুন ২০২০ ০৫:৩১732246
  • ইন্ডিয়ার বাইরে হেঁটে চলেছে ভারত

    - অসাধারণ। 

  • Atoz | 151.141.85.8 | ১৯ জুন ২০২০ ০৫:৪৯732247
  • সবাইকে ঠেলেঠুলে একই রকমের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ঠুসে দেওয়াও একধরণের ষড়যন্ত্র। আরে বেসিক প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো, যথা অক্ষরপরিচয়, প্রাথমিক গণিত, হিসেব টিসেব করতে পারা, ফর্ম ফিলাপ করতে পারা ইত্যাদি--- যেগুলো প্রতিটা নাগরিকের দরকার, সেগুলো সবার জন্য মাস্ট হোক। কিন্তু ঠাসাঠাসি করে সবকটাকে বিশাল বিশাল ইতিহাস ভূগোল মুখস্থ করানো, পিথাগোরাসের থিওরেম প্রমাণ করানো--- এ আসলে ষড়যন্ত্র। অজস্র ছেলেমেয়ে পরবর্তীজীবনে জীবিকা হিসেবে যা করবে তার সঙ্গে এই ধরণের শিক্ষার সম্পর্কই নেই। এগুলো "কেরিয়ারপন্থী মধ্যবিত্তের" শিক্ষাব্যবস্থা।
  • বিপ্লব রহমান | ১৯ জুন ২০২০ ০৭:২১732248
  • এপারের পরিস্থিতি প্রায় একই।  "বসে খায় ক্ষীর খই" বাক্যটি যেন শিক্ষা ব্যবস্থার মুখে  এক প্রচণ্ড  চপেটাঘাত       

  • Kunal Shekhar | ১৯ জুন ২০২০ ০৮:০৭732249
  • স্কুলের এই চিত্রটা বোধহয় সব স্কুলেই একইরকম। প্রভাবশালী বাবার ছেলেরা বরাবরই খাতির পেয়ে থাকে স্যারদের কাছে। তাদের হাবভাবই আলাদা। 

  • Sanjib Chatterjee | ১৯ জুন ২০২০ ২৩:২৪732251
  • ভাল লেগেছ। শৈশবের অনেককিছু মিলে গেছে তাই। চারিদিক দেখে ভয় লাগ।  এইরকম চলবে? তবু কিছু অসমসাহসী যুঝে যাচ্ছ। দেখে আশা জাগে।           

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত