• টইপত্তর  অন্যান্য

  • ' তারকার আত্নহত্যা' নাকি সমাজের দ্বারা ব্যক্তির খুন? আত্মহত্যার জটিল দার্শনিক বিমর্শ।

    Saikat Mistry লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | ১৬ জুন ২০২০ | ২৭৯ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন
  • "কেন গো কি হয়েছিল তার।
    একবার শুধালে না কেহ-
    কী লাগি সে তেয়াগিল দেহ?
    ...
    সে কি কভু ভেবেছিলাম মনে-
    ( এত গর্ব আছিল কি তার)
    আপনারে নিবাইয়া তোমাদের করিবে আঁধার।"-
    তারকার আত্মহত্যা, রবীন্দ্রনাথ,১৮৮১
    আত্মহত্যার পিছনে থাকে নানাবিধ কারণ।সম্প্রতি এক তারকার আত্মহত্যা নিয়ে যখন কথা বলছি, তখন আমাদের হাতে আছে লক্ষ লক্ষ কৃষক ও শ্রমিকের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান। তখন আত্মহত্যা গুলোর কারণ ও সাধারণীকরণ করার চেষ্টা যুক্তিযুক্ত।

    একএক সময় জীবনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায় নাকি? নেমে আসেনা কি ঘন অন্ধকার? পথ নেই, কেন বেঁচে আছি? কাছের মানুষ গুলো দূরের হয়ে গেছে? তাহলে? চোখের সামনে বন্ধ হয়ে গেছে সব দরজা।" মরণরে তুহু মম শ্যাম সমান" গোছের আহ্লাদে না হোক, " আরও এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে" কি ক্লান্ত করে তোলেনা আমাদের? যখন " গিয়েছে ডুবে... চাঁদ/ মরিবার হল তার সাধ" - এর মতো আমাদের জীবনে কি তেমন সাধ জাগেনা কখনো? আমার তো বহুবার জেগেছিল।অনেকেরই জাগে।আবার আশ্চর্য কৌশলে তাকে প্রমশিত করেতে হয়।প্রশ্ন জাগে, সত্যি কি এ কোন সাধ? না এক বিশেষ আলোহীন স্বাদহীন অবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ? জীবন যখন শুকিয়ে আসে,করুণাধারা এসে জীবনকে ভরিয়ে তোলার পথও রুদ্ধ হয়ে যায়; সেই দমবন্ধ অবস্থার দ্বারাই তো নিজেকে কেউ নিজে খুন করতে পারে।না হলে তো আত্মহনন সম্ভব হয় না। আত্মহত্যা নাকি সমাজিক অবস্থার চাপে ব্যক্তির হত্যা?এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এই লেখার লক্ষ্য।

    ২০১০ সালে বিদর্ভের কৃষক রামচন্দ্র রাউত তুলোচাষের ঋণের বোঝা শোধ করতে না পেরে ১০০ টাকার রাবার স্ট্যাম্পে রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে ' চরম পত্র' লিখে কীটনাশক বিষ পানকরে আত্মহত্যা করেন।
    স্টোয়িক দার্শনিক সেনেকা,মার্কসের কন্যা ইলিনর, কাদম্বরী,ফরাসি দার্শনিক জিল দ্যোলুজ, ভ্যানগর্গ - এরা সকলেই 'আত্মহত্যা' করেছিলেন। এই স্বেচ্ছামৃত্যু আসলে কি স্বেচ্ছায় মৃত্যু? নাকি প্রতিটি মৃত্যু রাষ্ট্র - সমাজের চরম আঘাত জাত? আমাদের সামনে যখন শত শত অভিবসী মানুষের ' স্বেচ্ছামৃত্যু ' এর খবর আছে, যা স্বেচ্ছায় মৃত্যু কিনা সেবিষয়ে গভীর আলোচনার বিষয়,অথচ সাধারণ জনগণের মৃত্যু গুলো আমরা প্রায় গ্রাহ্যই করিনা,সেই পরিসরে তারকার আত্মহত্যা বেশ আলোড়ন তুলেছে।আত্মহত্যা অবশ্যই আলোড়ন তোলার মতোই বিষয়।ক্যামু বলেছিলেন - সত্যি কোন দার্শনিক সমস্যার বিচার করতে হলে আত্মহত্যার বিচার করাটা জরুরি।
    গত ৯ জুন, সুশান্ত সিং রাজপুতের প্রাক্তন সেক্রেটারি দিশা সালিয়ান আত্মহত্যা করেন।আর ১৪ জুন বান্দ্রায় আত্মহত্যা করেন তরুণ তারকা সুশান্ত সিং রাজপুত।ভারতে প্রতি আধঘন্টায় একজন আত্মহত্যা করেন।অথচ স্পিনোজা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন - কেউ নিজের বধ্য আবার নিজের ঘাতক একসাথে ঘটতেই পারেনা।সুতরাং আত্মহত্যা অসম্ভব।মহাভারতের বনপর্বে বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্নকরেছিলেন - " আশ্চর্য কি?" উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন- প্রতিদিন এত মানুষকে শমনভবনে যেতে দেখি,তারপরও আমরা ভাবি অনন্ত সম্পদ নিয়ে আমরা বেঁচে থাকব,সেটাই আশ্চর্য। তেমনই আশ্চর্য নিজের দ্বারা নিজেকে হত্যা করা।আসলে প্রতিটি আত্মহত্যা সমাজের দ্বারা ব্যক্তির নিজের প্রাণনাশ।খটকা লাগতে পারে কথাটায়।প্রতিটি আত্মহত্যার পর অবসাদ, বিষাদের নানা কথা আমরা হাজির করি।বিষয়টা যেন ব্যক্তির বিষাদগ্রস্ত ছিল।অতএব তার সমস্যা। একান্তই দায়টা তার।১৯৬১ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে তাই সফল আত্মহত্যাকারীকেও অপরাধী বলে গণ্য করা হতো।
    রেমন্ড ফেরি আত্মহত্যা শব্দটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।প্রথমত, নিজেকে মারা, দ্বিতীয়ত, অন্যকে দিয়ে নিজেকে হত্যা করানো, তৃতীয়ত, এমন অবস্থায় পড়া যার মধ্যে নিজের মৃত্যু অনিবার্য, কোন বাধা না দিয়ে নিজেকে মরতে দেওয়া।এই তৃতীয় বিষয়টি সব আত্মহত্যার মূলে - এদিক থেকে ভাবলে সহজে বলা চলে না,নিজের দ্বারা নিজের হত্যা সম্ভব নয়।সুতরাং আত্মহত্যা অসম্বব। সুতরাং স্বেচ্ছায় মৃত্যু কথাটি নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।ধরাযাক- ১। সুশান্ত সিং নিজেকে হত্যা করেছে/ ধরা যাক তেলেঙ্গনায় কুয়োতে ঝাঁপিয়ে অভিবাসী শ্রমিকেরা আত্মহত্যা করেছে।২। তারা আত্মহত্যা করতেই চেয়েছিল।৩। তারা অবস্থার চাপে আত্মহনন করেছে।সুতরাং অবস্থা ও চাপ এক্ষেত্রে বড় কথা।ভিটে মাটি উচ্ছেদ হওয়ার ভয়ে, গাড়ির বনেটে হনুমান সেজে ভোটপ্রচার করা নিবাস সরকার যখন নিজেই নিজের ঘাতক হয়,তখনও কি তাকে আত্মহত্যা বলব? নাকি আত্মহননের পরিবেশ তৈরি করা সমাজকে দায়ি করব?কেউ বিতর্ক তুলতে পারেন, না খেয়ে যে মানুষরা আত্মহত্যা করল কুয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, যাকে পোশাকি কথায় বলে অবসাদ।আর ধনগর্বী তারকা প্রাক্ষোভিক পীড়নে যখন পোশাকি অবসাদের শিকার হন, তাতো এক হতে পারেনা।কিন্তু গভীরতর দার্শনিক বিচারে বোঝাযায়,সবটার ক্ষেত্রে দায়ি সামাজিক অবস্থা। কেউ প্রতিপ্রশ্ন তুলতে পারেন, একই সামাজিক অবস্থায় থেকেও তো সবাই আত্মহত্যা করেনা।তাহলে? তাহলে একি অতিব্যাপ্ত দোষে দুষ্ট? এর প্রতিপ্রশ্নে বলাযায়,কখনোই দুটি মানুষ কি একই সামজিক অবস্থার শিকার হতে পারেন? ঠিক একই মানসিক, সামাজিক সম্পর্কের পীড়ন তিনি অনুভব করেন? একই রকম মনোগঠন হতে দুটো লোকের পারে? উত্তর অবশ্যই নয়।এই অব্যপ্তি বা অতিব্যাপ্তির উত্তর এভাবে দিলাম।কেউ নাকোচ করতেই পারেন। ১৮৯৭ সালে এমিল দুর্খাইম " আত্মহত্যাঃ একটি সমাজ মনোবৈজ্ঞানিক পাঠ" বলে একটি বই লেখেন।তাতে যে তিনপ্রকার আত্মহত্যার কথা বলেন,তার কোনটির সাথে একুশ শতকের ঘটমান আত্মহত্যাগুলো মেলে না। স্পিনোজা আত্মহত্যাকে " অসম্ভব দোষ" হিসেবে দেখেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় " আত্মহত্যার অধিকার " গল্পে সফল এবং ব্যর্থ আত্মহত্যার অনবদ্য বর্ণনা দিয়েছেন।মার্কস ফরাসী পুলিশ আধিকারিক জাক পুশের "আত্মহত্যা বিষায়ক" পুস্তিকার জার্মান অনুবাদ করেছিলেন।পারী শহরের যুবাদের আত্মঘাতীনিদের কাহিনি প্রসঙ্গে মার্কস সিদ্ধান্তে এসেছিলেন - " প্রতিটি আত্মহত্যাই সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ"।মার্কস চেয়েছিলেন, আত্মহত্যাকে হত্যাকারীর অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে, সামাজিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হোক।
    বর্তমানে সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন, অসুস্থ সমাজিক সম্পর্ক, ভোগবাদী সমাজের কঙ্কাল,শোষণ ভিত্তিক সমাজে যে মানসিক,আর্থিক, সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়,তাকেই অপরাধী হিসেবে দোষী করা হয়।যাকে বলা চলে-" Blaming the victim. " আত্মহত্যা সব সামাজ ও দেশে আত্ম হত্যাকারীর দুর্বলতা,অবসাদ,পাপ হিসেবে দেখার রীতি প্রচলিত।অথচ গভীরতর দার্শনিক বিচারে আত্মহত্যা সমাজের বিশেষ অবস্থার দ্বারা শিকার হওয়া মানুষের নিজেকে ঘাতন।'তারকার আত্মহত্যা' শুধু নয়,সমাজে প্রতিমুহূর্তে যে শত শত মানুষ নিজেকে হত্যা করার পথ বেছে নেয়,সেই পরিসরে আক্রান্তের ত্রুটি সন্ধান নয়,দরকার মরমী সংলাপ, শুশ্রূষা আর গভীরতর অসুখে আক্রান্ত সমাজটিকে একটু করে সারিয়ে তোলা।শুকিয়ে আসা জীবনে একটু করে করুণা ধারায় ভরিয়ে তোলার প্রয়াস।তাহলে হয়ত আত্মহত্যার মতো জটিল বিষয়টিকে অবসাদ, হতাশার ঘাড়ে না চাপিয়ে দায় না সেরে, সঙ্কটগ্রস্ত সমাজের দিকে আমরা একটু করে নজর দিতে পারব।
    সূত্রঃ ১।তারকার আত্মহত্যা - অরিন্দম চক্রবর্তী
    ২। এথিকস্ - স্পিনোজা
  • বিভাগ : অন্যান্য | ১৬ জুন ২০২০ | ২৭৯ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন