• বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়।
    বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে।
  • ইরান

    গুরুচন্ডা৯
    বিভাগ : বুলবুলভাজা | ২৯ জানুয়ারি ২০২০ | ৬৭৪ বার পঠিত


  • যে দেশে এক্কেবারে চলতি ভাষাতেই টুরিস্টকে বলা হয় ‘মুসাফির’ তার রোদ্দুর তো আলাদা হবেই। অন্ধকার আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সবার আগে সেই কথাটাই মনে হল। আমার ভাঙাচোরা ফারসিই আমাকে বুঝতে দিয়েছে, সৈয়দ তার স্ত্রী তহমিনেহ্‌-কে মোবাইলে জানাচ্ছে, ‘হিন্দ-এর মুসাফির এসে গিয়েছে। আমরা শিগগির বাড়ি পৌছাচ্ছি’। ‘মুসাফির!’ সে কি সহজ কথা! চকিতে মাথায় খেলে যায় — দিল-এ-ম্যান, মুসাফির-এ-ম্যান! ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়-এর ফারসি শিরোনামের সেই কবিতার গোড়ার পঙ্‌ক্তিগুলি—‘প্রাণ আমার, মুসাফির আমার / হয়েছে যে আদেশ আবার / দেশ ছাড়ি, তুমি-আমি, আরও একবার।...’ ইরান শেষে আমাকে মুসাফির করলে!

    ঘর ছাড়ার আদেশ কার কখন কোনখান থেকে আসে কে বলতে পারে? ঘর ছাড়ার যে আদেশ আমায় ইরানে হাজির করে মুসাফির করল, সে আদেশ এসেছিল পাক্কা ১৫ বছর আগে। ওয়াশিংটন ডিসি। জর্জটাউন। এক পশলা হঠাৎ-বৃষ্টির পর পোটোম্যাকের ওপর পশ্চিম আকাশে রঙের ছুটছে। দোকানে দোকানে আলো জ্বলে গিয়েছে। ভেজা রাস্তায় গাড়ির হেডলাইট-টেললাইটের রঙিন ছায়া। সিরসিরে বাতাস। বাতাসে হঠাৎ-ভেজা মাটির গন্ধ। একটা পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢালাও ডিসকাউন্ট দিচ্ছে। এ বই সে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখ আটকে গেছে মলাটবিহীন পাতলা একটা গাঢ় খয়েরি রঙের হার্ড বাউন্ড বইয়ে– ‘Bride of Acacias: Selected poems of Forough Farrokhzad’
    সে বই আসলে একটা স্বর— অমোঘ, নিশির ডাকের মতো একটা ডাক:
    আমি রাত্রির গভীর থেকে কথা বলি
    কথা বলি অন্ধকারের গভীর থেকে
    আর রাত্রির গভীর থেকে বলি

    যদি আমার বাড়িতে তুমি আসো, মেহেরবান, আমার জন্যে এনো প্রদীপ একটা
    আর একটা জানালাও এনো
    যাতে আমি দেখতে পাই
    আনন্দে ভরপুর রাস্তার কলকলে ভিড়।

    এই সেই যাওয়া নানা কারণে যা হতে পারেনি পনেরোটা বছর। এ নেহাতই দৈবাৎ যে সে যাওয়া ঘটল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে — ২০১৫-র নভেম্বরে। যে মুহূর্তে ৩৬ বছর পর পশ্চিমি জগৎসভায় সসম্মানে ফিরে আসতে চলেছে ইরান। এও দৈবাৎ বইকি, যে আমার ইরান আবিষ্কার মার্কিন মুলুকেই। ব্যক্তিগতভাবে অবিশ্যি ইতিহাসের এই মোড়ের থেকে আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অন্য আর একটা মোড়।
    মোড়টা ঘোরা মাত্র প্রাণপণে স্টিয়ারিং ঘুরিয়েও ঘাড়ের ওপর এসে পড়া স্কুলবাসটাকে এড়ানো গেল না। রাস্তা থেকে ত্যারছাভাবে বেঁকে পাশের দেওয়ালে সজোরে ধাক্কা খেল জিপটা। ড্রাইভারের সিট থেকে তার আগেই ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছে মেয়েটি। মাথাটা ঠুকে গেছে পাশের পেভমেন্টের পাথুরে কোনায়। একমাথা কুচকুচে কালো চুল চুঁইয়ে আসছে রক্ত। তার ওপর এসে পড়ছে মিহি তুষার। বিকেল সাড়ে চারটে। ১৪ ফেব্রুয়ারি। সোমবার। ১৯৬৭। ফরুঘ ফ্যারোখজ়াদ। বয়স ৩২। সেই বসন্ত আর দেখা হল না তার। দেখে যাওয়া হল না কবিতার পঞ্চম সংকলনটা — ইমান বিয়াভ্যারিম বেহ্ আগাজ়-ই-ফ্যাস্‌ল-ই-স্যার্দ— এসো বিশ্বাস রাখি শীতের শুরুতে। তবু ওই পাঁচটি চটি সংকলন, সাকুল্যে ১২৭টি কবিতা, ফারসি কবিতার আদলটাই বদলে দিয়ে গেল। আর নব্য-ইরানি চলচ্চিত্রের এক গবেষক বলেছিলেন আমাকে, শুধু নব্য-ইরানি কবিতাই নয়, নব্য-ইরানি ফিল্মের গোটা ধারাটাই বেরিয়ে এসেছে ফরুঘের কবিতা আর ছবি থেকে। একটিই ছবি করেছিলেন অবশ্য। ১৯৬২ সালে। Non-fiction film। ২২ মিনিটের। নাম ‘Home is black’। উত্তর ইরানের ত্যাবরিজ়-এর কুষ্ঠরোগীদের একটি কলোনি নিয়ে। এই ১৯৬৩-তেই ফরুঘের একটি সাক্ষাৎকার নিতে ইরানে আসেন চলচ্চিত্রকার বের্নার্দো বের্তোলুচ্চি, আর মুগ্ধ হয়ে ফরুঘকে নিয়ে বানিয়ে ফেলেন একটি আধঘণ্টার ছবিই। উত্তর তেহরানের বিদ্বৎ সমাজ সেদিন ছি-ছি করেছিল ফরুঘের নামে। আর এই কিছুদিন আগে মার্কিনবাসী ইরানি কবি শোলেহ্ ওলপে আমায় বললেন, বর্তমান ইরান সরকারের হর্তাকর্তারা ফরুঘকে মনে করেন ‘a corrupt woman and her work was banned for a while’। অথচ আমি নিজের চোখে প্রায় অপার্থিব এক পরিস্থিতিতে দেখে এসেছি তেহরানের নবীন প্রজন্মের মধ্যেও কীভাবে চড় চড় করে বেড়ে চলেছে ফরুঘের কবিতার সবুজ ঘাস।

    ঝকঝকে উত্তর তেহরানে দারুস অঞ্চল আজও আছে। আছে ম্যার্বদশ্ত স্ট্রিট। কিন্তু খুঁজে পাইনি লোকম্যানুদ্দোল্লেহ স্ট্রিটের সঙ্গে সে রাস্তার সেই মোড়, যেখানে জিপ থেকে ছিটকে পড়েছিলেন ফরুঘ। খুঁজে না পাওয়াই স্বাভাবিক। আটচল্লিশ বছরে যেকোনো শহরেরই চেহারা আমূল বদলে যেতে পারে। কিন্তু তেহরানের সে বদলটা শুধু চেহারার নয়। স্বভাবের। অভ্যাসের। এমনকি যা আঁচ পেয়েছি, বিশ্বাসেরও। দিল্লি এয়ারপোর্টের ঝলমলে টার্মিনাল থ্রি-র ১৪ নম্বর গেটের পাশের ওয়েটিং লবিতে বসে, মাঝরাতে মহান এয়ারলাইন্স-এর দিল্লি-তেহরান ফ্লাইটের অপেক্ষা করতে করতে এই বদলের ছবিটা প্রথম মালুম চলে। তাতে অবিশ্যি কেবল অনেক প্রশ্ন জেগেছে মনে, কোনো উত্তর মেলেনি।

    ফ্লাইট ধরা মানেই আজকাল নিজেকে সন্ত্রাসবাদী নই প্রমাণ করার এক ভয়ংকর পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট হলে তো কথাই নেই। সে এক সাংঘাতিক টেনশন। যান্ত্রিক এবং মনুষ্য ছানবিনের জটিল বেড়াজাল টপকিয়ে ইমানটাকে অক্ষত অবস্থায় পার করার আশ্চর্য দক্ষতার পরীক্ষা। পদে পদে বুকের ভিতরটা কেমন খালি খালি লাগে— এই বুঝি কোনো-না-কোনো অপরাধে ধরা পড়ে গেলাম! কাজেই আমার ডব্লিউ ৫০৭০ ফ্লাইটের ডিপারচার রাত (নাকি সকাল বলব?) ২:৪৫ হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ কল্পিত এই সব উৎকণ্ঠায় তড়িঘড়ি এয়ারপোর্টে পৌছে সমস্ত সম্ভাব্য ফাঁড়া কাটিয়ে, নিজেকে আদ্যোপান্ত নিরপরাধ প্রমাণ করে সাড়ে বারোটা নাগাদ যখন নির্ধারিত গেটের পাশের চেয়ারে দম নিতে দেহটাকে এলিয়েছি, তখনও সে অঞ্চল খাঁ খাঁ!

    প্রায় ঘন্টাখানেক পরে সহযাত্রীদের আসা শুরু হয়। সে কী রোশনাই! ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি। তাদের ৯৫ শতাংশ মহিলা। যত সুন্দরী ততই মুখর। কলকলে হাসির ফোয়ারা। রঙিন নারীবুদ্বুদ। পরনে এক্কেবারে পশ্চিমি পোশাক— জিন্স, শার্ট, জ্যাকেট। টিকোলো নাক। অধিকাংশেরই লম্বা, খোলা, কালো বা বাদামি চুল। কিন্তু এমনটাতো হওয়ার কথা ছিল না। ইরানি ভিসা নেওয়ার সময় লম্বা নিয়মের তালিকার যেটাতে সবথেকে বেশি চোখ আটকে ছিল তাতে পরিষ্কার করে লেখা — ভিসার আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া ছবিতে মহিলাদের মাথা হেড স্কার্ফ, যাকে ফারসিতে বলে ‘রুস্যারি’, সেই রুস্যারিতে ঢাকা থাকতেই হবে। ইরানে মহিলাদের মাথা না-ঢাকা থাকা দণ্ডনীয় অপরাধ। ফরুঘ যখন আমূল বদলে দিচ্ছিলেন ফারসি কবিতার দীর্ঘ-দীর্ঘ ঘরানা, যখন তেহরানের গণ্যমান্যরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না এই বেপরোয়া, সিগারেট-ফোঁকা, বিবাহিত পরপুরুষের সঙ্গে প্রেমে মশগুল মেয়েটার আস্পর্ধা, তখনও কিন্তু ছিল না এমন কোনো আইন। তখনও ‘ইনকিলাব-ই-ইসলামি’ পাকাপাকিভাবে টানা আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্র হঠিয়ে ইরানে প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেনি— যে ইসলামি বিপ্লব আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে থাকা রাজতন্ত্র, রাজা, রাজপেয়াদাদের বিদায় করার পর আইন করে চালু করে দিল পুলিশ বিভাগের একটি নতুন শাখা— ‘Moral police’। সে পুলিশের আর পাঁচটা দায়িত্বের মধ্যে একটা হল মহিলাদের সাজপোশাক যথাযথ ‘ইসলামি’ হচ্ছে কি না তার ওপর কড়া নজর রাখা। সেটা ১৯৭৯।
    অথচ দেখছি পঁচিশ থেকে পঁয়ষট্টি বছর বয়সের অন্তত শ-খানেক ইরানি নারীর একজনেরও মাথা ঢাকা নয়। কেমন যেন সন্দেহ জাগে। ভুল গেটের পাশে অপেক্ষা করছি না তো? এই সুন্দরীর দল সত্যিই আমার মতোই তেহরান যাত্রী তো? বোর্ডিং পাশটা আরও একবার ভালো করে দেখে নিই। কান পেতে শুনি। না:! কোনো ভুল নেই। এ ভাষা পাক্কা ফারসি। শুধু এক্কেবারে পিছনের দিকে চোখে পড়ে খানতিনেক ভারতীয় পরিবার। সঙ্গে জনাপাঁচেক মহিলা। বয়স বোঝা অসম্ভব। আনখশির কালো হিজাবে ঢাকা। মুখ বোরকার অন্তরালে। বোর্ডিংয়ের ডাক পড়ে। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। উইন্ডোসাইড মিলেছে। কাঁধের ব্যাগ-ট্যাগ রেখে থিতু হই।

    ফ্লাইট ছাড়ে মিনিট পনেরো দেরিতে। দিল্লির বিশাল আলোর জাল ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেল। আর কিছু দেখার নেই। প্লেনের টানা একঘেয়ে ঘর্ঘর শব্দ আর হলদেটে আলোয় অদ্ভুত নির্বিকার মুখ আর শূন্য দৃষ্টি নিয়ে সকলে বসে। পরবর্তী চার ঘণ্টা এভাবেই বসে থাকব সকলে। পাশাপাশি। ঘেঁষাঘেঁষি। যদিও একে অপরের থেকে বহু আলোকবর্ষ দুরে। মাথা-ঢাকা-না-ঢাকার বিষয়টা মাথায় ঘুরতে থাকে। এই যে বোরকালীনা আমার সহযাত্রিণীরা— সকলেই ভারতীয়। দেশের কোনো আইন তাদের বাধ্য করেনি বোরকায় নিজেদের ঢেকে রাখতে। হয়তো তাদের পারিপার্শ্বিক সমাজ করেছে। হয়তো কেউই করেনি, পোশাকের এই আচারেই হয়তো তারা সচ্ছন্দ। হয়তো জন্মে থেকে তারা সেই পরিবেশে মানুষ যেখানে এর কোনো বিকল্প তাদের ভাবনাতেই আসেনি— এমনটাই দেখেছেন দিদি, পিসি, মা, ঠাকুমাকে। যেকোনো কিছুই সম্ভব। এবং এক-একজনের ক্ষেত্রে এক-একরকম সম্ভব। এ নিয়ে জ্বালাময়ী নানা থিয়োরিতে বিশ্বাস রাখার কোনো সুযোগ জীবন আমায় দেয়নি। পরবর্তী দিনগুলোতে যত ঘুরেছি ততই দেখেছি ইরানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উলটো। সরকার জোর করে তাদের মাথা ঢেকে দিয়েছে বটে, কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্রকে এমনই অবারিত করেছে, যা এ দেশের অধিকাংশ মহিলার কাছে অকল্পনীয়। ভাবতে ভাবতেই ঝিমুনি আসে। তেহরান আমাদের থেকে ঠিক দু-ঘন্টা পেছিয়ে। কাঁটায় কাটায় পৌনে পাঁচটার সময় দুর্বোধ্য ইংরেজিতে ঘোষণা হয়— সিটটা সোজা কর, সিট বেল্ট বাঁধো, ইমাম খোমেইনি আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে আমরা নামতে প্রস্তুত। সহযাত্রীদের ওপর চোখ বুলাই। সে কী? কোথায় গেল সেই গোছা গোছা কালো-বাদামি চুল? প্রত্যেকের মাথা ঢাকা। খেয়ালই করিনি কখন স্কার্ফ বের করে পটাপট মাথা ঢেকে ফেলেছে প্রত্যেকে! ভারতের মাটি আর ইরানের মাচির মধ্যে মোক্ষম তফাত।

    জানালা দিয়ে আলোর বাহার দেখে বুঝি জাঁদরেল একটা শহরে পৌছোলাম। তখনও আকাশ কালো। তেহরান। দিল্লির তুলনায় অনেক ম্যাড়মেড়ে বিমানবন্দর। অতি প্রয়োজনীয় দু-একটা বাদ দিলে সব সাইন ফারসিতে। ইংরেজি প্রায় নেই বললেই চলে। চোখে পড়ার মতো কিছু নেই, শুধু পেল্লায় একজোড়া ছবি ছাড়া। যে ছবির জোড়া জ্বলজ্বল করতে দেখেছি ইরানের সর্বত্র রাস্তায়-ঘাটে, বাজারে, ট্রেন স্টেশনে, বাস ডিপোয়, সরকারি বাড়ির ছাদে, মায় হোটেলের লবিতেও। হাসি হাসি মুখ করে আমাদের মতো নাদানদের কাণ্ডকারখানা দেখে চলেছেন অক্লান্ত দৃষ্টিতে। বাঁদিকে আয়াতোল্লা রুহল্লা মুসাভি খোমেইনি। ডাইনে আয়াতোল্লা সৈয়দ আলি হোসেইনি খামেনি। ইরানের প্রাক্তন এব বর্তমান ‘রহবর’, যার ইংরেজি ‘supreme leader’, বাংলায় বলা যেতেই পারে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। এই দুই ছবির সর্বব্যাপী দৃষ্টির অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে বোঝার চেষ্টা করেছি ইতিহাস কীভাবে বর্তমান গড়ে দেয়। কিন্তু আপাতত ওই দুটি ছবি ছাড়া আর কোনো কিছুতে একবারও মনে হয় না সাংঘাতিক কোনো ‘মোল্লাতন্ত্রে’ ঢুকলাম, যেমনটা আমায় ভয় দেখিয়েছিলেন শুভার্থীরা— দেখিস বাবা, বেশি নোটস-টোটস নিতে যাস না। কেউ আবার ই-মেলে অ্যাটাচ করে পাঠিয়ে দেন সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার আন্তর্জাতিক সংস্থা Committee to Project Journalists (CPJ)-র একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট, যাতে সাফ বলা আছে— ‘Iran is consistently one of the world's Worst jailers of journalists’। শুধু ভারতীয় বন্ধুরাই নয়, আমার যে ইন্টারনেট-বন্ধু সৈয়দের বাড়িতে আমার থাকার বন্দোবস্ত, সেও আমায় খুব পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয় — তুমি টুরিস্ট ভিসায় আসছ, সাংবাদিকী কৌতুহল বেশি প্রকাশ করতে যেয়ো না বাপু। ভিসার আবেদনেই স্পষ্ট বলা আছে যে আমি সাংবাদিক। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ঠিক আমার আগে লাইনে দাঁড়ানো সেই বোরকা পরিহিতা নারীদের একজন ও তাঁর পরিবারকে দীর্ঘক্ষণ ধরে যেভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্নের ধাক্কা সামলাতে দেখি, একটু নার্ভাসই লাগে। আমার কপালে কী প্রশ্ন আছে কে জানে? ডাক পড়ে। কাউন্টারের ওপাশে পাথুরে মুখ। পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিই। ফরফর করে পাতাগুলো ওলটান। ইরানি ভিসার ঠিক আগেই মার্কিন ভিসা। এখনও ভ্যালিড। দুটোর মধ্যে আবার আশ্চর্য সাদৃশ্য। এক পলক আটকে যান। বুক ঢিপঢিপ। এক পলকই মাত্র। পাতা উলটান। ইরানি ভিসা। বার কয়েক আঙুল বোলান। একটু মোড়েন। আর একবার আঙুল বোলান। স্ট্যাম্প। পাসপোর্ট ফিরে আসে। পাথরে মৃদু হাসির ভাঁজ— বহ্ ইরান খুশ-আমদিদ!

    ব্যাগেজ-বেল্ট থেকে স্যুটকেস দুটো নিয়ে সবে ভাবছি, কথামতো সৈয়দ আমায় নিতে আসবে তো? ওমনি দেখি রোগা লম্বা দাড়ি-গোঁফ সাফ করে কামানো, চোয়াল উঁচু, নাকে চশমা আঁটা এক যুবক আমাকে দেখে জুলপি এঁটো করা হাসি নিয়ে প্রাণপণে হাত নাড়ছে। গেট দিয়ে বেরোনো মাত্র, আমায় বুকে জাপটে ধরে —যেন কতকালের হারানো কোনো বন্ধু! তারপরে আক্ষরিক অর্থেই ছিনিয়ে নেয় আমার ব্যাগেজ ট্রলিটা। যেখানে তার গাড়ি পার্ক করা আছে সে অবধি ট্রলি নিয়ে যাওয়া যাবে না। স্যুটকেস দুটো টেনে নিয়ে যেতে হবে। মারামারির জোগাড়। সৈয়দ কিছুতেই আমায় বড়ো ভারী স্যুটকেসটা টানতে দেবে না। একটিই সহজ যুক্তি, তা নিয়ে কোনো কথা হবে না— তুমি না মুসাফির!

    ইরানি মেহমাননওয়াজির প্রথম আস্বাদ পাই, শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ, নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে যার একবারও, একটি বারও, অন্যথা হতে দেখিনি। এ সফরের আর সব কিছু যদি কোনোদিন ভুলেও যাই এ জিনিসটা মনে রয়ে যাবে। বিশেষ করে একটা ঘটনা। ইসফাহান থেকে গাড়িতে ঠিক এক ঘণ্টার পথ মরুভূমির কিনারায় বড়োজোর হাজার তিনেক পরিবারের ছোট্ট বসতি ভ্যারজ়ানেহ্। সন্ধে আটটার মতো। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ জনমানবহীন। একটা দোকান পর্যন্ত খোলা নেই। আসলে কোনো দোকানই নেই। কেবল সার সার দরজা-জানালা-বন্ধ বাড়ি। ইয়াসনা গেস্টহাউস-এর আমিই একমাত্র গেস্ট হওয়ায় এবং কোনো ঠাকুর-চাকর-ম্যানেজার না থাকায় আমার হাতেই গেস্টহাউসের মেন দরজার চাবি ধরিয়ে দিয়ে রাতের মতো বিদায় নিয়েছেন গেস্টহাউসের মালিক। খিদে খিদে পাচ্ছে। বেশ কিছুটা দূরের একটা একরত্তি রেস্তোরাঁয় দুপুরে লাঞ্চ করেছিলাম। যাই, সেখান থেকেই একটা ‘ফ্যালাফেল’ রোল কিনে আনি। গেস্টহাউসে চাবি মেরে হাঁটতে শুরু করি। কী একটা কারণে যেন এই খাঁ খাঁ ভাবটা আরও বেশি খাঁ খাঁ মনে হতে থাকে। একটু পরে খেয়াল হয় এতটা পথ হাঁটছি, একটাও যে লোক নেই শুধু তাই নয়, রাস্তায় একটা কুকুর পর্যন্ত নেই। তেহরানে প্রথম দিনই সেটা লক্ষ করেছিলাম। একই জিনিস দেখেছি ত্যাবরিজ়, খোই, ইসফাহান, শিরাজ়, ইয়জ়্‌দদ, মশহদ, নিশাবুর সর্বত্রই। কিন্তু শহুরে রাস্তায় সে অভাবটা খেয়াল হয় না। ভারতীয় শহরের, আর বিশেষ করে গ্রামের নিশুতি রাতের সঙ্গে নেড়ি কুকুরের পালের একটা অদ্ভূত সম্পর্ক আছে। ভ্যারজ়ানের পথে হাঁটতে হাঁটতে সে অভাবটা ভীষণভাবে বুঝতে পারি। পরে শিরাজ়ে, আমার আর এক বন্ধু সোমাইয়েহ্‌-র কাছে শুনেছিলাম— ‘কুকুর তুমি পুষতেই পারো, কিন্তু বাড়ির মধ্যে। তাও ঝামেলা হয়, যদি পাশের বাড়ি মিউনিসিপ্যালিটির কাছে অভিযোগ জানায়, অমুক বাড়ির কুকুর চেঁচিয়ে আমাদের জিনা হারাম করে দিচ্ছে। গাড়ি আসবে, কুকুর তুলে নিয়ে যাবে। কোনো তর্কবিতর্কের অবকাশ নেই। একবারই কুকুর দেখেছিলাম একটি। পেল্লায় এক মংগ্রেল নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন এক ব্যক্তি। সন্ধ্যের মুখে। প্রায় জনশূন্য একটি পার্কে। নিশাবুরে। আমাকে পেয়ে মহানন্দে খুব এক চোট চেটে দিয়ে গেল। নেড়ির দলের অবশ্য কোনো প্রশ্নই নেই।

    ভ্যারজ়ানের জনহীন, নেড়িহীন পথে হাঁটছি। মরুভূমির দিক থেকে একটা শনশনে কনকনে বাতাস গায়ে ফুটছে। চোখে পড়ে একটা শিরিনি— মিষ্টির দোকান। ফারসিতে শিরিন মানে মিষ্টি। আর তার দোকান হল শিরিনি। ঢুকে পড়ি। থরেথরে অন্তত পঁচিশ রকমের মিষ্টান্ন সাজানো ঝলমলে কাচের শোকেসে। পিছনে ধূসর রঙের টুপি, কোট পরা এক থুথুড়ে বুড়ো। দু-জনে মুখোমুখি। মাঝখানে ভাষার পাঁচিল। এক বর্ণ ইংরেজি বলেন না তিনি। ‘অ্যাজ় পাকিস্তান?’ পাকিস্তান থেকে? তাড়াতাড়ি তার ভুল শুধরে দিই, ‘ন্যা। অ্যাজ় হিন্দ!’ ভাঙা ফারসিতে ভর করে ছ-টা মিষ্টি বাছি। কোনোটা চমচম গোছের, কোনোটা খানিকটা গজা টাইপের, কোনোটা পেস্ট্রির মতো। সমস্ত ইরানে কোথাও আমাদের রসগোল্লা-পান্তুয়ার মতো রসের মিষ্টি দেখিনি। সত্যি বলতে কী, রস নিংড়ে সে রসে পাঁউরুটি, কী রুটি চুবিয়ে খাওয়ার দৃশ্য ইরান কেন, ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি তুরস্ক, নেপাল বা পাকিস্তানেও কখনও দেখিনি। ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও যেটুকু দেখা যায় সেটা নির্ঘাৎ বাংলারই প্রভাব। আমার ধারণা রসের কপিরাইট সম্পূর্ণ বাঙালির। শুকনো মিষ্টিগুলো বাক্সে পুরে, একটা ক্যারিব্যাগে ভরে আমার হাতে তুলে দেন বুড়ো।
    মানিব্যাগ বার বার করে জানতে চাই, ‘গিমতেশ চ্যান্দ অ্যাস্ত?’ কত হল?
    ‘হিচ! হিচ!’ কিছু না।
    সে কী? আকাশ থেকে পড়ি। কিছুতেই টাকা নেবেন না ভদ্রলোক। সেটা যে আমার কাছে অপমানজনক, এটা বোঝানোর মতো ফারসি আমার জানা নেই। হাত-পা নেড়ে বার বার মনের কথা চালান করার চেষ্টা করি। শেষে বুড়ো আমার হাত দুটো চেপে ধরে উদ্ভাসিত চোখে তাকিয়ে বলেন— মুসাফির! মুসাফির!
    তিরিশ বছরের ছটফটে ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দের অন্তহীন কৌতুহল আর ক্রমাগত বকবকানির স্রোতে ভাসতে ভাসতে যখন তেহরানের অতি মধ্যবিত্ত পাড়া ন্যাব্বব-এর মোর্তাজ়াভি স্ট্রিটে তার ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হলাম তখন শহরের উত্তরে বুক চিনো আলবোর্জ় পর্বতমালার তোচাল পাহাড়ের রুপোলি বরফের চুড়োয় প্রথম আলোর কমলা ছোপ লেগেছে।
    -------------------------------------
    বইমেলায় প্রকাশিতব্য গুরুচণ্ডা৯ সংস্করণ ‘ইরানে’ থেকে অংশবিশেষ
  • বিভাগ : বুলবুলভাজা | ২৯ জানুয়ারি ২০২০ | ৬৭৪ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • b | 172.68.146.73 | ২৯ জানুয়ারি ২০২০ ২০:৫৩90872
  • অসাধারণ
  • বিপ্লব রহমান | 172.68.146.223 | ২৯ জানুয়ারি ২০২০ ২৩:৫২90873
  • বইটি নিঃসন্দেহে কৌতুহল উদ্দীপক। লেখাটিও খুব ভাল।

    তবে এটি বোধহয় গুরুচণ্ডা৯র একটি ঢাউশ প্রকাশনা, ঠিক চটি সিরিজ নয়, দাম সাড়ে চারশো টাকা! মানে এপারে প্রায় হাজারটাকা! ডরাইছি গো

  • Random | 162.158.167.181 | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৪:১৮90876
  • Can anybody suggest where to buy this book online
  • de | 172.69.135.219 | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৫:১০90888
  • কিনতে হবে -
  • Random | 172.68.144.144 | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০১:৩৮90889
  • @de ki kore ba kotha theke janale badhito hobo
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত