• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • জিওরদানো ব্রুনো—সত্যনিষ্ঠার এক অনির্বাণ জাগপ্রদীপ # তিন

    Ashoke Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ | ৯১ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • [আগামি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বিজ্ঞান শহিদ জিওরদনো ব্রুনোর ৪১৭-তম মৃত্যু বার্ষিকী। এই উপলক্ষে আমি ব্রুনো সম্পর্কে আমার একটি লেখা এখানে সকলের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। যাঁরা ওই দিন বা ওই সময়ে ব্রুনো চর্চা করবেন, তাঁদের কাছে আনুষঙ্গিক এই সব তথ্য থাকা দরকার। যাঁরা এগুলো ইতিমধ্যেই জানেন, তাঁরা এটাকে স্বচ্ছন্দে অগ্রাহ্য করতে পারেন। এবার এল তৃতীয় কিস্তি]

    [৪] অসীম বিশ্বকথা

    ব্রুনো ভেবেছিলেন, জার্মানি সুইডেন সুইজারল্যান্ড যেহেতু ক্যাথলিক প্রভাব মুক্ত দেশ, প্রোটেস্টান্টরাই সেখানে প্রধান শক্তি, এই সব দেশে গেলে হয়ত তিনি একটু নিশ্চিন্তভাবে থাকতে পারবেন। সার্ভেতোর বিচার ও হত্যাকাণ্ড যে ক্যালভিনপন্থী প্রোটেস্টান্টরাই করেছিল, এটা বোধ হয় তাঁর খেয়াল ছিল না। অথবা, সম্ভবত নিজেও ধর্মে বিশ্বাসী হওয়ায়, ধর্ম মাত্রই যে তখন গোঁড়ামি ও অন্ধতার পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে আছে, সত্য ও যুক্তির পথে চলার সামর্থ্য তার আর নেই, চার্চের ধ্রুবিশ্বাস (dogma)-গুলিকে রক্ষা করতে গিয়ে সমস্ত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিসর্জন দিতেও যে সে আর দ্বিধান্বিত নয় -- এই উপলব্ধি তখনও তাঁর হয়নি। কিন্তু জেনেভায় পা দিতেই প্রোটেস্টান্টপন্থীরা তাঁকে বুঝিয়ে দিল, তারা তাঁর বন্ধু নয়। সেখানে থাকতে হলে তাঁকে প্রোটেস্টান্ট মত গ্রহণ করতে হবে এবং ক্যালভিনীয় গির্জায় যোগদান করতে হবে। শুধু তাই নয়, কোপারনিকাসের মতবাদ একদম প্রচার করা চলবে না।

    ঘটনা হল, প্রোটেস্টান্ট আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার ইতিমধ্যেই কোপারনিকাসের মতবাদ সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত রায় জানিয়ে দিয়েছেন: “লোকজন এক জ্যোতিষশাস্ত্রীর কাছে গিয়ে শুনছে, তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে পৃথিবী ঘুরছে; স্বর্গ বা আকাশ, সূর্য, চন্দ্র ঘুরছে না। যারাই বুদ্ধিমান সাজতে চায়, তারাই একটা করে নতুন তত্ত্ব আমদানি করে। আর বলে, এটাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব। এই মূঢ় লোকটা সমগ্র জ্যোতিষশাস্ত্রকেই উলটে দিতে চায়। অথচ পবিত্র ধর্মগ্রন্থে আমরা পড়েছি, জোশুয়া সূর্যকেই থামতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, পৃথিবীকে নয়।” [উদ্ধৃত: White 1960, I, 126; আরও দ্রষ্টব্য: বাইবেল, নিউ টেস্টামেন্ট -- জোশুয়া ১০/১২-১৩][6] লুথার ভক্ত এক অধ্যাপক তখনকার দিনের সবচেয়ে অকাট্য যুক্তি তুলে ধরে বাজিমাত করতে চাইলেন, “The eyes are witnesses that the heaven revolve in the space of twenty four hours”, ইত্যাদি। [উদ্ধৃত: White 1960, I, 126-27] সত্যিই তো! খালি চোখেই তো দেখতে পাচ্ছি যে . . .

    মনের দুঃখে ব্রুনো সুইজারল্যান্ড ছেড়ে গেলেন ফ্রান্সে, ক্যাথলিকদের দাপট সেখানে তখন একটু কম। সেখানে লিয়ঁ, তুলুজ, মঁতপলিয় এবং পারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দু বছর ধরে ঘুরে ঘুরে তিনি দর্শনে অধ্যাপনা করলেন। তাঁর ছাত্রপ্রিয়তা সেই যুগে ফ্রান্সের বিভিন্ন কোনায় এক গল্পের বিষয় হয়ে উঠেছিল। সেই খ্যাতির খাতিরে তিনি ফরাসি রাজ দরবারে একটা চাকরিও পেয়ে গেলেন। তিন বছর সেই পদে কাটিয়ে ১৫৮৩ সালে তিনি গেলেন রাজার প্রতিনিধি হয়ে ইংল্যান্ডে। দু বছর ধরে সেখানে বসবাস করা কালীন তিনি বিভিন্ন কলেজে দর্শন ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর ভাষণ দেন। এই ইংল্যান্ডেই তিনি তাঁর ঝঞ্ঝাসঙ্কুল জীবনের মাঝে দুই বছরের জন্য খানিকটা স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করতে পেরেছিলেন।

    এই সময় তিনি ওখানে বসে ইতালী ভাষায় সংলাপের ঢঙ-এ অনেকগুলো পুস্তিকা রচনা করলেন: (১) Cena de la Ceneri; (২) De la Causa, principio e Uno; (৩) Del infinito Universo e Mondi; (৪) Spaccio de la bestia trionfante; ইত্যাদি। এই সমস্ত বইতে তিনি শুধু যে কোপারনিকাসের তত্ত্বকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করলেন তাই নয়, এমন বেশ কিছু নতুন কথা বললেন, যেগুলো পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের দরবারে সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

    যেমন, তিনি ‘অসীম বিশ্ব’ পুস্তিকায় বললেন, “আমার মনে হয়েছে, ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারীর পক্ষে যখন একটা কেন, আরও একটা বা আরও অসংখ্য বিশ্ব সৃষ্টি করা সম্ভব, তখন মাত্র একখানা সীমিত বিশ্ব তৈরি করাটা নিতান্তই বেমানান; তাই আমি বলতে চাই, আমাদের পৃথিবীর মতো আরও অনেক বিশ্ব আছে। . . .” [উদ্ধৃত, Jeans 1947, 139] এর ভিত্তিতে তিনি ঘোষণা করলেন গাণিতিক জ্ঞান-সংপৃক্ত এক অসাধারণ যুগান্তকারী দার্শনিক উপলব্ধি: “বিশ্বজগত যখন অসীম, এর উপরে কোনো বস্তুকেই প্রকৃতপক্ষে এর কেন্দ্র বা সীমানা বলে নির্দিষ্ট করা যায় না।” [উদ্ধৃত, ঐ, ঐ] গ্রিক দার্শনিক দেমোক্রিতাস ও এপিকিউরাস এবং রোমান দার্শনিক লুক্রেতিয়াস প্রমুখর মতবাদ অনুসরণ করে প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তুকে এক আদি একক সচেতন সত্তা থেকে উদ্ভূত বলে তিনি এমন এক ব্যাখ্যা উপস্থিত করলেন যা ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কেও সংশয় জাগিয়ে তোলে: “বস্তুর যে এত রকম অসংখ্য রূপ আমরা দেখতে পাই, এর কোনোটাই বাইরে থেকে বা অন্য কোনো কিছু থেকে আসে না, বস্তু থেকেই বস্তুর জন্ম হয় বিকাশ হয়। . . . ফলে বস্তু আছে মানেই সে নানান রূপে আছে, সব কিছুই তার ভেতরেই লুকানো আছে; এই হচ্ছে সমগ্র প্রকৃতি এবং সমস্ত জীবন্ত বস্তুর জন্মধাত্রীস্বরূপ।” [উদ্ধৃত, Roy 1943, 62-63]

    আবার সমস্ত গ্রহ নক্ষত্রই যেহেতু একই রকম মোনাড দিয়ে তৈরি, তাই পৃথিবীর বস্তুগুলি পার্থিব (terrestrial) আর আকাশের বস্তুগুলি স্বর্গীয় (celestial) -- এরকম ভাগাভাগি করে রাখাও যুক্তিহীন। [উদ্ধৃত, Jeans 1947, 140]

    তাঁর আর একটি পুস্তিকা, De la Causa, principio et uno-তে তিনি যা বললেন তার মধ্যে বিস্ময়করভাবে আধুনিক বিজ্ঞানের স্বরধ্বনি শোনা যায়: “This entire globe, this star, not being subject to death, and dissolution and annihilation being impossible anywhere in Nature, from time to time renews itself by changing and altering all its parts. There is no absolute up or down, as Aristotle taught; no absolute position in space; but the position of a body is relative to that of other bodies. Everywhere there is incessant relative change in position throughout the universe, and the observer is always at the center of things.” [উদ্ধৃত, Kessler, on-line]

    সংক্ষেপে তাঁর বিশ্বতত্ত্ব সংক্রান্ত বক্তব্যগুলি এইরকম: (ক) বিশ্বজগত অসীম ও অনন্ত, তাই কে তার কেন্দ্র, কোথায় তার প্রান্ত -- এসব বলার কোনো মানে নেই; (খ) সূর্য একটি নক্ষত্র, এর চতুর্দিকে আবর্তনরত গ্রহমণ্ডলিকে নিয়ে গড়ে উঠেছে সৌরজগত; (গ) অন্যান্য নক্ষত্রগুলিরও সূর্যের মতো গ্রহ-পরিবার থাকার সম্ভাবনা আছে; (ঘ) গ্রহ এবং নক্ষত্র -- সকলেরই দু রকমের গতি রয়েছে: নিজের অক্ষের চারদিকে ঘূর্ণন এবং কক্ষ পথে আবর্তন; (ঙ) গ্রহ নক্ষত্র উপগ্রহগুলি নিয়ত পরিবর্তনশীল; (ছ) মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর অবস্থান আপেক্ষিক ও অন্য বস্তু সাপেক্ষে নির্ধারিত; (ছ) এই বিশ্বের উপর-নিচ, ডান দিক-বাঁদিক, সম্মুখ-পশ্চাৎ, ইত্যাদিও নির্বিশেষভাবে নির্ধারিত নয়, বিভিন্ন বস্তুসাপেক্ষে আলাদা আলাদাভাবে বুঝতে হবে; ইত্যাদি।

    এ তো গেল, ঈশ্বর কী কী করতে পারেন, তার কথা। ব্রুনো এখানেই থামলেন না। ঈশ্বরের পক্ষে কী কী করা সম্ভব নয় তাও তিনি এর পর বলে দিতে চাইলেন! অর্থাৎ, খ্রিস্টধর্মের অনেকগুলি মৌল অলৌকিক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কামান দাগলেন। তাঁর মতে -- কুমারী অবস্থায় তথাকথিত ‘পবিত্র আত্মা’র প্রভাবে মাতা মেরির গর্ভে যিশুর ভ্রূণ-সঞ্চার সম্ভব নয়। প্রাচীন কালে মানব সন্তান যিশুর উপর দৈবী মাহাত্ম্য চাপাতে গিয়ে সেকালের মানুষ এই সব অলৌকিক কাহিনির জন্ম দিয়েছিল। এখন আমাদের বুঝতে হবে, অন্য সব মানব শিশুর জন্ম যেভাবে হয়ে থাকে, যিশুর জন্ম তার থেকে আলাদা কোনো রাস্তায় হয়নি। যিশুর মহত্ত্ব জন্মের অলৌকিকতায় নয়, তাঁর লৌকিক মহান কর্মে। আবার ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর অবিশ্বাসীদের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করার অভিপ্রায়ে কবরের উপরে যিশুর পবিত্র আত্মার পুনরুত্থান (resurrection)–এর পল্লবিত কাহিনিও সত্য হতে পারে না বলে তিনি প্রচার করে গেলেন।

    তাঁর De triplici minimo et mensura প্রবন্ধে তিনি ঘোষণা করলেন বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের মূল মর্মবাণী: “যিনি জ্ঞানচর্চা করতে চান তাঁকে প্রথমে সব কিছুতে সংশয় প্রকাশ করতে হবে। কোনো বিষয়ে বিভিন্ন মতামত শোনার আগে এবং পক্ষে ও বিপক্ষে উত্থাপিত যুক্তিগুলি দেখে শুনে বিবেচনা করার আগে তিনি ঐ বিতর্কে কোনো মত দেবেন না। কানাঘুসোয় কী শোনা গেছে, অধিকাংশ লোক কী বলছে, বা যে বলছে তার বয়স বিদ্যা বা সামাজিক প্রতিপত্তি কেমন, তার ভিত্তিতে কোনো মতামত বিচার বা গ্রহণ করবেন না। যুক্তি দিয়ে যে সত্য যাচাই করা যায়, বাস্তব জগতের সঙ্গে যে চিন্তাধারা মেলে, তিনি তার ভিত্তিতে অগ্রসর হবেন।” [উদ্ধৃত, Gaglioti 2000, on-line]

    সেই কারণেই তাঁর তিক্ত মন্তব্য: “The fools of the world have been those who have established religions, ceremonies, laws, faith, rule of life. The greatest asses of the world are those who, lacking all understanding and instruction, and void of all civil life and custom, rot in perpetual pedantry; . . .” [Cabal of the Cheval Pegasus (1585)] এই কথা আমরা আবার শুনতে পাব তিনশ বছর বাদে— আমেরিকার একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক মার্ক টোয়েনের কণ্ঠে।

    আজ থেকে চারশ বছরেরও আগে একজন দেশ-দেশান্তরে বিতাড়িত চিন্তানায়কের কণ্ঠে উচ্চারিত ও কলমে লিপিবদ্ধ এই সব কথা শুনলে আজও আমরা বিস্ময়ে শ্রদ্ধায় চমকে উঠি।

    চমকে উঠেছিল খ্রিস্টীয় ধর্মতন্ত্রও। ঐশ্বরিক ক্ষমতায় সন্দেহ প্রকাশ করলে যেমন তারা অসন্তুষ্ট হত, ঈশ্বরের চার্চ-প্রদত্ত ক্ষমতা কেউ বাড়িয়ে দিলেও তাদের রাগ হয়ে যেত। তার উপর লোকটা বলে কী? স্বর্গ মর্ত্য পাতাল বলে যদি আলাদা করে কিছুই না থাকে, তাহলে ভগবানকে কোথায় বসানো হবে? নরকের অধিষ্ঠানই বা কোথায় হবে? আর, নরকে জ্বলে পুড়ে মরার ভয় না থাকলে আম জনতা পাদ্রিদের দাপট মানবে কেন? এত সাহস ওর যে খালি বলছে, কারোর কথা যাচাই না করে মানবে নাসে আরিস্ততল তলেমি অ্যাকুইনাস বা অন্য যেই হোন না কেন। এই ধর্মদ্বেষীর বিরুদ্ধে এক্ষুনি কিছু ব্যবস্থা না নিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। এবার ওর ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত ফয়সালা কিছু করা দরকার।

    এবং তাঁকে ইতালিতে ফিরিয়ে আনার জন্য যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল তা বোধ হয় একমাত্র ধর্মীয় নৈতিকতাতেই সম্ভব!!

    [৫] ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ

    ইংল্যান্ডের আবহাওয়াও তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইংরেজ জনসাধারণের তখন প্রচণ্ড বিক্ষোভ। তারা একদিন ফ্রান্সের দূতাবাস আক্রমণ করেই বসল। ফলে বাধ্য হয়ে ব্রুনো অন্যান্যদের সঙ্গে ১৫৮৫ সালে ফিরে গেলেন পারিতে। সেখানে কিছু দিন থাকার পর পরের বছর চলে গেলেন জার্মানির ভিটেনবার্গে। তারপর প্রাগ (১৫৮৮), হেল্মস্টাট (১৫৯০) হয়ে আবার জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে (১৫৯১)। কিন্তু কোথাও তিনি কাজ পান না, পেলেও বেশি দিন থাকে না। কোথাও তিনি শান্তিতে থিতু হয়ে থাকতে পারছেন না। পারতেন যদি মুখ বন্ধ করে চলতেন। কিন্তু যিনি বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রচার করবার জন্য সারা পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে এত ছোটাছুটি করছেন, তিনি চুপ করে থাকেন কী করে? পারিতে এসে ১৫৮৫ সালে লিখলেন De gli eroici furori । ১৫৮৬ সালে ভিটেনবার্গে বসে লাতিনে লিখলেন আরিস্ততলের মতবাদের বিরুদ্ধে ১২০টি প্রস্তাব বিশিষ্ট এক বড় প্রবন্ধ: “Centum et viginti articuli de natura et mundo adversus Peripateticos”।[7] ফ্রাঙ্কফুর্টে বসে কবিতার ছন্দে লাতিন ভাষায় লিখে ফেললেন বিশ্বতত্ত্বের উপর আরও তিনখানা বই। আর যাই তিনি লেখেন, সবই যেহেতু শেষ অবধি প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস অনুমোদিত ধ্যান ধারণার বিরোধী হয়ে যায়, প্রত্যেক জায়গা থেকেই তাড়া খেয়ে তাঁকে বেরিয়ে পড়তে হয়। নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে। কিন্তু কে দেবে তাঁকে আশ্রয়? অত বড় ইউরোপ মহাদেশ, ব্রুনোর জন্য ক্রমাগত ছোট হয়ে আসতে থাকে।

    অবশেষে ১৫৯১ সালের গোড়ায় ফ্রাঙ্কফুর্টের এক পুস্তক প্রদর্শনীতে সাক্ষাতকালে ভেনিসের একজন পুস্তক বিক্রেতা, জিওভান্নি বাতিস্তা সিওত্তো, তাঁকে প্রস্তাব দেন ইতালিতেই ফিরে আসতে। সেখানে একজন সম্ভ্রান্ত অভিজাত পরিবারের শিক্ষানুরাগী যুবক, জুয়ান মোসেনিগো, তাঁর কাছে পড়াশুনা করতে ইচ্ছুক। [Garvin 2012, on-line] ব্রুনো চাইলে হয়ত কোথাও একটা স্থায়ী চাকরিও তাঁকে যোগাড় করে দিতে পারবে সে। আর তার কাছে থাকলে গির্জার লোকেরাও তাঁকে বিরক্ত করতে সাহস পাবে না। চোদ্দ বছর ধরে দেশ ছাড়া ব্রুনো তখন পলাতক জীবনে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছেন। প্রিয় স্বদেশের মাটিতে পা রাখার জন্য মনে মনে তিনি অস্থির, ব্যাকুল। আর তাতেই তিনি ফাঁদে পড়ে গেলেন। লুকিয়ে লুকিয়ে চলে এলেন প্রথমে পাদুয়ায়, সেখানে গণিতের একটা অধ্যাপক পদ ফাঁকা ছিল। আবেদনও করলেন, কিন্তু পেলেন না। হতাশ হয়ে তখন গেলেন ভেনিসে। সেখানে মোসেনিগোর অট্টালিকায় আশ্রয় নিয়ে তাকে নতুন বিশ্বতত্ত্ব পড়াতে শুরু করলেন। তারপর, খবর পেয়ে, যথাসাব্যস্ত ওরা এল। যাজক বাহিনী এবং রাজার কোতোয়ালরা। ধর্মীয় বিচারসভা (Inquisition)-এর নামে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ধরে নিয়ে গেল। প্রথমে ভেনিসে, পরে রোমে পোপের প্রশাসনের কাছে।

    শুরু হল বিচারের নাটক।

    ব্রুনোর বিরুদ্ধে পোপতন্ত্রের অভিযোগ অনেক। একশ তিরিশটি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সবচাইতে গুরুতর অভিযোগ হল ইতালী ভাষায় লেখা তাঁর “বিজয়ী পশুদের বিতাড়ন” (Spaccio de la bestia trionfante) শীর্ষক পুস্তিকার বিষয়বস্তু। সেখানে নাম ভূমিকায় আছেন মহামান্য পোপ স্বয়ং, আর লেখক দেখিয়েছেনচার্চের মতান্ধ লোকদের না আছে ধর্মবিশ্বাস না আছে নৈতিক চরিত্র! এরকম যাঁর কাণ্ডকারখানা তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিচারের ফল কী হতে পারে সহজেই অনুমেয়। অপরাধীই তো এখানে বিচারকের আসন দখল করে নিয়েছে। সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত জেল হয়ে গেল তাঁর। রোমের ভ্যাটিকান প্রাসাদ সংলগ্ন ‘পবিত্র দপ্তর’–এর কারাগারে। তাঁর জন্য বরাদ্দ কামরাটিও সুন্দরভাবে তৈরি করে রাখা হল। আলোবাতাসহীন বদ্ধ প্রকোষ্ঠের মাথায় সীসার ছাদ। গ্রীষ্মে ঘরটা হয়ে উঠত একটা গরম চুল্লি। আর শীতকালে সাইবেরিয়ার কাঠের ঝুপড়ির মতো। সঙ্গে প্রতিদিন সামান্য খাদ্য ও জল এবং প্রচুর পরিমাণে দৈহিক নির্যাতন।

    যিনি সারা বিশ্বের মানুষদের কাছে এত দিন মহাবিশ্বের অসীমতার কথা প্রচার করে গেলেন, আজ তাঁর বিশ্ব চার হাত বাই ছ হাতে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল।

    মাঝে মাঝে বিচারকদের তরফ থেকে বার্তা আসত -- “ভুল স্বীকার কর, ক্ষমা প্রার্থনা কর। জীবন ফিরে পাবে। ঈশ্বর করুণাময়।” ব্রুনো নির্বিকার থাকেন। সত্যের উপলব্ধি, যুক্তির শক্তি তাঁকে দিয়েছে সমস্ত অত্যাচার সহ্য করবার মতো এক অপরিসীম মানসিক বল।

    ১৫৯৩ সাল থেকে এক টানা সাত বছর ধরে অত্যাচার চালিয়েও ব্রুনোর দৃঢ়তাকে টলানো গেল না। কোনো ভাবেই তিনি মাথা নত করতে সম্মত হলেন না। অবশেষে ১৬০০ সালের ২০ জানুয়ারি প্যাপাল ধর্মীয় বিচারসভা আবার মিলিত হল। এবার বসে পোপের অনুমতিক্রমে তারা সিদ্ধান্ত নিল -- এই দুর্বিনীত অবিশ্বাসীকে চরম শাস্তি দিতে হবে। একে আর বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। এর জন্য বরাদ্দ হল, বাইবেলের নির্দেশ অনুযায়ী, “যতদূর সম্ভব আরামদায়কভাবে এবং বিনা রক্তপাতে” (with possible clemency and without shedding blood) মৃত্যুদণ্ড। অর্থাৎ, জীবন্ত অবস্থায় বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারো। সেই বাইবেল, যাকে বাংলা অনুবাদে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে “প্রেমের বাণী”। ইংরেজিতে ওনারা স্নেহভরে বলেন The Gospel of Love!! যার প্রধান শিক্ষাই হল নাকি “প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে হবে”। Love thy neighbour!!! ভালোবাসাই বটে। জেনেভায় সার্ভেতো প্রায় চল্লিশ বছর আগে তা টের পেয়েছিলেন। এবার এও তার স্বাদ পাবে।

    ৮ ফেব্রুয়ারি জীর্ণ শীর্ণ কঙ্কালসার-দেহ ব্রুনোকে যখন কারাগার থেকে বের করে আনা হল এবং বিচারকের রায় পাঠ করে শোনানো হল, তিনি অতি কষ্টে খ্রিস্টীয় বিচারকদের দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসলেন, বললেন: “Maiori forsan cum timore sententiam in me fertis quam ego accipiam” (আমি তোমাদের রায় শুনে যতটা না ভয় পাচ্ছি, তোমরা দেখছি রায় দিতে গিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় পাচ্ছ)।

    বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই বাক্যটি চার শতক পার করেও এক অমর সংলাপ রূপে বিরাজমান!

    সংযোজনী

    [6] পাঠকদের সুবিধার জন্য বাইবেল থেকে সংশ্লিষ্ট অংশটুকু তুলে দেওয়া হল:

    12. Then spake Joshua to the LORD in the day when the LORD delivered up the Amorites before the children of Israel, and he said in the sight of Israel, Sun, stand thou still upon Gibeon; and thou, Moon, in the valley of Ajalon.

    13. And the sun stood still, and the moon stayed, until the people had avenged themselves upon their enemies. Is not this written in the book of Jasher? So the sun stood still in the midst of heaven, and hasted not to go down about a whole day. [Joshua 10:12-13]

    [7] Peripateticos: এই শব্দটি আরিস্ততল ও তাঁর শিষ্যদের সম্পর্কে প্রদত্ত একটি সাধারণ নাম। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল ভ্রাম্যমান গোষ্ঠী। শোনা যায়, আরিস্ততল শিক্ষাদানের সময় পায়চারি করে বক্তৃতা দিতেন। তার থেকে এই শব্দবন্ধের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। আবার, আরিস্ততলের এথেন্সে নিজস্ব জমি না থাকায় সেখানে তিনি কোনো অ্যাকাদেমি খুলতে পারেননি, প্লাতোর প্রতিষ্ঠিত অ্যাকাদেমিতেই তিনি এসে ঘুরে ঘুরে পড়াতেন, তার থেকেও এই নামটির জন্ম হয়েছিল বলে ভাবা যেতে পারে। গ্রিক থেকে রোমান সাহিত্যেও শব্দটি থেকে যাওয়ায় ইউরোপে দীর্ঘদিনই আরিস্ততলীয় চিন্তাধারার পরিচয়ের জন্য এই নামটা চালু ছিল। ব্রুনো সেই ঐতিহ্যই এখানে অনুসরণ করেছিলেন বলে আমাদের অনুমান।
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ | ৯১ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত