• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • জিওরদানো ব্রুনো—সত্যনিষ্ঠার এক অনির্বাণ জাগপ্রদীপ # পাঁচ

    Ashoke Mukhopadhyay
    বিভাগ : ব্লগ | ২৯ জানুয়ারি ২০১৭ | ৩৭ বার পঠিত
  • [আগামি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বিজ্ঞান শহিদ জিওরদনো ব্রুনোর ৪১৭-তম মৃত্যু বার্ষিকী। এই উপলক্ষে আমি ব্রুনো সম্পর্কে আমার একটি লেখা এখানে সকলের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। যাঁরা ওই দিন বা ওই সময়ে ব্রুনো চর্চা করবেন, তাঁদের কাছে আনুষঙ্গিক এই সব তথ্য থাকা দরকার। যাঁরা এগুলো ইতিমধ্যেই জানেন, তাঁরা এটাকে স্বচ্ছন্দে অগ্রাহ্য করতে পারেন। আজ পঞ্চম এবং শেষ কিস্তি]

    [৭] শেষ কথা
    ব্রুনোর শহিদত্ব বরণের পর চারশ বছর কেটে গেছে। বিজ্ঞান তারপর অনেক দূর এগিয়ে গেছে এবং বিকশিত হয়েছে। বৈজ্ঞানিক মতবাদ হিসাবে ব্রুনোর কথাগুলির ঐতিহাসিক মূল্য যা-ই হোক না কেন, প্রামাণ্য জ্ঞান হিসাবে আজ আর তার কোনো মূল্য বা গুরুত্ব নেই। অন্যদিকে বিজ্ঞানের বিকাশে বাধা দেবার মতো শাসকীয় ক্ষমতাও প্রতিটি ধর্ম অনেক দিন আগেই হারিয়ে ফেলেছে। বিজ্ঞান যুক্তিবাদ বিজ্ঞানমনস্কতা আজ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। অতএব প্রশ্ন উঠতেই পারে, এতদিন পরে ব্রুনোকে স্মরণ করার, চর্চা করার, বিশদভাবে আলোচনা করার সত্যি আর কোনো দরকার আছে কিনা। অন্য ভাষায় বলতে গেলে, আমাদের কালেও ব্রুনো চর্চা কতটা প্রাসঙ্গিক।

    আমার মনে হয়, এই প্রয়োজন অবশ্যই আছে।

    আমাদের দেশের প্রসঙ্গে তো আরও বেশি করেই আছে।

    প্রথমে আমাদের দেশের প্রসঙ্গই আলোচনা করি। এটা বোঝার জন্য আমাদের প্রথমেই মহান বিজ্ঞানী আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪-১৯৭৪)-র গ্যালিলেও সম্বন্ধে লেখা একটা ছোট অথচ মূল্যবান প্রবন্ধের মধ্যেকার কয়েকটা বাক্য স্মরণ করতে হবে: “সনাতনী ধার্মিকেরা বিজ্ঞানের শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন যথারীতি। ফলে ইতালী দেশই পেছিয়ে পড়ল। ফ্রান্স, ইংলন্ড ও অন্যান্য দেশে গালিলিওর আজন্ম সাধনা সুফল প্রসব করল।” [বসু ১৯৯২, ১৭৫]

    কথাটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, ইতালিতেই প্রথম ইউরোপীয় নবজাগরণের সুগম সঙ্গীত বেজে উঠেছিল। মাত্র দুশ বছরের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলেন সাহিত্যে শিল্পে বিজ্ঞানে পেত্রার্ক, বোক্কাচিও, রাফায়েল, মিকেলেঞ্জেলো, লিওনার্দ দ্য ভিঞ্চি, ব্রুনো, গ্যালিলেও, তরিসেলি, প্রমুখ অসংখ্য শিখর স্পর্শী প্রতিভা। একের পর এক। কখনও এক সঙ্গে। অথচ খ্রিস্টীয় ধর্মতন্ত্রের অশিক্ষা প্রসূত দাপটে বিজ্ঞানের সত্যকে অস্বীকার করে করে, সত্যের পূজারীদের মুখ বন্ধ করার চক্রান্ত করতে করতে সেই দেশ জ্ঞানে বিজ্ঞানে অর্থনীতিতে শিল্প বিকাশে ইংল্যান্ড ফ্রান্স হল্যান্ড বেলজিয়াম জার্মানির থেকে ধীরে ধীরে অনেক পেছনে পড়ে গেল। রেনেশাঁসের সোনার ফসল পরবর্তী অন্তত দুশ বছরের জন্য ইতালির হাতছাড়া হয়ে গেল।
    ইতিহাসের এই শিক্ষাটা বোধ হয় ভারতবর্ষে খুব কম লোকই বুঝতে পেরেছেন। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে এবং বিজ্ঞানচর্চায় ধর্মকে সজ্ঞানে বাদ দিয়ে চলার মতো ধর্মনিস্পৃহ নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি এদেশে গৃহীতই হয়নি।

    আর ইদানিংকালে তো সরস্বতী বন্দনা, দেশমাতৃকা পূজা, বৈদিক গণিত -- নানা নামে বেনামে ধর্মীয় সনাতন অন্ধবিশ্বাসগুলিকে জবরদস্তি শিক্ষার আঙ্গিনায় গুজে দেবার চেষ্টা চলছে। যে সব দেশ কোনো দিন সরস্বতী পুজো করেনি তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানে মৌলিক আবিষ্কারের পরিমাণগত তুলনা করলে বরং এক দুঃখজনক ছবিই ফুটে উঠবে। সরস্বতী বন্দনার সাথে সারস্বত কৃতিত্বের যেন এক অতিস্পষ্ট বিপ্রতীপ ও ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। অথচ মানুষের সরল বিশ্বাস ও ধর্মীয় আবেগে স্রেফ সুড়সুড়ি দিয়ে এই জলজ্যান্ত তথ্যগুলিকে তাদের দৃষ্টিপথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা জ্ঞান ও যুক্তির শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সামনের দিকে পা ফেলতে না পারে। আমরাও সময় থাকতে থাকতে সাবধান হতে পারিনি বলে জ্ঞানে বিজ্ঞানে সাহিত্যে শিল্পে খালি পিছিয়েই যাচ্ছি। নকলনবিশিতে হয়ত দু-চার পা এগিয়ে যেতে পেরেছি, কিন্তু সৃজনশীলতায় চলছে গ্যালিলেও-উত্তর ইতালির মতোই ধ্রুব অধোগমন। ব্রুনো চর্চা এই জন্যই আমাদের প্রয়োজন। সতর্ক বার্তা হিসাবে। ইতিহাসের শিক্ষা হিসাবে।

    এখানে আর একটা স্বল্পজ্ঞাত তথ্যও সকলের গোচরে আনতে চাই।

    সার্ভেতো ব্রুনো প্রমুখকে পুড়িয়ে মারা, গ্যালিলেওকে নির্যাতন ও হেনস্থা করার ফলে খ্রিস্টীয় গির্জার দুই তরফেরই মর্যাদা বিশ্বের দরবারে অনেকখানি তলায় চলে যায়। বিশেষ করে ক্যাথলিক চার্চের প্রতি শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মাত্রই বিরূপ হয়ে ওঠেন। বিশ শতকে এসে তাদের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রাণ কিছু খ্রিস্টান লেখক এক নতুন গবেষনা শুরু করেছেন। তাঁরা ব্রুনোর চরিত্র ও বুদ্ধিতে কিছুটা কালির দাগ ছিটিয়ে তাদের পূর্বসূরিদের অপরাধের বোঝা কমাতে চাইছেন। তাঁদের বক্তব্য হল, ব্রুনো আসলে কোপারনিকাসের মতবাদ প্রচারের জন্য চার্চের কোপে পড়েননি। তিনি নাকি মিশরীয় প্রাচীন গুপ্তবিদ্যা শিখে মানুষকে কালা যাদু দেখিয়ে মোহগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত করতেন, তিনি চার্চ, খ্রিস্টীয় নানাবিধ মৌল-ধারণা এবং মহামান্য পোপ সম্বন্ধে প্রচুর গালাগাল করতেন, ইত্যাদি।

    যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে এই অভিযোগগুলি সত্য, তার জন্য তাঁকে আট বছর ধরে জেলে পুরে নির্যাতন করা এবং অবশেষে প্রকাশ্যে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করাটা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় নাকি? বরং এটাও মনে রাখতে হবে, গ্যালিলেওর ব্যাপারে অনেক দিন ধরে ধীরে ধীরে পিছু হঠলেও ২০০০ সালের আগে অবধি ক্যাথলিক চার্চ ব্রুনো-হত্যার জন্য ন্যূনতম ভুল স্বীকার বা দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেনি। ব্রুনোর মৃত্যুর চতুর্শতবার্ষিকীতে এসে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাকে অনভিপ্রেত বললেও একই বিবৃতিতে তারা ব্রুনোর বিচারকদের পক্ষেও সাফাই গেয়ে রাখে। [Seife 2000] এর অর্থ হল, মুখ ফুটে না বললেও তারা এখনও সেই হত্যাকাণ্ডকে মনে মনে সমর্থনই করে। দ্বিতীয়ত, কথাগুলি যে সত্য নয়, তা বোঝা যাবে তাদের আসল -- এবং আজ অবধি জীবন্ত -- ক্ষোভের কারণটি থেকে, যা কিছুদিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনায় তারা মুখ ফস্কে বলেই ফেলেছে: “. . . his system of thought is an incoherent materialistic pantheism. . . . His attitude towards religious truth was that of a rationalist. Personally, he failed to feel any of the vital significance of Christianity as a religious system.” [Catholic Encyclopaedia 1999, III] ব্রুনোর চিন্তাধারার সাথে সনাতন ধর্মবিশ্বাসের পার্থক্য এবং আধুনিক যুক্তিবাদী মননের নৈকট্যই তাদের এই অকপট উষ্মার কারণ।

    এটা সবচেয়ে ভালো বোঝা যাবে জর্জ হ্বিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল (১৭৭০-১৮৩১)-এর লেখা থেকে। হেগেল ছিলেন দর্শনে ভাববাদী এবং মানসিকতায় প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান, যিনি ক্রিশ্চিয়ানিটিকেই মনে করতেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সেই হেগেল কিন্তু ব্রুনোর মধ্যে এক সদা চঞ্চল ও অস্থির সৃজনশীল চিন্তাবিদকে দেখেছিলেন: “Giordano Bruno was of an equally restless and effervescent temperament, and we see in him a bold rejection of all Catholic beliefs resting on mere authority. . . . Eye-witnesses . . . recount that he met death with the most unflinching courage. . . . His philosophic thoughts, to express which he sometimes made use of Aristotle’s concepts, give evidence of a peculiar, highly strung and very original mind. The substance of his general reflections is found in the greatest enthusiasm for the above-mentioned vitality of Nature, divinity, the presence of reason in Nature. His philosophy is thus on the whole certainly Spinozism, Pantheism. The separation of man from God or the world, all such relations of externality, have been superadded to his living idea of the absolute, universal unity of all things, for the expression of which idea Bruno has been so greatly admired. In his conception of things the main points are that, on the one hand, he gives the universal determination of matter, and, on the other hand, that of form.” [Hegel 1974, III, 119] তিনি ব্রুনোর মধ্যে দ্বান্দ্বিক চিন্তাপদ্ধতির প্রয়োগ ও বিকাশ দেখেছেন বলেই তাঁর দর্শনের ইতিহাস সংক্রান্ত আলোচনায় (১৮০৫-০৬) ব্রুনোর জন্য একটা বেশ বড় অধ্যায় বরাদ্দ করেছেন। [Hegel 1974, III; প্রবন্ধটি অন-লাইন পাওয়া যায়]

    ব্রুনো সম্পর্কে হেগেলের আলোচনা (১৮০৬) শুনেছেন কিনা জানা না গেলেও তাঁর দর্শন ব্যাখ্যায় কবি কোলরিজের ১৮১৮ সালে প্রদত্ত মতামত খুব বিস্ময়কর: “As far as human practice can realise, the sharp limits and exclusive proprieties of science, law and religion should be kept distinct. There is in strictness no proper opposition but between the two polar forces of one and the same power. Every power in nature and in spirit must evolve an opposite, as the sole means and condition of its manifestation: and all opposition is a tendency to re-union. This is the universal law of polarity or essential dualism, first promulgated by Heraclitus, two thousand years afterwards republished and made the foundation both of Logic, of Physics, and of Metaphysics by Giordano Bruno. The principle may be thus expressed. The identity of thesis and antithesis is the substance of all being; their opposition the condition of all existence, or being manifested; and everything or phaenomenon is the exponent of a synthesis as long as the opposite energies are retained in that synthesis.” [উদ্ধৃত, Singer 1950, Chapter eight]

    এই ধারাতেই চিন্তা করেছেন আরও অনেকে। যেমন ডরোথি সিঙ্গার [ইনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানের ইতিহাস লেখক চার্ল্‌স সিঙ্গারের স্ত্রী এবং নিজেও রেনেশাঁস-কালীন বিজ্ঞানের ইতিহাস গবেষক] বলেছেন, “ব্রুনোর অবস্থান কাল কোপারনিকাস আর গ্যালিলেওর মাঝখানে ঠিকই, তিনি কোপারনিকাসের বই থেকে অনেক উদ্ধৃতি দেন এবং গ্যালিলেও তাঁর মতামতের উপর গুরুত্ব দেন—তাও সত্যি; তথাপি এটা ভাবলে ভুল হবে যে তিনি কোপারনিকাসের চিন্তাধারা থেকে বিকশিত হয়ে গ্যালিলেওর দিকে এগিয়ে গেছেন। না। বরং দেখা যায়, তাঁর চিন্তাধারা পঞ্চম শতকের ছদ্ম-দিওনিসিয়াস থেকে শুরু করে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ পর্যন্ত দর্শনের যে বিকাশ-পথ, তারই মাঝখানে বিরাজ করছে।” [Singer 1950, Preface]

    প্যাটারসনও হেগেলের কথার সূত্র ধরেই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন, “[ব্রুনো] কোনো রহস্যবাদী চিন্তার রাস্তায় তাঁর সিদ্ধান্তে পৌঁছননি। . . . তিনি নিজেই এক আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিকাশের পথে পা বাড়িয়েছিলেন, তা নিয়েই তিনি লেখালেখি করেছেন।” “তিনি এমন এক আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের জন্ম দেন যেখানে দুনিয়ার সমস্ত প্রাকৃতিক পরিঘটনাকে মানুষ বুঝতে চাইবে তার মনের দ্বান্দ্বিক অবকাঠামোকে ব্যবহার করে।” [Paterson 1970, 16, 61]

    এই কথাটাই আরও নানা দিক থেকে যাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ব্রুনো চর্চা করে চলেছেন, তাঁরা তুলে ধরতে চাইছেন। ব্রুনো বিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়ে কী বলেছিলেন, সেটা বড় কথা নয়, তিনি যে স্বাধীনভাবে ভাবতে এবং ভাবাতে চেয়েছিলেন, সেটাই ছিল ইতিহাসের পটভূমিতে অনেক বড় কথা। মার্ক্সীয় পদ্ধতিতে বিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতা জন ডেসমন্ড বার্নাল এই জন্যই বলেছেন: “ব্রুনো মানুষকে কোপারনিকাসের তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে ও তর্ক করতে বাধ্য করেন।” “ব্রুনো এই শহিদত্ব বরণ করেছিলেন চিন্তার স্বাধীনতার সপক্ষে, বিজ্ঞানের সপক্ষে নয়। তিনি কোনো পরীক্ষা করেননি, কোনো পর্যবেক্ষণ করেননি, কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিজ্ঞানের তথ্যাবলি থেকে আপন পছন্দমতো সিদ্ধান্ত বেছে নেবার অধিকারের কথা ঘোষণা করে গেছেন।” [লাহিড়ী (অনুঃ) ২০০৫, ২৫৫] আপ্তবিদ্যার জগতে দু একটা ঠিক ধারণা এলেও সত্য জানার কোনো সঠিক উপায় জানা ছিল না। ফলে বারবার ভুল হত, ভুলের উপর ভুল জমে যেত, কিন্তু সেই ভুলগুলিকে আর মেরামত করা যেত না। কেন না ভুলগুলো দাঁড়িয়ে থাকত প্রাচীন কালের বড় বড় ঋষি জ্ঞানী আর সন্তদের বচনের ঘাড়ে। যেখানে হাত ওঠাতে গেলেই তা কেটে ফেলার জন্য ধর্মের খাঁড়া নিয়ে জহ্লাদেরা তৈরি ছিল। আর ব্রুনো যে পথের সন্ধান দিতে চেয়েছিলেন, তাতে ভুল হলেও ভুল শোধরাবার সুযোগ আছে। সত্য উদ্ধারের রাস্তা সর্বদাই খোলা থাকছে। সেখানে কে বলেছেন সেটা কোনো বড় ব্যাপার নয়, কী বলেছেন সেটাই আসল বিচার্য। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সড়ক নির্মাণের জন্য এই উপলব্ধিগুলিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন ছিল। ব্রুনো ঠিক সেই সংগ্রামটাই করে গেছেন। কঠিন মূল্য দিয়ে।

    ইতালির একজন সাম্প্রতিক রেনেশাঁস-গবেষিকা হিলারি গতি এই বিষয়টিই তুলে ধরতে চেয়েছেন: "For Bruno was claiming for the philosopher a principle of free thought and inquiry which implied an entirely new concept of authority: that of the individual intellect in its serious and continuing pursuit of an autonomous inquiry. . . . It is impossible to understand the issue involved and to evaluate justly the stand made by Bruno with his life without appreciating the question of free thought and liberty of expression. His insistence on placing this issue at the center of both his work and of his defense is why Bruno remains so much a figure of the modern world. If there is, as many have argued, an intrinsic link between science and liberty of inquiry, then Bruno was among those who guaranteed the future of the newly emerging sciences, as well as claiming in wider terms a general principle of free thought and expression." [Gatti 2002, 18–19]

    আজ আবার মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞান-বোধের উপরে আক্রমণ নেমে আসছে। শুধু তো ভারতে নয়, সারা পৃথিবীতেই তার চেষ্টা চলছে ধর্মের নামে -- কোথাও খ্রিস্টধর্ম, কোথাও ইসলাম, কোথাও হিন্দুধর্ম -- যাই হোক না কেন। সর্বত্রই সে ধর্ম, বক্তব্য তার একই: ব্যবহারিক জীবনে যত খুশি বিজ্ঞান নিয়ে চল, মেশিন বানাও এবং চালাও, মারণাস্ত্র তৈরি কর, খনিজ সম্পদ জৈব সম্পদ নিঃশেষ কর, আপত্তি নেই। কিন্তু মস্তিষ্কে চিন্তার প্রক্রিয়ায় যেন বিজ্ঞান যেতে না পারে। সেখানে ঢুকবে এবং বসবাস করবে ঈশ্বর, ব্রহ্ম, আত্মা, পরকাল, স্বর্গ-নরক, নিয়তি, কর্মফল, অলৌকিকতা, বাইবেল-কোরান-গীতা, মাদুলি-আংটি-লাল সুতো, দস্তা-লোহা-তামা, পান্না-নীলা-চুনি, আর টিয়া পাখি। এরাই বলে দেবে -- কী ভাবব, কীভাবে ভাবব। বড় ব্যবসায়ী, একচেটিয়া মালিক, বহুজাতিক সংঘ, ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র -- সকলেই ধর্মকে এখন আর শুধু আফিং-এর মতো ঝিম-ধরানো মাদক হিসাবে নয়, হিংস্র উত্তেজনায় তাতানো মাদক হিসাবে কাজে লাগাতে চায়। এবং এই কাজ শুরু হয়েছে বেশ অনেক কাল আগে থেকেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার পাঠ্য বিষয়ের মধ্য দিয়েও যুক্তি বিরোধী ধ্যান ধারণা ও নানা অসত্য কথা প্রচার করা হচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে নয়, উন্নত দেশগুলিতেও।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমেরিকার বিশিষ্ট প্রগতিশীল ইতিহাসবিদ জেম্‌স রবিনসন (১৮৬৩-১৯৩৬) ইউরোপ আমেরিকার মতো জ্ঞানেবিজ্ঞানে শিল্পে অগ্রসর দেশগুলিতে এই জাতীয় ঘটনা লক্ষ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। [Robinson 1934, Chapter 14] পরবর্তীকালে দেখা গেল, দেশে দেশে সরকারি ক্ষমতায় যারা বসে আছে, সংবাদপত্র, রেডিও, টিভির বিভিন্ন চ্যানেলের মালিক যারা -- সকলেই এই দায়িত্ব কম বা বেশি পালন করে যাচ্ছে। লক্ষ একটাইবর্তমান শোষণমূলক শাসনব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত ও নিরাপদ রাখা।

    বিজ্ঞানীদের অধিকাংশই এই সব ব্যাপারে উদাসীন বা নীরব। কিন্তু যাঁরা সোচ্চার হতে চান তাঁদেরও লিখতে বা বলতে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ধর্মকে সমর্থন করে লিখলে অত্যন্ত নিম্ন মানের লেখাও প্রতিষ্ঠিত পত্র-পত্রিকায় বেরিয়ে যাবে। ধর্মকে বিরোধিতা করে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে আশ্রয় করে কিছু লিখলে তা যত উঁচু মানেরই হোক না কেন, সহজে কোথাও প্রকাশিত হবে না। রেডিও বা দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলের বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষ্ঠানের বক্তা নির্বাচনেও একই রকম বিষম মাপকাঠি। এমনকি লোকপ্রিয় বিজ্ঞানের বইপত্র প্রকাশনার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এই সব পরিকল্পনার সাহায্যে সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে এরকম একটা ধারণা ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা চলছে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীই ধর্মের হয়ে ওকালতি করেন, কেন না তাঁরা বুঝেছেন যে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই। তাদের বেশিরভাগই জানতেই পারছে না যে আর একদল সমকক্ষ বড় মাপের বিজ্ঞানী আবার ধর্মবিশ্বাসকে সম্পূর্ণভাবেই জ্ঞানরহিত যুক্তিবিরোধী ও অনৈতিক বলে মনে করেন। এবং সুযোগ পেলে তা প্রমাণ করে দেখাতে পারেন। অর্থাৎ, আজকের দিনে ব্রুনো গ্যালিলেওদের দৈহিক দিক থেকে আঘাত না করেও গণমাধ্যমের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের আড়ালে তাঁদের মুখ বন্ধ করে দেবার ব্যবস্থা হচ্ছে। এই ঘটনাই ঘটছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ইংল্যান্ড ফ্রান্স জার্মানিতে, জাপানে কিংবা ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কায়।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে এই বিপজ্জনক প্রবনতা লক্ষ করে একজন বিশিষ্ট গ্যালিলেও-গবেষক গভীর উদ্বেগে বলেছিলেন: “Recent events have created a new alarm concerning the unchecked progress of scientific knowledge. This time it is not the church but the state which feels morally obliged to impose external limitations upon the freedm of scientific inquiry and the communication of knowledge and opinion.” [Drake (ed.) 1957, 6] বিগত দশকগুলিতে এই প্রবণতা কমা তো দূরের কথা, ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

    বিজ্ঞানের উপর, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর, যুক্তিবাদের উপর এই যে বিশ্বব্যাপী বহুদৃশ আক্রমণ চলছে, এই পরিস্থিতিতে ব্রুনোর জীবন সংগ্রাম, সেই সময়কার ইতিহাস আজ আবার আমাদের উপযুক্ত গুরুত্ব সহকারে স্মরণ ও চর্চা করা দরকার। তার মধ্য থেকে আমরা হয়ত অনেকটাই প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রেরণা লাভ করতে পারি।

    সহায়ক গ্রন্থসূত্র

    ১। সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৯৯২), “গালিলিও”; সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সঙ্কলন; বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ, কলকাতা।
    ২। সমরেন্দ্র নাথ সেন (১৯৯৪), বিজ্ঞানের ইতিহাস (অখণ্ড); শৈব্যা, কলকাতা।
    ৩। আশীষ লাহিড়ী (২০০৫) অনুবাদ: ইতিহাসে বিজ্ঞান (অখণ্ড); আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা। [মূল গ্রন্থ: ৪। J. D. Bernal (1954), Science in History; Watts and Co., London.]
    ৫। D. Berti (1889), Vita di Giordano Bruno, Turin.
    ৬। The Holy Bible, King James Version.
    ৭। Catholic Encyclopaedia (1999), Vol. III, “Bruno, Giordano”; New York.
    ৮। Stillman Drake (ed. 1957), Discoveries and Opinions of Galileo: Anchor Books, Doubleday, New York.
    ৯। Frederick Engels (1975), Socialism: Utopian and Scientific; Foreign Languages Press, Beijing.
    ১০। Frank Gaglioti, “A man of insight and courage: Giordano Bruno, philosopher and scientist”; World Socialist Website: http://www.wsws.org/en/articles/2000/02/brun-f16.html
    ১১। Karen Garvin (2012), “Giordano Bruno: Magic, Theology, and Heresy”; The website Academia.Edu: http://www.academia.edu/4135326/Giordano_Bruno_Magic_Theology_and_Heresy
    ১২। Hilary Gatti (2002), Giordano Bruno and Renaissance Science: Broken Lives and Organizational Power. Ithaca, New York: Cornell University Press.
    ১৩। Hegel (1974), Lectures on the History of Philosophy, translated by E. S. Haldane and F. H. Simson, in three volumes. Vols. I-III, The Humanities Press, New York. ব্রুনোর উপরে বক্তব্যের জন্য দ্রষ্টব্য:
    http://renaissancemagic.blogspot.in/2011/12/hegel-on-giordano-bruno.html
    ১৪। James Jeans (1947), The Growth of Physical Science; Cambridge University Press, Cambridge.
    ১৫। S. C. Joshi (1974), “Nicolaus Copernicus and the 'Commentariolus'”, Indian Journal of History of Science; 9 (1), 14-24
    ১৬। John J. Kessler, “Giordano Bruno: The Forgotten Philosopher”; The Secular Web: http://infidels.org/library/historical/john_kessler/giordano_bruno.html
    ১৭। Antoinette Mann Paterson (1970), The Infinite Worlds of Giordano Bruno; Springfield, Illinois. আরও দেখুন: http://dinnerwithwalt.com/?p=1152
    ১৮। James Harvey Robinson (1934), The Mind in the Making; Watts and Co., London.
    ১৯। M. N. Roy (1943), From Savagery to Civilisation; Renaissance Publishers, Bombay.
    ২০। Charles Seife (March 1, 2000), "Vatican Regrets Burning Cosmologist". Science Now.
    ২১। P. B. Shelley (1910), “Spirit” and “Fairy”; Queen Mab: A philosophical poem; Section VII; Thomas Y. Crowell & Co., New York. [শেলির এই কবিতাগুচ্ছ এবং এই কাব্যগ্রন্থটির সন্ধান দিয়েছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক, জনবিজ্ঞান বিজ্ঞান আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক ও লেখক (এবং আরও অনেক কিছু) ডাঃ শঙ্কর নাথ। পুরনো পরিচিতি ও বন্ধুত্বের সুবাদে এই রচনার স্বার্থে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য আমি তাঁর কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।]
    ২২। Dorothea Waley Singer (1950), Giordano Bruno: His life and thought; Henry Schuman, New York. আরও দ্রষ্টব্য: http://www.positiveatheism.org/hist/bruno00.htm
    ২৩। Max Bernhard Weinstein (1910), Welt- und Lebensanschauungen, Hervorgegangen aus Religion, Philosophie und Naturerkenntnis; Johann Ambrosius Barth, Leipzig.
    ২৪। A. D. White (1960), A History of the Warfare of Science with Theology; Vols. I-II; Dover Publications, New York.
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৯ জানুয়ারি ২০১৭ | ৩৭ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • করোনা ভাইরাস

  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত