• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • শ্রীপঞ্চমী

    ফরিদা লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৩৩০ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • তখন চন্দ্র সূর্য উঠত, দু'শো ছয় সারা কলকাতা ঘুরে করুণাময়ী পৌঁছত। অনেকটা যেন, সারা দিন সারা রাত মিউজিকাল চেয়ার খেলার মতো — কে তোমাকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারে, কে আবার ফেরাবে বিকেলে, যখন রোদ্দুরের তাত কিছুটা উতপ্ত হয় তোমার কপালে হাত রেখে। যে তোমাকে পেত, সেই বাসটি যেন অকারণে — টার্মিনাসের সামান্য বিশ্রামে রাতের আকাশ ব্ল্যাকবোর্ড মনে করে তারা জুড়ে জুড়ে ছবি টবি হিজিবিজি আঁকত, শব্দ জুড়ত মনে মনে। বাস কন্ডাক্টর এগরোল কিনে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতেন সেদিন আর তাসের আড্ডায় না গিয়ে। ড্রাইভারটি নিতেন পাড়ার কুকুরদের জন্য আস্ত দু-দু’'টো মেরি বিস্কুটের প্যাকেট।

    হাঁটাপথে স্কুল থেকে বাসের রাস্তাটুকুর ধুলো বালি ইঁটের টুকরো, তিরপল বাঁশের পোশাকে চায়ের দোকান, তার ক্ষয়াটে রোগা নড়বড়ে অপুষ্ট বেঞ্চিবাচ্চারা, ছেলেদের ইস্কুলের মাতব্বর গেট, তাদের দোতলার বারান্দা মাটি থেকে অল্প গোড়ালি তুলে ঝাঁকড়া নিমগাছ ও বাউন্ডারি দেয়াল পেরিয়ে তোমাকে দেখত বা দেখার চেষ্টা করত ওই রাস্তা দিয়ে তোমাকে হেঁটে যেতে তাদের বিশাল আয়ুর মাত্র ওই কয়েকটি দিনে। সেই দেওয়াল লেখা থাকত “পৃথিবীর সব ভোট শুধু তোমার জন্য”, পোস্টার পড়ত “তুমি একবার যদি চাও, তাই আমি আজীবন সেঁটে রইলাম, চলন্ত ট্রামের গায়ে বিজ্ঞাপন - “জীবনানন্দের জন্য আমাদের এখনও ক্ষমা করলে না?”। আশিকি সিনেমার জ্যাকেটে ঢাকা পোস্টারের মধ্যে থেকে নায়ক নায়িকা অপলক তাকিয়ে থাকত তোমার দিকে। আর কেয়ামত সে কেয়ামত তক সিনেমার পোস্টারই বা কম কী, আমীর খানের ঘাড় ঘুরে যেত তোমার চলাচলে সে তো স্পষ্ট জানতই সবাই।

    শ্রীপঞ্চমী টি সম্বৎসরের সত্যনারায়ণ সিন্নিপুজোর মধ্যে দুর্গাষ্টমী বিশেষ। সেই বাসরাস্তা, সেই বাসস্টপ থেকে স্কুল যাতায়াতটুকু প্রায় মহাকুম্ভের অমৃতযোগ। সেদিন চা দোকানের তাপ্পি দেওয়া তিরপলে রঙিন কাগজের ঝালর। নড়বড়ে বেঞ্চিবাচ্চারা ঠান্ডায় আরও ঠকঠকে হয়েও ন্যাপথলিন বলের গন্ধমাখা পোশাকের কাছাকাছি এসে পেপারমিন্ট খাওয়া বালকের মতো ঝকঝকে হাসে। চা ফোটানর স্যসপ্যানটিতে আজ তিন চারটে ছোট এলাচ পড়ল বলে সে প্রায় পায়েস রেঁধেছে মনে করে। নিমগাছটিতে নতুন ভর্তি হওয়া কচিপাতাদের দুর্দান্ত সবুজ ইউনিফর্মের কিচকিচানিতে প্রতিদিনের কাকেদের মিটিং অবধি খানিকটা চুপ। রাস্তা ধুতে মাঘের মহার্ঘ বৃষ্টি এসেছিল আগের রাত্রে। অনেক রাত অবধি তাদের তদারক করছিল শেষ শীতের প্রশ্রয় উষ্ণতা মাখা সামান্য বাচাল হাওয়া। রাস্তা থেকে ধুলোটুলো সাফ করে আলপনা দিয়েছিল নিমগাছটির পুরনো পাতা আর অজস্র কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি দিয়ে। ছেলেদের ইস্কুলের মাতব্বর গেটের পাল্লারা আজ খোলা। দরজার এমাথা থেকে ওমাথা কাগজের শিকল যা লাগান হয়েছিল তা গতরাতের বৃষ্টিতে তার একদিক খুলে গিয়ে হাওয়ায় হাওয়ায় পতাকা ওড়াতে চায়। দেবদারু পাতার ফেস্টুন যা ভোরে টাঙান হয়েছিল বলে বৃষ্টি বিপর্যস্ত নয়, সকালের হাওয়ায় সামান্য দোলে। গার্ড অফ অনার দিতে তোমাকেই, যখন সামনের রাস্তা দিয়ে তুমি যাও চলে।

    ওই তো সামান্য ক্ষণ, যার জন্য রঙিন কাগজ জন্মায়, কিছুক্ষণ ওড়ে, রাতের বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়ে অন্যরকম হয় পরদিন জঞ্জালের বাক্সে পড়বে জেনে। যার জন্য রাস্তা জোড়া কৃষ্ণচূড়া পাপড়ির রেড কার্পেট, যার জন্য চা দোকানের নড়বড়ে বেঞ্চিবাচ্চারা আপ্লুত হতে হতে নার্ভাস হয়ে যায়, ভাবে কিছু বলবে এইবার - বলা হয় না। ওই বুড়ো নিমগাছের ইস্কুলে ভর্তি হওয়া নতুন পাতারা জড়ো হয় তারা সবাই ওই ক্ষণটুকুই বেঁচে থাকে। তার আগে কিছুই ছিল না যেন। তার পরে কিছুই থাকে না। চায়ের স্যসপ্যান ক্রমশ তুবড়ে যেতে যেতে বাতিল হয়। চা - দোকানও উঠে যায় কালে কালে। তাতে কিছু যায় আসে না। তুমি তো আর ফিরে আসনি নাটকের দৃশ্য বদলালে।

    এও জানি, সেই বৃষ্টিভেজা রোদ্দুর সেই শহর সেই মুহূর্তদের অ্যালবাম তৈরি করে রেখেছিল বলে, আজও মন খারাপ হ'লে সে একলা একলা ওইসব নিজে নিজে বসে বসে দেখে। ঠিক সে কারণেই প্যাচপ্যাচে গরমের পর আকাশ কালো করে ঝড়বৃষ্টি আসে, প্রচন্ড শীতের পর ফুরফুরে দক্ষিণের হাওয়া যা কি না সামান্য হলদে রং নিয়ে নতুন পাতাদের চমৎকৃত করে। কিছুটা বদলে দেয়, এও জানি, যেমন শ্রীপঞ্চমীতে দোলের কৃষ্ণচূড়া এনে মেশায়, অনেকটা ভ্রমণের সময়, লাগেজের মধ্যে লেখার খাতার সঙ্গে চিরুনি আটকে থাকে। জানি সেই রাস্তারা তাদের নতুন অংশদের সে কথা বিশদে বলেছে এত যে তুমি সেখানে আজ প্রায় প্রবাদে পরিণত। যাবে নাকি আরও একবার? দেখই না একবার গিয়ে — সেই বাস, সেই রাস্তা, মুহূর্তরা দেখবে মাটি ফুঁড়ে ফের জন্মেছে এখনও সতেজ, ওই ভাষাতেই তোতলায় এখনও তোমায় দেখলে - দেখ, কী করে ওরা আবার তোমাকে নিয়ে, শুনবে ঠিক কোন কথা বলতে চেয়েছিল, যদি আজ একবার বলে ফেলে।
  • বিভাগ : ব্লগ | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৩৩০ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ফরিদা | 232312.161.342323.0 (*) | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০৩:৩৯49997
  • #
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন