• নিজের বাছাই-- মলয় রায়চৌধুরীঃ প্রাথমিক পাঠ প্রতিক্রিয়া

    Sakyajit Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১৪৬ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • যে লেখকের কলমের ভরকেন্দ্র হল মনস্হিতির বোধ ও উপলব্ধির, একাকীত্বের খুল্লমখুল্লা জবানবন্দি, তাঁর সামনে দাঁড়াতে অস্বস্তি হয়। প্রচলিত জনপ্রিয় সাহিত্যের ফিল-গুড ব্যাপারটা হারিয়ে যায় দুম করে, কারণ এতটা সততা তীব্র ও অসহনীয়। কিভাবে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর লেখায় আত্মপ্রক্ষেপণ ঘটিয়েও নিরপেক্ষ হয়ে যান, সামাজিক ঘটনার দ্রষ্টা হন, নির্মম সমালোচনায় শাণিত ইস্পাত হয়ে ওঠেন, তাঁর নিজের এই বাছাই সঙ্কলনটি পড়লে টের পাওয়া যায় । কিভাবে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর লেখায় আত্মপ্রক্ষেপণ ঘটিয়েও নিরপেক্ষ হয়ে যান, সামাজিক ঘটনার দ্রষ্টা হন, নির্মম সমালোচনায় শাণিত ইস্পাত হয়ে ওঠেন, সেটা বোঝা যাবে এই বইটা পড়লে। আর তাই নেক্রোফিলিয়া বা শবদেহের সঙ্গে সংগমের মত বিষয় তাঁর হাতে পড়ে হয়ে ওঠে অন্তর্ঘাতের মাধ্যম। মলয় নিজেকেই যেন ছুরি দিয়ে কোপাতে থাকেন, আর তখন যে রক্তপাত হয় সেটাই তাঁর লেখালিখি। নেক্রোপুরুষ, স্বমেহনের দর্শন, অথবা ডিসটোপিয়ার দেশ, যাই পড়ি না কেন, মলয় সেখানে নিজের মাংসের টুকরোই সাজিয়ে রেখেছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার যে মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী লেখক হতে আসেননি, তিনি এসেছিলেন বাঁক বদলের জন্য, যেন সেটাই তাঁর কাজ। মলয়ের সেরা লেখা কোনটা? সম্ভবত মলয়ও জানেন না। কেননা তিনি সেরা লেখা লিখতে চাননি কখনো, চেয়েছিলেন চলমান সাহিত্যের ওপর হাতুড়ির ঘা মেরে নিজের ভাষাটাকে প্রতিষ্ঠা করতে। কতটা সফল হয়েছেন, সময় বলবে। কিন্তু এই সঙ্কলনটা পড়লে বোঝা যায়, এত বয়েসে এসেও মলয় গেরিলা আক্রমণের রণনীতি থেকে পিছু হটবার পাত্র নন।

    ব্যক্তিগতভাবে আমি সবথেকে বেশি তড়িদাহত হয়েছই নেক্রোপুরুষ নামক গদ্যটি পড়ে। এটা এতই অন্যরকম যে একে গল্প, উপন্যাস, কনফেশন এরকম কোনও খোপে ঢুকিয়ে দিতে না পেরে 'গদ্য' নামক একটি সাধারণীকৃত উপাধি বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হল। বাড়ি ভেঙ্গে পড়ার শব্দ তখনই শোনা যায়, যখন তা শোনার জন্যে কেউ থাকে। সাহিত্যের কাজ কী? ক্যাথারসিস করা? মানে, মোক্ষণ? বরং মলয়ের লেখা প্রতিমুহূর্তে ক্যাথারসিসের উল্টোদিকে হাঁটে, নেক্রোপুরুষ তার প্রধান উদাহরণ। মোক্ষণ করা, শান্তি দেওয়া তাঁর কাজ নয়, বরং আপাতশান্তির বোধটাকে আঘাত করাই মূল উদ্দেশ্য! নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নেওয়া’র গড্ডালিকা স্রোতগুলোর পালটা স্রোত সাহিত্যে-জীবনযাপনে আসে। আর, যতোটা ‘সংস্কৃতি’ ঠিক করে দেওয়া রাষ্ট্র থাকবে, ততটাই থাকবে রাষ্টনির্মিত, তথা পুঁজিনির্মিত সেই ‘সংস্কৃতিকে’ প্রত্যাখ্যান। হয়তো সমান্তরাল, তবু থাকবে। প্রবলভাবেই। অনেকটা এরকম

    "হ্যাঁ, আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে প্রেম করে পরম সন্তোষ পাই। নাঃ, পেতুম বলা ভাল। মেয়েদের শব মাত্রেই, হোয়াট ইউ কল, সচ্চিদানন্দময়ী, যাদের বুকের ভেতরে আর বাইরে লেজার আলো কিং কোবরার মতন কুণ্ডলী পাকিয়ে ওত পেতে থাকে, আচমকা বেরিয়ে জাপটে ধরে, আলোয় আলো করে দেয় অস্তিত্বকে"। (নেক্রোপুরুষ)

    আত্মস্বীকৃতি, ঐতিহ্যের নামে স্খলনের সর্বস্ব বিনাশী যে সাহিত্যরাজনৈতিক প্রকল্প মলয় গ্রহণ করেছেন, খুব অস্তিত্বগত কারণেই মূলধারার সাহিত্যের পক্ষে তাকে হজম করা সম্ভব হয়নি। তাই এক সময়ে একে হাংরি, ক্ষুৎকাতর এবম্বিধ বহু অভিধায় ভূষিত করা হয়েছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কি হাংরি রূপকেও আর বেঁধে ফেলা যাচ্ছে না মলয় রায়চৌধুরির লেখাকে। কিং কোবরা যখন অস্তিত্বকে আলোয় আলো করে দিচ্ছে, এমন উপমা তো আমাদের ধ্রুপদী সাহিত্য থেকেই সারজল সংগ্রহ করে নিয়েছে বলা চলে। পূর্বজদের থেকে ঋণ নিয়ে তারপর ট্র্যাডিশনকে আক্রমণ করা, অসম্ভব শক্তিশালী কলম ছাড়া এমন হওয়া সম্ভব নয়। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, অন্তত এই বাছাই সংকলন পড়ে এমনটাই মনে হয়েছে যে মলয় রায়চৌধুরীর আক্রমণ পণ্যবাহী সভ্যতাজাত ব্রয়লার সংস্কৃতির প্রতি। বাংলার আবহমান ট্র্যাডিশনের কাছে দিনের শেষে তাই নতজানি থেকে তিনি উচ্চারণ করতে পারেন "আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে বাংলা ভাষা আমার স্বদেশ নয়" (আমার স্বদেশঃ বাংলা ভাষার জন্য প্রেমের কবিতা)

    বহু আগে আর্থার মিলার বলেছিলেন, ‘ভাষাকে যে আক্রমণ সরে সেই ভাষাকে বাঁচায়।’ মলয় রায়চৌধুরি একই সঙ্গে হন্তারক ও পরিত্রাতা হিসেবে নিজেকে খুঁড়তে চাইছেন। এই যাত্রাপথ কঠিন, এবং সকলের জন্য নয়।
  • বিভাগ : ব্লগ | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১৪৬ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 3478.160.342312.238 (*) | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০৩:০৭49833
  • কিং কোবরা-র উপমাটা ভাল, তবে মৃতার সাথে যৌনতা যদি শুধুমাত্র শক ট্রিটমেন্টের জন্য লেখার বিষয় হয়ে থাকে, তবে আগ্রহী নই। বইটা হাতে পেলে পড়ে দেখতে হবে
  • aranya | 3478.160.342312.238 (*) | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০৩:২৫49834
  • মলয়-এর লেখা খুব অল্প পড়েছি। মেয়েদের অবজেক্টিফিকেশন, তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বর্ণনা, পাঠক-কে শক দেওয়ার চেষ্টা -এগুলো প্রকট। সাহিত্যের প্রয়োজনে এগুলো আসছে নাকি জোর করে আনা সেটা প্রশ্ন + এর বাইরেও মলয়ের লেখায় আরও কিছু পাওয়ার আছে কিনা।
    এই বইটা খুবই পড়ার আগ্রহ রইল। আফটার অল, সিড যখন এত ইমপ্রেসড, নিশ্চয়ই কিছু আছে :-)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত