ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • বার্সিলোনা - পর্ব ৪

    Binary লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৯ আগস্ট ২০১৯ | ১০০৩ বার পঠিত
  • আমি যখন কলকাতার সওদাগরি অফিসে কাজ করতাম , তখন আমার একজন সহকর্মী ছিলেন। তিনি পাঁচ গ্রেডের কর্মী ছিলেন। এই পাঁচ গ্রেডের একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। পাঁচগ্রেড হলো অফিসার গ্রেড তাই কোনো ওভার টাইম নেই। এদিকে চার গ্রেড পর্যন্ত চুটিয়ে ওভারটাইম। তাই ওজনে কম হয়েও চার গ্রেডের কর্মীরা পাঁচ গ্রেডের থেকে অনেক বেশি মাস মাইনে পেতেন । তো আমার বয়জেষ্ঠ সেই সহকর্মী মনের দুঃখে গান গাইতেন "জন্ম পাঁচে মৃত্যু পাঁচে, ভাবনা কিরে ভাই , ওভারটাইম নাই , সাড়ে চারটে বেজে গেলে বাড়ি চলে যাই"।

    লিওনেল মেসির এফসি বার্সিলোনা দেখে আমার তাই মনে হল। ওই ওভটাইমের অংশ টুকু বাদ দিয়ে। এফসি বার্সিলোনা লিওনেল মেসির ধাত্রীভূমি। পনেরো বছরের মেসির আজকের সুপারস্টার-এ মেটামরফোসিস পুরোটাই এই ক্লাবে। এখনে স্পেন বা ইউরোপের এই মেসি প্রেমটা পরতে পরতে চোখে পরে। অনেকটা রোমান ক্যাথলিকদের ভগবান জীশু কে দেখতে ভ্যাটিকান যাওয়ার মত। এফসি বার্সিলোনার ফুটবল স্টেডিয়াম , ক্যাম্প নৌ, মেসিময়। ঢোকার গেট দিয়ে মাঠের দরজা পর্যন্ত পরপর গিফটশপ, মেমেন্টো শপ, সব মেসির দোকান। মেসি টিসার্ট , মেসির সই করা টুপি, মেসির সই করা ফুটবল, বুট, লা-লিগার রেপ্লিকা ইত্যাদি প্রভৃতি। সেগুলোর আবার প্রায় আকাশছোঁয়া দর। আমার মেয়ে অবশ্য মেসি রোনালদো এসব চিনতো না। বেসবল , হকি আর আমেরিকান ফুটবল শুনে বড় হওয়া হলে যা হয় আর কি। কিন্তু স্টেডিয়ামে ঢুকে লোকেদের হৈচৈ পাগলামি দেখে মেসি টিসার্ট আর টুপি কিনে ফেলল। তারপর হোটেলে ফিরে ইন্টারনেট ঘেঁটে আমায় পঞ্চাশ রকমের প্রশ্ন করল। এফসি বার্সিলোনার স্টেডিয়াম দেখতে যাওয়ার জন্য-ও অগ্রিম টিকিট কেটে ফেলেছিলাম। আমরা যে সময় বার্সিলোনা গেছিলাম , তার কাছাকাছি সমযেই লা-লিগা শুরু হওয়ার কথা। দেখলাম তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গ্যাছে জোর কদমে। মাঠের ঘাস পরিচর্যা হচ্ছে। স্টেডিয়ামের লাগোয়া মিউজিয়াম, তাতে বার্সিলোনার ইতিহাস, তাতে অতীতের সোয়াশো বছরের দিকপাল খেলোয়াড়দের সই করা জার্সি , এতদিনের যেতা লা-লীগ, উফাকাপ , ওয়ার্ল্ড ক্লাব কাপ, ক্লাবে খেলে যাওয়া হিরো ফুটবলারদের প্রমান সাইজ ছবি , পোস্টার, এলসিডি স্ক্রিনে স্মরণীয় খেলার স্নিপেটস। তার মধ্যে আমার প্রিয় ম্যারাডোনা রোনালদিনহো-ও আছে। মাঠ , গ্যালারি, প্রেসবক্স, খেলোয়াড়দের সাজঘর সবই খোলা আছে দেখার জন্য। খালি ঘাসে নামা বারণ।

    হোটেল থেকে বেরোনোর সময়, দেখেছিলাম , ক্যাম্প নৌ-এর সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন বাডাল। সেই মত ট্রামে উঠে চেঞ্জ করে মেট্রো উঠেছি , তো সেই মেট্রো দেখি বাডাল এর চার স্টেশন আগে থেমে গেলো , আর যাবে না। সুড়ঙ্গ থেকে ওপরে উঠে দেখি একদম রেসিডেন্সিয়াল একটা নেবারহুড। অলিগলি চলিরাম টাইপ। গলির মোড়ে মুদির দোকান। রাস্তায় গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসে লোকজন গুলতানি করছে। ম্যাপ দেখে জায়গাটার কোনো হদিস করতে পারলাম না। কোন দিকে হাঁটবো , আগে না পিছে, ডাইনে না বামে ? একটা কোনো বড় রাস্তা পেতে হবে যেখানে , ট্রাম বা নিদেন পক্ষে বাস বা ট্যাক্সি পাওয়া যায়। মাথার ওপর গনগনে রোদে ঘন্টাখানেক এদিক ওদিক হাঁটার পরে দেখি একজাগায়তেই ফিরে এলাম। লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে স্প্যানিশে আর ইশারায় হিজিবিজি বলছে , তাও খুব হেসে হেসে। তো, দেখি একজন মাঝ বয়সী লোক বারমুডা পরা, কাঁচাপাকা চুল উল্টে আঁচড়ানো , মুদিখানা থেকে বেরোচ্ছে , আমাদের অসহায় অবস্থা দেখে কাছে এসে বলল

    - ইংলিশ, ইংলিশ ?
    - ইয়েস ইয়েস (হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো করে) , উই ওয়ান্ট টু গো টু মেন ট্রাফিক রোড
    - এএএএএ রাইত রাইত (গলির মোড়ে ডানদিকে যেতে হবে) এএএএএএ গোগোগো (অনেকটা যেতে হবে) , আপ আপ (চড়াই রাস্তা) এএএএএএ তেন মিনিত (১০ মিনিট হাঁটা) , বিগ রোদ , ট্রাম (এই পর্যন্ত বলে হাঁপিয়ে নিল)
    - থেঙ্ক ইউ স্যার
    - সরি মাই ইংলিশ (অপরাধীর হাসি)
    - সরি ফর নট নোয়িং স্প্যানিশ (আমার ততধিক অপরাধীর হাসি)

    মেন রোডে এসে ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম , সেটা আবার ২ মিনিটেই ক্যাম্প নৌ এর সামনে নাবিয়ে দিল।

    ক্যাম্প নৌ দেখার পরে আবার ট্রামে আর মেট্রো চেপে গেলাম গোথিক কোয়াটার। চোদ্দোশো শতকের ক্যাথিড্রাল আর পারিপার্শিক সেই মধ্যেযুগীয় স্থাপত্য। যদিও এখন টুরিস্ট আর রেস্টোরেশনের চাপে সেই মধ্যেযুগীয় গম্ভীর সুনসান ভাবের কিছুই অবশিষ্ট নেই। ক্যাথিড্রালের ভেতরে বাইরে অবশ্য এখনো ১৪০০ সাল। ক্যাথিড্রালে দেখলাম মেয়েদের ট্যাঙ্কটপ মিনিস্কার্ট বা হটপ্যান্টস পরে ঢোকা নিষিদ্ধ। ছেলেদের-ও ট্যাঙ্কটপ পরে ঢোকা বারণ। ইটা অবশ্য শুধু এখানে না , বিশ্বজুড়ে সমস্ত ক্যাথলিক চার্চের-ই একই নিয়ম। এখানে আবার দেখলাম মিনিস্কার্ট বা শর্টস পরিহিত মেয়েরা এক ইউরো দিয়ে গামছা ভাড়া নিয়ে কোমড়ে জড়িয়ে ঢুকতে পাচ্ছে। আমি অবশ্য গামছা বলাতে বৌ চোখ পাকিয়ে বললো 'ওগুলো স্কার্ফ'। কন্যা ক্যাথিড্রাল দেখতে চাইলো না , অটোম্যাটিক বাইক স্ট্যান্ড থেকে কয়েন দিয়ে বাইসাইকেল নিয়ে অলিগলি ঘুরে এলো ঘন্টা খানেক। এই সাইকেল গুলো আবার চড়াই-এ ওঠার সময় ব্যাটারিতে চলে।

    ক্যাথিড্রাল চত্বরে দেখলাম পাঁচটা ছেলে, খালি গায়ে, খুবই সুগঠিত চেহারা সাউন্ড বক্স বাজিয়ে খালি হাতের জিমন্যাস্টিক দেখাচ্ছে। তাদের একজনের আফ্রিকান চেহারা বাকিরা হিস্প্যানিক। লোকজন ভিড় করে দেখছে , তারপর শেষের দিকে পয়সা দেওয়ার ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এদিক দিয়ে বার্সিলোনা আর রামরাজতলার কোনো পার্থক্য নেই। মেয়ে সাইকেল নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরাও একটা সিমেন্টের চাতালের ওপর বসে ওদের কসরত দেখলাম। পনের মিনিট ধরে সার্কসবাজী দেখিয়ে পাঁচ মিনিট করে রেস্ট নিচ্ছে। খুবই শ্রমসাধ্য ব্যাপার। মানি ব্যাগ খুলে কিছু ইউরোর কয়েন দিলাম ওদের কালেকশন বাক্সে।

    আরেকটু রাত হলে একটা ঝাঁ চকচকে রেস্তোরা, যার ভেতরে গথিক এম্বিয়েন্স আর উর্দি পরা বেয়ারারা মোটামুটি ভালো ইংরেজি বলতে পারে, সেখানে বসে ওয়াইন আর পাপরিকা মাছ খেলাম। বৌ অবশ্য যথারীতি চিকেন।
  • | বিভাগ : আলোচনা | ২৯ আগস্ট ২০১৯ | ১০০৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Binary | 237812.69.451223.45 (*) | ২৯ আগস্ট ২০১৯ ০৯:১১49193
  • *
  • সুকি | 237812.68.345623.184 (*) | ৩০ আগস্ট ২০১৯ ০২:২৬49194
  • বার্সিলোনা আমার ব্যপক লাগে - ভালো লাগছে লেখা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন