
ওলায় বসে জানলার কাচটা নামিয়ে দিল সৌম্য। এমনিতেই এসি ওর পছন্দ নয়, তার ওপর এই প্যানডেমিকের সময় মনে হয় একটু খোলামেলা থাকাই ভাল। সৌম্য ভেবেছিল তুহিনদের বাড়ি যেতে যেতে ও রজতের সাথে মায়ের এখানে আসার ব্যপারটা নিয়ে একটু কথা বলে নেবে। সোহিনীদেবী রজতকে চেনেন সৌম্যর বন্ধু এবং ওদের ডিটেক্টিভ এজেন্সি সৌরলোকের পার্টনার হিসেবে। তিনি জানেন, যে কাজের প্রয়োজনে রজতকে প্রায়ই সৌম্যর বাড়ি থেকে যেতে হয়। তাই সৌম্যর বাড়িতে সব সময়ই রজতের জন্য স্পেয়ার টুথব্রাশ, জামাকাপড়, ঘরে পরার পায়জামা, চপ্পল ইত্যাদি থাকে। কিন্তু রজত আর সৌম্য যে কাজের পার্টনারের থেকেও বেশি কিছু, সেটা ওঁর জানা নেই। ফলে, সোহিনীদেবী কলকাতায় এলেই রজতকে কিছু দিনের জন্য পাততাড়ি গোটাতে হয়। এবং প্রতিবারই এই নিয়ে একটা মন কষাকষি হয়। ... ...

আমার জীবনে এই শিক্ষকদের প্রচুর অবদান। সব শিক্ষকের কাছেই আমি ঋণী। তবে বিতর্ক, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, কুইজের জগৎ আমাকে চেনান শিশির দত্ত। সত্তর দশকে স্কুলেই ছুরি খেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ অদ্ভুতভাবে। ইংরেজির ক্লাস। ... ...

চাষে প্রচুর বিষের ব্যবহার আর অন্যদিকে ঝড় বন্যার ফ্রিকোয়েন্সি বাড়তে থাকায় চ্যাং, বাসা, শাল, খলসি, সরপুঁটি ও জিওল রা প্রায় বিদায় নিলো। পুরানো কিছু পুকুরে কোনোরকমে বেঁচে আছে। মাগুরের দেশী জাত খুঁজে পাওয়া কঠিন। জমিদারী যুগে পুকুরের অন্য সম্মান ছিলো তার অন্যতম কারণ পুকুরের জল পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখন সে কাল গেছে। পুকুরের প্রতি খুব অবহেলা। পুকুর আগে পুরো সেচে দিতোনা। আর দিলেও হাপা করে কালো মাছ রেখে দিতো। এমন করে পুকুর সংস্কার করতো যে জলের মান নষ্ট হতোনা। এখন সেসব জ্ঞান গেছে। দিকে দিকে মেশিন। হাতে সময় কম। শ্রমিক কম। সবুজ বিপ্লবের পর থেকে কৃষিকে অলাভজনক করে তোলা হয়েছে বলে যুবসমাজের অনেকাংশের প্রবল অনীহা... ... ...

বলতে বলতে, কী আশ্চর্য, দাদুর গলায় আক্ষেপ ঝরে পড়ে! আগের কথার রেশ টেনে বলেন – “তবু ভাতেরও অভাব কিছু মানুষের।” কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন দাদু। তারপর আবার বলতে থাকেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে, বিশ্বযুদ্ধের পরে পরে পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষের ছায়া বাংলার এই শস্যগোলাকেও গ্রাস করল।তারপর স্বাধীনতা লাভ। এদিকে স্বাধীনতার পঞ্চাশ -ষাট বছরেই অতিরিক্ত রাসায়নিক সার আর কীটনাশক মাটির গুণ অনেকটা নষ্ট করে দিলো। বড় বড় দেশী আর বিদেশি কোম্পানিগুলো মানুষকে কম শোষণ করল? কোটি কোটি ডলার লুঠ করে নিয়ে গেল। বেশি ফসলের আশায় চাষীরা তা দিল! কী করবে তারা? লোভের দেখানো পথের বাইরে আর কোনো বিকল্প তারা নিজেরা ভাবতে পারল না, কেউ ভাবাল না।” ... ...

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একটি বিশাল কাঠের বাড়ির সামনে থামার নির্দেশ পেলাম। বোঝা গেলো এটি মানুষ পরীক্ষা করার কারখানা। তার চত্বরে কয়েকটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ইউনিফরম ধারি পুলিশ ইঙ্গিতে আদেশ করল গাড়ি ছেড়ে অফিসে ঢুকতে। পাঁচ ধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে যাব, আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হল বহু ভাষায় লিখিত একটি সাবধান বাণীর প্রতি। রাশিয়ান নরওয়েজিয়ান সহ সকল নরডিক, ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় লেখা আছে: এই সীমান্ত চৌকিতে কোন প্রকার ঘুষ দান করা অথবা ঘুষ দান করার প্রচেষ্টা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ছবি তুলতে গেলে রক্ষী বাধা দিলো। আমি পিরকোকে বললাম তার মানে এখানে টাকা দেয়া নেয়ার ব্যবসা চলে। সে চিন্তিত হয়ে বললে আমার কাছে তো রুবল নেই। ... ...

আসল কারণটা অন্য। গতকাল ওই যে খিলাফৎ কমিটির নোটিশটা ছাপানো হয়েছিল, সেটার জন্যেই বন্ধ করল কাগজটা, রাগ আর সামলাতে পারল না। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন ওই নোটিশ কাল বসুমতীতেও বেরিয়েছে? কই, তাদের তো বন্ধ করেনি। কিন্তু, সে যাই হোক, করেছে, ভালোই হবে। আজকের কাগজের জন্যে যে এডিটরিয়ালটা লিখেছিলাম – দুর্যোগের পাড়ি – সেটা মোসলেম ভারতে ছাপিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছি। নবযুগকে আজ জুলুম করে বন্ধ করার খবরটা নিশ্চয়ই বেরোবে দুয়েকটা অন্য কাগজেও। যারা এতদিনেও নবযুগ পড়েনি, বাংলা খবরের কাগজের সেই পাঠকদেরও নবযুগের ব্যাপারে কৌতূহল বাড়বে। এখন যতদূর তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের কাগজটা আবার বের করা চাই। আমার তো মনে হয় একটু কষ্ট করে হলেও ওই দুহাজার টাকা আজই জমা দিয়ে দেওয়া উচিত। ... ...

আর ছিল চাঁদা মাছ। মাথায় পাথর থাকতো। থাকতো তারার চিহ্ন। আর ছিল পুঁটি। নানা রকম আকারের। বড় বা মাঝারিগুলো পদোন্নতি পেয়ে আলাদা হতো চুনোমাছ থেকে। পুঁটি মাছ ভাজা, চচ্চড়ি, ঝাল, টক--সব ভাবেই খাওয়া হতো। আর দেদার হতো পুঁটি শুঁটকি। সেগুলো ক্যানেলের ধারে ক্যানেলের পাড়ে বেশি হতো। আশ্বিন কার্তিক মাস জুড়ে। সারা রাত ধরে লোকে ক্যানেলের পাড়ে সাপের ভয় এড়িয়ে আড়া বসাতো। রাতে আড়া পাহারা দিত। তাতে শোল, চ্যাং, ল্যাঠা মাছও পড়তো্। চ্যাং বোড়া বলে একটা সাপ ছিল বিষাক্ত। চ্যাং মাছের মতোই দেখতে। আমি ভয়ে কোনোদিন খাই নি। সাপের মতো দেখতে ভেবে ল্যাঠা মাছও খেতাম না। শোল মাছ দেখি শহরে খুব দামি। ... ...

আজ ২০২২ সাল, ঝড় বন্যায় বিধ্বস্ত সুন্দরবনের চাষবাস পশুপালন নিয়ে নতুন ভাবনা চলছে। গরু পোষা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এখন তাই গাড়োল ভেড়ার নাম উঠে আসছে খুব। সে এই সুন্দরবনের জলবায়ুতে সবচেয়ে উপযুক্ত। দু একটা NGO এসব ভাবছে। কিছুদিন পর দূর থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে তারা হাজিরও হবে কিন্তু সুন্দরবনের মাটিতে বছরের পর বছর পশুপালন করে মণি যে অভিজ্ঞান লাভ করেছিলো তা আর আমরা পাবোনা। মণি আজ থেকে কুড়ি বছর আগে একপাল গাড়োল ভেড়াই পালন করেছিলো! ... ...

বুড়ি জানে হাতে একটু টাকা রাখতে হয়। এদিকটা না দেখলে হবেনা। গঞ্জনা জুটবে, না খেয়েও মরতে হতে পারে। ক্রয়ক্ষমতাই তো ক্ষমতা এখন! বুড়ি বোঝে। এদিকটা না সামলালে চলবেনা, অরণ্যের জীবন তো আজ আর পাওয়া যাবেনা। তাই সে এটুকু করে। বাদবাকি সবসময় তুমি দেখো, বুড়ি আর প্রকৃতি। বুড়ি যেনো কথা বলে, "কীগো কেমন আছ তোমরা সবাই? আমার মন ভালো নেই। বাঁশবাগানে চ্যাং মাছ নেই। খালে শাল মাছ নেই। প্যাঁচার ডাক শুনতে পাইনা। শেয়ালরা কেউ নেই।" ... ...

মিষ্টির রসে ডুবে থাকা মাছি উঠে আসতে পারে না সেই রসকুণ্ড থেকে। ডানা, পা, শুঁড় রসে ভারি। নিয়তির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে অন্ধের মতো এদিক ওদিক ঘোরে।আয়ু থাকলে সে বাঁচে আরও কিছুদিন। কিছুদিন আরও স্বাধীনভাবে জীবনকে নেড়েচেড়ে দেখে নেয়।কিন্তু তার দৃষ্টির ঘোরাফেরা একটা নির্দিষ্ট সীমায়, জীবনকালও সেই গণ্ডির ভেতরেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ মানুষের জীবনই এই। এই অঞ্চলের মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়, বরং নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই একরকম। নিশ্চেষ্ট, উদ্যমহীন।খেয়েপরে অর্থ উপার্জন করার আত্মকেন্দ্রিকতার বাইরে হাজার অপমান আর অসম্মানেও তারা বোবা। চেনা ছকের বাইরেও যে জীবনের যে একটা উদ্দেশ্য থাকতে পারে এমন কথা তারা সম্ভবত চিন্তাতেই আনতে সক্ষম নয়। ... ...

আপনি যে একদিন বিখ্যাত হবেন তা আমার জানা ছিল, আমি মুজফ্ফর সাহেবকে বলছিলুম, আমার বিশ্বাস ছিল আপনি একদিন দেশবিখ্যাত এক লেটোশিল্পী হবেন। এখন তো দেখছি আপনি একজন দেশবিখ্যাত লেখক কবি এবং গায়ক, প্রায় ঠিকই ছিল আমার ধারণাটা। কিন্তু আপনি কি জানেন, ছেলেবেলায় আলাপ না হওয়া সত্ত্বেও আমি কেন আপনাকে মনে রেখেছি? আমার মায়ের কাছে শুনেছিলুম আমি নাকি এক ফকিরের আশীর্বাদে জন্মেছিলুম। ফকির মানে কী, আমি জানতুম না তখন। কিন্তু আপনার বাবা তো অজয়ের দুপারেই বিখ্যাত ছিলেন। আমি যখন শুনলুম তাঁর নাম ফকির আহ্মদ, কেউ না বলা সত্ত্বেও আমি ধরে নিলুম, ইনিই নিশ্চয়ই সেই ফকির, এঁর আশীর্বাদেই আমি জন্মেছি। ... ...

ওদিকে দেখি অনেক ক্যাম্প। সেখান থেকে ডাকছে, আসুন কমরেড। কোথাও কোথাও রুটি গুড় কাগজে মোড়া কোথাও লুচি আলুর দম। কড়াই ভর্তি আলুর দম। আমি দেখছি কড়াইয়ের নাম। দেখি, ও মা, ধীরেন। কড়াইকেও মনে হল, কমরেড কড়াই। আমরা ছোটো। জল তেষ্টা পেয়েছে। একজন স্বেচ্ছাসেবক বললেন, কমরেড খোকা, ওইদিকে জলের ট্যাঙ্ক আছে। আমাকেও কমরেড বলেছে। মনে হল, অনেক বড় হয়ে গেছি। আনন্দে জল এসে গেল চোখে। কেউ আমাকে কমরেড বলেছে। ... ...

আউগুসট বেবেল স্ত্রাসের মোড়- এখানে একদিন জানতে চেয়েছিলাম মাকস শিফারডেকার স্ত্রাসে কিভাবে যাব।দশ বছর আগে গাড়ি দাঁড় করিয়ে একজনকে প্রশ্ন করলে তিনজন হাজির হতেন এখন একজন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা দূরের কথা দর্শন পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। নীল শাদা অক্ষরে লেখা আছে মাক্স শিফারডেকার স্ত্রাসে। চেনা বাড়ি চেনা মুখ। তেরো নম্বর কিন্তু আমূল পরিবর্তিত। সেই চকচকে টালি, রাস্তা থেকে ওঠার ধাপ গুলো সুন্দর রঙ করা। হাইকে খুব খুশী হল আমাদের দেখে। জাখসেন / থুরিঙ্গেনের উচ্চারণে একটা বড়ো আদরের টান আছে। অনেকটা আমাদের বীরভূম বর্ধমানের বাংলার মতন। জানি 'কতদিন পরে এলে গো 'এ বাক্যের সম্যক অনুবাদ হয় না কিন্তু হাইকের কণ্ঠে আমি সেই সুর শুনলাম। ... ...

বরযাত্রীরা হিন্দুদের বিয়েতে ছাদনাতলাতেই খেতেন। মাথায় শামিয়ানা টাঙানো হতো। চারদিক সমান মাথা। সেখানে। গ্রামের মানুষদের বাড়ির দাওয়া বা আঙিনায়। কেউ কেউ গোয়াল ঘর পরিষ্কার করেও খাওয়াতেন। হিন্দু মুসলমান আলাদা বসানোর রীতি তেমন ছিল না, কিন্তু জাতপাত মানা হতে দেখেছি। শ্রাদ্ধ বাড়িতে বামুন তো আগে খেতোই, বিয়ে বাড়িতে শেষে খেতে দেওয়া হতো তফশিলি জাতির মানুষদের। বিশেষ করে বাগদি মুচিদের। আমাদের গ্রামের প্রশান্ত মজুমদার নামে ব্রাহ্মণ সন্তানের বিয়েতে এই ভেদ উঠে যায়। ... ...

স্নানের আগে মাথায় ঢালা হবে তেল। সর্ষের তেল। একটা ছোট নোড়া দিয়ে গড়িয়ে সেই তেল পড়বে সিঁথিতে সেখানে ঠেকানো থাকে পান পাতা। সেই পাতা দিয়ে তেল পড়বে কুলোয়। কুলোয় রাখা থাকে চাল আর বিউলির ডাল। বর বা কনে তেল দিয়ে তা মাখাতে হয়। হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়েই এই রীতি। গায়ে হলুদের আগে হিন্দু মুসলিম দুই বাড়িতে বর বা কনে পক্ষ থেকে তত্ত্ব আসে। তত্ত্ব নিয়ে আসা লোক হয় ধুরন্ধর। আসলে গোয়েন্দাও। বুঝে নিয়ে যায় আসল হালচাল। বন্দোবস্ত। নাপিতদের পাঠানো হতো বেশিরভাগ জায়গায়। মুসলমানদের বেলায় হাজাম। রঙ্গ রসিকতায় চাপান উতোরে এই লগ্নযাত্রীরা মাত করে দিতেন। বিকেল হলে মেয়ে বঊদের দল আসতো লগন দেখতে। কী কী দিয়েছে--কী কী দেয়নি তার বিদেন বা টীকা ও ব্যাখ্যান চলতো। ... ...

টেলিভিশনে ব্রায়ান হ্যানরাহান যখন এই যুগান্তকারী ঘটনাবলির বর্ণনা দিচ্ছেন, আমি চোখ বন্ধ করে ভাবছি বারো বছর আগের সেই দিনটার কথা যেদিন আমি পশ্চিম বার্লিনের পতসডামার প্লাতসে একটা কাঠের পাটাতনের ওপরে উঠে প্রথম পূর্ব বার্লিন দেখি। কাঁটা তারের বেড়ার ওপারে ধূসর মাটি, ভাঙ্গা চোরা চ্যান্সেলরির বাড়ি যার নিচে ছিল হিটলারের বাঙ্কার, গোয়েরিঙের হাওয়া অফিস। সে মাত্র বত্রিশ বছর আগের কথা। লোকে কেতাবে পড়ে আমি চোখের সামনে ইতিহাস দেখছি। ঠিক এই সময়ে জার্মানি ফিরব ? কাজে? কো ইন্সিডেনসের বাংলা কি ? সমাপতন কি একেই বলে ? ... ...

সত্যি কথা বলি কাজীদা, আস্তে আস্তে কেমন ভালই লেগে গেল শিবপুরকে। ননী জেঠুর অনুমতি নিয়ে আরও দুয়েকটা বাচ্চাকে পড়াই, হাতখরচের টাকা উঠে যায়। নানা মানুষের সঙ্গে মিশি, সাহিত্য সভায় যাই, লাইব্রেরিতে কিছু কাজের দায়িত্ব পাই, গান্ধি বিফল হলে যে লড়াই লড়তে হবে, তার আঁচ গায়ে লাগে, মিছিল-মিটিংয়েও যাই। পিংলার সঙ্গে তো সেইভাবেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল একদিন। করাচির কথা, আপনার কথা সব শুনেছি। একদিন বলল আপনার ‘নবযুগ’-এর কথা। মাঝেমধ্যে গঙ্গা পেরিয়ে ‘নবযুগ’ কিনেও আনে। সেই ‘নবযুগ’ পড়িয়েছি একজনকে। আপনার সঙ্গে তিনি আলাপ করবেন। কাল আসবেন একবার? ... ...

শালপ্রাংশু চেহারার নানাজি এসে আমার ছোট্ট খাট্টো চেহারার নানিকে এসে বহু ডাকলেন, সম্মান থাকবে না। এমন করো না, সালমা। চিরকাল বলেন অমুকের মা। মানে বড়মেয়ের মা বলে ডাকেন। আজ স্ত্রীকে সন্তান হওয়ার আগের ডাকে ডাকলেন। দরজা ঈষৎ ফাঁক করে সালমা উত্তর দিলেন, ওঁদের ভালো করে খাইয়ে ফেরৎ পাঠাও। ওই ছেলের সঙ্গে আমার সোনার মেয়ের বিয়ে দেবুনি। অনড় স্ত্রী। কন্যা। বড় আদরের মেয়ে। সুন্দরী। বিদূষী। ভালো ছড়া লেখে। এমন মেয়েকে ওই পাত্রের হাতে দিতে তাঁরও মন চায় না। দেখতে কালো। কিন্তু পয়সা আছে। পড়ালেখা জানে। ভালো পরিবার। কিন্তু মা মেয়ে অনড়। ... ...

আমাদের গ্রামে হিন্দু মুসলমান সবার প্রধান আনন্দ ছিল মাঘ মাসের ওলাইচণ্ডী পূজার মেলায়। দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা আছে-- আছে ইদ বকরিদ মহরম--- কিন্তু মাঘ মাসের মেলাই আসল মিলবার জায়গা। সেটা হলেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ। আত্মীয় স্বজন কুটুম আসার এই তো আসল সময়। দুর্গাপূজার সময় অনেকের ঘরেই অভাব। ইদ বকরিদ ধান ঝাড়ার সময় কবার আর হয়? পৌষ মাসে ধান কাটা শেষ। মাঘ মাসের ১৯ তারিখ মেলা। হাতে পয়সাও ম্যালা। ফলে আনন্দের অর্থই আলাদা। কাঠের নাগরদোলা, পাঁপড় চপ বেগুনি পেঁয়াজি ঘুগনি, জিভে গজা পান্তুয়া লেডিকেনির দোকান বসে মেলায়। দুর্গাপূজা বা ইদে তো সেসব অনুপস্থিত। বাঁশি কেনা, ঘড়ি কেনা, টিকটক কেনা, লাট্টু কেনা, রঙিন চশমা-- সেতো ইদ বকরিদ দুর্গাপূজায় সবার সম্ভব নয়। ... ...

একদিন রয়টারে খবর এলো (মে ১৯৮৯) - ম্যাকডোনালডকে বেজিঙ্গে দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে আমাদের অর্থলগ্নির কোন সুযোগ নেই। এ সামান্য টাকা তাদের শিকাগো অফিস দেবে। শোনা গেলো অনুমতি পেতে বছর খানেক সময় লেগেছে (দোকান খুলতে আরও ছ মাস)। পরের মাসে এই খবরকে ছাপিয়ে গেলো একটি আশ্চর্য ছবি – একটা গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে একজন একটি ট্যাঙ্কের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে – স্থান তিয়ানানমেন স্কোয়ার (স্বর্গীয় শান্তির দ্বার)। তারপরে আর কোন খবর নেই টেলিভিশনে। ... ...