এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • মাঝিদার গপ্প

    Dyuti Mustafi লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | ২৫ মার্চ ২০১৯ | ২০৪৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Dyuti Mustafi | ২৫ মার্চ ২০১৯ ০৫:১১382979
  • মাঝি দার গপ্প
    দ্যুতি মুস্তাফি

    আজকের গল্পের নায়কের নাম লক্ষ্মণ মাঝি। ছোঁচালো দাড়ি নেই তার। অনেকেই তাকে মাঝি দা বলে ডাকে এ তল্লাটে। মাঝি দা কোনো মাছ ধরে বলে শুনিনি। তবে তার মনের জালের বুনোটে আমরা ধরা পড়েছি। দাদা একজন ছিল তবে তার নাম রাম নয় , অর্জুন। মায়ের নাম সুমিত্রা বা কুন্তি কোনোটাই নয়। তবু তাদের নামে রামায়ণ, মহাভারত একাকার। লক্ষ্মণ কোনো বৈঠা পারাপার করে নি। তার কোনো লক্ষ্মায়ণ লেখা হবে না। কোনো রাবীন্দ্রিক ছোঁওয়া তাকে আবদুল মাঝিও করতে পারবে না।

    লক্ষ্মণ কোল ইন্ডিয়ার বিসিসিএলের অন্তর্গত এক খাদানের খেটে খাওয়া মানুষের নাম। আমার সাথে এই বছর ছয় সাত আলাপ। কত্তার সাথে আরো কিছু বেশী। খেটে খাওয়া বললেই করুণা হয়। না , এরা মাইনে পত্তর কলকাতার অফিস বাবুদের থেকে ঢেড় বেশীই পায়। তবু এদের জীবনের চাহিদা অন্যরকম। আমি তেমন কিছুই জানি না হয়ত। তবু যা জানি তা দিয়েই লক্ষ্মণ চরিত লিখতে বসা। আমার কত্তার কাছে মাঝি দার কাজ।আমার সাথে এই মাঝে মধ্যে কত্তার নানা ফাইল পত্তর আনা নেওয়া বা কোনো দায় দরকারে আসে যায় সেটুকুই আলাপ। আমি ওর মেমসাব। লক্ষ্মণকে দেখতে কালো, খাটো মাথা, টি শার্ট কিম্বা শার্ট আর প্যান্ট পরে যা খুবই সাধারণ মানের। পায়ে সাধাঋণ চপ্পল। একটা গামছা সঙ্গী গরমে, ঠান্ডায় জ্যাকেট, মাফলার এসব। এদের বয়স বোঝা দায় , দেখে যদি মনে হয় আর চার পাঁচ বছরের পর রিটিয়ারমেন্ট , জিগ্গেস করে হয়ত জানা গেল বলছে পঞ্চাশ। আবার কারোর দশ বছর চাকরি আছে কিন্তু শারীরিক বয়স কবেই ষাট ছুঁয়েছে। মাঝি দা ঐ পঞ্চাশ মতো হবে। চুল কাঁচা পাকা। যখনি দেখা "প্রণাম মেমসাব" বলে একগাল সরল হাসি।শুরুর দিকে হাঁ করা লক্ষ্মণ বলতাম। এই রকম অগুনতি মানুষ এখানের হাঁ করা। এক বললে আরেক শোনে, যা শুনলো বুঝলো আরো অন্য কিছু। সাহেব কোনো ফাইল আনতে বললেন, ও তাকে কি বুঝলো ওই জানে। ফোন করে না বলে দিলে ফাইলের বদলে আরো কত কি গিয়ে জুটতো সাহেবের আপিসে। ওদিক থেকে দাবড়ানি ঘাড়ে নিয়ে আবার লক্ষ্মণ এদিকে আসে, "এটা লয় মেমসাব, ওটা খুঁজত্যাছিল" বলে আবার কি বলে। মানুষের অভ্যস্হ হতে টাইম লাগে।তাই এরপর সাহেব আগে ফোন করে তারপর তাকে পাঠায়। আপিসেও অনেক ঝক্কি পোহায় সাহেব তাকে নিয়ে। কিন্তু এমন মানুষগুলো বড্ড দাগ কাটে মনে। বোকামির থেকে সরলতা তখন সামনে আসে। হঠাৎ ওদের সরলতা, ওদের মনুষ্যত্ব দেখে অবাক হতে হয়। এমন করেই সম্পর্কের জাল বোনা হয়। লক্ষ্মণের সাথে এভাবেই হৃদ্যতা বাড়তে থাকে। বিভূতি বাবুর আরণ্যকের সেই ফেলে আসা বইয়ের পাতার চরিত্রগুলো বার বার জলজ্যান্ত হয়ে ধরা দেয় এই মুনিডি মাইনসের জীবনে। কোলিয়ারি দেখছি বিয়ে হয়ে থেকে। এই একটাই মাইনসে জীবনের এতোটা কাটলো। যেখানে নেট খুললে আপডেটের পর আপডেট নতুন সবকিছুর সেখানে কয়লা মাখা এই কালো জীবন বড় অদ্ভুত। এখানে এখনো যুগ যুগ লাগবে শহুরে কালচার আসতে। এরা এখনো তেমন করে অনেক কিছু জানে না। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দিয়ে জীবন মাপা যায় না।

    আমরা সেবার মেয়ের এডমিশন নিয়ে ব্যস্ত, ছেলে ওর দাদু ঠাকুমা আসাতে ওনাদের সাথে রইলো , লক্ষ্মণকে বলে যাওয়া হয়েছিল , একটু দেখিস। ফোনে খবর পেতাম সে নাকি দুবেলা আসতো। আমার শ্বশুর মশাইয়ের কি লাগবে না লাগবে, তাকে নিয়ে বিকেলে বাইকে একটু বাজার ঘুরিয়ে আনা, নিজের বাড়ি নিয়ে যাওয়া, শাশুড়ি মায়ের পুজোর জোগাড়ের ফুল, বেল পাতা তোলা , ওদের একা লাগবে বলে সন্ধ্যায় এসে বসে থাকা এগুলো কোনো অফিস সম্পর্কে পরে না।এগুলোই একটু দেখা। লক্ষ্মণের সুগার আছে, তাই আমরাও একটু আধটু এটা ওটা বলি , বোঝাই। শরীরের যত্ন নিতে বলি। একবার হোলির আগে ওর দাদা মারা গেলেন, ও সাহেবের কাছে হোলির দিন সেই দাদার জন্য কেঁদে আকুল। লক্ষ্মণের বৌ, মা ,ছেলে , মেয়ে আরো কত কে আছে। কিছু বললেই" হ মেমসাব " বলে সম্মতি জানায়।হঠাৎ হঠাৎ অনেকদিনের জন্য সংসার সামলাতে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়। এসে কি সব কারণ দেয় । "সাহাব মা টার তবিয়ত গরবরাইলো।তাই সেন্ট্রাল লিয়ে গালি। " কখনো "সাহাব, আমাদের ঐ রাস্তার ধারের জমিটা নিয়ে বাবা কাকার লড়াই চলত্যাছিলো।" কিম্বা শোনপুরের হাটে পুরানো বলদগুলো বেচে আলি, একটা নতুন গাই নিলি।" লক্ষ্মণের কাজের অন্ত নাই।একবার সরস্বতী পুজোর পর প্যান্ডেল খুলেছে , সারা বাগানে ছোট ছোট পেরেক। সেবার সবাই তাজ্জব হয়ে গেছি ওকে দেখে , কোথা থেকে একটা চুম্বক এনেছিল, সারা বাগান সেটা দিয়ে পেরেক তুললো। পড়াশোনা করে রোজের কত টেনশনের জীবন সকলের। আর এই রকম একদল মানুষ যেন পৃথিবীর বাইরে বাস করছে। পুঁথিগত বিদ্যা তেমন নেই, শুধুই কাজ করতে জানে, সৎ থাকতে জানে। জীবনেকে এখনো অতো প্যাঁচালো করেনি, কোনো হিসেব দিয়ে সম্পর্ক মাপতে শেখে নি। লক্ষ্মণ মাঝির সাহেবের এতোকালে মুনিডির পাট চুকেছে। তাও কোয়ার্টারটা নানা কারণে বদলানো হয় নি। আমিয় এই মরসুমের প্রথম কচি সজনে, কচি নিমপাতা এনে দিলো। আজ আর সাহেবকে রোজ দেখে না সে। তবু হঠাৎ করে চলে আসে , মেমসাব বলে ডাক দেয়। সাহেবকে দেখলে চোখগুলো কেমন জল জল হয়ে যায় ওর। গেলো রবিবার জানে সাহেব ঘরে থাকবে , তাই এত্তগুলো বেল এনে জোটালো। সাহেব কি খুশী ওকে দেখে। বার বার মনে হয় মুনিডি ছাড়লে আর কি তোদের মতো মানুষ পাবো? আমরাও শহুরে হাওয়ায় পাল্টে যাবো। তোরা ভালো থাকিস। জীবনের যে দাঁড় তুই টানছিস সেই দাঁড়ের ভরসায় থাকা মানুষগুলো ভালো থাকুক। তুই সুগারটা কম রাখিস, ভালো থাকিস ।
  • Amit | 781212.198.235612.130 | ২৫ মার্চ ২০১৯ ০৮:০২382980
  • একটা মায়া জড়ানো লেখা। ভালো লাগলো পড়ে।
  • Dyuti Mustafi | ২৫ মার্চ ২০১৯ ১০:৩৮382981
  • ধন্যবাদ।
  • সুপর্ণা | 671212.193.013412.121 | ২৫ মার্চ ২০১৯ ২১:২০382982
  • সুন্দর, সাবলীল প্রকাশ।।।।।বড় ভাল লাগল।লক্ষণ মাঝি ভাল থাকুন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন