• টইপত্তর  অন্যান্য

  • বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

    Ankur Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | ২৪ আগস্ট ২০১৮ | ৮১৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ankur Chakraborty | ২৪ আগস্ট ২০১৮ ১০:৫৬376956
  • বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

    -অঙ্কুর

    ****

    বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, না, জীবনানন্দ দাশ নয়, আমার কথাই বলছি। আর বাংলার এই মুখ আমি কেবল যে গতকাল দুটি বিশেষ ফেসবুক পোস্টের কারণেই দেখলাম, তেমনটাও নয়। আমি বহুদিন যাবৎ একটা কথা বলে আসছি, এবং সেটা বাস্তব, সেটা হলো, "বাঙালির মুখে 'লাল সেলাম', মনে 'জয়শ্রীরাম'"। গতকালের যে পোস্টদুটির পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারনা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে, সেটা নিয়েই এবার কলম ধরা।

    গতকাল এক বন্ধুর সুবাদে দুটো লিঙ্ক পেলাম। যার দুটোই তার বেশ কয়েক ঘন্টা আগে থেকেই ভাইরাল হয়ে গেছিল, এবং সেইসব লিংকে থাকা কমেন্ট গুলো বাঙালির মধ্যে ক্রমবর্ধমান মনুবাদী সত্তাকে বের করে আনছিল, যেভাবে গর্ত থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে আসে পোকামাকড়।
    প্রথম লিংকে দেখলাম আলিপুরদুয়ার জেলার এক বালিকা বিদ্যালয়ে একটা অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের পাশাপাশি শিক্ষিকারাও গানের সাথে উদ্দাম নৃত্য করছেন।
    একে "শিক্ষিকা", তাতে "উদ্দাম নৃত্য", ব্যস, আর যাবে কোথায়? পুরুষতান্ত্রিক বঙ্গসমাজে (যাকে এতদিন বেশ উদার সমাজ বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হত) মহিলারা নাচবে? কেমন করে হয়? এই সমাজে, যেখানে মনোহরলাল খট্টরের মত কট্টর হিন্দুত্ববাদী জানোয়ারদের মনুবাদী মনোভাবকে আমরা ফেসবুকে নিন্দিত করে নিজেদের মহান প্রমান করতে ব্যস্ত, পাশাপাশি সেই আমরাই স্কুলের আনন্দানুষ্ঠানে মেয়েরা নাচলে, তার ওপর তারা যদি শিক্ষিকা হন, তাহলে খট্টরপন্থী হিন্দু হয়ে উঠি। কারন, মনের গহীন কোণে কোথাও না কোথাও আমরা বিশ্বাস করি যে বাঙালি মেয়েরা ওই চিরাচরিত ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। সেই "সংস্কৃতি" (ভুলেও অপসংস্কৃতি বলবেন না, বরং রচনা লিখুন কেমনভাবে আপনি এই সংস্কৃতির জন্য প্রাউড ইন্ডিয়ান), যা আপনার চোখে নারী মানেই হেঁসেল ঠেলা, "স্বামী"র আদেশ মুখ বুঁজে পালন করে যাওয়া, এবং অবশ্যই গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা জন্ম দিয়ে প্রকৃত নারী হওয়ার "দায়িত্ব ও কর্তব্য" পালন করে যাওয়াকে বোঝায়। অতএব, তারা যদি নাচে, তাদের নাচ দেখে তো আপনার হঠাৎ করে জাঙ্গিয়ার ভিতরটা ফুলে উঠবে, অন্ডকোষ চুলকাবে, তারপর "উফফ, কি ডবকা মাল মাইরি" বলে ঝাঁপিয়ে পড়তে, ধর্ষণ করতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু আপনি ফেসবুকে এবং চোখেমুখে নীতিবাদের পরাকাষ্ঠা সেজে নিদান দেবেন, কারন আপনি চান না যে মহিলারা বাড়ির বাইরে বেরোক। স্কুলে পড়ানো তো দূরের কথা এবং তার ওপর নাচা? ছিঃ!

    ওনাদের উচিত ছিল সারদা বালিকা বিদ্যালয়ের সন্ন্যাসিনীদের মত মাথায় গেরুয়া ঘোমটা দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে নিদান দেওয়া অথবা মাদ্রাসার ছাত্রীদের বোরখায় চোখ নাক মুখ ঢেকে হুজুরদের ফতোয়া শোনা এবং মুখ বুঁজে মেনে নেওয়া।
    কারন, মুখে বা মুখবইতে যতই নিজেকে লি-বেড়াল বা নারীবাদী, নারী সুরক্ষার বার্তাবাহক দেবদূত হিসেবে তুলে ধরুন না কেন, আপনি চান যে সৌদি আরবের মত এখানেও মেয়েদের পিটিয়ে মারা হোক, আপনি চান যে হরিয়ানার মত এখানেও অনার কিলিং হোক, কারন ওরা যে আপনার, অর্থাৎ পুরুষের, আপনার পুরুষত্বের অনারকে ঘা দিয়েছে!!!

    এবার আসি, দ্বিতীয় এবং আরও গুরুতর লিংকের বিষয়ে। একটা ফটোগ্রাফির পাতা, যা বেশ কিছুদিন ধরেই বাঙালি মেয়েদের ছবি দিয়ে আসছে (বা হয়তো কালকের পরে সেটা অতীত হয়ে গেছে, বা নিকট ভবিষ্যতে হয়ে যাবে), সেখানে একজন আলোকচিত্রীর তোলা ছবিতে একজন মহিলা কেবলমাত্র বাঙালির বিয়ের মুকুট পরে, হাতের গাছকৌটোয় নিজের যোনিমুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। আছে, তো আছে! ছবিটা ভালোভাবে তোলা হয়নি, তার মধ্যে ন্যুড আর্টের সৌন্দর্য বিন্দুমাত্রও নেই। বেশ, এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু, না, বিয়ের মত "পবিত্র" রীতিকে অপমান করেছেন যে ফটোগ্রাফার! গাছকৌটো মানে লক্ষ্মীর প্রতীক, লক্ষ্মী মানে হিন্দু দেবী, সুতরাং হরহর করে মহাদেব করতে করতে আপনি চলে এলেন হিন্দুত্বের অপমানের প্রতিকার করতে। ফটোগ্রাফার এবং মডেলের (যার মুখ বোঝাও যাচ্ছে না, কোত্থেকে তার বা অন্য কারও একজনের প্রোফাইল লিঙ্ক বের করে ) মাথার দাম ধার্য করতে। ঠিক যেমনটা উত্তরভারতের হিন্দুস্তানী বলয়ের নরাধমগুলো করে। আপনি এতদিন বলিউড দেখে ওদের অনুসরণ করেছেন। হেব্বি ম্যাচো ব্যাপারস্যাপার ওদের, তাই না? তাই, আপনাকেও ওদের মত ম্যাচো, হতে হবে। মাথার দাম ধার্য করতে হবে, খুনের হুমকি দিতে হবে, তবে না আপনি বাঙালির মত মেয়েলি, ম্যাদামারা জাতি থেকে গর্বিত ভারতীয় স্তরে উন্নীত হবেন? কারন, ভারতীয়ত্ব মানেই তো পৌরুষের আস্ফালন। কিন্তু বিয়ের মত "পবিত্র" (আপনাদের মতে) রীতিকে রোজ অপমান করে আপনার মা-বাবার মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে যে আপনার বৌয়ের সতীচ্ছদা ফাটানোর চেষ্টা করেন, তাও তার অনুমতি ব্যতীত; তার বেলা? ওহ, ওটা যে এখন আপনার আইন স্বীকৃত অধিকার। কারন, পুরুষ-বর্ষের মহামান্য আদালত যে বলেই দিয়েছে, বিয়ের পরে আবার ধর্ষণ কি?

    তা, বেশ। এইসব পুরুষালি, ম্যানলি, ম্যাচো, হাঙ্কি ব্যাপারে গা ভাসিয়েছেন যখন, তখন ধর্ম রক্ষা ও ধর্ম সংস্থাপনার দায়িত্ব যে আপনাদের মত মহা"পুরুষ"দের ওপর। অতএব, এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে হট টপিক হলো, নিজেকে বেশি বেশি করে হিন্দু, মুসলমান প্রমান করা। আর সেটা করতে হলে নারীর স্বাধীনতা, অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং তার পাশাপাশি ফেসবুকে হুমকির বন্যা বইয়ে দেওয়া। ছবির নীচের মন্তব্য গুলি সেরকমই। যারা একটু মৃদু, তারা "ইশ, সমাজটা উচ্ছন্নে গেল!", "মেয়েটার লজ্জা-শরম নেই", "ফটোগ্রাফির বলিহারি" বলে থেমে গেলেন, মঝঝিমা পন্থার লোকজন কেবল কমেন্টের মাধ্যমে "মাগী", "খানকি", "বেশ্যা", "রেন্ডি" বলে মনে মনে বেশ কয়েকবার মেয়েটাকে খাটে তুলে উদ্দাম ঠাপ দেওয়ার সুখ নিয়ে নিলো, আর তারপরেই এলো উগ্র হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী (এটাই যদি মিয়া খলিফার বদলে সত্যিকারের কোন মুসলমান মেয়ে কেবল হিজাবে মুখ ঢেকে বাকিটা উলঙ্গ হয়ে ছবি তুলতো, তাহলে আসতো কাঠ-মোল্লার দল, একই ধারাভাষ্য নিয়ে), তারা বললো "হিন্দু খতরে মে হ্যায়!", "হর হর মহাদেব, ফটোগ্রাফারকে মেরে ফেসবুকে পোস্ট না দিয়েছি তো আমার নাম অমুক সিং রাজপুত (যদিও বাঙালির ছেলে, কিন্তু নামের পোঁদে রাজপুত, আর ব্র্যাকেটে নাগরী হরফ) নয়!" ইত্যাদি।

    আর তার ফলশ্রুতি হিসেবে, বাঙালি ফটোগ্রাফার ছেলেটি ভয় পেয়ে ওদের নৈতিক বিজয় ঘোষণা করে ছবিতে শাড়ি পরিয়ে দিলো (যদিও সেটা ফটোগ্রাফির ধরনের চাইতেও জঘন্য ফটোশপ)।
    হ্যাঁ, আমরা এটা বেশ ভালোমতোই জানি যে ওইসব সিং রাজপুত জাতীয় নব্য বাঙালি হিন্দুর কিছুই করার ক্ষমতা নেই, বরং আমাদের মহান আইন ব্যবস্থা হয়তো ধর্ম-নুনুভূতিতে আঘাত করার "অপরাধে" ফটোগ্রাফার ও মডেলকে হেনস্থা করবে, গ্রেপ্তার করবে এবং প্ৰথমে ছবি প্ৰকাশ করে তারপর তাদের পরিচয় গোপন করার খেলা খেলবে, বলবে "ভুল হয়ে গেছিল"। কিন্তু, তারা এইসব সমাজে বেড়ে ওঠা সম্ভাব্য খুনি, ধর্ষকদের সেফগার্ড করবে। কারন, এদের ধরলে যে ওপর মহলের চাপ আসবে, বড়বাবুর চাকরিও চলে যেতে পারে।
    কিন্তু, যদি এইসব সম্ভাব্য খুনি বাস্তবের খুনি হয়েই ওঠে, পারবেন তো ধর্মের "অবমাননাকারী"কে সেফগার্ড করতে? না কি বামের মুখোশ খুলে রামের মুখ বেরিয়ে পড়া বাঙালির মত প্রশাসনও বলবে, "ধর্মের অপমান করেছে, তাই মেরেছে! বেশ করেছে!" ?

    আবার, এই প্রশাসনের কর্তারা এবং এইসব খুনিরাই তাদের ছেলেমেয়েদের বই পড়ে বিদ্যাসাগরের জীবনী মুখস্থ করতে বলবে, পরের সপ্তাহে বাংলা, ইতিহাস পরীক্ষা না?
    আর বিদ্যাসাগর হয় লজ্জায় মুখ ঢাকবেন, নয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন, ভাগ্যিস মরে বেঁচে গেছেন। না হলে কতবার কত লোকের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে, নারী মুক্তির কথা বলে কতবার যে তার টাইমলাইনে খুনের হুমকি পেতেন! কে জানে?
  • Ankur Chakraborty | ২৪ আগস্ট ২০১৮ ১০:৫৬376955
  • বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

    -অঙ্কুর

    ****

    বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, না, জীবনানন্দ দাশ নয়, আমার কথাই বলছি। আর বাংলার এই মুখ আমি কেবল যে গতকাল দুটি বিশেষ ফেসবুক পোস্টের কারণেই দেখলাম, তেমনটাও নয়। আমি বহুদিন যাবৎ একটা কথা বলে আসছি, এবং সেটা বাস্তব, সেটা হলো, "বাঙালির মুখে 'লাল সেলাম', মনে 'জয়শ্রীরাম'"। গতকালের যে পোস্টদুটির পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারনা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে, সেটা নিয়েই এবার কলম ধরা।

    গতকাল এক বন্ধুর সুবাদে দুটো লিঙ্ক পেলাম। যার দুটোই তার বেশ কয়েক ঘন্টা আগে থেকেই ভাইরাল হয়ে গেছিল, এবং সেইসব লিংকে থাকা কমেন্ট গুলো বাঙালির মধ্যে ক্রমবর্ধমান মনুবাদী সত্তাকে বের করে আনছিল, যেভাবে গর্ত থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে আসে পোকামাকড়।
    প্রথম লিংকে দেখলাম আলিপুরদুয়ার জেলার এক বালিকা বিদ্যালয়ে একটা অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের পাশাপাশি শিক্ষিকারাও গানের সাথে উদ্দাম নৃত্য করছেন।
    একে "শিক্ষিকা", তাতে "উদ্দাম নৃত্য", ব্যস, আর যাবে কোথায়? পুরুষতান্ত্রিক বঙ্গসমাজে (যাকে এতদিন বেশ উদার সমাজ বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হত) মহিলারা নাচবে? কেমন করে হয়? এই সমাজে, যেখানে মনোহরলাল খট্টরের মত কট্টর হিন্দুত্ববাদী জানোয়ারদের মনুবাদী মনোভাবকে আমরা ফেসবুকে নিন্দিত করে নিজেদের মহান প্রমান করতে ব্যস্ত, পাশাপাশি সেই আমরাই স্কুলের আনন্দানুষ্ঠানে মেয়েরা নাচলে, তার ওপর তারা যদি শিক্ষিকা হন, তাহলে খট্টরপন্থী হিন্দু হয়ে উঠি। কারন, মনের গহীন কোণে কোথাও না কোথাও আমরা বিশ্বাস করি যে বাঙালি মেয়েরা ওই চিরাচরিত ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। সেই "সংস্কৃতি" (ভুলেও অপসংস্কৃতি বলবেন না, বরং রচনা লিখুন কেমনভাবে আপনি এই সংস্কৃতির জন্য প্রাউড ইন্ডিয়ান), যা আপনার চোখে নারী মানেই হেঁসেল ঠেলা, "স্বামী"র আদেশ মুখ বুঁজে পালন করে যাওয়া, এবং অবশ্যই গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা জন্ম দিয়ে প্রকৃত নারী হওয়ার "দায়িত্ব ও কর্তব্য" পালন করে যাওয়াকে বোঝায়। অতএব, তারা যদি নাচে, তাদের নাচ দেখে তো আপনার হঠাৎ করে জাঙ্গিয়ার ভিতরটা ফুলে উঠবে, অন্ডকোষ চুলকাবে, তারপর "উফফ, কি ডবকা মাল মাইরি" বলে ঝাঁপিয়ে পড়তে, ধর্ষণ করতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু আপনি ফেসবুকে এবং চোখেমুখে নীতিবাদের পরাকাষ্ঠা সেজে নিদান দেবেন, কারন আপনি চান না যে মহিলারা বাড়ির বাইরে বেরোক। স্কুলে পড়ানো তো দূরের কথা এবং তার ওপর নাচা? ছিঃ!

    ওনাদের উচিত ছিল সারদা বালিকা বিদ্যালয়ের সন্ন্যাসিনীদের মত মাথায় গেরুয়া ঘোমটা দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে নিদান দেওয়া অথবা মাদ্রাসার ছাত্রীদের বোরখায় চোখ নাক মুখ ঢেকে হুজুরদের ফতোয়া শোনা এবং মুখ বুঁজে মেনে নেওয়া।
    কারন, মুখে বা মুখবইতে যতই নিজেকে লি-বেড়াল বা নারীবাদী, নারী সুরক্ষার বার্তাবাহক দেবদূত হিসেবে তুলে ধরুন না কেন, আপনি চান যে সৌদি আরবের মত এখানেও মেয়েদের পিটিয়ে মারা হোক, আপনি চান যে হরিয়ানার মত এখানেও অনার কিলিং হোক, কারন ওরা যে আপনার, অর্থাৎ পুরুষের, আপনার পুরুষত্বের অনারকে ঘা দিয়েছে!!!

    এবার আসি, দ্বিতীয় এবং আরও গুরুতর লিংকের বিষয়ে। একটা ফটোগ্রাফির পাতা, যা বেশ কিছুদিন ধরেই বাঙালি মেয়েদের ছবি দিয়ে আসছে (বা হয়তো কালকের পরে সেটা অতীত হয়ে গেছে, বা নিকট ভবিষ্যতে হয়ে যাবে), সেখানে একজন আলোকচিত্রীর তোলা ছবিতে একজন মহিলা কেবলমাত্র বাঙালির বিয়ের মুকুট পরে, হাতের গাছকৌটোয় নিজের যোনিমুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। আছে, তো আছে! ছবিটা ভালোভাবে তোলা হয়নি, তার মধ্যে ন্যুড আর্টের সৌন্দর্য বিন্দুমাত্রও নেই। বেশ, এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু, না, বিয়ের মত "পবিত্র" রীতিকে অপমান করেছেন যে ফটোগ্রাফার! গাছকৌটো মানে লক্ষ্মীর প্রতীক, লক্ষ্মী মানে হিন্দু দেবী, সুতরাং হরহর করে মহাদেব করতে করতে আপনি চলে এলেন হিন্দুত্বের অপমানের প্রতিকার করতে। ফটোগ্রাফার এবং মডেলের (যার মুখ বোঝাও যাচ্ছে না, কোত্থেকে তার বা অন্য কারও একজনের প্রোফাইল লিঙ্ক বের করে ) মাথার দাম ধার্য করতে। ঠিক যেমনটা উত্তরভারতের হিন্দুস্তানী বলয়ের নরাধমগুলো করে। আপনি এতদিন বলিউড দেখে ওদের অনুসরণ করেছেন। হেব্বি ম্যাচো ব্যাপারস্যাপার ওদের, তাই না? তাই, আপনাকেও ওদের মত ম্যাচো, হতে হবে। মাথার দাম ধার্য করতে হবে, খুনের হুমকি দিতে হবে, তবে না আপনি বাঙালির মত মেয়েলি, ম্যাদামারা জাতি থেকে গর্বিত ভারতীয় স্তরে উন্নীত হবেন? কারন, ভারতীয়ত্ব মানেই তো পৌরুষের আস্ফালন। কিন্তু বিয়ের মত "পবিত্র" (আপনাদের মতে) রীতিকে রোজ অপমান করে আপনার মা-বাবার মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে যে আপনার বৌয়ের সতীচ্ছদা ফাটানোর চেষ্টা করেন, তাও তার অনুমতি ব্যতীত; তার বেলা? ওহ, ওটা যে এখন আপনার আইন স্বীকৃত অধিকার। কারন, পুরুষ-বর্ষের মহামান্য আদালত যে বলেই দিয়েছে, বিয়ের পরে আবার ধর্ষণ কি?

    তা, বেশ। এইসব পুরুষালি, ম্যানলি, ম্যাচো, হাঙ্কি ব্যাপারে গা ভাসিয়েছেন যখন, তখন ধর্ম রক্ষা ও ধর্ম সংস্থাপনার দায়িত্ব যে আপনাদের মত মহা"পুরুষ"দের ওপর। অতএব, এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে হট টপিক হলো, নিজেকে বেশি বেশি করে হিন্দু, মুসলমান প্রমান করা। আর সেটা করতে হলে নারীর স্বাধীনতা, অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং তার পাশাপাশি ফেসবুকে হুমকির বন্যা বইয়ে দেওয়া। ছবির নীচের মন্তব্য গুলি সেরকমই। যারা একটু মৃদু, তারা "ইশ, সমাজটা উচ্ছন্নে গেল!", "মেয়েটার লজ্জা-শরম নেই", "ফটোগ্রাফির বলিহারি" বলে থেমে গেলেন, মঝঝিমা পন্থার লোকজন কেবল কমেন্টের মাধ্যমে "মাগী", "খানকি", "বেশ্যা", "রেন্ডি" বলে মনে মনে বেশ কয়েকবার মেয়েটাকে খাটে তুলে উদ্দাম ঠাপ দেওয়ার সুখ নিয়ে নিলো, আর তারপরেই এলো উগ্র হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী (এটাই যদি মিয়া খলিফার বদলে সত্যিকারের কোন মুসলমান মেয়ে কেবল হিজাবে মুখ ঢেকে বাকিটা উলঙ্গ হয়ে ছবি তুলতো, তাহলে আসতো কাঠ-মোল্লার দল, একই ধারাভাষ্য নিয়ে), তারা বললো "হিন্দু খতরে মে হ্যায়!", "হর হর মহাদেব, ফটোগ্রাফারকে মেরে ফেসবুকে পোস্ট না দিয়েছি তো আমার নাম অমুক সিং রাজপুত (যদিও বাঙালির ছেলে, কিন্তু নামের পোঁদে রাজপুত, আর ব্র্যাকেটে নাগরী হরফ) নয়!" ইত্যাদি।

    আর তার ফলশ্রুতি হিসেবে, বাঙালি ফটোগ্রাফার ছেলেটি ভয় পেয়ে ওদের নৈতিক বিজয় ঘোষণা করে ছবিতে শাড়ি পরিয়ে দিলো (যদিও সেটা ফটোগ্রাফির ধরনের চাইতেও জঘন্য ফটোশপ)।
    হ্যাঁ, আমরা এটা বেশ ভালোমতোই জানি যে ওইসব সিং রাজপুত জাতীয় নব্য বাঙালি হিন্দুর কিছুই করার ক্ষমতা নেই, বরং আমাদের মহান আইন ব্যবস্থা হয়তো ধর্ম-নুনুভূতিতে আঘাত করার "অপরাধে" ফটোগ্রাফার ও মডেলকে হেনস্থা করবে, গ্রেপ্তার করবে এবং প্ৰথমে ছবি প্ৰকাশ করে তারপর তাদের পরিচয় গোপন করার খেলা খেলবে, বলবে "ভুল হয়ে গেছিল"। কিন্তু, তারা এইসব সমাজে বেড়ে ওঠা সম্ভাব্য খুনি, ধর্ষকদের সেফগার্ড করবে। কারন, এদের ধরলে যে ওপর মহলের চাপ আসবে, বড়বাবুর চাকরিও চলে যেতে পারে।
    কিন্তু, যদি এইসব সম্ভাব্য খুনি বাস্তবের খুনি হয়েই ওঠে, পারবেন তো ধর্মের "অবমাননাকারী"কে সেফগার্ড করতে? না কি বামের মুখোশ খুলে রামের মুখ বেরিয়ে পড়া বাঙালির মত প্রশাসনও বলবে, "ধর্মের অপমান করেছে, তাই মেরেছে! বেশ করেছে!" ?

    আবার, এই প্রশাসনের কর্তারা এবং এইসব খুনিরাই তাদের ছেলেমেয়েদের বই পড়ে বিদ্যাসাগরের জীবনী মুখস্থ করতে বলবে, পরের সপ্তাহে বাংলা, ইতিহাস পরীক্ষা না?
    আর বিদ্যাসাগর হয় লজ্জায় মুখ ঢাকবেন, নয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন, ভাগ্যিস মরে বেঁচে গেছেন। না হলে কতবার কত লোকের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে, নারী মুক্তির কথা বলে কতবার যে তার টাইমলাইনে খুনের হুমকি পেতেন! কে জানে?
  • ... | 9001212.56.340112.94 | ২৪ আগস্ট ২০১৮ ১২:৪৮376957
  • এই বঞ্চিত বাঞ্চদটা এখানেও বাংলা বাঙালিপক্ষ চোদাতে এসেছে?
  • | ২৪ আগস্ট ২০১৮ ১৩:০৭376958
  • উনি তো লগিন করে নাম টাম দিয়েই লিখেছেন। আপনি কে পুটকি দিয়ে খেউড় মারছেন?

    লেখাটা প্রসঙ্গে ঃ হ্যাঁ চাড্ডিকুল খুব লাফাচ্ছে দেখলাম দ্বিতীয় কেসটায়। পুলিশ এই মাথার দাম ধার্য্যকারীকে ধরবে কিনা জানা নেই তবে সুস্থবুদ্ধির মানুষদের এই দাবী জানানো খুব প্রয়োজন।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
    • কি, কেন, ইত্যাদি
    • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
    • আমাদের কথা
    • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
    • বুলবুলভাজা
    • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
    • হরিদাস পালেরা
    • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
    • টইপত্তর
    • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
    • ভাটিয়া৯
    • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
    যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন