এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্মৃতিচারণ  স্মৃতিকথা

  • কিছুক্ষণ ৩ 

    হীরেন সিংহরায় লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | স্মৃতিকথা | ২৭ মে ২০২৩ | ৮৫৯ বার পঠিত
  • কিছুক্ষণ
     
    এস্তাদিও দো মারাকানা , রিও দে ঝানেইরো 
     
    জুলাই ৪, ২০১৪ 
     
            _-     তাহলে এই অবধি এসে পৌঁচেছি ! বিশ্বাস হচ্ছে না । 
    -       -      এক জীবনে অনেক জীবন মেলে  , বাবা। কীপ  দি ফেথ ! 
     
    স্টেডিয়ামের ডান দিকে গাড়ি থেকে নেমে পথচারীদের রাস্তা পারাপারের জন্য নির্মিত সেতুর ওপরে দাঁড়িয়ে প্রথম বার দেখলাম  এস্তাদিও দো মারাকানা.  ইন্দ্রনীলের কাঁধে  হাত রেখে বলেছি
     
     “ বন জোভির সেই গানটা মনে আছে তোর?  লিভিং অন এ প্রেয়ার ? দ্যাখ, উই হ্যাভ মেড ইট টু মারাকানা ! “ 
     
    পিতা পুত্রের  ফুটবলের যাত্রা গান শুরু হয়েছিল একদিন উত্তর পশ্চিম লন্ডনের পাড়ার মাঠ থেকে - স্থানীয়  লিগে হেনডন এফ সি বনাম কিংসটোনিয়ান দলের খেলা যখন দেখি তখন  ইন্দ্রনীলের  বয়েস আট । পরের বছর নিকটবর্তী বোরহ্যামউড গ্রামের মাঠে সদ্য প্রিমিয়ার লিগ বিজয়ী আর্সেনালের প্রীতি প্রদর্শনী ম্যাচ -ইন্দ্রনীল ততদিনে জেনে গেছে তার বাকি জীবনের  সুখ দুঃখ উত্তর লন্ডনের আর্সেনাল ফুটবল দলের  সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িত হয়ে রইল। দশ বছরের জন্মদিনে পুরনো ওয়েম্বলির অলিম্পিক গ্যালারিতে বসে দেখেছি প্রথম আন্তর্জাতিক খেলা: ইংল্যান্ড বনাম চিলি – তরুনতম খেলোয়াড় হিসেবে মাইকেল ওয়েন সেদিন ইংল্যান্ড জার্সি পরে মাঠে নামলেন ।  তারপরে আর্সেনালের মাঠে নিয়মিত  আসা যাওয়া , সিজন টিকেট, হাইবেরি মাঠ , পরে এমিরেটস-  কোনদিন দলের খেলা দেখতে ওল্ড ট্রাফোর্ড ,  ম্যানচেস্টার ; অ্যানফিল্ড , গুডিসন পার্ক , লিভারপুল , স্ট্যানফোরড ব্রিজ, চেলসি ।  সে থাকে তার মায়ের কাছে, সপ্তাহান্তে দেখা হয়।  লেখা পড়ার কথা খুব কম কেবল আর্সেনাল ও ফুটবল আমাদের দুজনকে বেঁধে রেখেছে এক সূত্রে । নিক হর্নবির ফিভারপিচ বইতে নিজের জবানিতে তিনি এমনি একজন আর্সেনাল পাগল ছেলের কথা লিখেছেন যার সঙ্গে তার বাবার যোগাযোগ শুধু আর্সেনালের মাঠে ( গেট এইচ ব্লক ১১১ রো ২৭ সীট ৫৭০ ৫৭১)। মনে হয়েছিল এটা তো আমার আর ইন্দ্রনীলের গল্প। তারপরে একদিন দেশ ছেড়ে বিদেশে , কোপেনহেগেনের পারকেন,  প্যারিসের স্টাদ দে ফ্রঁস আর্সেনাল বনাম বার্সেলোনা, এবং ফুটবল বিশ্বকাপ-  গেলসেনকিরশেন, ডরটমুণ্ড; জার্মানি ২০০৬,  জোহানেসবুরগ;  দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০। 
     
    এবার ব্রাজিল:  রিও , সান পাউলো , মারাকানা এবং সান্তস  !
     
    মারাকানা এক  কিংবদন্তির রঙ্গমঞ্চ ! নিজের দেশের মাটিতে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জেতার সংগ্রাম। ৬৪ বছর আগে উরুগুয়ে তাদের   স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়েছিল – সাঁও পাওলোর ফুটবল মিউজিয়ামে সে ম্যাচের রেকর্ডিং আছে। উরুগুয়ে গোল করলে দু লক্ষ মানুষের সমাবেশ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় – নিঃশব্দতা যে বাঙময় হতে পারে তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ।
     
    আগেরদিন পাহাড়ের ওপর থেকে পরিত্রাতা জিশুর মূর্তির পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে দেখেছি অনেক দূরে একটি  বিশাল  চাকার আকৃতির স্টেডিয়াম।  সেখানে যাবো কাল। 
     

     

    জার্মানি বনাম ফ্রান্স – কোয়ার্টার ফাইনাল , বিশ্বকাপ ২০১৪ 
     
    এই দুই জাত শত্রু অস্ত্র হাতে মুখোমুখি হয়েছে অনেক বার । ফুটবলের  বিশ্বকাপ বিজয়ের বাসনা কোন যুদ্ধ জয়ের চেয়ে কিছু কম নয়। তাই তিন দশক আগের এক সন্ধ্যের কথা মনে পড়ল অনিবার্যভাবে।  
     
     
    প্রাক কথন 
     
    বিশ্ব কাপ ফুটবল , স্পেন ১৯৮২ 
     
    ২৫শে জুন স্পেনের দিজন  শহরে অনুষ্ঠিত  জার্মানি বনাম অস্ট্রিয়ার বি গ্রুপের  শেষ খেলাটির ফলাফল ম্যাচ  শুরুর আগেই নির্ধারিত হয়েছিল- জার্মানিকে জিততে হবে ১-০ অথবা ২-০ গোলে । কোথা থেকে উটকো আলজেরিয়ান টিম এসে প্রথম খেলায় ২-১ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে দিলে পর ইউরোপীয়দের নিজেদের অঙ্কটা ওলট পালট হয়ে গেল। আগের দিন  চিলির বিরুদ্ধে আলজেরিয়া জিতেছে  ২-১ গোলে -তাদের পয়েন্ট চার।  অস্ট্রিয়ারও চার  ( সে সময়ে জিতলে দু পয়েন্ট পাওয়া যেতো ) , জার্মানির দুই।  পরের লেভেলে খেলতে গেলে  জার্মানিকে ম্যাচ জিততে হবে অন্তত ১-০ গোলে।  তাহলে অস্ট্রিয়া এবং জার্মানি দু দল উঠবে পরের গ্রুপে, আলজেরিয়া বাড়ি ফেরার প্লেন ধরবে ।  কিমাশ্চরযম   - ১০ মিনিটের মাথায় জার্মানি গোল করল – পরের আশি মিনিট বাইশ জন মহারথী এক গোলাকৃতি বস্তুটিকে যাতে কোনমতে কোন  গোলে প্রবেশ না করতে পারে তার যে চেষ্টা চালালেন তাকে নানান নামে বিভূষিত করা হয়েছে – দিজনের কলঙ্ক, অনাক্রমণ চুক্তি, আনশ্লুস;  আরবিতে  দিজনের ফজিহত বা স্ক্যানডাল । পরে জার্মানির অধিনায়ক স্বীকার করেন ১-০ ফলাফল আগে থেকেই স্থির হয়েছিল ; কোন খেলায় গোল করতে মেহনতের প্রয়োজন,  এখানে গোল না করার মেহনত ছিল অনেক বেশি।  এই নির্লজ্জ ম্যাচ ফিক্সিং থেকে অবশ্য একটি ভাল ফল পাওয়া গেল – কোন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যে কোন গ্রুপের সব শেষ খেলাটি এখন একই দিনে একই সময়ে হয় যাতে কেউ অন্য ম্যাচের ফলাফল  দেখে নিয়ে সাট্টা না খেলেন।  
     
    সেদিন আমি মিউনিকের পাবে এ ম্যাচ দেখি। সমবেত জার্মানরা জাতীয়তাবাদ শিকেয় তুলে নিজেদের  খেলোয়াড়দের তুলোধোনা করতে থাকে সারা সময় । অস্ট্রিয়ার ফিফা চিফ অর্বাচীনের মতো বলেছিলেন,  মরুভূমির লোকেরা কি ভেবেছিল ? বিশ্বকাপ জেতা এত সহজ ?
     
    পরের রাউনডে স্পেন ও ইংল্যান্ডকে টপকে  জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া ও উত্তর আয়ারল্যান্ডকে  টপকে ফ্রান্স সেমি ফাইনালে মুখোমুখি দাঁড়াবে সেভিয়া শহরে।  
     
    বৃহস্পতিবার , ৮ জুলাই , ১৯৮২ 
     
    জার্মানি বনাম ফ্রান্স – সেমি ফাইনাল 
     
    ফ্রাঙ্কফুর্টের বাড়িতে বসে টেলিভিশনে দেখছি -  দিজনের জার্মানিকে চেনা যায় না  রীতিমত বাঘ সিংহের লড়াই । 
     
    পিয়ের লিটবারস্কির গোল এবং মিশেল প্লাতিনির পেনাল্টির পরে স্কোর ১-১ 
     
    নির্ধারিত  সময় প্রায় শেষ – হঠাৎ মিশেল  প্লাতিনির পাস পেয়ে প্যাত্রিক বাতিসতঁ জার্মান গোলের দিকে ধাবমান ( তাঁর নিজের কথায় , একেবারে ফাঁকা গোল , যেন  ভোর পাঁচটার সঞ্জে  লিজে )।  গোলকিপার টোনি শুমাখার অসম্ভব দ্রুত গতিতে ছুটে এসে হাত এবং কনুই সহযোগে তাঁকে ধাক্কা  দিলেন। এই সংঘর্ষের ফলে বাতিসতঁ অজ্ঞান  , দুটো রিব , দুটো দাঁত উড়ে গেল।  টোনি ধীরগতিতে নিজের গোলের দিকে হাঁটলেন।  বাতিসতঁ বেঁচে আছেন কিনা সেটা জানবার কোন কৌতূহল তিনি দেখান নি বরং বাতিসতঁকে স্ট্রেচারে  নিয়ে যেতে এত দেরি  হচ্ছে কেন এ প্রশ্ন করেন। কোন সাজা নয়,  ডাচ রেফারি করভের গোল কিকের নির্দেশ দিলেন।  পরে রেফারি বলেন  ঘটনাটি তিনি ঠিক মতন লক্ষ্য করেন নি।  ভিডিও রেফারি আসতে অনেক দিন বাকি । অতিরিক্ত সময়ের খেলার ফল ৩-৩ , পেনাল্টি শুট  আউটে জার্মানি বিজয়ী ( বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম শুট  আউট ) । শুমাখার দুটি পেনাল্টি বাঁচালেন।।  



     
    ফুটবলের মাঠে এ ধরনের  নৃশংস  আক্রমণ এক বিরল ঘটনা ।  শুমাখার কোন রকমের সমবেদনা জানান নি, সেদিন নয় , তিরিশ বছর পরেও নয়।  তিনি তাঁর কর্তব্য পালন করছিলেন ( নুরেমবেরগের বিচারে  এমন কথা শোনা গেছে অনেকবার )।  আপন গোল রক্ষা তাঁর কাজ। পরের দিন আমাদের অফিসে এ নিয়ে তুমুল বাত বিতণ্ডা চলল – শুধু জনা তিনেক ফরাসি নয়, কয়েকজন জার্মান সহকর্মী কড়ি  সে কড়ি  নিন্দা করলেন।  ফরাসি প্রেসের গ্যালাপ পোল  অনুযায়ী  শুমাখার সবচেয়ে ঘৃণিত জার্মানের স্থান গ্রহণ করে হিটলারের বাঁধা আসনটি  টলিয়ে  দিলেন। জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট শ্মিড ফরাসি রাষ্ট্রপতির কাছে সহানুভূতির বাণী  পাঠান ।  
     
    দু বছর বাদে স্ত্রাসবুরগে দু দেশের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলো।  দর্শকের গ্যালারিতে শুমাখাররুপী একটি প্রকাণ্ড পুতুলকে ফাঁসিতে লটকানো হয়েছিল । 
     
    এই দুই দল ? আবার বিশ্বকাপে ? অশনি সঙ্কেত দেখা যায় কি আকাশে ?
     
    শুক্রবার , ৪ জুলাই ২০১৪ মারাকানা ষ্টেডিয়াম 
    কাল তিন ঘটিকা 
     
    যে কোন নাটকের গোড়ায় পাত্র পাত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে  দেওয়া হয় , তারপরে ঘটনার ঘন ঘটা -   রাইজিং অ্যাকশন!   সেটির  পরিণতি  ক্লাইম্যাক্সে ; অতঃপর ফলিং অ্যাকশন । বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার  অভিজ্ঞতা থেকে  স্বচ্ছন্দে বলতে পারি  নাট্য শাস্ত্রীদের এই বিন্যাসের সঙ্গে ফুটবল খেলাটা হুবহু মিলে যায় । তফাত এই যে সবটাই মঞ্চে বা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় না ।  পাত্রদের নাম ধাম , প্রতি সপ্তাহের বেতন কত তা আমরা জানি ।  তাদের ভূমিকা এই নাটিকার ক্লাইম্যাক্স পর্বে , মানে মাঠের ভেতরে।  খেলা শুরুর আগে মঞ্চের চারপাশে যা  চলতে থাকে সেটা রাইজিং অ্যাকশন, সেটা আমার কাছে আসল খেলার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়!  ম্যাচের কয়েকদিন আগে থেকেই শহরের পথঘাট  ভরে যায় -  নানান দেশের পতাকা, মুখে রং, মাথায় বিচিত্র টুপি , ক্লাউনের সাজ সজ্জা ,  ফুটপাথে ম্যাপ ও  ছবি আঁকা, নানান গান ( একবার ফ্রান্সের লঁসে ইউরো ২০১৬ তে ক্রোয়েশিয়া  আর পর্তুগালের ফ্যানরা রাস্তার ওপরে লোক সঙ্গীতের চাপান উতর  বসিয়ে দিয়েছিলেন – এ যতো গায় অন্যে গায় তার শত গুণ ।  কারো ভাষা অবিশ্যি কেউ বোঝে না )। স্লোগানে স্লোগানে অলি গলি গুলজার। সারা ইউরোপে উজ্জ্বল গ্রীষ্মের দিনে অজস্র হাসি খুশি মানুষের মেলা বসে যায় – ফুটবল শুধু একটা বাহানা!  
     
    দুঃখের বিষয় আন্তর্জাতিক ফুটবল মেলার আরেকটি  অপ্রীতিকর দৃষ্টিকটু এবং অত্যন্ত অবাঞ্ছিত চেহারা আছে।  ইংরেজ ফুটবল ফ্যানরা দুটো তিনটে বিয়ারের পরেই দক্ষ যজ্ঞ শুরু করার জন্য  বিশেষ রূপে খ্যাত, তা অকুস্থল যেখানেই হোক না কেন । মোবাইল টেলিফোনের কল্যাণে পুলিসের সঙ্গে চোরা গোপ্তা লড়াই খুব সহজ হয়ে পড়েছে ।  ফ্যানেরা  শহরের নানান কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে , ইশারা ইঙ্গিত পেলেই যূথবদ্ধ হয়ে শত্রু পক্ষের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নেমে পড়ে।  শুধু ইংরেজ কেন, এ ব্যাপারে ফরাসি জার্মান ডাচ বা রাশিয়ান কেউ কম যায় না । আমার দেখা উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম স্কটিশ ও ওয়েলশ ফ্যান গুষ্ঠি।  
     
    খেলা শুরু তিনটের সময় । মাঠে পৌঁছেছি তিন ঘণ্টা আগে – ওই রাইজিং অ্যাকশন দেখার জন্য ।  ইন্দ্রনীল কিছু না বলে অদৃশ্য হয়ে গেছে – এই ভিড়ের ভেতরে তাকে খুঁজি কোথা । হঠাৎ হাজির হলো ।  বকাবকি করা গেলো না- তার দু হাতে দুটো কাগজের গেলাসে ব্রহ্মা বিয়ার ! দুনিয়ার এই একমাত্র দেশ যেখানে স্বয়ং ব্রহ্মা মার্কা বিয়ার মেলে । নামের অরিজিনটা এখন জানা হয়ে ওঠে নি । ইতি উতি লোকজন জড় হচ্ছে – কেউ কেউ  জার্মান পতাকা, ফরাসি পতাকা গায়ে  জড়িয়ে , গাট্টা গোট্টা কিছু লোক পতাকা দোলাচ্ছে।  তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি এই লাইনটা মনে পড়ল । পাবে যে হারে বিয়ার বিক্রি হচ্ছে তাতে ব্রহ্মা অচিরেই এই পতাকা বাহকদের ওপরে ভর করতে পারেন ।তার ফল দু রকম হতে পারে – পতাকার অধঃপতন অথবা পতাকার দণ্ডটির লাঠি রূপ ধারণ- কাফকার মেটামরফসিস ! 
     

    ব্রহ্মার সাপ্লাই চেন
    আমরা দাঁড়িয়ে আছি ষ্টেডিয়ামের শান বাঁধানো চত্বরে । সামনের রাস্তার নাম রুয়া রেবেলো ।  সে রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ , ব্যারিকেড তৈরি ।  আমাদের টিকিট  আছে জেনে তবেই পুলিস আমাদের এ অবধি আসতে দিয়েছে ।  উলটো দিকের অলি গলি থেকে রবাহূত অনাহুত লোকেরা হাজির হলেই পুলিসের লাঠি সচল হচ্ছে । উলটো দিকের রুয়া মেনেজেস পাব থেকে ব্রহ্মা হাতে নিয়ে ফরাসিরা ডাইনে গিয়ে লাল নীল সাদা পতাকার তলায় সমবেত হচ্ছে – আলে লে ব্লয় শোনা যাচ্ছে ঘনঘন । ষ্টেডিয়াম চত্বরে আমাদের ঠিক পাশেই জার্মানরা বিয়ার কিনে রাস্তা পার হয়ে আপন পতাকার নিচে ক্রমাগত ওলে,  ওলে ওলে গেয়ে যাচ্ছে ।  কথাটা জার্মান নয় কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে জার্মান ফ্যানরা এই স্প্যানিশ শব্দাবলীর সাহারা নিয়ে আপন জাতীয়তা জাহির করে থাকে। ক্রমশ লোক জন বাড়ছে । বোঝা গেলো রুয়া রেবেলো হচ্ছে ম্যাজিনো লাইন – এপারে জার্মান , ওপারে ফরাসি পতাকাবাহক  সৈন্য ।  ঝলমলে রোদ্দুর , বেশ গরম । বত্রিশ বছর আগে সেভিয়ার মাঠের ভেতরে রক্তারক্তি ব্যাপারটা প্রায় ভুলেই যাচ্ছিলাম-  হেন কালে দেখি লাল সোনালি কালো রঙ্গের ঝাণ্ডা উঁচা করে  উচ্চরবে ওলে, ওলে ওলে চিৎকার করতে করতে কিছু জার্মান বাহিনী ম্যাজিনো লাইন পার হচ্ছে । লাল নীল সাদা ফরাসি পতাকাবাহী রা  একটু সন্ত্রস্ত কিন্তু  সেই ‘ আলে লে ব্লয় ‘ ( অগ্রসর হও নীল বাহিনী ) থামছে না। 
     
    ইংল্যান্ডের ফুটবল মাঠে দু দলের মাঝে যে সশব্দ লড়াই সর্বদা চলতে থাকে তাকে ট্রাইবাল ওয়ারফেয়ার আখ্যা দেওয়া হয়েছে - সেখানে কোন সভ্য ভদ্র ভাষার ব্যবহারকে দুর্বলতা বিবেচনা করা হয় ।  হাইবেরিতে নর্থ ব্যাঙ্কের আসনে বসে আর্সেনালের খেলা দেখার সময়ে যে প্রকারের  বর্ণমালার   সম্মুখীন হতে হয়েছে তাতে ভীত   হয়ে বারো বছরের ইন্দ্রনীলের কান বন্ধ করে দেবার চেষ্টা করেছি !  
     
    এখানে তেমন কিছু নয় -অন্তত এ অবধি কেউ কাউকে গালাগালি করছে বলে মনে হলো না । জার্মানটা আমার চেনা, ফরাসি ভাষার খারাপ শব্দগুলো ইন্দ্রনীল ভাল চেনে । এটা বেশ বোঝা গেলো জার্মান পতাকা বাহক বৃন্দ ফরাসিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে -  মাঝের ব্যবধান অতি সামান্য । পাবের ব্যবসা তুঙ্গে – রিও শহরে ব্রহ্মা একেবারে বন্যার মতন বয়ে  চলেছেন। এই গরমে বিয়ার মাথায় চড়তে কতক্ষণ ? এবারে কি ঘটতে যাচ্ছে ? ম্যাচ শুরু হতে এখনও এক ঘণ্টা এখানে যদি কোন গোলযোগ ঘটে তার রেশ চলে যাবে মাঠের ভেতরে- প্রথম লক্ষণ এক দেশের ফ্যান অপর  দেশের জাতীয় সঙ্গীতের  সময়ে হট্টগোল বাধাবে।  সেটাই শেষ নয় অবশ্য । 
     
    সেভিয়ার দুর্ব্যবহারের শোধ? খুন কা বদলা খুন ?
     
    সদ্য প্রয়াত  দীর্ঘদিন ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রবাসী  আমার গিমুদা বলতেন  পাইকারি মন্তব্য করিস না ( জার্মানে পাউশালিজিইয়েরুং) । সেটা  কোন বুদ্ধির পরিচয় নয়।  
     
     

    শত্রু মিত্রের পতাকা পাশাপাশি 
     
    পরের আধঘণ্টা সেই রুয়া রেবেলোর দুপাশে যা দেখেছি তার সামান্য কিছু ক্যামেরায় , বাকিটুকু মনে রেখে দিয়েছি ।  রাখবো বাকি জীবনভর।  জার্মান ও ফরাসি ফ্যান মিলে মিশে  গেলো তাদের আপন আপন পতাকার নিচে, চিরশত্রুর গলা জড়াজড়ি করে গাইল ‘ওলে, ওলে ওলে’  -একটু থেমে ‘ আলে লে ব্লয়’  । দুটি বিভিন্ন বর্ণের পতাকা আন্দোলিত হতে থাকল একই সঙ্গে – এক সূত্রে বাঁধা হয়ে গেলো সহস্রটি মন । বার্লিন থেকে বিয়ারিতজ , লাইপজিগ থেকে লিওঁ কেবল ফুটবল পারে মানুষকে মানুষের কাছে 
    আনতে।
     
    খেলার ফল 
    জারমানি ১- ০ ফ্রান্স 
     
    ফাইনাল
     
    জারমানি ১-০ আরজেনটিনা 
     
     
     
     


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • স্মৃতিচারণ | ২৭ মে ২০২৩ | ৮৫৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন