এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আত্মশুদ্ধির বোধোদয়

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ১০ অক্টোবর ২০২২ | ৮০ বার পঠিত
  • শৈশব অথবা কৈশোরের প্রাক্কালে যখন কোনো দুষ্টুমি কিংবা অন্যায় করে মিথ্যা কথা বলে অন্যায়টি ঢাকার প্রচেষ্টায় সচেষ্ট থাকতাম অথবা ঠাকুরের পুজোর থালার থেকে লুকিয়ে মোদক কিংবা নাড়ু  চুরি করতাম, ঠাকুমা এবং মা-কাকিমারা চেঁচিয়ে উঠতেন, 'তোর কী কোনো ভয়-ডর নেই ! চুরি করে আবার মিথ্যা কথা বলছিস ! কেউ ঠেকাতে পারবে না, রসাতলে যাবি তুই।' তখন ভাবতাম 'রসাতল' আবার কি ? রস মানে তো খেজুরের রস, আখের রস, মিষ্টির রস। আর 'রসাতল' মানে রসের অতল। 'রসাতল' কেন খারাপ হবে ? ঐ বয়সে শুনেছিলাম গুরুজনদের থেকে, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল নিয়েই ভারতীয় পুরাণের ত্রিভুবন। আমরা জন্মেছি মর্ত্যে। ভালো কাজ করলে, মৃত্যুর পরে স্বর্গবাস আর মন্দ কাজ করলে পাতালবাস। পরে বড় হয়ে জ্ঞানের পরিধি বাড়লো। জানতে পারলাম, পাতালের রয়েছে সাতটি স্তর। অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল এবং পাতাল। পাতাল তো রসাতল থেকেও গভীর। তাহলে মা-ঠাকুমা-কাকিমারা পাতাল না বলে 'রসাতল' কেন বলতেন সর্বনাশের চরমসীমা হিসেবে। স্কুলের শিক্ষক জানালেন, খুব সম্ভব বাংলা ভাষা অন্যায়কারীকে আত্মশুদ্ধির জন্য একটি শেষ সুযোগ দিতেই নিম্নতম অন্ধকূপ থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। ধন্য আমাদের বাংলা ভাষা। কিন্তু আজকের যুগের অন্যায়কারীরা কি প্রকৃতপক্ষে আত্মগ্লানিতে ভুগছে ! আমাদের বাংলা ভাষার বিশিষ্টার্থক প্রয়োগের মর্যাদা দিচ্ছে ! নিজেদের শুদ্ধির কোনোরকম প্রচেষ্টায় আছে !

    বাংলা ভাষায় কিছু কিছু শব্দ আছে, যা আমাদের সমাজ-জীবনের সঙ্গে ভীষণরকমভাবে জড়িয়ে আছে এবং প্রাসঙ্গিক অর্থাৎ লাগসই। কিছু কিছু শব্দ তার আসল মানের ঊর্ধ্বে নতুন অর্থ নিয়ে আমাদের সামাজিক জীবনে বেশ দাপটের সাথে টিকে আছে।

    স্কুলে পড়াকালীন জানলাম 'কারসাজি' শব্দটির অর্থ মূল ভাষা ফারসিতে 'কার্য-সম্পাদনকারী' অথবা 'নির্মাতা'। 'কারসাজ' কথাটির অর্থ কর্তা অর্থাৎ 'বিধাতা'কেই বোঝায়। আর বিধাতা অথবা সৃষ্টিকর্তার কাজ সৃষ্টি করা অথবা 'কারসাজি' করা। কিন্তু বাংলা ভাষায় এসে এই মহৎ কাজটি হয়ে গেল দুর্নীতি অথবা অন্যায়কারীদের অসৎ কাজ। বাংলা ভাষায় 'কারসাজি' শব্দের অর্থ চালাকি করে অন্যকে ঠকানো অথবা প্রতারণা করা। আর এই 'কারসাজি' অর্থাৎ প্রতারণা করে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা অথবা ঠকানোকে আমাদের সমাজে একশ্রেণীর মানুষ মনে করে একটি বিশেষ এবং উঁচুমানের দক্ষতা।

    'উত্তমমধ্যম' কথাটির অর্থ উত্তম রূপের প্রহার এবং মধ্যম মানের লাঞ্ছনা। ছোটবেলায় স্কুলে খুবই প্রচলিত ছিল এই কথাটির। মধ্যম'টাই অবশ্য বেশি প্রয়োগ হতো, অর্থাৎ নীলডাউন অথবা কান ধরে ক্লাসের বাইরে দাঁড়ানো - মানে লাঞ্ছনার একশেষ। পাড়ায় চোর অথবা বাসে-ট্রেনে ছিনতাইকারী ধরা পড়লে 'ধোলাই' কথাটির প্রয়োগ বেশি করে শুরু হোলো। ধীরে ধীরে আমজনতা এখন 'উত্তমমধ্যম' এর পরিবর্তে 'ধোলাই' কথাটির বেশি প্রয়োগ করতে ভালোবাসে। সম্প্রতি শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি বিক্ষুব্ধ জনতার 'উত্তমমধ্যম' অর্থাৎ 'ধোলাই' আতঙ্কে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। ২০২১ সালে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি পালিয়ে যান উজবেকিস্তানে, যখন তালিবান দখল করে কাবুল। 'ধোলাই' নয়, প্রাণহানির ভয়ে। ইউক্রেনের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ২০১৪ সালে গণ বিক্ষোভের মুখে পড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাশিয়ায়। অর্থাৎ 'ধোলাই' আতঙ্কে দেশ ছেড়েছিলেন। সম্প্রতি সংবাদপত্রে দেখতে পাওয়া যায় কলকাতা শহরে এক প্রাক্তন রাজনীতিবিদের উদ্দেশে এক মহিলার চপ্পল নিক্ষেপ। এটা কি ধীরে ধীরে ক্ষুব্ধ জনতার 'ধোলাই' প্রয়োগের পূর্ব বহিঃপ্রকাশ। 'ধোলাই' আতঙ্ক কিন্তু শুধু চোর-ছিনতাইকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে ভবিষ্যতে। যেমন প্রবাদে আছে পাপ বাপকেও ছাড়ে না, অর্থাৎ পাপ করলে তার কোনো ক্ষমা নেই। 

    সত্যজিৎ রায়ের 'অভিযান' চলচ্চিত্রের শুরুতে ভাঙা আয়নায় নরসিংকে ভগ্ন ও বিধ্বস্ত অবস্থায় আবিস্কার করে দর্শক। ছবির শেষের দিকে সহকারী রামার সাথে কথাবার্তার সময় গাড়ির অক্ষত সাইড লুকিং গ্লাসে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সংহত মনে হয় নরসিংকে। সেসময় সে নতুন কোম্পানি খুলে বড়লোক হওয়ার বাসনায় আফিম চোরাচালানে বদ্ধপরিকর। বড়লোক হতে চাওয়া কি পাপ ? কে না চায় একটু সুখে থাকতে ? বড়লোক হতে চাওয়ায় কোনো পাপ নেই, এমনকি সুখের জীবন চাওয়াতেও নেই কোনো আপত্তি। বিপত্তি ঘটে তখনই, যখন কেউ পাপের পথে ধনী হতে চায়, চোরাগলিতে সুখ পেতে চায়। সেটা নরসিং শেষলগ্নে অনুধাবন করতে পারে। নির্মাতা আমাদের দেখান, নরসিং তখন গাড়ির চালক নয়, বনে যায় ঘোড়সওয়ার রাজপুত। সেই মুহূর্তে সে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে ফেলা এক অকুতোভয় অভিযাত্রিক। অনিশ্চিত, কিন্তু সৎপথের পথিক।

    'অভ্যুত্থান' শব্দটির অর্থ হলো আকস্মিক জাগরণ। অভ্যুত্থান শব্দটি এসেছে ফরাসী শব্দ ক্যুপ (Coup) থেকে। তবে অভ্যুত্থান শব্দের অন্য অর্থ - কাউকে সম্মান দেখানোর জন্য আসন থেকে উঠে দাঁড়ানো। অর্থাৎ অভ্যুত্থিত হওয়া। কিন্তু আজকাল 'অভ্যুত্থিত' কথাটি সাধারণত ব্যবহার হয় আকস্মিক ও অবৈধভাবে নির্বাচিত সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে দলগত কোন জনগোষ্ঠীর অবস্থান ব্যক্ত করে ক্ষমতাচ্যুত করা কিংবা জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করানো’কে। সামরিক অভ্যুত্থানের তুলনায় সম্প্রতি শব্দটি বেশি ব্যবহার করা হয় যখন চতুরতার সহিত ঘোড়া কেনা-বেচার কৌশলে ক্ষমতাসীনের আসনটি দখল করা হয় অন্যায়ভাবে অথবা নিজের সিংহাসনটি বিরোধী পক্ষের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয়। এবং এটি একটি উচ্চস্তরের রাজনীতির আখ্যা পেয়েছে আজকাল। 

    এককথায় 'খয়ের খাঁ' শব্দের অর্থ মঙ্গল ইচ্ছা পোষণকারী বা কল্যাণ কামনাকারী। কিছু মানুষ সব সময় ক্ষমতাবানদের কাছে থাকে এবং ভালো ভালো কথা বলে নিজের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। অন্যের তোষণকারী অথচ সুযোগসন্ধানী এসব ব্যক্তিকে বাগ্‌ধারায় খয়ের খাঁ বা চামচা বলে। এই 'খয়ের খাঁ' অথবা 'চামচা'র কোনো অভাব নেই প্রশাসনে, অফিসে, গণমাধ্যমে।
    'কারচুবি' শব্দটির ফারসি অর্থ কাপড় বা কাঠের উপর লতাপাতা বা ফলফুলের নকশা তোলার কাজ। বাংলায় এই শব্দটি হয়ে গেল 'কারচুপি'। আর কারচুপির অর্থ আমরা কে না জানি। ভোটাভুটি হোক, স্কুলের মিড্-ডে মিল হোক, খাবারে ভেজাল মেশানো হোক, শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ হোক - সবজায়গায় কারচুপি। সংবাদপত্রে শুধু একটাই খবর - কারচুপি আর দুর্নীতিতে দেশটা ছেয়ে গেল। 

    এখন বাংলা ভাষার বিশিষ্টার্থক প্রয়োগের প্রতি মর্যাদা জ্ঞাপন করে - 'রসাতল' থেকে 'পাতাল' অর্থাৎ সর্বনিম্ন স্তরে না যাওয়ার শেষ সুযোগটি যদি আত্মশুদ্ধির দ্বারা অর্জন করতে একান্তই অপারগ হয় অর্থাৎ অভ্যুত্থিত অথবা জাগরিত হতে না চায়, এই 'কারসাজি' এবং 'কারচুপি'তে লিপ্ত 'খয়ের খাঁ'রা, তাহলে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে গণ'ধোলাই'এর ভয়ে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টকেও কিন্তু দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছিল যখন সাধারণ জনতার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। খুবই হয়ত আবশ্যিক এইসময়ে দুর্নীতিকাজে ও আসুরিক প্রবৃত্তিগুলির চরিতার্থে  লিপ্ত মানুষগুলির এবং তাদের সহকারীদের আত্মশুদ্ধির বোধোদয় হওয়া নরসিংয়ের মতন। তা নাহলে ভবিষ্যৎ বা ইতিহাস কেউই হয়ত ক্ষমা করবে না তাদেরকে।

    নোট : ৩০/৯/২২ 'উত্তরের সারাদিন' পত্রিকাতে প্রকাশিত 
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন