এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • গোদার যাত্রা : নুভেল ভাগ থেকে মেটাভার্স - ২

    Tirtho Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৪৮ বার পঠিত
  • ॥ ২ ॥

    নুভেল ভাগ 

    ২৮ সে ডিসেম্বর, ১৮৯৫। ঠান্ডা, স্যাঁৎ-স্যাঁতে এক শনিবার প্যারিস শহরে। শহরের একটি রাস্তার ধারে গ্র্যান্ড ক্যাফে তে গ্র্যান্ড ক্যাফেতে এসে হাজির হয়েছে প্যারিস শহরের নিমন্ত্রিত সাংবাদিককুল ও থিয়েটার ডিরেক্টররা। অগাস্টা ও লুইস দুই লুমিয়ের ভাইয়ের তৈরী করা এক নতুন যন্ত্র সিনেমাটোগ্রাফের কারসাজি দেখানো হবে। সেই শোতে বিশিষ্ট থিয়েটার ডিরেক্টরদের মধ্যে হাজির ছিলেন আরেকজন ব্যক্তি, তার নাম George Melies। 

    দশ থেকে পনেরো মিনিট দৈর্ঘের প্রায় কুড়িটি ফিল্ম এর এই শো টি র একটি ছিল সেই বিখ্যাত ট্রেনের দৃশ্য যেটি স্টেশনে এসে থামলে লোক নেমে আসে ট্রেন থেকে প্লাটফর্মে।  পর্দায় চলন্ত ট্রেনের ছবি ক্রমশ বড় হয়ে ক্যামেরার কাছে আসতে থাকায় ভয়ানক চমকে যায় দর্শকরা।  হুড়োহুড়ি পড়ে যায় দর্শকদের মধ্যে ঘর ছেড়ে বেরোবার জন্যে। সেই প্রথম সিনেমার বাস্তব অভিঘাত চমকে দেয় দর্শকদের। জন্ম নেয় সিনেমাটিক রিয়ালিটি। বাস্তবকে যথাসম্ভব বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই এর উদ্দেশ্য। আর্ট বা এক্সপ্রেশন ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

    এদিকে সেই প্রথম ছবিতে দর্শক আসনে বসে থাকা আমন্ত্রিত জাদুকর এবং থিয়েটার ডিরেক্টর George Melies এর প্রতিভাবান মস্তিষ্ক  বুঝে গেছিলো এই নতুন যন্ত্রটির অমিত সম্ভাবনা।  তিনি একটি সিনেমাটোগ্রাফ জোগাড় করে নিজেই বসে যান স্ক্রিপ্ট লিখতে। একটি ষ্টুডিও নির্মাণ করেন এবং অভিনেতা ভাড়া করে শুরু করে দেন ফিল্মের শুটিং। প্রথম ফিকশন ফিল্মের জন্ম দেন তিনি। বিভিন্ন ধরণের বিভ্রম (illusion)  তৈরী করেন তার যন্ত্রের সাহায্যে এবং স্টপ মোশান, স্লো মোশান ইত্যাদি ফিল্ম টেকনিক গুলির জন্ম দেন Melies।

     ১৮৯৯ থেকে ১৯১২ এর মধ্যে বানানো প্রায় ৪০০ টি ছবি ছিল ইল্যুশান, কমেডি, প্যান্টোমাইম প্রভৃতিতে ভরপুর এক জমজমাট ফ্যান্টাসির সমাহার। ১৯০২ তে তৈরী A Trip to the Moon এর নাম বোধয় অনেকেরই শোনা। লুমিয়ের ভাইদের ছবি বাস্তবকে পর্যবেক্ষণ করে সেখান থেকেই তার মালমশলা তৈরী করে নেয় যা রিয়েলিস্টিক ধারার জন্ম দেয়। অন্যদিকে মেইলিসের ছবি রিয়েলিটির বিপরীতে এক কাল্পনিক জগৎ তৈরী করে যে জগৎ শিল্পীর কল্পনায় ও শৈলীর প্রকাশে ভরপুর। ঊনবিংশ শতাব্দীর ওলন্দাজ চিত্রশিল্পের মতোই এই ধারা পরিচিতি পেলো এক্সপ্রেশনিষ্ট ছবি হিসেবে।

    এই দুই  ধারার বৈপরীত্য সিনেমা মহলে খুবই পরিচিত Lumière -Méliès দ্বন্দ্ব নামে। সেই প্রথম ছবি প্রদর্শনের প্রায় একশো পঁচিশ বছর পরেও সেই দ্বন্দ্ব বর্তমান। সমস্ত ফিল্ম জঁ-র উৎপত্তি এই দুই ধারার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক থেকেই। এই দুই ধারা কে প্রথম ধাক্কা দেয় ১৯৫৯-১৯৬৮ সময়কালে তৈরী হওয়া কিছু ছবি যা একেবারেই স্বতন্ত্র। স্বল্প বাজেটে স্টুডিওর বাইরে অনেক ক্ষেত্রেই অপেশাদার অভিনেতা দের দিয়ে বানানো এই ছবিগুলি সিনেমাপ্রেমী দর্শকের চেতনায় নতুন ধাক্কা দেয়। তৈরী হয় পরিচালকের নিজস্ব স্টাইলে তৈরী হওয়া ছবি। এই ছবিগুলি যেন ব্যক্তির নিজস্ব বোধ, ভাবনা, অনুভূতি, মননের প্রতিচ্ছবি। শিল্পীদের আঁকা ছবির মতো। মগ্ন-চৈতন্যের ছবি। অনেকটা আত্মজীবনীমূলক এই ছবিগুলি যেন নিজেকে খুঁড়ে তৈরী করা। ওই শিল্পীকেই যেন পড়া যায় ছবিগুলির মধ্যে দিয়ে।

    বিখ্যাত ফিল্ম সমালোচক ও তাত্ত্বিক André Bazin  ১৯৪৮- এ আরো দুজন ফরাসি ফিল্ম সমালোচকের সাথে মিলে প্রথম প্রকাশ করেন Cahiers du Cinéma, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ফিল্ম পত্রিকাগুলির অন্যতম। নাতিদীর্ঘ ৩০ পাতার জার্নাল টি তে চার-পাঁচ টি করে প্রবন্ধ থাকতো। প্রবন্ধগুলিতে বিভিন্ন ছবির সমালোচনা ও পরিচালকদের নিয়ে লেখা-পত্তর থাকতো। কোনো কোনো সময় ফিল্মের সমালোচনার এক্সটেনশন হিসেবে ফিল্ম তত্ত্বের ও আলোচনা থাকতো। এই আলোচনা মূলত ফরাসি ও ইতালীয় নিও-রিয়ালিস্টিক ছবিগুলি নিয়েই হতো। হলিউডের ছবিকে গণ্য করা হতো না। এটি অঁদ্রে বাঁজার  সিদ্ধান্ত ছিল। 

    এই জার্নাল টি তে ক্রমে ক্রমে কিছু তরুণ ফিল্ম সমালোচক ও উৎসাহী এসে জড়ো হয়। সেই গোষ্ঠীর অন্যতম মাথা ছিলেন পাঁচ লেখক - সমালোচক, François Truffaut ,  Jean-Luc Godard , Éric Rohmer, Jacques Rivette, Claude Chabrol। এদের মধ্যে প্রথম দুজনের সাথে অঁদ্রে বাঁজার এর মতবিরোধিতা শুরু হয়। বিরোধিতার মূল কারণ ছিল অঁদ্রে বাঁজার এর হলিউড এর ছবি নিয়ে একপেশে মনোভাব। অথচ এই তরুণ সমালোচকরা আলফ্রেড হিচকক ও হাওয়ার্ড হক্স এর মতো পরিচালকদের নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং তাদের নিয়ে লিখতেন। এই বিরোধিতা চরমে ওঠে ত্রুফোর লেখা একটি প্রবন্ধ নিয়ে  যেখানে তিনি নিওরিয়ালিস্ট ধারার বিখ্যাত ফরাসি ছবিগুলির তুমুল সমালোচনা করেন প্রাচীনপন্থী, কল্পনাবিহীন, তাৎপর্য্যহীন কিছু সাহিত্যের এডাপ্টেশন বলে।

    ত্রুফো ঘোষণা করেন একটি ছবির নির্মাণে পরিচালকের গুরুত্বের কথা। সিনেমার অথর (লেখক) হলেন পরিচালক - politique des auteurs। এটি পরবর্তীকালে auteur theory হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। শুরু হয় ব্যক্তিগত  ছবি (personal film)। পরিচালকের ভাবনা, বোধ, অনুভূতির অনুরণন এই সমস্ত ছবিগুলি। পরবর্তীকালে গোদার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের প্রস্তাবনা করেন Cahiers এ লেখা বেশ কয়েকটি প্রবন্ধে। ফিল্ম montage ও mise-en -scene নিয়ে। সাধারণত ফিল্ম montage বেশ কয়েকটি টুকরো অথচ ভিন্ন শটের সমাহারে তৈরী যেখানে সাধারণত স্থান পরিবর্তন হয়। mise-en -scene হলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে ক্যামেরার সামনে থাকা সমস্ত কিছু। সেখানে  কয়েকটি শটের একরৈখিক সমাহারে তৈরী হয় একটি দৃশ্য। এই দুটি পদ্ধতির মধ্যে একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে। গোদার এই দুটি পদ্ধতির দ্বান্দ্বিক সংযোজন ঘটিয়ে একটি নতুন ভাষা তৈরী করলেন সিনেমার।

    গোদার ১৯৫২ সালে Cahiers ছেড়ে চলে যান অঁদ্রে বাঁজার সাথে মতবিরোধের কারণে। ১৯৫৬ তে ফিরে আসেন। ততদিনে তিনি একটি শর্ট ফিল্ম তৈরী করে ফেলেছেন। আর Cahiers এর সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে বাজাঁ কে। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে এই ফিল্ম সমালোচকের দল ঠিক করেন আর লেখা নয়। এবার তাদের তত্ত্বের প্রয়োগ করার সময় হয়ে এসেছে। তৈরী হতে থাকে একটার পর একটা ছবি। L’Express  নামে একটি ফরাসি   পত্রিকায় এক সাংবাদিক প্রথম নামকরণ করেন এই নতুন ধারার ছবি গুলির - Nouvelle Vague। আধুনিক কালের ফিল্ম ঐতিহাসিকরা   শুধু মাত্র  Cahiers এর  পঞ্চ-পাণ্ডব ও অন্যান্য সমালোচক-পরিচালকদের ছবিকেই ফরাসি নব তরঙ্গ বলতে চান না নির্দিষ্ট করে। Cahiers এর বাইরেও এই সময় বেশ কিছু পরিচালক এই ধরণের ব্যক্তিগত ছবি করেছেন যাতে নুভেল ভোগের বৈশিষ্ট ছিল। পরবর্তীকালে Abbas Kirostami, Nanni Moretti,  Hou Hsiao-Hsien,Wong Kar-wai প্রমুখ পরিচালকদের ছবিকেও এই ফরাসি নবতরঙ্গের উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয় ।

    (চলবে) 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন