এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মহালয়া

    Sobuj Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ২৬৩ বার পঠিত
  • ক্যালকাটা পোর্ট ট্রাস্টের (CPT) একজন সাধারন কর্মচারী ছিলেন আমার পিতাশ্রী। পরবর্তী কালে, মানে ২০০১ সালে CPT হয়ে যায় KPT শহরের নাম পরিবর্তনের সাথে সাযুজ্য রেখে। 
    বাবা অবশ্য তার অনেক আগেই ১৯৮২ সালে স্বেচ্ছাবসর গ্ৰহন করেন। এমনিতেই কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়স আটান্ন বছর। বাবার ক্ষেত্রে সেও হয়ে দাঁড়াল ছাপান্ন বছর।অর্থাৎ আমাদের সংসারের অর্থনৈতিক অবস্থা বারোটা ছাপান্ন। কারণ তিন ছেলের কেউই তখনো নিজের পায়ে দাঁড়ায় নি। শুধুমাত্র দিদি নমো নমো করে পাত্রস্থ হয়েছে।

    সংসার তো স্বচ্ছল ছিলই না তবু এই সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কারণ হলো তিন শিফ্ট কাজ, দূরত্ব এবং বাবার স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে! ব্যান্ডেল/হুগলী থেকে কোলকাতা ডেলি পাষন্ড গিরি করা প্রায় তিন দশক ধরে। তার আগে কলকাতায় থাকতেন। মর্নিং এবং আফটার-নুন শিফ্ট সত্যিই কষ্টকর ছিল। শীত, গ্ৰীষ্ম, বর্ষা; এদিকে ভোর চারটে ওদিকে রাত বারোটা। সেও যদি কানেক্টিং ট্রাম বাস ঠিক থাকতো তবে! নইলে বাড়ীতে মায়ের বিনিদ্র প্রহর গোনা ও হা-হুতাশ:

    - কি হলো রে লোকটার! 

    - তোরা বাড়ীতে তিন তিনটে দামড়া ছেলে;

    - একটু দ্যাখ না রে...

    বোঝো ঠ্যালা! মাকে কিছুতেই বোঝানো যেতো না। ছোট্টখাট্ট চেহারার ভীতু সম্প্রদায়ের মানুষ! 
    আমাদের পারিবারিক স্বচ্ছলতার সাথে সাযুজ্য রেখে আমাদের বাসস্থান সম্পর্কে একটা ধারনা দেবার চেষ্টা করা যাক।

    ঠাকুমা বলতো গোপাল ভাঁড়ের দোতলা!

    কিনু গোয়ালার গলির যাবতীয় বৈশিষ্ট্য আমাদের ওই গলিতে আজো টাটকা উপস্থিত। আর সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের বার্তা উহ্য রাখাই ভালো।

    গলির রাস্তা থেকে সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই ডানদিকে বাথরুম ও পায়খানা একসাথে। বামদিকে এ্যাসবেসটসের ছাদ ওলা একটা ছোট্ট রান্নাঘর। এর অন্যতম বৈশিষ্ঠ হলো জানলা খুলে সোনা রোদের আলো এবং জানলা মারফৎ পরিচিত অপরিচিত পথচারী, প্রতিবেশী সবার সাথে সরাসরি আলাপ করতেন আমার ঠাকুমা। মানুষ জন বড় ভালো বাসতেন।

    রান্নাঘর আর বাথরুমের মাঝে একফালি উঠোন, একতলায় প্রবেশের পথও বটে। সামনেই লম্বা বারান্দা এবং লাগোয়া দুটো এঁদো ঘর। বারান্দা থেকেই একটা ষোলো ধাপের সিঁড়ি কোনোক্রমেই বেঁকে উঠে গেছে দোতলায়।

    দোতলাটা একতলার রেপ্লিকা! শুধু বারান্দার ছাদটা ছিল টিনের। গ্ৰীষ্মকালে বাড়াবাড়ির জন্য অনেক কান্নাকাটির পর পাল্টে এ্যাসবেসটস করে দিয়ে ছিল। বারান্দা পুরোনো দিনের আদলে অর্ধেক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তাই পূবের আলো বাতাস ভালোই খেলতো কিন্তু ঝড় বাদলে ত্রাহি মধুসূদন! জানলা দরজা বন্ধ না থাকলে খোলা বারান্দা পেরিয়ে ঘর ভাসিয়ে দিত। 
    সময়ে সময়ে পোড়ার মুখো হনুমানও ঘরের ভেতর হানা দিত। সে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি হত, তাকে ঘর থেকে বিদেয় করা। পুরুষ হনু হলে তো সে বেপরোয়া, দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে আসতো।

    এই বাড়ীতে আমরা ভাড়া থাকতাম। পয়ত্রিশ টাকা ভাড়া। (বাবা অবসর নেয়ার পর ঐ বাড়িটাই বাধ্য হয়ে কিনে নেয়। তাতে আমাদের ঘাড়ে বেতাল। বাড়ি ওলা্র নগদ নিয়ে আপদ বিদায়) বাবা কাকার পরিবার মিলিয়ে বারোজন! এর ওপরেও গল্প আছে। সেসব এখন থাক।

    বাড়ীওলা ভারি অদ্ভুত লোক! পুরো মহাজনী চেহারা।বয়স বছর ষাটের গোড়ায়, কৃপনরাও তাকে বলতো চশমখোর! মাথা ন্যাড়া। দুপায়ে দুরকম স্ট্র্যাপের হাওয়াই চপ্পল। শক্তসমর্থ বেঁটেখাটো চেহারা। মাথায় তিলক। মুখে হরিনাম। অল্প তোতলা। একেবারে নাটক থেকে তুলে আনা চরিত্র! 

    অনেকগুলো বাড়ীর মালিক। সেইসব বাড়ির বেঁচে যাওয়া ওঁচা জিনিষ দিয়ে আমাদের বাড়িটা বানানো হয়েছে।
    তাল কাঠের কড়ি বর্গা আলকাতরায় চোবানো। বলতো - কাঠ আবার পুরনো হয় নাকি, চাঁচলেই নতুন। নাম গুঁইরাম ভড়।

    গঙ্গা নদীর ধারে যে দুটো ঐতিহাসিক ইমারত, ব্যান্ডেল চার্চ এবং হুগলি ইমামবাড়া,খাড়া আছে, তার থেকে প্রায় সমদূরত্বে আমাদের পাড়া রায়বাজার তথা গলি, তেওয়ারি পাড়া লেন।

    জি টি রোড ধরে হুগলী  মোড় থেকে ব্যান্ডেলের দিকে আসতে একফালি রাস্তা জি টি ছেড়ে আমাদের পাড়ার ওপর দিয়ে আরও কিছু দূর এগিয়ে হুগলী চুঁচূড়া মেইন রাস্তার সাথে মিশে গেছে। দেবানন্দ পুর থেকে এক সময়ে সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পায়ে হেঁটে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে পড়তে আসতেন। আমাদের এরিয়ার জমিদার শ্রী প্রফুল্ল মুখপাধ্যায় এর বাড়ীতে তিনি আশ্রয় নিতেন। সে ফলক সদর দরজাতেই লটকানো আছে। তাঁকে স্মরণে রেখে পৌরসভা ঐ টুকুর নামকরণ করেছে শরৎ সরণি। আর শরৎ সরণি থেকে অনেক লেন সমকোণে বেরিয়েছে। তেমনি একটিতে আমাদের বাস।

    দিনটা ছিল মহালয়ার আগের রাত। সময়টা সম্ভবত সত্তর একাত্তর হবে! দেওয়ালে দেওয়ালে তখন শ্নোগান - 'সত্তরেরে দশক মুক্তির দশক'। 'বন্দুকের নলই শক্তির উৎস'! 

    মনে আছে বাবা একদিন উৎপল দত্তের 'তীর' নাটকের একটা কপি আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন সাবধানে পড়ো আর সাবধানে রেখো, কারো সঙ্গে আলোচনার দরকার নেই! তবে পড়ার আগেই বাবা ফেরৎ নিয়ে নেয়! তাই আমার পড়া আর হয়ে ওঠে নি!! সে সময় বাঙলা উত্তাল।

    বাবা সেদিন 'বি' সিফ্ট ডিউটি করে একটু আগেভাগেই চলে এসেছিল! সৌজন্য বাবার কলিগ স্যামুয়েল আঙ্কল। ভদ্রলোক এ্যাঙলো ইন্ডিয়ান, অবিবাহিত এবং পানপ্রিয় মানুষ। বাবাকে ভীষন ভালোবাসতো। তার নাইট ডিউটি থাকলে তাড়াতাড়ি এসে বাবাকে রিলিভ দিত।

    বাবার পেটেন্ট দেবতা  ছিল 'নারায়ন'। বাবা বেশ সু-কন্ঠস্বরের অধিকারী ছিলেন। অ্যামেচার নাট্যগোষ্ঠীর সাথে যুক্ত ছিলেন। নারায়নকে বেশ সুর করে টেনে বলতেন , না-রা-য়-ন। ব্যাপারটা কতখানি ঠাকুরকে স্মরণ করে বলতেন তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে! কেননা বাবা অত্যধিক ধূমপান এবং চা-পান করতেন। নারায়ন বলাটা প্রায় সেইরকম নেশার মতোই। বাবা পায়খানা যাবার আগে পেট চাপড়াচ্ছেন, ধূমপান করছেন এবং যথারীতি নারায়ন বলছেন। আমি ফাজিল ছিলাম; জিগ্গ্যেস করতাম বাবা এই সময়ে তোমার নারায়ন ও তো একই কাজে ব্যাস্ত থাকতে পারে? কেন তাকে বিরক্ত করছো। বাবা হো হো করে হেসে উঠতেন এবং বাথরুমের দরজা বন্ধ করে আবার নারায়নকে ডাকতেন!

    যাই হোক সেদিনের কথায় ফিরি! রাত এগারোটা মফঃস্বলের মানুষের কাছে বেশ গভীর রাত। তার ওপর সে রাত যদি মহালয়ার আগের রাত হয় তবে তো দশটার মধ্যে খেয়ে দেয়ে ঘুম। ভোর চারটে উঠতে হবে। তারপর অপেক্ষা! সেই শিহরণ জাগানো ভদ্র কন্ঠের। বাবার বাড়ীতে উপস্থিতির দুটি অমোঘ ঘোষনা ছিল : এক) উৎকট তামাকের গন্ধ; দুই) 'নারায়ন' বলে হাঁফ ছাড়া ডাক!

    মা যথারীতি জেগে বাবাকে পরিপাটি করে খাইয়ে, সবকিছু গুছিয়ে তবে নিস্তার পেতেন।  বাবা মা দুজনেই বারান্দার দক্ষিন পূর্ব কোনে দাঁড়িয়ে সংসারের টুকি টাকি আলোচনা সারছিলেন।সামনেই পূজো। এরপর বাবার ধূমপান শেষ এবং সশব্দে নারায়ন ডাক ছেড়ে শোবার ঘরে প্রবেশ এবং রেডিওটা ঠিক আছে কিনা দেখে নিয়ে নব ঘুরিয়ে কাঁটা কলকাতা 'ক' এ সেট করে দিলেন। আমাদের এ্যালার্ম দেওয়া টেবিল ঘড়িতে ততক্ষনে বারোটা বেজে গেছে।

    অকস্মাৎ ধুপ করে একটা সজোরে আওয়াজ ! মনে হলো রান্না ঘরের এ্যাসবেসটাসের ছাদে হনুমান জাতীয় কোন একটা জানোয়ার পড়লো ! তবে আমাদের ওদিকে বড় ভাম বিড়ালের উৎপাত ছিল খুব। তক্ষুনি বারান্দা থেকে মায়ের ভয়ার্ত গোঙানির আওয়াজ শোনা গেলো - ওঁ  ... ওঁ... ওঁ... ওগো  ও  ও ও...

    আমি শুরু থেকেই প্রায় মটকা মেরে শুয়েছিলাম। তড়াক করে মশারি তুলে একলাফে চৌকাঠ পেরিয়েই মায়ের কাছে পৌঁছে গেলাম! গিয়ে দেখি ঐ আওয়াজের সাথে সাথে মা প্রায় লাট্টুর মতো চোখ ওপরে করে, কানের কাছে একটা হাত দিয়ে ঘুরেই চলেছে! মানে কোনো কিছু দেখে মা বিশাল ভয় পেয়েছে।

    ততক্ষনে বাড়ীর সবাই জেগে গেছে! আর পাড়া প্রতিবেশী কমবেশী জাগতে শুরু করেছে, চেঁচামেচি শুনে! আমি মাকে জাপটে ধরে অভয় দিয়ে থামালাম। তখনো মা রীতিমতো ভয়ে কাঁপছে। তারপর ঢক ঢক করে খানিকটা জল খেয়ে মা যেটা বললো তার মর্মার্থ হলো: 

    বাবা ঘরে ঢোকার পরে পরেই আমাদের দোতলার ছাদ থেকে রান্না ঘরের ছাদে একলাফে, তারপর রান্না ঘরের ঢালু ছাদ থেকে দ্বিতীয় লাফ দিয়ে গলির রাস্তায় পড়ে প্রায় ড্রপ খাওয়া বলের মত করে পগার পার। কালো মুষকো পারা একটা লোক! মাথার চুল একদম ছোটো করে ছাঁটা। খালি গা চকচক করছে, আর হাফ প্যান্ট পরা।

    এদিকে পাড়া জুড়ে নাটক শুরু। ছেলে, বুড়ো, দামড়া, মহিলা সবাই খড়্গ হস্ত! মহালয়ার রাত, সবাই প্রায় এমনিই অর্ধ জাগ্ৰত তার মধ্যে চোরের এত সাহস! পাড়ায় সবাই প্রায় (নিম্ন) মধ্যবিত্ত একমাত্র আমাদের দক্ষিন জুড়ে যে বিশাল প্রাসাদপমো অট্টলিকা রয়েছে, ওরা ছাড়া। ও বাড়ীর মালিক একসময় গাড়োয়ান ছিল। কিন্তু নিজের পরিশ্রমে, বাকি ভাগ্যের জোরে, কনট্রাকটরি করে প্রচুর কালো টাকার  মালিক। যতই গাড়ী বাড়ি বেড়েছে ততই বেড়েছে অপগন্ড সন্তান সন্ততি। ওদের ইতিহাস মহাভারত সমান!

    সেই সন্তানেরা অর্ধেক ঘরে বাকি অর্ধেক নীচে। তাদের বাড়ীতে ভাড়া থাকে আমারই বন্ধু গৌর। তারা চার ভাই এক বোন। বোন আমার দিদির বন্ধু। তারা সবাই হুঙ্কার ছাড়ছে যাদের বাড়ী থেকে চোর বেড়োলো তারা এখনো কেউ নীচে কেন নামলো না! বোঝো বাঙালি... সেই উস্কানিতে অনেকেই হাওয়া দিচ্ছে। দিক গে! 

    আমার ঠাকুমা চিরকালই শক্ত মানসিকতার মানুষ। তিনি বাইশ বছর বয়সে তিন সন্তানকে নিয়ে বিধবা হয়ে ছিলেন এবং গ্ৰাম ছেড়ে প্রথমে কলকাতা পরে মফঃস্বলে।

    ঠাকুমা বললো আগে দ্যাখ কিছু চুরি গেছে কিনা! সাইকেলটা আছে না গেছে। তখন বাড়ির সবার টনক নড়লো! বাড়ীতে হাতে গোনা একটি সাইকেল। তাও বাবার নাটকের ক্লাব সদস্য বৃন্দের ভালোবাসার উপহার।

    নীচে নেমে দেখি সাইকেলটা মোটা চেনে বাঁধা হয়ে জানালার গরাদ ধরে যথারীতি দাঁড়িয়ে আছে। এই সাবধানতা আমার দাদার। ধরে প্রাণ ফিরে এলো!  তবে কি কিছুই যায় নি! সাইকেল আর স্নানের বালতি ছাড়া নেবার মতো তেমন কিছুই নেই যদিও। 

    আমাদের হাতে এমনিতেই হারিকেন! পেছনে কে এবং কি আছে তা বাবার ভগবানই জানে!

    গেছে, গেছে; তবু গেছে।

    ঠাকুমা রান্না ঘরে কোনোদিন ই তালা দেয়না। শিকল তুলে দেয়। ঠাকুমা জানালো, তার ফোড়নের কৌটোতে রাখা, দেড় টাকা ছ'আনা, পিতলের একটা হাতা আর লম্ফ এবং ভাইয়ের একজোড়া নতূন চটি। দাদা বললো - বারবার করে বারণ করলাম পূজোর আগে পড়িস না। দেখলি তো?

    সার্ভে শেষ!

    এর পর খিল খুলে চোরের মায়ের বড় গলা দের সাথে এক পশলা গলার লড়াই। - কিছুই যায়নি তবু এতো হৈ চৈ কিসের ?  আহা বড়ী আফশোষ কি বাত! তবু চোরের সাহসিকতা এবং অ্যাথলিট সুলভ লাফ ঝাঁপ দেখে মিত্তির বাড়ির ছেলে আমার পাড়া তুতো বন্ধু আকাশ বল্লো, নারান ছাড়া এ কাজের শিল্পী আর কেউ নয়। ঐ চোর,ঐ চোর!

    অনেক রাত হলো! যে যার ঘরে ফেরা যাক। মহালয়া আসন্ন প্রায়!

    হঠাৎ আমার মনের কুয়াশা কেটে একটা পুলক অনুভব করলাম।

    ঐ চোর, ঐ চোর! নারায়নই এসেছিল। কেননা বাবা স্বভাব বশত সজোরে না-রা-য়-ন কে স্মরণ করে ঘরে যাবার পরেই কালো মুষকো পারা চোরের লম্ফ ঝম্প। এবং মায়ের কম্পন ও ঘুর্ণন!নারায়ন এলাকার পরিচিত চোর, সেটা ওর থেকে ভালো আর কেউ জানে না! তাই স্বকর্ণে নিজের নাম শুনে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া! 

    নারায়ন ছিল পূর্ববঙ্গ থেকে আসা একটি ভদ্র পরিবারের সন্তান।

    ছোটো বেলার থেকেই সে দূরন্ত ও ডানপিটে। পড়াশোনায় একদমই মন নেই। সুতরাং বাড়ীতে অনাদৃত। তারপর ঐ চত্বরে বাগান, পুকুর সবকিছুতেই তার অগাধ আধিপত্য। তার ফলে অজস্র অভিযোগ এবং বাড়ীতে ততোধিক উত্তম মধ্যম। পড়াশোনাতে মন নেই বাড়িতে কেউ ভালোবাসে না। ভদ্র পরিবারে নারায়ন আর দেবতা রইল না। অপদেবতা হয়ে পলায়ন করল এবং চৌর্য্য বৃত্তিতে সিদ্ধহস্ত হয়ে  তার নিজের পরিচিত এরিয়ায় ত্রাস সঞ্চার করলো!

    তবে সে ডাকাত ছিলনা এবং অস্ত্র ধারন করতো না। কিন্তু একবার যদি সে অনেকের মাঝখান থেকেও একহাত দূরে ছিটকে যেতে পেরেছে, তবে সে কার্ল লুইস! তাকে ধরে কার বাপের সাধ্যি।

    আমাদের বাড়িতে তার আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত সে আমার কাছে এক ধাঁধা ছিল। এসবই আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি। নারায়ন ধরা পড়লে, হাটে বাজারে তার আত্মীয় স্বজন মুখ ঘুরিয়ে চলে যেত ! কারণ অনুমেয়। জনতার অনন্ত ঔৎসুক্য!তবে নির্মম প্রহার এবং হজম করার অসাধারণ ক্ষমতা তার ছিল! পরিচিতরা তার মুখ বাঁচিয়ে মেরে হাত পা ভেঙ্গে দিতো। কিছুদিন পর আবার যে কে সেই! 

    প্রত্যেক চোরের যেমন মহাজন থাকে নারায়নেরও ছিল। সে গঙ্গার ওপাড়ে থাকে। নারায়ন সারারাত চুরি করে ভোর রাতের ফেরিতে মহাজনের আড়তে।একদিন সেই মহাজন, ধোপদুরস্ত
    অবাঙালি লোক, প্রহার রত জনতার ভীড়ে  মিশে বেশ কায়দা করে বলতে লাগলো - - আরে ইরকম মারলে তো ও মরে যাবে! উকে পুলিসে দিয়ে দেন। মরে গেলে আপনারা ফিরে ফেঁসে যাবেন! তখন সবাই একে একে নিরস্ত হলো এবং পাতলা হলো। নারায়নকে পুলিসে দেওয়া হলো, নারায়ন বেঁচে গেলো!

    কিন্তু একটা ব্যাপার আমার আজো বিস্ময় লাগে ভেবে যে আমার পাশের বাড়ীতেই চল্লিশ চোরের সম্পদ। সেসব চিচিং ফাঁক না করে আমাদের বাড়িতে তো নারায়ন শিলা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই পেত না। হয়তো সেই তালেই ছিল। কেননা আমাদের ছাদ থেকে লাফিয়ে পাশের বাড়িতে যাওয়া একমাত্র ওর পক্ষেই সম্ভব। 

    মাঝখান থেকে বিধি বাম। নারায়ন নাম হলেই হবে না, ভক্তি চাই, ভক্তি! ভক্তি ভরে ডাকলে নারায়ন নিজেই নিজেকে বিপদে ফেলে দেন। 
    আর চোরের নাম নারায়নই বা কেন হলো? পার্থ ও তো হতে পারতো!

    যে বিশাল চত্ত্বর কে আমি প্রথমেই চিহ্নিত করেছি, শরৎ সরণি থেকে গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চল, এর পুরোটাই নারায়নের  মৃগয়া ক্ষেত্র ছিল। শরৎ সরণির পশ্চিম ধার জুড়ে, ওলাই চন্ডীর মন্দির এর কিছুটা আগে পর্যন্ত (কৈলাস নগর), এক সময়ে  লুকোবার মত বন জঙ্গলে ভর্তি ছিল।

    আমাদের ছোটো বেলায় চল ছিল মহালয় শেষ হবার আগেই অন্ধকার থাকতে থাকতে বিভিন্ন বাগানে ফলমূলের জন্য হানা দেওয়া, যাতে এদিকে কারো নজর না থাকে।

    সেবারের গ্ৰুপটা বেশ বড় ছিল। দু পাড়া মিলিয়ে জনা দশ বারো তো হবেই। আমি অবশ্যই ছিলাম না। সারারাত প্রায় নিজেদের মধ্যে মাকে নিয়ে নানা রকম হাসি তামাশা করে ভোর হয়ে এসেছিল। আমি শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

    সকালে বন্ধুদের কাছে ভোর রাতের অভিযানের গল্প শুনলাম! ওরা কৈলাস নগরের দিকে গেছিল, শরৎ সরণি ছেড়ে। কৈলাস নগর তখন ধীরে ধীরে জমে উঠছে বাড়িঘর কম এবং কম লোকের বাস। বাড়ির রেডিওর মহালয়ার পাশাপাশি একজন নাকি শুনতে পায় বনের মধ্যে থেকে মহালয়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। 
    বাকিরা বললো - কেউ হয়তো রেডিও নিয়ে বনে হাগতে গেছে।
    - ছাড়তো চল আলো ফুটছে। একজন বললো। মহালয়া শেষের পর্যায়ে:

    "রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি"

    তবুও কৌতুহল চাপতে না পেরে সবাই মিলে পা টিপে টিপে দূর থেকে দেখতে চাইলো মালটা কে? 
    দূর থেকে ওরা দেখে একটা লোক আপাদমস্তক চাদরে মোড়া রেডিওটা মাথায় দিয়ে ঘুমাচ্ছে। এদিকে মহালয়া চলছে। দেখলে মনে হবে লাশ! 

    কাছে গিয়ে চাদর ধরে টান দিতেই সব ফর্সা। সবাই একেবারে থ। দেখে 'কার্ল লুইস' শুয়ে। ঘুম চোখে ওদের সবাইকে দেখে প্রথম টা অবাক হয়েছিল! পালাবার চেষ্টা করেছিল একবার, কিন্তু সবাই মিলে জাপটে ধরে পেড়ে ফেলে ছিল। মহালয়ার দিন রেডিওটা হাত সাফাই করেও চন্ডী নারায়ন কে ধরিয়ে দিলে। একি নারদের কাজ! নারায়ন, নারায়ন...

    সারারাত চুরি করে ভোর রাতে মাল সমেত ঘুমিয়ে পড়া নারানের পুরনো রোগ! এইভাবেই বহুবার সে ধরাও পড়েছে। নাহলে কার্ল লুইসকে ধরে কার সাধ্য! ভোরের আলো ফুটতেই, দিকে দিকে রটি গেল 'দেবতার গ্ৰাস'!

    "রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।।

    বিশ্বপ্রকৃতি মহাদেবী দূর্গার চরণে চিরন্তনী।
    ভৈরব ধ্যানরতা পূজারিনী ভৈরবীতে 
    গীতাঞ্জলি প্রদান করে ধন্যা হলেন।

    তাঁর গীতবানী আজ অনিলে সুনীলে জননোদয়ে
    দিকে দিকে সঞ্চারিত।"

    শান্তি দিলে ভরি
    দুখরজনী গেল তিমির হরি।
    প্রেমমধুর গীতি
    বাজুক হৃদয়ে নিতি নিতি মা।
    প্রাণে সুধা ঢালো 
    মরি গো মরি।

    নারায়নের রেডিওতে বেজেই চলেছে...মহিষাসুরমর্দিনী...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Atanu Roy | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪:৩১512266
  • বেশ ভাল লিখেছেন, এরকম কত কাহিনী আমাদের অজানা রয়ে আছে।
     
    আমি 1981 তে ডানলপ এ চাকুরি করতাম। কইলাশ নগরে থাকতাম।
     
    সবাই ভাল থাকবেন ।
  • Sobuj Chatterjee | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৯:২১512269
  • আপনাকে ধন্যবাদ।ডানলপে আমার অনেক বন্ধুই কাজ করতো। কৈলাশ নগরেও অনেক পরিচিতর বাস । তবে সবার সাথে যোগাযোগ নেই!ভালো থাকবেন।
  • r2h | 192.139.20.199 | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২০:২০512302
  • ভালো লাগলো।
  • Sobuj Chatterjee | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২৩:৪০512319
  • ,@r2h  ধন্যবাদ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন