বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মার্কস কিছু ব্যাপার না, মানুষ হও

    স্বাতী রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ জুন ২০২২ | ৪৭৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • বোর্ডের পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গে মানুষ হওয়া না হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। পিরিয়ড। একথা সবাই জানেন। শুধু গুটি কয়েক মা বাবা ছাড়া। ওই ইচ্ছে সিনেমাটার মা র মতন যারা। 

    তবে এইপ্রসঙ্গে  আমার কেমন একটু সমস্যা মনে হয়। প্রথমত,  মানুষ হওয়া কাকে বলে? সমাজের সকল স্তরে কি "মানুষ হওয়ার " ডেফিনিশন এক? এবং সেই স্ট্যান্ডার্ডও  কি সময়ের সঙ্গে এক থাকে? আমি যে ভ্যালু সিস্টেমএ বড় হয়েছি সেখানে মদ্য পান করা আর অমানুষ কথাটা সমার্থক। আজকে সে কথাটা বললে ঘুড়াতেও হাসবো কর্তা। আবার সেই সমাজে মাতৃআজ্ঞা শিরোধার্য করে বউকে পাত্তা না দেওয়াও খুবই চলে। শেখাব আজকে ছেলেকে সে কথা ? আবার আমার কাছে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর সঙ্গে ছেলে মেয়ের অমানুষ হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই, অথচ অনেক মধ্যবিত্ত বাড়িতে বলে দেখুন একবার! সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঘাড় নেড়ে নেড়ে বলবেন যে ঘোর অমানুষ সন্তান! নাহলে কেউ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়! কেউ বলে বন্ধুদের পরীক্ষার হলে টুকতে সাহায্য করা একটা কৃতিত্বের কাজ, কেউ বলবেন, ছি ছি সে তো অসততা! কেউ কেউ সন্তানকে সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, আবার কেউ কেউ সমাজের খবরদারিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়ে ক্লিনিক্যাল detachment কেই সন্তান মানুষ করার সব থেকে বড় গুণ বলে ভাবেন।  সব মিলিয়ে এই "মানুষ হওয়ার"  ডেফিনিশনটাতেই বড় আটকে যাই। আছে নাকি কোন সর্বজন এবং সর্বকালসম্মত সংজ্ঞা ? 

    কিন্তু বোর্ডের নম্বর মোটেই এরকম abstract ব্যাপার নয়। বেশ একটা ধরতে পারা যায় গোছের জিনিস। সন্তান শুধু মানুষ হলেই হবে, বোর্ডের নম্বরের দরকার নেই এই কথাটা বলতে পারিনা। বিশেষত আমাদের মতন জনবহুল দেশে যেখানে নম্বর একটা ফিল্টার ক্রাইটেরিয়া হিসেবে ব্যবহার হয়। আগে তো ইন্টারভিউ বোর্ডের কাছে পৌঁছাতে হবে। তাই নিজের " বিশেষ প্রতিভাহীন" সন্তানদের অন্তত বুক বেঁধে বলতে পারিনা যে marks does not matter. তবে হ্যাঁ চাকরির পরোয়া না করলে অন্য কথা। কিন্তু ব্যবসা করে খেতে গেলেও কিছু অন্য রকম গুণ লাগে। আমাদের মতন নিতান্ত ফুটো চাকরিজীবি পরিবারে সেই exposure দেওয়ারও ability নেই। এক নিজে নিজে শিখতে পারলে আলাদা কথা। 

    তাই ফার্স্ট হতেই হবে না বললেও নম্বর পেতে হবে না এই কথা বলতে পারি না। বার বার বলি পড়াশোনাকে ভয় পেও না, এনজয় করতে শেখ। নম্বর আপনি আসবে। কিন্তু সেই সঙ্গে এও জানি যে এ আদতে আমাদের তিনপুরুষের ইস্কুল যাওয়ার অর্জন। এবং সেই সঙ্গে আমাদের সামাজিক অবস্থানের সুবিধা। আমরা জানি যে আমাদের সন্তানকে পাস মার্কস তোলার জন্য মারামারি করতে হবে না, এমন কি হয়ত প্রথম ডিভিশন পাওয়ার জন্যও না। 

    কিন্তু ওই যে মানুষটা আমার বাড়িতে পুরোন কাগজ কেনাবেচা করতে আসেন, যার ছেলে মেয়ে সব পরীক্ষায় একবারেই পাস দিয়েছে, আর তারপর একজন বিয়ে করে নিয়েছে, আরেক জন বাড়িতেই বসে কটা টিউশনি করছে কারণ তার কলেজের শিক্ষক বা বন্ধুরা কেউই নাকি বলে দেয় না কিভাবে চাকরির পরীক্ষার জন্য দরখাস্ত করতে হবে ( যেমন শুনেছি তেমন বলছি খালি )   এদিকে বাপের সংসারে হাঁড়ি চড়ে না প্রায়, তাকেও কি আমরা বলব marks does not matter? এ কথা জেনেও যে শুধুই পাস মার্কস তার জন্যে অনেক জায়গাতেই  চিচিংফাঁক মন্ত্রের কাজ করবে না। কী পথ দেখাব তাকে? আমার ছেলে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেবে  আর ওর ছেলেকে বলব ডেলিভারি বয় হতে ?জীবনের সব স্তরেই আসলে রিয়েলিটিটা আলাদা আলাদা  হয়ে যায়। 

    জীবনে ফাইটিং স্পিরিট  আসল। কম্পিটিটিভ স্পিরিট নয়। ফাইটিং স্পিরিট। একবার কোন কারণে খারাপ হলে পরের বার লড়ে যাব। মার্কস কম পেলে মন খারাপ হোক। কিন্তু সেই মন খারাপ যেন ধ্বংস না ডেকে আনে, বরং পরের বার আরও ভাল করতে অনুপ্রেরণা দেয়। আসলে প্রতিযোগিতা নিজের সঙ্গে।  কতটা চট করে কত কিছু শিখে নিতে পারছি। 

    মধ্যবিত্তের নিম্নবিত্তের নম্বর আর শৃংখল ছাড়া হারানোর কিছু নেই। এদেশের যা সিস্টেম তাতে নম্বর হারালে শৃংখল আরও ঘাড়ে চেপে বসে কখনো কখনো। সাধারণত। সবাই চা ওলা থেকে প্রধানমন্ত্রী হন না। হতে চাইলেও অনেক বাবা মা সেটা পছন্দও করবেন না। চাওলা হওয়া অসম্মানের নয় কিন্তু তার সঙ্গে প্যাকেজ হিসেবে সাধারণত যে  নিত্য দারিদ্র্য আসে, সেটা  বিশেষ সুবিধারও নয়। পথের পাঁচালী সিনেমা হলেই দেখতে ভাল লাগে, নিজেকে হরিহর বা সর্বজয়া হতে হলে ততটা ভাল নাও লাগতে পারে। মধ্যবিত্ত বাড়ির পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে ভাইবোনের মধ্যে চ্যাটচ্যাটে মন কষাকষি দেখেছেন? নিজের পায়ে নিজের যতটা আকাঙ্খা সেই মত সবল ভাবে দাঁড়াতে না পারলে সেটা কিন্তু প্রায় বাধ্যতা মূলক হয়ে যায়। আকাঙ্খা আছে কিন্তু সাধ্য নেই এমনটা থেকেই ইচ্ছের মা র মতন মা তৈরি হয়। শুধু মা নয়, সন্তানের উপর বাজি রাখা বাবারাও হয়। কোন ছাত্র  নিশ্চয় নিজে তেমন হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। 

    প্রতিবার মাধ্যমিকের পরে একদফা করে "মার্কস কিছু ব্যাপার না, মানুষ হও " বলে রাশি রাশি সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট দেখি বলে এই কথা গুলো বলতে ইচ্ছে করল। আগামী দিনের পরীক্ষার্থীদের বলি,  মানুষ তো হতেই হবে , নিজ পারিপার্শ্বিকের সংজ্ঞা অনুসারে। সেই সঙ্গে মার্কসও পাও। First হতে হবে না, কিন্তু নম্বর নিয়ে উদাসীনও হয়ো না।  পরীক্ষার আগে থেকেই সেজন্য প্রস্তুতি নাও। যেখানে যা বুঝতে পারছ না,  আশেপাশের যাকে পাবে হাতের কাছে তাকেই ধর। না বুঝে নেওয়া অবধি ছেড় না একদম। মনে রেখ, ঠিক মত  পড়তে পাওয়া তোমার অধিকার। আর সেই সঙ্গে খেটে সৎ পথে উপার্জন করা মার্কসেও তোমার অধিকার, অন্তত যতদিন না ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম তোমার অধিকারের আওতায় আসছে। All the best for your future.
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মনোবিদ | 185.220.101.145 | ০৬ জুন ২০২২ ০১:১৪508541
  • মার্কস সবাই বেশি বেশি পেলে তো মুড়ি মিছরি এক দর | স্মার্টনেস টাই আসল জিনিস ?
  • স্বাতী রায় | ০৬ জুন ২০২২ ১০:৪০508546
  • কি জানি! আসল যে কী তাও ভাল মতন বুঝিনা। যাকে আমরা স্মার্টনেস বলি,তার কতটা পারিবারিক কালচারাল ক্যাপিটাল, কতটা পারিবারিক অর্থনৈতিক স্থিতির কারণে দশটা অন্য ব্যাপারে মন দিতে পারার ক্ষমতা, কতটা ছোটবেলা থেকে পাওয়া বিভিন্ন এক্সপোজার আর কতটা অন্য কিছু তাও আমার বুঝতে অসুবিধা হয়।  
  • r2h | 134.238.14.27 | ০৭ জুন ২০২২ ১২:১৪508572
  • খুবই ভালো লাগলো লেখাটা। শত হাতে সহি পরখের ছল বিদায় বেলায় নীরব ব্যথা সহিয়া বিকাতে না চাইলে তূণীর একেবারে ফাঁকা থাকলে চাপ।
    মিডিওক্রিটিকে দশচক্র মিলে একটা গালাগাল বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু মিডিওকারের অস্ত্র বলতে ঐ পরীক্ষার নাম্বার টাম্বার। তা না থাকলে যে পরিমান ঘষ্টাতে হয় বা লেগে থাকতে হয়, সেই টেনাসিটি বা সুযোগ সহজ না।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন