ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মাংসের রেসিপি

    Arundhati Sarkar Santra লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ মে ২০২২ | ৫৩৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৫ জন)
  • আগে এত রকমের রেসিপি টেসিপি দেখে কিন্তু মাংস হতনা। সেই এক ধরাধ্ধম আদা রসুন বাটা হল, নাকের চোখের জল ঝরিয়ে পেঁয়াজ কেটে, হলুদ লঙ্কা তেজপাতা, কেউ সামান্য জিরে গুঁড়ো ছড়িয়ে কষিয়ে জল মেরে ঢাকা দিয়ে দিলেই বেসিক মাংসটা রেডি। তারপর ঢাকা খুলে ঘি, গরমমশলা ঢেলে দিলেই... আঃ, তোফা।
    তো, তারপর সে জামানার জামানত জব্দ হয়েছে বহুদিন, আমাদের জেনারেশনের হাতে খুন্তি যেতে এমনি সহজে রান্না আমরা মোটেও করিনি। কোনবার গরমজলে ধুয়ে ভিনিগারের ফাউন্ডেশন মাখিয়েছি, কে বলল আবার ওতে হবেনা, টকদই এর ফেসিয়াল করে দাও। আরেকজন বল্লে একি ছি ছি, গওমমশলা কেউ পরে দেয়? ওটা ফোড়নে দিয়ে দে, ওটাই তো আসল পারফিউম।
    তবে এ হল মানে আমার মত যারা, 'ছোট্ট টিপ, হালকা লিপস্টিক' তাদের রান্না। আর যারা পাক্কা সাজুনি, তারা যে মাংসের বাটির সঙ্গে সেল্ফি তুলবে বলে কি, কি করতে পারে সে আর না বলাই ভালো।
    ইরানি বনবালার পদরেণুর কাসুন্দি থেকে শুরু করে আফ্রিকান জেব্রার দুমতেল সব তারা ট্রাই করে ফেলেছে। এখন খেতে সেই মাংস কেমন হবে তা বলা মুস্কিল, কিন্তু ঐ, ম্যারিনেশনটা ইনস্টাতে ভালো খায়। মানুষে যা খুশি খেলেই হল। এমনকি না খেলেও হল।
    তবে আমার পাশের ফ্ল্যাটের ঊষা ভাবির মাংস রান্না করার রেসিপি জানার পর আমার এসব জানাচেনা জ্ঞান তুশ্চু বলে মনে হয়। আদতে ঐ মাংস রান্নার পদ্ধতি শোনার পর মাংসকে আমার আর পদ বলেই মনে হয় না। মনে হয় মাংস হল প্রতিটি বুনিয়াদি পরিবারের কালচারাল হেজিমনি।
    এসব ভাট বকার একটাই অর্থ হল ওদের মাংস রান্নার পদ্ধতিটি জানার পর আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
    ঊষা ভাবির সঙ্গে আমার বাটি চালাচালি ভাব নেই। অনেকটা ওপরসা আলাপ আর কি। তবে সে যাই হোক, দুপুরের ঘুম ভেঙে ব্যালকনিতে দুটো মেয়েছেলে একজায়গায় হলে রান্নাবান্না নিয়ে কথা হবেনা তা হতে পারে না। আমি ওদের ধরনের টিন্ডা, লৌকি, দাল মাখানি শিখি। ওকে আমাদের শুক্তো, পেঁপের প্লাস্টিক চাটনি শেখাই। ও শুক্তোর রেসিপি শুনে ঠোঁট উল্টোয় "করেলা এয়সে তো হামারি ঘরমে কোই নেই খায়েগা।" ইসস্ আমিও মনে মনে মুখ বেঁকাই। একগাদা পেঁয়াজ রসুন দিয়ে করলার সত্যনাশ করে দাও আরকি!
    যাই হোক কথাবার্তা শেষমেশ সেই মাংসের গিয়ে ঠেকে। এরা মূলত দৈনন্দিন জীবনে নিরামিষ খেলেও মাংস খায়না তা নয়। সাস সসুর, দেবর, বাল বাচ্চা নিয়ে ঊষা ভাবির খুশিয়াল সংসার। ফ্যামিলি বিজনেস, টাকা পয়সার অভাব নেই। স্বামী মাঝেমধ্যেই সোনা গয়না টয়না গিফট করে। দেখায়ও আমাকে। তা ওদের একবার রান্নায় দু আড়াইকিলো মাংস লেগে যায়। তবে খুব একটা বৈচিত্র্য নেই।
    আমি তাই মহা উৎসাহে ওকে আমার জানা সব রেসিপি উগরে দিতে থাকি। ও কিন্তু ভালো লিসেনার। একবার শুনেই মনে রেখে দেয় গোটা রেসিপি। কিন্তু ওর ভার্সনে ও 'লেবুর রস মাংসটায় মাখিয়ে' দিয়ে শুরু করে মাঝে আমার রেসিপিটা বলে, শেষে 'গরমমশলা ছড়িয়ে' নামিয়ে নেবে।
    একদিন বললাম, আগে যে অন্য মশলাগুলো দিলে, শেষে 'গরমমশলা ছড়িয়ে' নামালে তো আর তার টেস্টটা ঘেঁটে যাবে।
    ও একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, "নেহি তো বাবুজি নেহি খা পায়েঙ্গে।"
    আমি বললাম, আরে করেই একদিন দেখোনা। কিন্তু ঊষা ভাবি ঐ মাথায় বসে যাওয়া স্টেপসের বাইরে বেরোতে পারবে না। রাগও ধরে যায় এক একদিন আমার।
    একদিন বললাম, কি রকম হবেনা শুনি? আজ আঙ্কলজি কে আমার রেসিপি করে খাওয়াবো। দেখি তো কেমন তোমার ঐ আগে নিম্বুপানি আর শেষে গরমিমশলা না দিলে সে খায়না?
    ভাবি একটু উদাস হয়ে বলল, "দিস। তোরটা খাবে"
    আমি বললাম, "মানে কি? আমাকে মুখের ওপর বলতে পারবে না তাই নাকি?"
    ভাবি বলল, "না না তা নয়।" তারপর খানিকক্ষণ সময় নিয়ে বলল, "সেই ষোল বছরে যখন শাদি হয়ে আসি, তখন থেকেই মাইজি আগে নিম্বু মাখিয়ে গুনে নিত মাংসের পিস। আমি রসুই করতাম। শেষে মাইজি আবার গরমমশলা ঢালবে বলে গুনে নিত। মাঝে আমি লোভে পড়ে যদি দু এক পিস...
    মুখে বলতো এরকম না করলে, "বাবুজি নেহি খা পায়েঙ্গে"।
    কথাটা শেষ করেনা ও।
    আবার ঢোক গিলে বলে, "কি কান্ড বলত, এখন আমি বাল বাচ্চার মা। এখনও কি আমি ..? ওরাও বন্ধ করে নি আমারও বলতে ইচ্ছা হয়না।"
    ভাবি একটু ম্লান হেসে ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
    আমি স্তব্ধ হয়ে ওর সোনার বালা পরা হাতটির দিকে তাকিয়ে থাকি।
    ঐ হাত দিয়ে ও বছরের পর বছর অবিশ্বাসের মাংস রাঁধছে। এ ও এক অভিনব রেসিপি বটে।

    চিত্রঋণঃ আন্তর্জাল
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • যোষিতা | ১৫ মে ২০২২ ১৭:২৪507677
  • এটা তো কবিতা
  • ইন্দ্রাণী | ১৫ মে ২০২২ ১৭:৫৮507681
  • ছোট্টো লেখা। কী অভিঘাত!
    বহুদিন মনে থাকবে।
  • r2h | 134.238.14.27 | ১৫ মে ২০২২ ১৯:২২507687
  • অভিঘাত শব্দটা ইন্দ্রাণীদি বলে দিয়েছে, ঐটা ছাড়া বলার নেই কিছু। শেষটা এইরকম ভাবতে পারিনি, চমকেছি।

    সংকোচের সঙ্গেই বলি, একটা টাইপো, বালা পড়া পরা -এইটা যদি করে দেওয়া যায়, আর চিত্রঋণের আগে একটা স্পেস, এগুলো কিছু না, কিন্তু লেখার তীব্রতার জন্যেই, শেষে শ্বাস ফেলার জন্যে একটা ফাঁকা লাইন পাওয়া গেলে ভালো ...
  • ঝর্না বিশ্বাস | ১৫ মে ২০২২ ২০:৫৮507688
  • বাহ...'অবিশ্বাসের মাংস'.. সুন্দর লিখেছেন।..  আসলে ধরা বাঁধা গন্ডির বাইরে বেরোতে আমাদের একটু সময় লাগে। এখানেও তাই বোধহয়।.. 
  • Arundhati Sarkar Santra | ১৫ মে ২০২২ ২১:০১507689
  • সবাইকে অনেক ধন্যবাদ
  • AC | 73.241.122.10 | ১৫ মে ২০২২ ২২:৫০507696
  • খুব ভালো লেখা। খালি মাঝে ওই 'মেয়েছেলে' শব্দটা ছাড়া ; জানিনা ওটা r পেছনে কোনো বিশেষ টিপ্পনী আছে কিনা 
  • Emanul Haque | ১৬ মে ২০২২ ১৮:২২507726
  • সুন্দর লেখা
  • dc | 182.65.209.119 | ১৬ মে ২০২২ ১৮:২৭507727
  • গল্পের শেষটা পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল, তবে এরকম আমাদের চারপাশে অনেক সময়ই হয়, সেটাও ঠিক। লাইফ পার্টনারকেই যদি বিশ্বাস না করতে পারলাম তাহলে বিয়ে করে লাভটাই বা কি? 
  • Sumedha Ray | 2a02:908:1e7:34e0:d5e4:d06:6e55:8afb | ১৭ মে ২০২২ ০২:২১507741
  • কিছু কিছু লেখা চিরদিনের মতো মনে গেঁথে যায় ...এই লেখা সেই লেখা ।..শেষটুকু পরে স্তব্ধ হয়ে গেছি ...
  • Amit | 121.200.237.26 | ১৭ মে ২০২২ ০৫:২১507746
  • গল্পটা পড়ে মনটা খারাপ লাগল কিন্তু অবাক হলাম না। ঠিক এতটা না হলেও ছোটবেলায় যৌথ পরিবারে নিজের চোখেই সিমিলার নানা ধরণের ন্যারো মাইন্ডেডনেস দেখে দেখেই  বড়ো হয়েছি। কাও বেল্ট তো ছেড়েই দিচ্ছি, ওগুলো এখনো আদিম যুগে পড়ে আছে , অন্য স্টেট্ গুলোতেও বেশির ভাগ ভারতীয় যৌথ পরিবারে বৌ আনা হয় বেসিক্যালি ঘরের ফাইফরমাশ খাটার জন্যে একটা ফ্রি তে কাজের লোক পাওয়ার আশায়। 
     
    আজকাল বরং মাইক্রো এবং ডাবল ইনকাম ফ্যামিলি গুলোতে তে মেয়ে দের একুয়াল রাইটস বেটার এস্টাব্লিশড হচ্ছে। বাপ্ মায়ের আঁচলের তলা থেকে বেরিয়ে ঘরের কাজ ভাগ করে নিতে শিখছে ছেলেরাও আস্তে আস্তে। যদিও ওয়েস্ট এর লেভেলে আস্তে হয়তো আরো ৫০-৬০ বছর। যদ্দিন সস্তায় কাজের লোক জুটবে ইন্ডিয়ায় , তদ্দিন সভ্য সোসাইটি তৈরী হবে না। 
  • Arundhati Sarkar Santra | ১৭ মে ২০২২ ০৯:১৪507748
  • মতামত গুলির জন্য ধন্যবাদ। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন