ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • গল্প : কালীপদ কেরানি

    Dipankar Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ | ২৯৭ বার পঠিত
  • কালীপদবাবু বয়সের আগেই বুড়িয়ে গেছেন। আজকাল চোখেও ভালো দেখেন না। সুগার হাড়ের ব্যথা মাথা ঝিমঝিম সব লেগেই আছে। ঘুম থেকে ওঠে শরীরটাকে সোজা করতেই অনেকক্ষণ লাগে। মন মেজাজও তাই ভাল থাকে না। গিন্নি বলেন, বনের বাঘে খায় না মনের বাঘে খায়। অফিসে আসার জন্য প্রমথকে বলে রেখেছেন তার অটোটা নিয়ে ঠিক সাড়ে নটায় রোজ আসার জন্য। প্রমথ অবশ্য কথার খেলাপ করে না। বিশেষ অসুবিধে হলে ফোন করে জানিয়ে দেয়, অন্য অটো পাঠাচ্ছি।

    চাকরির আর দু'বছর বাকি। অফিসে আজকাল তার উপর তেমন একটা কাজের চাপ নেই। নতুন দু'টো ছেলে চাকরিতে জয়েন করায় তারা তার কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বড্ড মায়া লাগে ছেলে দুটোকে। ওরা কন্ট্রাকচুয়াল। চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটে। কালীপদকে কাকু বলে ডাকে। হাত থেকে টেনে নিয়ে যায় তার কাজ।

    আজ কালীপদর নাওয়া খাওয়া একটু আগেই শেষ। কিন্তু মনটা কেন জানি না কচকচ করছে। রোজকার মতো ঠাকুরের পায়ে তুলসী পাতা দিতে গেছিলেন। কিন্তু চন্দন দিয়ে যেই তুলসী পাতাটা বিষ্ণুর ফটোতে দিয়েছেন তা না আটকে নিচে পড়ে গেছে। সেই থেকে, ওম নমো ভগবতে বাসুদেবায় জপ করে যাচ্ছেন।

    প্রমথ গেটের সামনে এসে হর্ণ দিচ্ছে। কালীপদ ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আরও দু-তিন বার জপ করলেন। প্রমথ ডাকছে, কাকু রেডি তো? তাড়াতাড়ি করুন রাস্তায় যা জ্যাম দেখে এলাম মনে হয় না সময়মতো পৌঁছাতে পারবো।

    কালীপদ হাত দেখালেন। প্রমথ মুখ বন্ধ করলো।

    অটোতে উঠে বসতেই অফিস থেকে বড়বাবুর ফোন এল, কোথায় আছেন, অফিসে আসছেন তো?

    কালীপদর বুকটা ধ্ক করে উঠলো। এ সময় তো বড়বাবু ফোন করার কথা নয়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন এখনো দশটা বাজতে পনেরো মিনিট বাকি। তাহলে কি অফিসে কোনো অঘটন ঘটেছে। নাকি অফিসের কেউ তার নামে গতকাল কোনো অভিযোগ করে গেছে।

    কালীপদ সাহসে ভর করে প্রশ্ন করলেন, কি হয়েছে বড়বাবু? কোন অসুবিধা হয়েছে নাকি?

    না না তেমন কিছু নয় আপনি অফিসে আসুন বলছি।

    আর কিছু প্রশ্ন করার আগেই বড়বাবু ফোনটা কেটে দিলেন। বড্ড অসভ্য প্রকৃতির লোক। নিজের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই তিনি বলেন। উল্টো দিকের কথা খুব একটা শুনতে চান না।

    কালীপদর শ্বাসগুলো খুব জোরে জোরে পড়ছে। মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যামে অটোর গতি চিনা জুকের মত হয়ে গেছে। প্রমথ কিছু একটা বুঝতে পেরেছে হয়ত। দীর্ঘদিন ধরে কালীপদকে নিয়ে যায় কিনা। কাকু, অফিসে কি কোনো সমস্যা হয়েছে?

    না রে তেমন কিছু নয়। তুই একটু তাড়াতাড়ি চালা বাবা।

    প্রমথ দু-একবার হর্ন বাজালো। এই জ্যামে এর চেয়ে বেশি তার করারও তো কিছু নেই। সে তো আর পাখি নয় যে সামনের গাড়িগুলোর উপড় দিয়ে উড়ে যাবে।

    অফিসে ঢুকে কালীপদ নিজের টেবিলের দিকে না গিয়ে সোজা বড়বাবুর দিকে চলে গেলেন। কালীপদকে দেখে বড়বাবু বললেন, এসে গেছেন এই নিন কাগজটা রেখে কপিতে সই করুন। কালীপদর গলা শুকিয়ে আসছে। চশমা ছাড়া যতদূর দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সরকারি কাগজ। কালীপদ আমতা আমতা করে বললেন, কি এটা?

    না না ভয়ের কিছু নেই, নির্বাচন এসেছে তো তাই ইলেকশন ডিউটির কাগজ এসেছে।

    বিষ্ণুর পায়ের তুলসী'টা পড়ে যাওয়ার সময়ই কালীপদ প্রমাদ গুনেছিলেন। আজ লক্ষণ ভাল নয়! কাগজটা হাতে নিয়ে কালীপদ ভেল ভেল করে বড় বাবুর দিকে তাকালেন। নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি যেদিন জারি হয়েছিল সেদিনই কালীপদ একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন। কিছু লোক ভোটকেন্দ্রে তাকে কুপিয়ে খুন করছে। কালীপদ লাফিয়ে ঘুম থেকে উঠে দেখেন ঘামে তার পুরো শরীর ভিজে গেছে।

    বড়বাবু তাড়া দিচ্ছেন, কপিতে সই দিন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনারা না ইলেকশন ডিউটির নাম শুনলেই ভয়ে কেঁচো হয়ে যান।

    কালীপদর গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা মনে হলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। লম্বা লম্বা চার পাঁচটা লোক লুঙ্গি কোচা দিয়ে হাত দা'টা তার গলায় লাগিয়েছিল, ব্যালট পেপারগুলো দে শালা না হলে তুই নয় তোর লাশ বাড়ি যাবে।

    কালীপদ নিজের টেবিলে বসে ডিউটির কাগজটা দেখছেন। বিশেষ দেখে অবশ্য লাভ নেই।।আজকাল তো সেন্টারের নাম আগে জানায় না। ভোটের দিন ডিকোডিং করে চিচিংফাঁক হয়।
    সবকিছু আজ তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। হাতে কাজ উঠছে না। কালীপদ অফিস ক্যান্টিনে গিয়ে এককাপ চা'র অর্ডার দিলেন। মন শক্ত করার চেষ্টা করতে হবে এবার। কে যেন একজন মহাপুরুষ বলে গেছেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত একজোড়া নতুন জুতোর জন্য হাহাকার করছিলাম যতক্ষণ না দেখলাম একটা লোক যার দুটো পা-ই নেই। তাই নিচের দিকে দেখতে হয়। গতবার ভোটের সরঞ্জাম নিতে গিয়ে এমন এক ভদ্রলোককে পেয়েছিলেন যিনি কবেই পেনশনে চলে গেছেন। কিন্তু তাকেও ছাড়া হয়নি। অবশ্যই ভুলবশত ! কিন্তু সে বেচারা যেভাবে ছোটাছুটি করছিল যেন সব দোষ তার। রিটায়ার করে মরে যাওয়াই বোধহয় তার উচিত ছিল। অন্তত এমন একটা বিচ্ছিরি অবস্থায় তাকে পড়তে হতো না।

    ভোটের ডিউটিতে যাবার দিন কালীপদ এমন মরাকান্না দিলেন যেন তিনি আর ফিরে আসবেন না। তার কান্না শুনে পাশের বাড়ির ব্রজেন'দা এসে পিঠে হাত রেখে সান্তনা দিয়ে বললেন এমন কাঁদতে নেই কালী, ওখানে গিয়ে একটা ফোন দিস। আমাদের পার্টির ছেলেদের বলে দেবো। ব্রজেনদা বিরোধী দল ছেড়ে শাসক দলে সদ্য যোগ দিয়েছন। পাকা খেলুড়ে। গত পরশু তার বাড়িতে নেতাদের বৈঠক গেছে। দলে ঢুকেই ভাল জায়গা করে নিয়েছেন। ব্রজেন'দার কথায় একটু ভরসা পেলেন কালীপদ, আমার নম্বরটা সেভ আছে তো ব্রজেন'দা? ফোন করলে ধরো প্লিজ।

    ব্রজেনদা পিঠ চাপড়ে বললো, যা যা বিন্দাস মুডে ডিউটি দে গিয়ে।

    একজোড়া ভোটের পার্টির জনাদশেক লোক নিয়ে একটা ছোট বাস গ্রামের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। সন্ধ্যে হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অচিন দেশের দিকে যাত্রা। সবার মুখেই উৎকণ্ঠার ছাপ। চাপা ফিসফাস কথাবার্তা। কিছুদূর গিয়ে এক পার্টি নেমে গেল। যেখানে নামল সেখানে দু চারটে ঘরবাড়ি আছে অবশ্য। গ্রামের একটা দোকানও খোলা আছে তখনও। কালীপদর পার্টিকে এবার এগুতে হবে আরো আগে। এমনিতেই গা ছমছম করছে তার ওপর ড্রাইভার বলল আপনাদের যেখানে সেন্টার সেখানে তো গাড়ি যাবে না, পায়ে হেঁটে যেতে হবে। কী আর করা! এক জায়গায় এসে গাড়ি থামলো। এবার পায়ে হাঁটা পথ। অন্ধকার পথে মোবাইলের আলোই ভরসা। একসময় স্কুল ঘরে এসে পৌঁছলো কালীপদর পার্টি। এখানে ভোট নেওয়া হবে। কিন্তু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা? হাঁকডাক করে কাউকেই পাওয়া গেল না। অন্ধকার স্কুল ঘরে মাটির সোঁদা গন্ধ। রাতের নিস্তব্ধতায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর একটা অচেনা শব্দ ছাড়া বিশেষ কোনো সাড়া নেই। মনে হয় কোনো অদ্ভুত প্রাণী কিছু একটা বললো। মানুষের আওয়াজ বোধহয় তার অপছন্দ।

    কালীপদ ভাবছেন, ভগবান তার জন্মের সময় বেশি আঁচে কপালটা পুড়ে রেখেছেন! দুনিয়াতে কত কত লোক কী সুন্দর সব ঝামেলা থেকে দিব্যি উতরে যায়। এইতো অফিসের নিরঞ্জন গতবছর ভোটের ডিউটি দিয়ে এসে গল্প করেছিল সে নাকি বাগানে কোথায় ডিউটি দিয়ে এসেছে। তার নাকি সাহেবের বাংলোয় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। এমন বাংলো তার চৌদ্দপুরুষের কেউ দেখেনি। সুস্বাদু খাবার আর সারারাত তাস খেলা। নিরঞ্জন সুযোগ পেলে বোতলে একটু আধটু চুমুকও দেয়। সাহেবের নির্দেশে বাগানের সেজবাবু নাকি সে ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন।

    স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্ন মিলে রাতটা কোনক্রমে কেটে গেল কালীপদর। সকালে অবশ্য গ্রামের দুই একজন লোকের দেখা পাওয়া গেছে। এক বাড়ীতে বলে কয়ে সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন প্রিসাইডিং অফিসার। কালীপদ সাধারণ কেরানি, তাই ভোটের ডিউটিতে তিনি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে নন এখানে। মানুষের আঙ্গুলে কালি লাগানোটা তার কাজ। প্রিসাইডিং অফিসার প্রচুর কাগজপত্র নিয়ে বসেছেন। গুরুগম্ভীর লোক। কোন এক স্কুলের নাকি হেডমাস্টার।

    পরদিন ভোট পর্ব শান্তিপূর্ণই চলছিল। এরই ফাঁকে গরম গরম চা আর রুটি সবজিও সবাই খেয়েছেন। দিনটা ভালয় ভালয় কেটে যাচ্ছে দেখে একসময় কালীপদ ইষ্ট নাম জপ করা ভুলে গেছিলেন। সত্যিই, বিপদে পড়লেই মানুষ ঈশ্বরকে ডাকে। এতে সম্ভবত ঈশ্বর তাকে বেইমান ভেবে একটা উটকো ঝামেলা সৃষ্টি করেন। সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে যাওয়ার পথে তখন বছর সত্তরের এক বৃদ্ধ এসে বললেন তাকে আটখানা ব্যালট পেপার দিতে হবে। এগুলো সবই তার বাড়ির মহিলাদের ভোটের জন্য। প্রিসাইডিং আপত্তি করায় তিনি বললেন, আরে মশাই এত বছর তো এভাবেই দিয়ে এসেছি। খানদানি বাড়ির মেয়েছেলে সদরে আসবে নাকি?

    প্রিসাইডিং আর কিছু বলার আগেই তিনি ঈগলের মত ছোঁ মেরে কিছু পেপার হাতে নিয়ে নিলেন। তাই দেখে কারা যেন চেঁচিয়ে উঠলো, ব্যালট ছিনতাই হচ্ছে রে এ এ .. তোরা কে কোথায় আছিস এগিয়ে আয়।

    সম্ভবত এরা বিরোধী পার্টির লোক। দেখতে দেখতে ভোট কেন্দ্রটা রণক্ষেত্রের রূপ নিল। কারো হাতে দা, কারো হাতে লাঠি। ছিনতাইবাজ লোকটাকে সবাই চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো। সেও সহজে দমবার লোক নয়। তার ভাইপো নাকি পঞ্চায়েত প্রধান পদে দাঁড়িয়েছে। বাতাসের আগে খবর চারদিকে ছড়িয়ে গেল। কালীপদ ঠকঠক করে কাঁপছেন । আঙুলে লাগানোর কালির দোয়াত উল্টে তার শার্টের উপর পড়েছে।

    কে যেন পেছন থেকে কালীপদর মাথায় একটা সজোরে চাঁটিও মারলো। শক্তিশালী হাত। কালীপদ চোখে অন্ধকার দেখছেন। টাল সামলাতে না পেরে উড়ে গিয়ে ছিনতাইবাজের উপর পড়লেন। ততক্ষণে ছিনতাইবাজের ভাইপো সেখানে দলবল নিয়ে হাজির হয়েছে। সে তার কাকার উপর পড়ার অপরাধে কালীপদর কলার চেপে ধরল। সেই সুযোগে প্রিসাইডিং সহ পোলিং পার্টির লোকেরা যে যেদিকে পারে ছুটে পালিয়ে গেল। কালীপদ একা অসহায়ের মত গুন্ডাদের মধ্যে আটকে গেলেন। ঘিরে ধরা লোকেরা কালীপদর মাথায় পেটে বুকে কিল ঘুষি মেরে যাচ্ছে। পঞ্চায়েত পদ প্রার্থী লোকটা কালীপদর সামনে দাঁড়িয়ে একটা অশ্লীল গালি দিয়ে তার নাকে সজোরে একটা বিক্সিং মারলো। কালীপদ তারার মত ঝিলমিল কী যেন দেখছেন। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপরের কথা তার আর খেয়াল নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলেন তিনি হাসপাতালের বেডে। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা, নাকে মাথায় প্লাস্টার। পরে জেনেছেন যে তার মার খাওয়ার ছবি নাকি পত্রিকাতেও এসেছিল।

    দেখতে দেখতে একটা বছর পেরিয়ে গেছে। এই এক বছরে মনের আর শরীরের দুটো ক্ষতই মিলিয়ে গেছে। চাকরিও প্রায় শেষের পথে। চাকরিতে থাকতে থাকতেই মেয়েটার বিয়ে দেওয়ার কথা আগাম ভেবে রেখেছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক সরকারি চাকুরিয়ান সুপাত্রও পেয়েছেন। দাবিদাওয়া তেমন কিছুই নেই। তবে একশ জন বরযাত্রী আসবে এটাই কথা। তাদের যেন আপ্যায়নে ত্রুটি না হয়।

    সরকারি চাকরি শুনে কালীপদ জাত গোত্র তেমন একটা খুঁজেন নি। আত্মীয়স্বজন মাতুল বাড়ি আদিবাড়ি এসব নিয়েও তার তেমন আগ্রহও নেই।

    বরযাত্রী বোধ হয় একশর জায়গায় একটু বেশিই এসেছে। এক এক করে তো আর ক্যাটারারের মত মাথা গুনে দেখা যায় না। একশ হোক আর দুশো কালীপদ আপ্যায়নে ত্রুটি রাখতে চান না। এক এক করে সবাইকে গিয়ে নমস্কার জানিয়ে ভাব বিনিময় করছেন। ঘটক সবার সাথে কালীপদর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। ইনি বরের মামা, ইনি কাকু, এইজন মাসি তো উনি প্রতিবেশী। কালীপদ মুখের দিকে দেখছেন আর মাথা নুইয়ে নমস্কার দিচ্ছেন। বিয়ের প্রাথমিক আচার-অনুষ্ঠানে যাদের সঙ্গে কালীপদর পরিচয় হয়েছিল তাদের দেখে তিনি বলেছেন, উনাকে তো চিনি। আগে পরিচয় হয়েছে।

    এরই মধ্যে সোফায় বসা সাদা প্যান্ট আকাশি শার্ট পরা এক ভদ্রলোকের দিকে কালীপদর চোখ বারবার যাচ্ছে। লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছেন! কালীপদ আস্তে আস্তে সে দিকেই এগুচ্ছেন। ঘটক এবার এক এক করে সোফায় বসা লোকটার কাছে কালীপদকে নিয়ে এলো। গোলাপি গায়ের রঙের সাথে চোখে সোনালি চশমায় লোকটাকে মানিয়েছে বেশ। ঘটক বললো ইনি বরের মেজ মামা। খুব জনপ্রিয় লোক। দশ গ্রামের লোক ওনাকে সম্মান করে। কত গরিব দুঃখি যে উনার দয়ায় বেঁচে আছে ঈশ্বরই জানেন। এমন অমায়িক সজ্জন ব্যক্তি সে তল্লাটে আর নেই। আপনার মেয়ে ভাগ্যবান এমন একজন মামাশ্বশুর পেয়েছে। লোকটার সাথে চোখাচোখি হতেই কালীপদর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। কালীপদর মুখের হাসিটা মিলিয়ে মুখটা আস্তে আস্তে কেমন যেন বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ভয় পেলে তার মুখটা নিচের দিকে টানতে থাকে। সম্ভবত নার্ভের রোগ। কালীপদর মনে হচ্ছে লোকটার সাথে একটা ভয়ের সম্পর্ক যেন আছে কোথাও। নাহলে বুকের স্পন্দন এত বাড়বে কেন। লোকটা কালীপদর দিকে হাত বাড়ালো । কালীপদর হাত কাঁপছে। লোকটা বলল, কি হয়েছে? অসুস্থ লাগছে নাকি? ঘটক ঢাকবার চেষ্টা করলো, না আসলে উনি মেয়ের বাবা তো তাই যাতে সব ঠিকমতো হয় এনিয়ে চিন্তায় আছেন। লোকটা খুব মিষ্টি করে হাসলো। কালীপদ আর লোকটার মুখের দিকে তাকাতে পারছেন না।

    চোখের সামনে লোকটার আসল পরিচয় ফুটে উঠেছে। এতক্ষনে মনে পড়েছে লোকটাকে কোথায় দেখেছেন। এই সেই লোক যে নির্বাচনের দিন কালীপদকে পিটিয়ে ভোট ছিনতাই করেছিল। এই সেই পঞ্চায়েত প্রধান যার মার খেয়ে কালীপদ হাসপাতালে দশদিন ভর্তি ছিলেন । কালীপদ এখানে আর দাঁড়াতে পারলেন না। ভগবান সহায়। হটাৎ করে কারেন্ট চলে গেল। কালীপদ এই সুযোগে আসছি বলে সরে এলেন।

    ভাগ্যিস কারেন্ট চলে গিয়েছিল। আর একটু হলেই লোকটা তাকে চিনে ফেলতো। কী লজ্জাই না হতো তখন। লোকটার সামনে আর না যাওয়াই ভাল। কিন্তু একটু পরেই তো কন্যাদানে বসতে হবে। সবাই কুঞ্জোর চারদিকে থাকবে। তিনি লুকাবেন কী করে !

    তা ছাড়া আজ লুকোলেই কি শেষ? এখানে যখন মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন তখন এই লোকের সাথে তো বারবার দেখা হবে। ওদের বাড়িতে যে কোনো অনুষ্ঠানে মুখোমুখি হওয়ার ভয় আছে। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না কালীপদ। কেনো যে বিয়ের আগে সব আত্মীয় স্বজনকে দেখলেন না!

    কালীপদ বিয়ে বাড়ির কোলাহল থেকে সরে এসে সামনের খালি মাঠটায় দাঁড়িয়েছেন। এখানে বরযাত্রীদের গাড়ী গুলো রাখা আছে। ড্রাইভাররা গল্প গুজব করছে। খালি মাঠ হলেও হরিপদ যেখানে দাঁড়িয়েছেন সেখানে ভীষণ শব্দ। একটা বিশাল জেনারেটর চলছে । ভবিষ্যতের কথা ভেবে কালীপদ ঘামছেন। পকেটের মোবাইলটা মনে হয় বাজছে। কেউ হয়তো তাকে না পেয়ে খুঁজছে? এখানেই বা কতক্ষন দাঁড়াবেন। কোনোক্রমে আজকের রাতটা পার করে দিতে পারলে রক্ষে। ভবিষ্যতে আর মেয়ের শ্বশুর বাড়ির কোনো অনুষ্ঠানে নিজে না গিয়ে গিন্নিকে পাঠাবেন। নিজেই আর বাঁচবেন কদিন। মুখ লুকিয়ে বছর দু তিন কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

    কালীপদ চমকে উঠলেন। কে যেনো অনেকক্ষণ ডেকে উত্তর না পেয়ে পিঠে হাত রাখলো। ঘুরে চেহারাটা দেখে দৌড়ে পালাতে চাইছিলেন। সেই লোকটা! এখান পর্যন্ত চলে এসেছে। লোকটা হাত ধরে আটকালো কালীপদকে। এখানে কি করছেন? কালীপদর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। মাটির দিকে দেখছেন। চোখ থেকে টপটপ জল পড়ছে। লোকটা বললো, আমি আপনাকে দেখেই চিনতে পেরেছিলাম। ওসব কিছু না। লাইট কেস। চলুন দেখি। বলে গলায় ধরে হাটতে হাটতে বিয়ে বাড়ির দিকে যেতে লাগলো। নিজের বাড়ীতে ঢুকতেই আজ পা কাঁপছে কালীপদর।

    ঘটক কালীপদকে বারবার ফোন করে না পেয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে। গলায় ধরে দুজনকে আসতে দেখে হেসে বললো, বাহ্ দুই বেহাইর প্রথম পরিচয়েই এতো মিল। একেবারে বাড়ি ছেড়ে গলাগলি করে মাঠে। কালীপদ একটু তফাৎ যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটা যেভাবে কালীপদর ঘাড়ের ওপর দিয়ে বুক পর্যন্ত হাত নামিয়ে এনেছে তাতে ছুটা মুশকিল। কালীপদর কিছু বলতে গিয়ে শুধু ঠোঁট কাপল। কোনো শব্দ তৈরি হল না। লোকটা বললো, উনার সাথে আমার অনেক পুরনো পরিচয়। আর কিছু বলার আগেই কালীপদ লোকটার মুখের দিকে করুণ ভাবে তাকালো। এবার বোধহয় পরিচয়ের সূত্র টা সে বলে দেবে। লোকটা কালীপদর দিকে তাঁকিয়ে চোখ টিপলো। খুব স্মার্ট লোক। কিছুটা বেশরমও মনে হয়। এধরনের কান্ড করে মনে হয় সে ধাতস্ত। তাই আগে বলছিল, লাইট কেস ! কালীপদ এখনও স্বাভাবিক হতে পারছে না। সবলের সামনে দুর্বলের সমানে সমানে দাঁড়িয়েও একটা হীনমন্যতাবোধ থেকেই যায়। সবল যতই স্বাভাবিক আচরণ করুন দুর্বলের সেটাকে অনুগ্রহ বলেই মনে হয়। সবল অন্যায় আচরণ পরেও বুক ফুলিয়ে হাঁটতে পারে আর দুর্বল অন্যায় ভাবে মার খেয়েও চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারে না। কালীপদও লোকটার গায়ে গা লাগিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেনি। ক্ষমতাবানের শরীরের একটা গরম বাতাস তার বাঁচার শ্বাসটুকু আটকে দিচ্ছিল। কালীপদ আবারও হাত ছাড়িয়ে সরে গেল।

    বিয়ে শেষ। বরযাত্রীরা এবার চলে যাবে। কালীপদ সামনে আসতে চাইছে না। কেন যে কালীপদ লুকোচ্ছে সে নিজেও ভেবে পাচ্ছে না। কে যেনো একদিন বলেছিল, মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের লজ্জা শরম নাকি একটা অভিশপ্ত প্রাপ্তি !
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন