• খেরোর খাতা

  • ক্ষুদ্র জীবন টুকরো কথা

    Asadul Islam লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ অক্টোবর ২০২১ | ২১৭ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ক্ষুদ্র জীবন টুকরো কথা - ১  

    তখন আমি নাদান। ২০০৪ সাল।  সবে হাঁটা শুরু করেছি লেখালেখির জগতে।  গোবরডাঙ্গার ছোটগল্পের কাগজ 'সাগ্নিক' তাদের ১৪১১-র বার্ষিক সংখ্যাটি করেছিল 'পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজ ও জীবনের গল্প ' --- এই  বিষয়টি নিয়ে। আমরা চারিদিকে যেমন দিশাহীন ও অগোছালোভাবে নানা পত্রিকা প্রকাশ করতে দেখি সেরকমভাবে কিন্তু করা নয় এই সংখ্যাটি। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে কাজটি  করা হয়েছিল। এই কাজটি করার ক্ষেত্রে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সাগ্নিকের সম্পাদক উজ্জ্বল চক্রবর্তী, সাহিত্যিক সাত্যকি হালদার এবং সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক মিলন দত্ত। সেই সময় পর্যন্ত  পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান জনজীবন নিয়ে ওইরকম যত্নশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমার নজরে পড়ে নি। সংখ্যাটিতে গল্প ছিল কুড়িটি।  সাত্যকি হালদার, শৈলেন সরকার ছাড়া বাকি ১৮ জন লেখক ছিলেন মুসলিম সমাজের। আব্দুর রাকিব, সোহরাব হোসেন, আফসার আমেদ, এ মান্নাফ, আনসারউদ্দিন, নীহারুল ইসলাম ---  এইসব পরিচিত এবং শক্তিশালী লেখকদের সঙ্গে আমারও একটি গল্প ছিল ওই সংখ্যায়। তখন আমি একদমই অপরিচিত একজন এবং উজ্জ্বল চক্রবর্তী, সাত্যকি হালদার বা মিলন দত্ত কারো সঙ্গেই চেনাজানা তো পরের কথা কোনো পরিচয়ই ছিল না। তবু আমার গল্প কীভাবে স্থান পেল তার পিছনে আছে আরও এক গল্প। সেকথা অন্যসময় বলা যাবে। লেখকদের মধ্যে আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ এবং আমার গল্প দিয়েই শুরু হয়েছিল সংখ্যাটি। পরে জেনেছিলাম কেন আমার গল্প দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেকথা নিজে মুখে বলা উচিত নয় বলে মনে করি। তবে ওই সংখ্যায় সবচেয়ে মূল্যবান লেখাটি ছিল  মিলন দত্তের।  'আমাদের সাহিত্য, আমাদের মুসলমান জীবন' শিরোনামে যে ভূমিকাটি তিনি লিখেছিলেন, আমি মনে করি মুসলমান জীবন ও সমাজকে নিয়ে কাজ করতে হলে তো অবশ্যই -- কেবল জানতে চাইলেও ---- মুসলিম-অমুসলিম প্রত্যেকেরই ওই প্রবন্ধটি পড়া উচিত।

    সাগ্নিকের ওই সংখ্যাটি এতটাই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল যে তা খুব দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। কলেজস্ট্রিট পাড়ার বর্তমানের বিখ্যাত প্রকাশক সংস্থা 'গাঙচিল' ২০০৫  সাল থেকে পথচলার শুরু করে।  তারা ওই সংখ্যাটিকেই 'তাহাদের কথা' নাম দিয়ে বই আকারে প্রকাশ করে। গাঙচিলের প্রথম বই এটি। কলকাতা বইমেলা তখন ময়দানে হতো।  আমি থাকতাম  আলিমুদ্দিন স্ট্রিট এলাকায়। হেঁটে হেঁটে বইমেলা গিয়েছিলাম। গাঙচিলের স্টলে যেতে এবং নিজের পরিচয় দিতে অধীরদা, অধীর বিশ্বাস যে সম্মান এবং ভালোবাসা দেখিয়ে এক কপি বই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তা আমার স্মৃতিতে আজীবন অমলিন হয়ে থাকবে। হেঁটে হেঁটে বইমেলা থেকে ফেরার পথে যে কী অনুভূতি হয়েছিল তা ভাষায় করা প্রকাশ করার  ক্ষমতা আমার নেই। একটা শিহরণ আর ভালোলাগার আবেশ ছেয়েছিল মনপ্রাণ জুড়ে। এতদিন বইমেলা যেতাম অন্যের বই কিনতে, এবার আমার গল্পও কেউ কিনে পড়বে এই ভাবনা আমাকে এনে দিয়েছিল জান্নাতের অনুভূতি। পশ্চাৎপদ সমাজের অধিকতর পশ্চাৎপদ এলাকার এক পরিবারের যে সন্তান অনটন উপেক্ষা  ছুঁয়ে পৌঁছে গেছে কলকাতার মতো মহানগরীতে, সেখানে কেউ তার ভাবনা-কল্পনাকে নিজের ভাবনা দিয়ে অনুভব করবে --- এই চিন্তা ঘোর লাগিয়ে ছিল মনে। 

    নতুন বইয়ের গন্ধে যে কী মাদকতা আছে, নতুন বই না-পাওয়ার বেদনা বুকের পাঁজরে লুকিয়ে পুরনো বই নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন তাঁদের জানার কথা। নতুন বইটা নিয়ে বাসায় ফেরার পথে দু-একবার গন্ধ শুকে বইটা বুকে চেপে ধরে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিল তখন। ওই গল্প সংকলনের সমালোচনা বের হয়েছিল আনন্দবাজার, প্রতিদিন, গণশক্তি ইত্যাদি পত্রিকায়। শুভেন্দু দাসগুপ্ত, রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা সমালোচনা করেছিলেন। তিন-চারজনের গল্পের কথা উল্লেখ করেছিলেন ওই সমালোচনায়। আমার গল্পের উল্লেখ ছিল প্রতিটি সমালোচনায়।  রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের  মতো অত্যন্ত শক্তিশালী লেখক আমার গল্প নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন তা আমার লেখক জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি। পরস্পর পিঠ চুলকানো আর ধরা-করার এই যুগে খানিকটা আশ্চর্যের ঠেকতে পারে এটা জেনে যে, সমালোচকদের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিল না, আজও নেই। অনেকবার মনে হয়েছে রামকুমারবাবুর সঙ্গে দেখা করে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসি। অগ্রজ বড়ো মাপের লেখক অচেনা-অজানা অনুজ লেখককে কেবল লেখা দিয়ে বিচার করে  ভালোবাসা প্রদানের মাধ্যমে  যে মহত্ত্বতার পরিচয় দিয়েছেন তার প্রতিদান শ্রদ্ধা ছাড়া আর কী হতে পারে! বড়ো বড়ো লেখকরা যে বড়ো মনের মানুষও হন তা তো আমরা বিভিন্ন বিখ্যাত লেখকদের জীবনী পাঠ করে  জেনেছি। আমি জানলাম আমার জীবন দিয়ে।  আফসোসের কথা হল,  সাক্ষাৎ করা আর হয়ে ওঠেনি। রামকুমারবাবুর করা একটি মাত্র মন্তব্য আমার ক্ষুদ্র জীবনের চোরাকুঠিতে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণ-সঞ্চয়। দেখা হলে হয়তো একান্তে যে কথা বলতাম, আজকে পাঁচজনের সামনে, আপনাদের কাছে সেই ভাবনা প্রকাশ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানালাম। সাগ্নিকের উজ্জ্বল চক্রবর্তী, সাত্যকি হালদার, মিলন দত্ত এবং গাঙচিলের অধীর বিশ্বাস --- এঁদের সকলের কাছে বাতাস তুমি আমার শ্রদ্ধাটুকু  পৌঁছে দিও। কারণ ওঁরা না থাকলে আমার ওই প্রাপ্তিটুকু হতো না।  

     

  • বিভাগ : অন্যান্য | ১৫ অক্টোবর ২০২১ | ২১৭ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:e875:5bde:d784:1795 | ১৫ অক্টোবর ২০২১ ২২:১৯499635
  • সুন্দর 
  • বিপ্লব রহমান | ১৬ অক্টোবর ২০২১ ০৫:১৮499639
  • সাহিত্যের এই সব বিপরীত স্রোতও  অসীম শক্তি ধরে। দুর্গম যাত্রাটিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় ধন্যবাদ। 
     
    ভবিষ্যতে আপনার নিজস্ব লেখা প্রত্যাশা করি, নিছক স্মৃতিচারণ নয়। শুভেচ্ছা 
  • Asadul Islam | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:৩৩500879
  • ধন্যবাদ। ভালো থাকুন। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন