• বুলবুলভাজা  পড়াবই  বই পছন্দসই

  • সহজ পড়া - মনে মনে ম্যাজিকের বই

    মহুয়া দাশগুপ্ত
    পড়াবই | বই পছন্দসই | ০৭ নভেম্বর ২০২১ | ৩৬৫ বার পঠিত

  • দুই তিন বছর আগের কথা। মেয়ের পাঠ্য বইগুলি নাড়াচাড়া করতে করতে প্রথম হাতে এল ‘সহজ পড়া’ প্রথম পর্ব, লেখক সুদেষ্ণা মৈত্র। বইটা মেয়েকে পড়াতে পড়াতে কেমন ভালো লাগতে শুরু করল। তারপরেই শিশু সাহিত্য সংসদের ক্যাটালগ খুঁজে সংগ্রহ করলাম ‘সহজ পড়া’ দ্বিতীয় পর্ব। এইবার আরো মুগ্ধ হলাম। সেই ১৯৯৭ সালের এক ডিসেম্বর মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সুদেষ্ণা মৈত্রের ‘সহজ পড়া ’ বইটির দুটি খণ্ড। প্রকাশক শিশু সাহিত্য সংসদ। আপাতভাবে শিশুপাঠ্য এই বইদুটি বিভিন্ন বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার অন্তর্গত। কিন্তু এই দুটি বই পাঠ্যতালিকার গুরুগম্ভীর গণ্ডি পেরিয়ে শিশুদের এক আশ্চর্য কল্পনার ভুবনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। লেখিকা সুদেষ্ণা মৈত্র নিজে একজন শিশুসাহিত্যিক। ছোটদের মধ্যে গল্প বলার আর্টটিকে ছড়িয়ে দেন খেলার ছলে। এই পাঠ্য বইদুটিও সেই মজার ছলে শিশুশিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রথম বাংলা শেখার জন্য সহজ পড়া প্রথম ভাগটি বেশ মনোগ্রাহী। ছোট্ট ছাত্রদের নরম মনে দাগ কেটে যায় মায়াবী শিক্ষণ পদ্ধতি। ব্যঞ্জনবর্ণ শিখতে বসে খুদে পড়ুয়ারা যখন দেখে ‘যাদের মাথায় মাত্রা দেবেই’ আর ‘যাদের মাথায় অল্প মাত্রা দেবে’, এমন মজার খেলা- তখন বাংলা শেখা শুরু হয় পড়া পড়া খেলা দিয়ে। এ যেন এক মজার পথ। যতি চিহ্নের শ্যামলা বাঁক পেরিয়ে কচি মন দ্রুত এগিয়ে চলে। মধ্যে মধ্যে রঙ চেনার পর্ব আসে। কথার পিঠে কথা সাজিয়ে গপ্পো জমে। সমাজের কত্ত ছবি কোলাজের মতো মনের অ্যালবামে জমা হয়! বিচিত্র জীবিকার মানুষ চিনতে চিনতে শব্দও চেনা হয়ে যায়। ছোটো ছোটো তালিকা, খোপ, ছবি, রঙ- শিশুমনে এক গতিময় আনন্দ তৈরি করে। এইভাবে বেশ একটা ছাপ রেখে যায় সহজ পড়ার প্রথম পর্ব।

    সহজ পড়ার দ্বিতীয় পর্বে পড়ার আসর জমে ওঠে আরো। ততদিনে বর্ণ, শব্দ কচিকাঁচা মনগুলিতে বসে গেছে। এবার যেন বাবু হয়ে বসে যুক্তাক্ষর। একটি সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন লেখিকা সুদেষ্ণা মৈত্র। প্রথমে ব-ফলা, য-ফলা, র-ফলা ও রেফ শেখানো হয়েছে। তারপর এক একটি ব্যঞ্জনের সঙ্গে একই বর্গের এবং অন্য বর্গের যোগ কীভাবে হয় তা শেখানো হয়েছে। তারপর খুদে পড়ুয়া দুই বর্ণের যুক্তাক্ষরের পথ পেরিয়ে এগিয়ে গেছে তিন বর্ণের যুক্তাক্ষরের বর্ণ সঙ্কুল পথে। প্রতিটি ধাপে অলক্ষ্যে রয়েছেন লেখিকা, স্নেহময়ী শিক্ষয়িত্রীর মতো।

    আরেকটি দিক বড় চোখ টানে। দুটি পর্বেই টুকরো টুকরো মনোহর গদ্যগুলি। প্রতিটি গদ্য নীতিবোধ জাগায়, ভালো অভ্যাস তৈরি করে। রাখির দিনে শাড়ি পরা, রঙিন ছবি, হাসি, মজা, ভীম মালীর সাজি ভরা রঙিন ফুল বেশ ঝলমল করে তোলে মনটা। রূপসা নদীর তীরে দূর থেকে ভেসে আসে গান। মধুসূদন দাদা একতার বাজায়। রেখা যখন বাবার হাত ধরে মেলায় যায়, চুড়ি কেনে, পিঠে পায়েস খায়- তখন বানান শেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশুমনে তৈরি হয় নস্টালজিয়ার শিকড়। মন উথলপাথল হয় বৈশাখের কালবৈশাখী ঝড়ে। কেউ আবার বহুদূর যাবে বলে কৌটো ভরা মুড়ি নেয়। লেখিকা এই যে গল্পের জাল বুনতে শুরু করলেন, এ শুধু গল্প নয়, জীবনের বুনিয়াদ। তারপর বেলা গড়িয়ে যাওয়ার মতো করে খুদে পড়ুয়া অনায়াসে গিয়ে দাঁড়ায় সহজ পড়ার দ্বিতীয় পর্বে। সেখানেও গল্পে গল্পে পাঠ এগোয়। আদিত্য সেনের কল্যাণপুরে গবেষণা, নাট্যকলায় উৎসাহ, ঈদের পরব, শীতকালের চিড়িয়াখানা কেমন সুন্দর এক পট-চিত্র তৈরি করতে থাকে। তারপর ঋ কার শেখাতে গিয়ে অমোঘ এক মন্ত্রের মতো সহজিয়া সুরে বই যেন কথা বলে ওঠে—

    ‘পৃথিবীতে আমরা বাস করি আমরা।
    আমাদের দৃঢ় হতে হবে।
    আমরা পৃথক হব না।
    সবার হৃদয় জয় করব। ’

    এমনি করে মুখোশের গল্প, দেশে ফেরার কথকতা, জন্মদিনে বই পাওয়া, ভোম্বল সর্দার, রশ্মিমালার গল্পের সোপান পেরিয়ে কখন যে কচিকাঁচাদের মনটি উঁচু তারে বাঁধা হয়ে যায় বোঝাই যায় না পড়ার মুহূর্তে। এই বই পড়ার সময়কার অভিজ্ঞতা আলাদা। গা ঘেঁষে আসে সাদা রঙের আহ্লাদী কুকুরছানা, সরস্বতী পুজোর গন্ধ মিশে যায় বইয়ের পাতার গন্ধের সঙ্গে। এই ফাঁকেই শেখা হয়ে যায় বানান টানান, শব্দ, বর্ণ!

    দুটি পর্বেই খুব মানানসই কবিতা রয়েছে, অবশ্যই ছন্দে গাঁথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, গিরীন্দ্রশেখর বসু, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ কবির কবিতায় কচি পড়ুয়াদের ছন্দের দোলা দিয়ে কত কিছু শিখিয়েছেন সুদেষ্ণা মৈত্র। এর মধ্যেই রয়েছে অনুশীলনী। সেও বেশ মজার। পড়া পড়া খেলার আদর্শ রূপ।

    সব মিলিয়ে একটি পাঠ্যপুস্তক যে এমন উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে, না পড়লে ঠিক অনুভব করা যাবে না। পাতায় পাতায় রঙিন ছবি, অভিধান, গদ্য, পদ্যের সহজিয়া চালের আড়ালে যে গভীর প্রজ্ঞা তার কাছে নত হতে হয়। সুদেষ্ণা মৈত্র সহজভাবে যে ছবি তৈরি করেছেন কথা দিয়ে তা অনবদ্য। বাংলা সাহিত্যের সম্পর্কে হয়তো ভালো লাগার বোধ শিশু মনে জাগিয়ে তুলতে তিনি পেরেছেন। বই দুটির ছাব্বিশ তম মুদ্রণ হাতে নিয়ে অন্তত তাই মনে হল। মনের চোখ খুলে দেয় যা, তাই তো জ্ঞান। সহজ পড়া খুব সহজে জ্ঞানের পথে একটি শিশুর নতুন যাত্রার শুভসূচনা ঘটাতে পারবে। বইটি শিশু মনস্তত্ত্বের কথা মনে রেখে লেখা। শুধু বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় নয়, ঘরে ঘরে শিশু পড়ুয়া রবি ঠাকুরের সহজ পাঠের মতো এই বইও ছুঁয়ে দেখুক। তারপর? মনে মনে ম্যাজিক হবে।

    সহজ পড়া( প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব)
    সুদেষ্ণা মৈত্র
    প্রকাশক: শিশু সাহিত্য সংসদ
    মূল্য-মোট ১৪০ টাকা


    প্রাপ্তিস্থান :
    অনলাইনে — কলেজস্ট্রীট ডট নেট
    বাড়িতে বসে বইটি পেতে হোয়াটসঅ্যাপে বা ফোনে অর্ডার করুন +919330308043 নম্বরে।

     

  • বিভাগ : পড়াবই | ০৭ নভেম্বর ২০২১ | ৩৬৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন