• খেরোর খাতা

  • কাঁচের পিরামিড

    Kausik Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৮৭২ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৩ জন)
  • ক‍্যাঁচকোচ শব্দ তুলে জং ধরা লোহার দরজাটা খুলে গেলো। পুরনো, অতএব শব্দ হবেই। আর শব্দের পেছন পেছন বেরিয়ে এলো হাবু আর ইয়াসিনদের ছোট্ট দল।

    অর্জুনপুর থেকে বাজপুর হয়ে আরো খানিক দূরে যায় ওরা। পরাণ আর সাবির এই পুরনো লোহালক্কড়ের জিনিস কেনাবেচার কাজে প্রথম থেকেই ছিলো ওদের দুজনের সাথে। সাধারণত ওরা যায় দুই আলাদা দিকে দুজনের দুটো দলে ভাগ হয়ে, কিন্তু আজ ঘটছে কিছু অন‍্যরকম। কাঁকনতলার বড়ো তরফের বাড়ির উঠোনে বসে বাড়ির পুরনো সব ঢালাই লোহার রেলিং আর লোহার আসবাবের সাথে আরো টুকরোটাকরা ধাতব জিনিস দেখতে দেখতে ওদের চারজনের অভ‍্যস্ত চোখ যখন বুঝে নিচ্ছিলো যে এগুলো কিনে বেচতে পারলে লাভ মন্দ হবে না, ঠিক তখনই হাবু দেখলো উঠোনের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো অচল উইলিস জিপটা।

    বড়ো তরফের বড়ো কর্তা বসে ছিলেন কাছেই, আর একজন গোমস্তা ধরনের লোক সব ভাঙাচোরা জিনিস হাজির করছিলো চাকরবাকরদের নিয়ে। বাকিরা খেয়াল করেনি, কিন্তু হাবুর চোখে ততক্ষণে ধরা পড়ে গেছে ওপাশে কুলগাছের নিচে ধুলো আর মরচের আবরণে ধূসর বাদামী হয়ে ওঠা জিপের অবয়ব।

    এ তল্লাটে ওদের বিশ বছর ধরে যাতায়াত শুধু ব‍্যবসার কারণে না, ওরা পাশের এলাকা অর্জুনপুরের বাসিন্দা। অল্প বয়স থেকে নানান ধান্দায় লেগে থেকে থেকে এখানকার ঘরবাড়ি, আর ঘরবাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা মানুষজনের কে কোনদিকে যায়, কেন যায়, তার অনেকখানি ওরা জানে। অথচ এই পুরনো অব‍্যবহৃত জিপটা ওদের জানার বাইরে থেকে গেছে এতোকাল। হাবুর আজকের উত্তেজনার কারণ ঠিক এটাই।

    না জানা একটা তথ‍্য আবিষ্কারের আনন্দ, কিংবা উত্তেজনা, হাবুকে অধীর করে তুললো। জিপগাড়িটা সচল থাকলে কাঁকনতলার বড়ো তরফের ওটা বিক্রি করার প্রশ্নই ওঠে না, মানে ওদের কাছে বিক্রি করার প্রশ্ন ওঠে না। উপরওয়ালার অসীম দয়া যে গাড়িটা অচল। আর বড়ো তরফের যে এখন টানাটানির সময় যাচ্ছে, সে কথাও সবাই জানে। অতএব হাবু বড়ো কর্তাকে অনুরোধ করতেই পারে অকেজো ধাতব বান্ডিলটাকে তার কাছে বিক্রি করার জন্য।

    এ পর্যন্ত হাবুর হিসাব ঠিকই আছে। মুশকিলের কথা হলো যে আজ ইয়াসিন, পরাণ, আর সাবিরও হাজির আছে ওর সাথে এই একই ঠিকানায়। ভাঙা জিপটা কিনে লোহার টুকরো হিসেবে বিক্রি করলে যে লাভ থাকবে বলে হাবু মনে করছে, সে সামান্য নয়। চোখ তার, দেখা তার, হিসাবও তার, অথচ ভাগ দিতে হবে বাকি তিনজনকে, এইটাতে হাবুর ঘোর আপত্তি।

    গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ চিরকাল চারচাকা গাড়িকে ভয় পেয়ে এসেছে, অন্তত মালিক হয়ে বসার দিক থেকে দেখলে তো বটেই। হাবু ব‍্যতিক্রম না। কিন্তু কেনাবেচার বেলায়, বিশেষ করে কিনে বেচার ক্ষেত্রে একেবারে জহুরি সে। বাতাসপুরের কুঞ্জ সাহার আড়তে এই সব ভাঙা লোহালক্কড় বিক্রি করতে করতেই সে দেখেছে অবরে সবরে ভাঙা মোটরবাইক, এমনকি ভাঙা চারচাকার গাড়িও আসে কুঞ্জ সাহার কাছে বিক্রীত হবার জন‍্য। আর সে সব জিনিস কতোতে আসে আর কতোতে যায় তা হাবু জানে কারবারে জড়িত থাকার ফলে।
    “বুড়োকে একবার বলি গাড়িটার কথা?” সাবির চাপা গলায় বললো হাবুকে।
    “কি বলবি? কোন গাড়ির কথা বলছিস রে?” খানিকটা অন‍্যমনস্কভাবে সাবিরকে উত্তর দিতে দিতেই ‘গাড়ি’ শব্দটা হাবুকে সচেতন করে তুললো। সাবিরও তাহলে খেয়াল করেছে গাড়িটাকে।
    মনের কথা মনে রেখে হাবু উত্তর দিলো, “ফালতু এসব ঝামেলায় দরকার নেই।”

    হাবুর মনে হলো সাবির বোধহয় কথাটা ঠিক বুঝতে পারলো না। এরকম সময়ে হাবুর মাথা কাজ করে খুব দ্রুত। চারজনের মধ্যে কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি ঠিকই, এবং এও ঠিক কথা যে কারবারে চারজনের টাকা খাটে যৌথভাবে, একজন কোনো খোঁজ পেলে চারজন মিলে কেনা থেকে বেচা পর্যন্ত সবকিছু একসাথে করে।
    কিন্তু আপাতত এই গাড়িটার ব‍্যাপারে হাবু একাই এগোতে চায়। ভাঙা লোহার জিনিস কিনে এবং বেচে যা হচ্ছে তার চেয়ে ওপরে যাওয়াই সে জরুরী মনে করছে। এখনই সাবিরকে থামিয়ে দিতে হবে।
    “গাড়িটা যে নিতে চাচ্ছিস,” হাবু বললো সাবিরকে, “এখান থেকে অতো বড়ো জিনিসটা নিয়ে যাবি কেমন করে?”
    চারজনে মিলে কাজ করলে এই সমস‍্যাটা আদৌ সমস‍্যা নয়। কিন্তু যেহেতু এতোকাল ওরা সাইকেলে চেপেই সব জায়গায় গেছে, মাল কিনে দূর দূর এলাকা থেকে কুঞ্জ সাহার কাছে নিয়ে গেছে সাইকেলে চাপিয়েই, অনেকটা যেন প্রতিবর্ত ক্রিয়ার প্রভাবে সাবির মেনে নিলো হাবুর কথা।
    বললো, “সে আমিও ভেবেছি। তাও বললাম, যদি যদি তুই কিছু উপায় বের করিস ভেবে…”

    উপায়ের কথা ভাবা হয়ে গেছে হাবুর। তিন চাকার সাইকেল ভ‍্যানে জিনিসটাকে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনো ব‍্যাপারই না, একটার জায়গায় না হয় দুটো ভ‍্যানই লাগবে। বড়ো জোর তিনটে।
    ফজু বিশ্বাসের ছোট্ট বাগানের ডজন খানেক আমগাছ গত ক’বছর ধরে ফলন দিচ্ছে ভালো। মন্ডলদের ছোটো ছেলে কার্তিক এলাকার বেশিরভাগ বাগানের গাছের আম আর লিচু পাইকারি হিসেবে কিনে থাকে বছরের পর বছর। তারপরে সেই আম আর লিচু বেচে সে যে ভালোই টাকা কামায়, তা বোঝা যায় তার দুই ছেলের পালসারে চড়ে ঘোরা দেখে।
    কার্তিকের মতো টাকার জোর নেই হাবুর। তবে এ বছর ফজু বিশ্বাসের গাছ ক’টা নেবে সে। ভাঙা জিপটা সেই স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি হতে পারে।

    সমস্যা ঝুলে থাকলো অন্য দিকে। সাবিরের চোখ যখন পড়েছে গাড়িটার দিকে, সাবিরও যে গাড়িটা তার মতো একলা কিনে ফেলার মতলব করবে না, তেমন ভরসা আর করতে পারছে না হাবু। সাবির তার ব‍্যবসার পুরনো অংশীদার, বন্ধু, বহু বছরের সম্পর্ক। তবুও।

    ভাবতে ভাবতে হাবুর সামনে সমাধানের একটা ছবি ভেসে উঠলো। সাবিরের সাইকেলে আজকের কেনা জিনিসগুলোর বেশিরভাগ চাপালে কেমন হয়? এমনিতে ওরা যে যার সাইকেলে এসব মাল চাপায় আন্দাজে, কাজ করে করে সে আন্দাজ পাকাও বটে। খুব একটা কম বেশি হয় না। তবুও কিন্তু মাঝে মধ্যে হয়ে যায় এমন যে একজনের পক্ষে একটু বেশিই মাল চাপলো সাইকেলের পেছনে। টলমলে হ‍্যান্ডেলে কোনো মতে ব‍্যালান্স রেখে এগোতে হয় তখন। বিশেষ করে ছুটে চলা লরিতে ভরা হাইওয়ে ধরে এগোনো তখন বেশ বিপদের। বাকিরা সে সময় টলোমলো সাইকেলটাকে সামনে রেখে এগোয়, পেছন থেকে সাবধান করতে করতে যায়।

    মাথায় ঝোঁক চাপলে হাবু একেবারে পাগল। এই মুহূর্তে অনেক কিছু মনে আসছে তার। পরাণ আর ইয়াসিনকে আলাদা এগোতে বলে সে তার সাইকেল নিয়ে যাবে সাবিরের পাশাপাশি চালিয়ে। তারপর সুযোগ বুঝে সাবির আর তার সাইকেল, দুটোকেই, পুকুরে হোক, বা বাসের নিচে, ফেলার উপায় বার করতে হবে। বিষয়টা কতোটা সম্ভব, কতোটা বেআইনি, আপাতত সে সব ভাবার মতো অবস্থায় নেই হাবু।

    কাঁকনতলার বড়ো তরফের গোমস্তা ধরনের লোকটা হাঁক দিলো, “এসো হে, নাও, নাও, সব বাঁধা ছাদা হয়ে গেছে তোমাদের, গেট খুলে দিই। এবার এসো তোমরা।”
    মরচে ধরা গেট হাঁ হয়ে গেলো ফোঁপানোর শব্দের সাথে, চারজনের দলটা বেরিয়ে এলো বাইরে।

    ***

    কিস্কার স্কুলে আজ একটা গোলমাল বেধেছে।

    ওয়ার্ক এডুকেশনের টিচার দূর থেকে পড়ুয়াদের কাজ দেখে নম্বর দেন না। নিজে ঘেঁটে নেড়ে দেখে তারপরে যে বানিয়েছে তাকে প্রশ্ন করেন, যখন বোঝেন যে তাঁর পড়ুয়াই জিনিসটা বানিয়েছে, তার অভিভাবকরা নয়, তখন নম্বর দেন।

    কিস্কা ছোট থেকে ওঁর সেরা ছাত্র, গোটা স্কুল তার তৈরি জিনিস দেখবার জন‍্য অপেক্ষা করে থাকে।

    আজ যখন স্কুল শুরুর আগে সবাই স্কুলের মাঠে জড়ো হয়েছে শারীরশিক্ষার জন‍্য, একটা ছোট্ট হু-উ-উ-শ শব্দের সাথে স্বচ্ছ সিলিকা জাতীয় জিনিসের তৈরি একটা তেকোনা মতো যান ভেসে এসে নামলো স্কুলের মাঠে। চারটে স্বচ্ছ দেওয়ালে ঘেরা যান, যার প্রতিটা দেওয়ালই একেকটা ত্রিভুজ। ত্রিভুজগুলো একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছে ওপরের দিকে একটা বিন্দুতে। আর নিচে চারটে ত্রিভুজের ভূমি মিলিত হয়ে একটা চোকো মেঝে তৈরি করেছে। ভেতরে সুন্দর গোছানো ককপিটে একটা ডিসপ্লে বোর্ড মেঝের সাথে চল্লিশ ডিগ্রি কোণ তৈরি করে চালকের দিকে তাকিয়ে। আজকাল যেকোনো যান বানালেই তার প্রোপালশন সিস্টেমের সাথে বসানো থাকে হাইপারক‍্যালকুলেটর। স্বচ্ছ দেওয়ালের ওপারে এ যানের ভেতরেও হালকা নীলচে রঙের হাইপারক‍্যালকুলেটরের চেহারার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেকোনো প্রশ্ন, তা সে অঙ্কের হোক, বা ইতিহাসের, হাইপারক‍্যালকুলেটর তাকে এক বিশেষ গাণিতিক ধাঁচে ঢেলে নিয়ে খুব দ্রুত উত্তর বার করে। যানের বেলায় ঐ যানের ট‍্যুর হিস্ট্রি থেকে প‍্যাসেঞ্জার হিস্ট্রি হয়ে মেকানিক্যাল হিস্ট্রি পর্যন্ত সব তথ্য ধরে রাখে যানের হাইপারক‍্যালকুলেটর। স্বচ্ছ যানের ভেতর থেকে যখন কিস্কা নেমে এলো কেউ অবাক হলো না।

    কেউ অবাক হলো না, কারণ আজ কিস্কার ক্লাসের পড়ুয়ারা তাদের প্রোজেক্টের কাজ জমা দেবে, এটা প্রায় সবাই জানে। আরো বড়ো কথা হলো এই স্বচ্ছ পিরামিড যানটা নিয়ে এসেছে কিস্কা। কিস্কার কাজ মানে অবাক হতেই হবে, একথা জানে বলে কেউ আর তেমন অবাক হয় না আজকাল। মুগ্ধতার প্রথম ভাগ কেটে যাবার পরে সবাই এসে জুটলো কিস্কা আর তার আকাশযানের চারপাশে। কিস্কা গত কয়েকদিন ওড়াউড়ি করেছে তার যান নিয়ে। সন্তুষ্ট হয়ে আজ সে এনেছে প্রোজেক্টের কাজ হিসেবে টিচারের কাছে জমা দিতে।

    মাঠের ও প্রান্তে চার ক্লাস নিচের একটা পুঁচকেকে দাঁড় করিয়ে কিস্কা তার যানের ফোটোসাকশন মেশিনটা চালু করলো। ককপিটের পেছনের দেওয়ালের ভেতর থেকে একটা নীল আলোর বিম বেরিয়ে সোজা পৌঁছে গেলো বাচ্চাটার কাছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে এবার বিমটা একটু একটু করে দৈর্ঘ্যে ছোটো হতে শুরু করলো। বাচ্চাটাও একটু একটু করে এগিয়ে আসতে শুরু করলো যানের দিকে। বোঝা যাচ্ছিলো বাচ্চাটাকে চুম্বকের মতো টেনে আটকে রেখেছে নীল আলোর বিম। এক সময় বিমের সাথে বাচ্চাটাও ঢুকে পড়লো যানের ভেতরে, তারপরে অদৃশ্য হয়ে গেলো নেগেটিভ লাইট চেম্বারের ভেতরে।

    নেগেটিভ লাইট চেম্বার পুরনো আমলের টেকনোলজির জিনিস। এমন পলিমার দিয়ে তৈরি যা কোনো আলো প্রতিফলিত করে পাঠায় না।, ফলে চেম্বার বা তার ভেতরের জিনিস দেখা যায় না।
    বাচ্চাটা অদৃশ্য হয়ে যেতেই কিস্কার বন্ধুরা হৈহৈ করে উঠলো কিস্কার প্রশংসায়। কিন্তু গর্ব অনুভব করার সময় পেলো না কিস্কা। তার পকেটের ভেতর পিঁ পিঁ করে বাজতে শুরু করেছে। কিস্কার টেলিকমিউনিকেটর তারবিহীন ভাবে তার যান, স্কুলের হাইপারক‍্যালকুলেটর, এমনকি বন্ধুদের এবং শিক্ষকদের টেলিকমিউনিকটরের সঙ্গে যুক্ত। যন্ত্রটা বার করে একবার তাকিয়েই কিস্কা বুঝলো যে যানের ভেতরে বাচ্চাটা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। বাচ্চাটার চিন্তাতরঙ্গের গ্রাফ ধরা পড়ছিলো কিস্কার হাতে ধরা টেলিকমিউনিকেটরের পর্দায়। কেন বা কি দেখে বাচ্চাটা ভয় পেয়েছে সেটা খোঁজার চেয়ে জরুরী আগে তাকে বার করা। হাতের যন্ত্রের বোতামে চাপ দিয়ে বাচ্চাটাকে বার করতে কিস্কার সময় লাগলো তিন সেকেন্ড। বাইরে এসেই এক ছুটে বাচ্চাটা ঢুকে গেলো স্কুলের ভেতরে।

    এবার বন্ধুদের অভিনন্দন আর প্রশংসার ঢেউ কিস্কাকে ভুলিয়ে দিলো সবকিছু। একটু পরেই সবার টেলিকমিউনিকেটর একসাথে বাজতে শুরু করলো। একবার এ ওর দিকে তাকিয়েই কিস্কার সাথে তার বন্ধুরা ছুটতে ছুটতে এসে ঢুকলো স্কুলে। দেরি হয়েছে ক্লাসে ঢুকতে, দূরযোগাযোগের যন্ত্র তারই ইঙ্গিত দিয়েছিলো সবাইকে। কিস্কার মন বলছিলো বাচ্চাটাকে দিয়ে যেভাবে আজ তার স্কুলের দিন শুরু হয়েছে, হয়তো এবার ক্লাসে ঢুকে টিচারের বকাবকি খেতে হবে।

    ক্লাসে ঢুকে দেখা গেলো টিচার তখনও আসেন নি, যদিও ওয়ার্ক এডুকেশনের টিচার সময় মেনে চলেন ভয়ানক ভাবে। গোটা এ্যান্ড্রোমিডা পাড়ায় যে গ‍্যালাকটিক টাইম চালু আছে, ওঁর টেলিকমিউনিকেটর একেবারে নিখুঁত ভাবে তার সাথে মেলানো। কিন্তু আজ ওঁকে দেরি করতে দেখে কিস্কা বুঝলো নিজেকে গুছিয়ে নেবার জন্য সে একটু সময় পাবে।
    টিচার এসে ক্লাসে ঢুকলেন থমথমে মুখ নিয়ে। সবাই বুঝে গেলো আজ সবাই-ই দেরি করে ঢুকে টিচারকে চটিয়ে দিয়েছে।

    কিস্কার পাশে বসা জেরী ফিসফিস করে বললো, “তোর মেশিনটা আজ আমাদের দেরি করিয়েছে। কিন্তু ওটা একবার দেখলেই ওঁর মন ভালো হয়ে যাবে।”
    আজ কারো হাতের কাজ দেখলেন না টিচার। কিস্কার আকাশযান দেখা যাচ্ছিলো জানালা দিয়ে। অন‍্যমনস্ক ভাবে সেটাকে দেখতে দেখতে কিস্কাকে ডেকে নিয়ে তিনি বেরিয়ে দাঁড়ালেন করিডরে। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন কিস্কাকে।
    কিস্কা কতোদিন ধরে বানিয়েছে, ফ্লাইট কন্ট্রোলের জন‍্য ঠিক কি কি ব‍্যবস্থা আছে, প্রোপালশনের জন‍্য সে পাল্সড্ ফিউশন ব‍্যবহার করেছে কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষের প্রশ্নটার বেলায় টিচার পুরো দশ মিনিট ধরে তার ব‍্যাখ‍্যা শুনলেন।
    অনেক কাল আগে কতকগুলো লিথিয়াম রিংয়ের মধ‍্যের ফাঁকটাতে হাইড্রোজেনের দুটো বিশেষ আইসোটোপ ভরে প্রবল ম‍্যাগনেটিক ফিল্ডে ফেলে ফিউশন ঘটিয়ে মহাকাশযান চালানো হতো। কিস্কার টেকনোলজি প্রায় একই, শুধু রিং আর আইসোটোপ আলাদা। এতে করে সে পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের একটা ছোট সৌরজগতে ঘুরে আসতে পেরেছে স্কুল খোলার আগের কদিনের ছুটিতে।
    এর পরে টিচার যেটা বললেন, কিস্কা আদৌ সেটার জন্য তৈরি ছিলো না।।
    বললেন, “তোমার কমিউনিকেটরটা দাও তো।”
    কিস্কা যন্ত্রটা বার করতেই প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে নিলেন সেটা। তারপরে কিস্কাকে অনুসরণ করতে বলে সোজা হাঁটা শুরু করলেন প্রিন্সিপ‍্যালের ঘরের দিকে। পড়ুয়াদের ব‍্যক্তিগত কমিউনিকেটর টিচাররা কখনোই নেন না। আজ টিচার কেন নিলেন, তার উত্তর ভাবার আগেই কিস্কা দেখলো সে ঢুকে গেছে প্রিন্সিপ‍্যালের ঘরে।
    মনে হয় টিচারের সাথে আগেই এক দফা কথা হয়ে গেছে প্রিন্সিপ‍্যালের, কারণ ওরা দুজন ঢুকতেই প্রিন্সিপ‍্যাল হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “এনেছেন? কই, দেখি।”
    বাধ‍্য বাচ্চার মতো টিচারও কিস্কার কমিউনিকেটরটা তুলে দিলেন প্রিন্সিপ‍্যালের হাতে।

    কিস্কা বুঝতে পারছে না কি ঘটছে, কেন ঘটছে, তার কমিউনিকেটরটাই বা কেন টিচারদের দরকার। প্রিন্সিপ‍্যাল ততক্ষণে যন্ত্রটার সাথে ওঁর সামনে রাখা হাইপারক‍্যালকুলেটরের যোগাযোগ পরীক্ষা করে নিয়ে হাইপারক‍্যালকুলেটরের থ্রিডি ডিসপ্লে অন করে তাকে আর টিচারকে হাতের ইশারায় ডিসপ্লে দেখতে বললেন।

    বিস্মিত কিস্কার চোখের সামনে ফুটে উঠলো তার সাধের আকাশযানের নেগেটিভ লাইট চেম্বারের ভেতরের দৃশ‍্য। একটা উদ্ভট জন্তু পড়ে আছে চেম্বারের ভেতরে। থ্রিডি ডিসপ্লে বিভিন্ন কোণ থেকে জন্তুটাকে দেখিয়ে যাচ্ছে।

    বিশ্রী দেখতে জন্তুটা। দেহের এক প্রান্তে দুটো লম্বা লম্বা প্রোজেকশনের মতো অঙ্গ বেরিয়েছে। তাদের শেষ প্রান্ত চ‍্যাপ্টা এবং খাঁজকাটা। ঠিক উল্টো প্রান্তে একটা ছোটো নলের মতো জিনিসের ওপরে অনেকটা ডিমের মতো দেখতে একটা অঙ্গ। যেখানে ডিম্বাকার অঙ্গটা বেরিয়েছে, তার এপাশে নলটার গোড়া থেকে দুপাশে দুটো ছোটো প্রোজেকশন, তাদেরও ডগা চ‍্যাপ্টা এবং খাঁজকাটা। জন্তুটাকে টিচার বা প্রিন্সিপ‍্যাল না চিনলেও কিস্কা চিনতে পেরেছে।

    দেখে বোঝা যাচ্ছে যে জন্তুটা মরে গেছে। মেরে ফেলতে চায়নি কিস্কা। তার সদ‍্য তৈরী যান চালিয়ে দেখার জন‍্য একটু ঘুরতে গিয়ে কিস্কা পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের একটা তারার জগতে পৌঁছে গেছিলো। সেখানে একটা গ্রহে প্রাণ আছে দেখে গ্রহের ভেতরে ঢুকে ওড়াউড়ি করতে করতে কমিউনিকেটরে জীবটার চিন্তা ধরা পড়েছিলো, আর তা থেকে কিস্কা যখনই দেখলো জীবটা তার কাছের অন্য একটা জীবের জীবনচক্র থামিয়ে দিতে চায়, তখন সে খানিক কৌতূহলের বশে জীবটাকে তুলে নিয়েছিলো তার চৌম্বক নীল আলোর টানে। কিন্তু এরা কিস্কার ছোটবেলার খেলনা রকেটের মতোই খুব ঠুনকো। এরা গ্রহের বাইরের দিকের গ‍্যাসীয় আবরণ থেকে গ‍্যাস নিয়ে বাঁচে, কিন্তু সে গ‍্যাস শরীরে জমিয়ে রাখার ব‍্যবস্থা না থাকায় গ‍্যাস না পেলেই মরে যায়। কিস্কা এটা জানতো না।

    প্রিন্সিপ‍্যাল এদিক ওদিকে কয়েকটা বোতামে চাপ দিয়ে একটা প্রিন্ট আউট বার করে একবার দেখে নিলেন, তারপর টিচারের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, “দেখুন।”

    টিচারের পাশে দাঁড়িয়ে কিস্কা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো লেখা আছে :
    নাম– হাবু বিশ্বাস
    ঠিকানা- সল নক্ষত্রের তিন নং গ্রহ
    বয়স- গ্রহের ৩৯ আবর্তনকাল
    জেন্ডার- পুরুষ

    জেন্ডার জিনিসটা কি, তা কিস্কার মাথায় ঢুকলো না।

    ***

    কিস্কাকে জেন্ডার সংক্রান্ত সমস্যায় ফেলে রেখে লেখা থামালেন বিদ‍্যাপতি বারুই। থামালেন এমনটাও ঠিক বলা যায় না। বলা উচিৎ হবে বিদ‍্যাপতি লেখা থামাতে বাধ্য হলেন।
    নকুল এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। ল‍্যাপটপের দিক থেকে চোখ না সরিয়ে বিদ‍্যাপতি বললেন, “কি রে, কিছু বলবি?”

    নকুল এ বাড়িতে আছে প্রায় তিরিশ বছর ধরে। যখন ওর বয়স ছিলো সতেরো আঠারো, আর বিদ‍্যাপতি ছিলেন আঠাশ, সেই সময় নকুল এসেছিলো ফাইফরমাশ খাটার লোক হয়ে, আর যায় নি। সময় যেমন গড়িয়েছে, তার সাথে সাথে নকুলের পদের পরিবর্তন হয়েছে। এখন নকুলকে বিদ‍্যাপতির আপ্ত সহায়ক বা ব‍্যক্তিগত সহচর বলা যেতে পারে। রাঁধুনি আজ খিচুড়ি রাঁধবে কিনা, মালি বাগানের কোন গাছটার ডাল ছাঁটবে, সব নকুলের নির্দেশমতো হয়।

    বিয়ে করেননি বলে বিদ‍্যাপতির কোনো খেদ নেই। অসুবিধাও নেই। চাকরি আর লেখালিখির কাজে সারাদিন চলে যায়। নকুলও নিঃশব্দে ওঁর প্রয়োজনগুলো মেটায়।

    এই মুহূর্তে নকুল এসে দাঁড়ানোতে বিদ‍্যাপতি বুঝলেন গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে, অতএব লেখা থামাতেই হলো।
    প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে বুঝলেন যতোটা ভেবেছিলেন, বিষয়টা তার চেয়ে গুরুতর।
    নকুল মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিদ‍্যাপতি আবার প্রশ্ন করলেন, “ কিছু বলবি, নকুল?”
    মাটির দিক থেকে চোখ না তুলে নকুল বললো, “আঁইগ‍্যা, ছোঁড়াগুলো আবার এঁইচে দাদাবাবু।“
    বিদ‍্যাপতির মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো। ঝামেলাটা চলছে মাস তিনেক ধরে।

    পাড়ার উঠতি ছেলেদের মধ‍্যে পবন আর আশরাফ এখন সামনের সারিতে। মিউনিসিপ‍্যালিটির চেয়ারম্যান হারু দত্তের ভাইপো হলো গিয়ে পবন। কাকা দশ বছর ধরে মিউনিসিপ‍্যালিটির চেয়ারম্যান পদে থাকলে ভাইপোর আর লেখাপড়ার ডিগ্রি না থাকলেও চলবে, একথা পবন বুঝে গেছে বহু আগেই। এগারো ক্লাসের পরে আর তাই সময় নষ্ট না করে পবন বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে জড়িয়ে ফেলে নিজেকে। প্রাণের বন্ধু আশরাফকেও ও প্রথম থেকেই জড়িয়ে নিয়েছিলো এই সব কাজে।

    প্রথম প্রথম ছোটখাটো জনসেবা, যেমন ভয় দেখিয়ে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা, এ ধরনের কাজ করতো দুজনে, বাড়ির মালিক সেবা পেয়ে কিছু দিতো। লোকে বলে ঐ ‘কিছু’-র পরিমাণও ওরাই ঠিক করতো। ‘কিছু’ দিতে রাজি না থাকলে ভাড়াটিয়াকে ফিরিয়ে আনবার পূর্ণ সম্ভাবনা আছে বলে মালিকরাও চাপাচাপি করতো না। এমনি চলতে চলতে শিগগিরই পবনরা বুঝে গেলো এ শহরে বেশ কিছু পুরনো বাড়ি আর ফাঁকা জায়গা আছে যেখানে ফ্ল‍্যাট বানাতে পারলে লাভ অনেক বেশি। তাই ঐ ধরনের বাড়ি আর জমির মালিকরা দুজনের সেবার লক্ষ্য হয়ে উঠতে লাগলো ধীরে ধীরে। এর মধ্যে পবন আর আশরাফকে ঘিরে বেশ কিছু ছেলেও জুটেছে।

    বিদ‍্যাপতির বাড়ির সাথে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা আছে, সেখানে তাঁর প্রিয় বাগান। বাড়ি আর বাগান মিলে প্রায় দশ কাঠারও বেশি জায়গা। বিদ‍্যাপতির বাড়ি পবনদের রাডারে ধরা পড়ে গেছে বেশ কয়েক মাস আগে, নেহাৎ একই পাড়ার লোক বলে উনি এতোকাল ছাড় পেয়ে আসছিলেন। এবার মিউনিসিপ‍্যালিটির ভোটে জিতে হারু দত্ত ফের আরেকবার চেয়ারম্যান হবার পরে আর পবনরা বিদ‍্যাপতিকে সেবা করতে দেরি করতে চাইলো না। বার তিনেক ওদের দলের ছেলেরা এসেছে বিদ‍্যাপতির কাছে, বিদ‍্যাপতি পাত্তা দেন নি। কিন্তু আজ পবন আর আশরাফ নিজেরা উপস্থিত হয়েছে ওঁর দরজায়। বিদ‍্যাপতি বুঝলেন এবার আর রেহাই নেই। যাহোক একটা দাম তিনি পাবেন বটে, কিন্তু ঠিকানা বদল ঠেকানো যাবে না।

    গত তিনমাসের পরিস্থিতি একবার মনের ভিতর উল্টে পাল্টে নিতে বিদ‍্যাপতির কয়েক সেকেন্ড লাগলো। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। বাড়ি বিক্রির ইচ্ছে নেই যেমন, তেমনই বুঝতে পারছেন যে পবন আর আশরাফের হাতে বাড়ি তুলে দিতে না চাইলে এখানে বাস করতে পারবেন না। বসে বসে হতাশ রাগে জ্বলতে জ্বলতে বিদ‍্যাপতির মনে হতে লাগলো একমাত্র কোনো জাদু বা সমাপতন তাঁকে বাঁচাতে পারে এদের হাত থেকে। এমন কিছু কি ঘটতে পারে না, যেমন আশ্চর্য সমাপতন উইলিয়াম বারোজের গল্পের বেলায় ঘটে, তেমনটা যদি তাঁর বেলাতে ঘটে যায়, তাহলে বাগানে তাঁর প্রিয় গাছগুলো পবনদের লোভী হাত থেকে বাঁচবে।

    বারোজ অজস্র জাদুকরী শক্তিতে বিশ্বাস রাখতেন, তুকতাকের সাহায্য নিতেন যাতে কেউ ক্ষতি না করতে পারে। এ হেন বারোজ খবরের কাগজ থেকে বাক্য কেটে কেটে নিয়ে কাটা টুকরোগুলোকে আঠা দিয়ে সাঁটছেন খাতায়। পাতার পর পাতায় মাপসই বাক্য সাঁটতে সাঁটতে সে একটা বিমান দুর্ঘটনার কাহিনী দাঁড়িয়ে গেলো। গল্প সম্পূর্ণ হবার পর পরই আমাজনের বৃষ্টিমুখর অরণ্যে একটা বিমান ভেঙে পড়লো, দেখা গেলো বিমানের বর্ণনা, পাইলট এবং যাত্রীদের বিবরণ, সব মিলে গেছে বারোজের গল্পের সাথে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে স্বাভাবিক বুদ্ধি দিয়ে ব‍্যাখ‍্যা করা যায় না। একে বড়ো জোর সমাপতন বা কোইনসিডেন্স বলা চলে। আপাতত এরকম কোনো ঘটনা ঘটে গিয়ে যদি এই পবন আর তার দলবল তাঁর কাছে থেকে সরে যায়, তাহলে বিদ‍্যাপতি সুখী হতেন।

    চিন্তাগুলো বাইরে প্রকাশ না করে বিদ‍্যাপতি সংক্ষেপে নকুলকে বললেন, “ভেতরে আসতে বল।”

    ওরা একবার ঢুকলে যে আর লেখালিখি করা যাবে যাবে না বেশ খানিকক্ষণ, তা বোঝা যাচ্ছে। বিদ‍্যাপতি ল‍্যাপটপ শাট ডাউন করে টেবিলের এক পাশে সরিয়ে রাখলেন।

    ***

    আজ বাড়িতে ফেরার পর থেকে কিস্কা দেখছে বাবা আর মা দুজনেই গম্ভীর। স্কুলের রিপোর্ট যে বাড়িতে পৌঁছে গেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

    শুতে যাবার আগে কিস্কা মা’কে বিষয়টা একবার জিজ্ঞাসা করবে ভাবলো, কিন্তু ভয়ে করা হলো না। গত কিছুদিন ধরে বাবার কাজের চাপ বেড়েছে খুব। হাজার হাজার বছর আগে এখানকার বাসিন্দারা যুদ্ধ করা ছেড়ে দিয়েছে। যুদ্ধে লাভ যা হয়, অতি উন্নত অস্ত্র শস্ত্র ব‍্যবহার করলে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয় তার চেয়ে বেশি। কিন্তু এখনো বহু নক্ষত্রের বহু গ্রহের জীবকুল লড়াই করে। একাধিকবার তারা এ্যান্ড্রোমিডার এলাকাতেও হানা দিয়েছে। কিস্কার বাবার মতো বিজ্ঞানীদের কাজ হলো সে সব আক্রমণ প্রতিহত করার উপায় খোঁজা।

    এ্যান্ড্রোমিডার পাড়ায় যুদ্ধ এবং অস্ত্রের ব‍্যবহার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, কিস্কার বাবাকে অস্ত্রধারীদের সঙ্গে লড়বার জন্য অন‍্য পথ খুঁজতে হয়। কিছুদিন আগে উনি মূল এ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রকে ঘিরে বিশাল বিশাল রিফ্লেকটর বসানোর ব‍্যবস্থা করেছেন। বহু আলোকবর্ষ দূর থেকে অন‍্য গ্রহের প্রাণীরা টেলিস্কোপ ইত‍্যাদির সাহায্যে এ পাড়ার দিকে তাকিয়ে এ অঞ্চলটাকে একাধিক নক্ষত্রের সমবায়ে তৈরি এ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা বলে মনে করে। আর মূল নক্ষত্রের অতি উজ্জ্বল সে প্রতিফলনে দিব‍্যি লুকিয়ে থাকে কিস্কাদের গ্রহটা।

    এর সাথে উনি আরো কিছু কাজ করেন। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি তারার সৌরজগতে যতো উন্নত জীব আছে, তাদের ক‍্যাটালগ বানান উনি। অবস্থান, অর্থাৎ কোন তারার কোন গ্রহে থাকে, চেহারা কেমন, গঠন, মানসিক প্রবণতা, এ সবই ওঁকে খুঁটিয়ে দেখে লোড করে রাখতে হয় সরকারি হাইপারক‍্যালকুলেটরে। সম্প্রতি একটু চিন্তার কারণ উনি খুঁজে পেয়েছেন পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের একটা সৌরজগত নিয়ে। সৌরজগত আর পাঁচটা যেমন হয়, এও তেমনই। কিন্তু এর তিন নম্বর গ্রহে উন্নত জীবের বাস তো আছেই, সে জীব অতি হিংস্র, সব সময় আপন এলাকা বাড়াতে ব‍্যস্ত। এমনকি তুচ্ছ কারণে নিজের বা অন‍্য জাতের জীবকে মেরে ফেলতে এদের অসুবিধা হয় না।‌

    কিস্কার বাবার দপ্তরের অধীনে থাকা ব্রহ্মাণ্ড চষে বেড়ানো ব‍্যোমযানগুলো নিয়মিত তাঁকে রিপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। এদের বিষয়ে সবথেকে বিপদের তথ‍্য কিস্কার বাবা পেয়েছেন মাত্র ক’দিন আগেই।

    যেকোনো নক্ষত্র বা নীহারিকা থেকে যে আলো বেরিয়ে এসে মহাবিশ্বে ধাবমান হয়, তাকে অন্য কোনো না কোনো নক্ষত্র বা নীহারিকার পাশ দিয়ে যেতেই হয়, তখন ঐ নক্ষত্র বা নীহারিকার মহাকর্ষের প্রভাবে সে আলো একটু বেঁকে যায়। ব্ল‍্যাক হোলের পাশ দিয়ে গেলে তো এরকম আকছার ঘটে, এমনকি খুব ভারী গ্রহের বেলাতেও এমন ঘটে। অনেকটা যেন মহাকর্ষের এক লেন্স কাজ করে এখানে। আর ঐ আলো বেঁকে যাবার হিসেব ঠিক ঠিক ধরতে পারলে যার টানে আলো বেঁকে গেলো, তাকে চোখে না দেখতে পেলেও তার অবস্থান, বেগ ইত্যাদি বার করে ফেলা যায় হিসেব করে। কিছুদিন আগে কিস্কার বাবা খবর পেয়েছেন যে পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের সেই হিংস্র জীবকুল এই বিষয়টা ধরে ফেলেছে কিছুদিন আগেই, তত্ত্ব পেরিয়ে প্রমাণও পেয়ে গেছে তারা। সোজা মানে দাঁড়ালো এই যে তাঁর সাধের রিফ্লেকটর আর তাঁর গ্রহকে লুকিয়ে রাখতে পারবে না।

    পাশের ঘর থেকে মায়ের গলা শুনতে পেলো কিস্কা। মা কথা বলছেন বাবার সাথে।
    “সন্তান বড়ো হয়ে যাচ্ছে মানে যা খুশি করবে?”
    কিস্কা বুঝলো মা আজ বেজায় চটেছেন স্কুলে তার পিরামিড নিয়ে কেলেঙ্কারির জেরে। কিন্তু মা ‘যা খুশি’ শব্দ দুটো বললেন কেন? কতোটা খবর স্কুল থেকে পাঠানো হয়েছে তা আঁচ করার চেষ্টা করলো কিস্কা।
    কিছুটা বোঝা গেলো মায়ের এর পরের কথাতে।
    “বাবা সারাদিন অন‍্য গ্রহের জীবদের নিয়ে ব‍্যস্ত, বাবার সন্তানও হয়েছে ঠিক একই রকম।”
    এবারও বাবার উত্তর শোনা গেলো না। সাধারণত মা রেগে থাকলে বাবা উত্তর দিয়ে সমস্যা বাড়াতে চান না। মা অবশ‍্য থামলেন না।
    স্কুল থেকে পাওয়া সব তথ‍্য এক এক করে মা পেশ করতে থাকলেন বাবার কাছে। মাকে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছিলো, বিশেষ করে মা যখন দূর সৌরজগৎ থেকে তুলে আনা জীবটার কথা বলছিলেন।

    “প্রাণ সৃষ্টি করতে পারি আমরা এখন…” কিস্কা বুঝতে চেষ্টা করলো মা কোন দিক থেকে আক্রমণ চালাবেন। ধন্ধ মিটে গেলো মায়ের পরের কথাগুলোতে।
    “…মৃত‍্যুও রোধ করতে পারি আমরা, তাই বলে তোমার বুদ্ধিমান সন্তান যেকোনো গ্রহ থেকে খুশিমতো জীব তুলে আনবে? আর আনার পরে সে জীবের প্রাণরক্ষার কোনো দায়িত্ব নেবে না?”
    বাবার গলা এখনো শোনা যাচ্ছে না। মানে বাবা গভীর মনোযোগের সাথে মায়ের কথা শুনছেন। আর বাবা জানেন যে মা যখন কিস্কার বর্ণনা দিচ্ছেন তোমার সন্তান বলে, তার মানে মা এখন খুব রেগে আছেন। মাঝখানে কথা বলতে গেলেই মা ফেটে পড়বেন রকেট ইঞ্জিনের লিফট্ অফের মতো।

    “জানো, কি করে জীবটাকে কিস্কা ধরেছে?” আবার মায়ের কথা শোনা যাচ্ছে। এবং এই প্রথম বাবার গলাও শোনা গেলো।
    “ওর সেই ম‍্যাগনেটিক বিম কাজে লাগিয়ে, তাই তো?”
    “বিম দিয়ে তো জীবটাকে তুলেছে ওর আকাশযানে,” মা উত্তর দিলেন, “কিন্তু বেছে বেছে ঐ জীবটাকেই সে তুললো কেন?”
    “কেন তুললো?” বাবার সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে বোঝা যাচ্ছে বাবা এখনো মায়ের রাগ দেখতে চাইছেন না।
    এ ঘরে বসে কিস্কা মায়ের মুখ দেখতে পাচ্ছে না, বুঝতে পারছে না তার এক্ষুণি ডাক পড়বে কিনা ও ঘরে। বিষয়টা যে সহজে মিটবে না তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
    “ওর কমিউনিকেটরে তো থট ওয়েভ এ্যানালাইজ করার ব‍্যবস্থা করেছে, তোমার গুণধর…” মা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই বাবার ডাক শুনতে পেলো কিস্কা।
    “কিস্কা, এ ঘরে একবার আয় তো। তাড়াতাড়ি আয়।” বাবার গলায় উত্তেজনার ছোঁয়া।

    হাতে ধরা টেলিকমিউনিকেটর নামিয়ে রেখে কিস্কা উঠে যাচ্ছিলো পাশের ঘরে। তার আগেই বাবা হন্তদন্ত হয়ে এসে ঢুকলেন এ ঘরে, আর তাঁর পেছনে পেছনে মা।
    চমকে গিয়ে কিস্কা একেবারে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালো। বুঝতে পারছে আজ দুঃখের সময় আসছে কয়েক মিনিটের মধ্যে। মা রেগেই আছেন, এবার চিন্তা তরঙ্গ বিশ্লেষণের কথায় বাবাও বিস্তর চটেছেন, না হলে তাকে ডাকার পরে নিজেই চলে আসতেন না।

    বাবা কিন্তু কোনো রাগ দেখালেন না। বরং তাকে নিয়ে বসে পড়লেন বিছানার এক ধারে।
    “ঠিক করে বুঝিয়ে বল তো, তুই থট ওয়েভ ধরার ব‍্যবস্থা রেখেছিস কেন? মানে এটা তোর দরকার হচ্ছে কেন?” বাবার প্রশ্নে কোথাও রাগের ছোঁয়া নেই।
    মা একবার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বসলেন এসে কিস্কার আরেক পাশে। এরকম অবস্থায় কিস্কা আগে কখনো পড়েনি। দুজনে তার দুপাশে, উঠে পালানোর রাস্তা বন্ধ। যা-ই বলুক, তার খেয়ালিপনায় একটা জীবের প্রাণ গেছে, এ দোষ সে কিভাবে ঢাকবে, কি বললে তার দোষ লঘু হবে, তা কিস্কা ভেবে পাচ্ছে না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে এবার মা বললেন, “বল, বাবার কথার উত্তর দে।”

    মায়ের গলাও এখন আশ্চর্যভাবে উত্তেজনাবিহীন। বরং মনে হচ্ছে মা-ও বেশ আগ্রহী তার উত্তর শুনতে। ভেতরে ভেতরে কিস্কা অস্থির হয়ে উঠলো। কিন্তু এখন মাথা ঠান্ডা রাখার সময়। অনেকটা সাবধান হয়ে কিস্কা মুখ খুললো।
    “বাবা, জেন্ডার কাকে বলে?”
    বাবা যা জানতে চেয়েছেন, কিস্কার প্রশ্ন তার সাথে সম্পর্কহীন। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিতে বাবা একটুও সময় নিলেন না।
    “তুই ঐ প্রিন্সিপ‍্যালের হাইপারক‍্যালকুলেটর থেকে বেরোনো প্রিন্ট আউটের কথা বলছিস তো?”

    কিস্কা বুঝলো সে ঠিক রাস্তায় এগোচ্ছে। বাবা যা জানতে চান, সেখানে পৌঁছবার আগে সে একটু নিজেকে গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করছে মাত্র।
    “হ‍্যাঁ, বাবা, ঐ যে জীবটা মরে গেছে, ওর বর্ণনায় লেখা ছিলো ওর জেন্ডার হচ্ছে পুরুষ। পুরুষ মানে কি? জেন্ডার শব্দ দিয়ে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বুঝতে পারছি।”
    এর পরের অনেকখানি সময় কেটে গেলো বিজ্ঞানী বাবার সাথে কৌতূহলী সন্তানের আলোচনায়। কিস্কার গ্রহে বহু শতাব্দী আগেই জেন্ডার সংক্রান্ত বিষয় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। স্ত্রী পুরুষ ভেদ নেই, সবাই সব কাজ করে। কেবল খুব ঘনিষ্ঠ কিছু পারিবারিক সম্পর্কের বেলায় এখনো সামান‍্য তফাৎ বোঝা যায়, যেমন ‘বাবা’ বা ‘মা’ বললে দুটো একদম সমান সমান ভূমিকার কিন্তু পৃথক জীব বোঝায়। ভাষাতেও এর প্রভাব পড়েছে। জেন্ডার শব্দটা আজকাল তেমন চলে না, বিশেষ করে কিস্কার বন্ধুরা বা একই বয়সের অন‍্যরা এ ব‍্যাপারে কিছু জানেও না।
    শুধু সন্তানের জন্ম দেবার কাজ ছিলো স্ত্রী জীবদের একচেটিয়া। কৃত্রিম উপায়ে নিউক্লিক এ্যাসিড থেকে দরকার মতো জীবসৃষ্টির কাজ হয়ে আসছে কিস্কার উর্ধ্বতন চার পুরুষের সময় থেকে, জেন্ডার বিষয়টা আরো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে এর ফলে। কিস্কা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলো বাবার কথা।

    মুগ্ধতা থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে এনে বাবা বললেন, “এইবার বল, তুই থট ওয়েভ ধরে কি করতে চাইছিলি?”
    কখন যে মা কিস্কার আরো কাছে সরে এসে বসেছেন কিস্কা খেয়াল করেনি। বাবার কথায় বাস্তবের জগতে ফিরে এসে কিস্কা বললো তার মনের কথা।
    “আসলে কি হয়েছে জানো? ওরা কে কেমন সেসব তো জানতাম না। ঐ গ্রহটাতে প্রথমবারে ঘুরতে গিয়ে দেখলাম যে পুরো গ্রহেই ওদের মধ্যে বৈষম্য অনেক বেশি। আকাশযান বানিয়েছে, কিন্তু তাতে সবাই চড়তে পারে না। দেখে মনে হলো আমাদের মতো দূরপাল্লার মহাকাশযান বানালেও কি ওরা একদলকে চড়াবে, এবং আরেক দলকে চড়তে দেবে না?”
    বাবার মুখের ভঙ্গিতে বোঝা গেলো বাবা খুশি হচ্ছেন কিস্কার কথায়।

    “তখন ফিরে এসে থট ওয়েভ ধরার ব‍্যবস্থা করলাম, যাতে পরেরবার গেলে বুঝতে পারি কিসের ভিত্তিতে ওরা এই চড়তে দেওয়া না দেওয়া ঠিক করে।”
    “তারপরে কি হলো, এই জীবটাকেই বেছে নিলি কেন?”

    “আমি তেমন কিছু ভাবিইনি বাবা, ওটার সাথে আরো কয়েকটা বিশ্রী দেখতে জীব ছিলো। আমি ওদের গ্রহের বাইরের গ‍্যাস স্তরের ওপরের দিকে ছিলাম, ওরা আমার যানটাকে দেখতে পায়নি তাই। কিন্তু আমি ওদের মনের চিন্তাগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। এই জীবটা ওর সঙ্গে থাকা আরেকটা জীবের জীবনচক্র থামিয়ে দিতে চাইছিলো। তখন অন‍্য জীবটাকে বাঁচাতে এটাকে তুলে নিলাম। এটা মরে যেতে পারে ভাবিনি।”

    কিস্কার বাবা চুপ, মা-ও কথা বলছেন না।

    “এর জন্য কি আমাকে শাস্তি পেতে হবে, বাবা?” প্রশ্ন করলো কিস্কা।
    এতোক্ষণ কথা না বললেও মা এবার উত্তর দিলেন, “এতো নিচু শ্রেণীর জীবের মৃত্যুতে শাস্তির বিধান নেই। কিন্তু এই ঘটনা থেকে তুমি শিখলে যে অন‍্য সৌরজগতের জীবের ক্ষেত্রে যতোটা সম্ভব দায়িত্ববান হতে হবে।”

    কিস্কার বাবাকে একটু অন‍্যমনস্ক দেখাচ্ছিলো, কিছু যেন ভাবছেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বারবার যে তুমি বলছিলে তোমার সন্তান, তোমার সন্তান, কিস্কা সত‍্যি আমারই সন্তান। তুমি জানো না ও আমাকে অন‍্য সৌরজগতের হিংস্র প্রাণীদের মোকাবিলা করার পথ দেখিয়েছে।”
    কিস্কার মায়ের রাগ অনেক আগেই পড়ে গেছে। এবার ছেলেকে নিয়ে হাল্কা গর্ব মেশানো গলায় বললেন, “কিস্কা আবার তোমাকে কোন পথ দেখালো?”

    বাবা একটু ঘুরে বসলেন।

    “দ‍্যাখো, আমরা তো সম্ভাব‍্য আক্রমণকারীদের বাইরের আচরণ ট্র‍্যাক করি মাত্র। কিন্তু একটা গ্রহের সব উন্নত জীব হিংসুটে বা এলাকা দখলে ইচ্ছুক এমন তো নয়। তাহলে শুধু এলাকা দখল করতে চায় যারা, বিজ্ঞানে উন্নতির সাহায‍্য নিয়ে যারা আমাদের এখানে পৌঁছে যেতে পারে, যদি আমাদের মহাকাশযানগুলো থট ওয়েভ ট্র‍্যাক করে সেই ধরনের জীব চিহ্নিত করতে পারে, তাহলে সেই জীব ক’টাকে তুলে নিয়ে এলেই পুরো গ্রহের সমাজে খালি অহিংসরা পড়ে থাকবে। ওদের সমাজে তখন পরিবর্তন আসতে বাধ্য।”
    একটু সংশয়াচ্ছন্ন সুরে কিস্কার মা বললেন, “এতে কাজ হবে মনে করছো তুমি?”

    বাবা বললেন, “যারা অন‍্য কারো দ্বারা অত‍্যাচারিত, তাদের চিন্তার রেকর্ডও আমরা খুঁটিয়ে দেখবো। তাহলে আরো নির্দিষ্টভাবে আমরা হিংসুটেদের বাছাই করতে পারবো।”
    কিস্কা এতোক্ষণ কথা বলেনি। এবার খুব নীচু গলায় বললো, “বাবা, আমি ঐ পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহটায় যাবো আরেকবার? তুমি রাগ করো না, বাবা। নীল রঙের গ্রহটা, দূর থেকে দেখলে তুমি চোখ ফেরাতে পারবে না।”

    বাবা উঠে দাঁড়ালেন। কিস্কার শরীর স্পর্শ করে গভীর গলায় বললেন, “অবশ্যই যাবে। কিন্তু শুধু ঘুরতে গেলে হবে না। আমাদের সভ‍্যতাকে বাঁচাতে হবে। তুমি যাবে, প্রাণীগুলোর থট ওয়েভ খুঁটিয়ে দেখবে। আর অন‍্য কেউ তার এলাকা দখল করতে চায় ভেবে যারা কষ্ট পাচ্ছে, তাদের চিন্তা আরো বেশি করে পরীক্ষা করবে। তাহলে অপরাধীগুলোকে চিহ্নিত করা সহজ হবে।”
    “কিন্তু আমার এইটুকু কিস্কাকে অতো ঝামেলার মধ্যে পাঠাবে? আর প্রশাসনকে এড়িয়ে এসব করা কি ঠিক হবে?” এতোক্ষণে মা কিস্কাকে ‘আমার কিস্কা’ বলে দাবি করলেন।
    বাবা বললেন, “আমার দপ্তরের বড়োকর্তাদের কাছে কিস্কার কাজের খবর পৌঁছে গেছে শিক্ষাবিভাগের মাধ্যমে। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওর আচরণ খুঁটিয়ে দেখে ওকে কাজে লাগানো যায় কিনা তা রিপোর্ট দিতে।”

    সীমা ছাড়ানো উত্তেজনায় কিস্কা বললো, “বাবা, আমিও তোমার মতোই প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাজ করবো?”
    ছেলের দিকে স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাবা বললেন, “অবশ্যই।”
    খুশিতে ফুটতে ফুটতে কিস্কা দেখলো মা-ও তাকিয়ে আছেন তার দিকে, দৃষ্টিতে গর্ব, স্নেহ আর প্রশ্রয় ঝরে পড়ছে।

    ***

    সৃষ্ট চরিত্রের সাফল‍্য লেখকের মনকে একধরনের ভালো লাগায় ভরে তোলে। কিস্কার কাহিনী এই সময়ে যে মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, বিদ‍্যাপতির মনও খুশিতে ভরে ওঠার কথা ছিলো। কিন্তু আপাতত তার কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। চেয়ারম্যান হারু দত্তের ভাইপো পবন আর তার দলবল সেদিন বেরিয়ে গেছিলো বিদ‍্যাপতির সাথে সব কথাবার্তা পাকা করার পরে। গোটা বিষয়টাকে একতরফা আলোচনা বলা যেতে পারে। পবন আর আশরাফ সরাসরিই বিদ‍্যাপতিকে বলে গেছে বাড়িটা তাদের হাতে তুলে দিতে হবে, অবশ‍্য তারা দাম গুনে দেবে নগদ টাকায়। এবং বিদ‍্যাপতি যেমন আশঙ্কা করেছিলেন, তেমনই হয়েছে। বাজারদরের চেয়ে খানিকটা কম দামেই তাঁকে বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে।

    রাতে বিদ‍্যাপতি দুটো রুটি খান সবজি দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে এমন চলে আসছে।

    আজও দুটো রুটি খেয়েছেন। খেয়ে এসে এখন এই দোতলার বারান্দায় পায়চারি করতে করতে নিচে অন্ধকার বাগানের দিকে তাকাচ্ছিলেন। এতো বছর ধরে বাগানের গাছগুলোর সাথে তাঁর জানাশোনা। মানুষ বা কুকুরের হাত পা কেটে গেলে যেমন ব‍্যাথা লাগে, গাছেদেরও কি তেমন ব‍্যাথা লাগে? পবনরা তো একটা গাছও রাখবে না। গাছগুলোকে কাটবে যখন, ওদের তো চিৎকার করার উপায় নেই, ওরা নীরব যন্ত্রণায় তিল তিল করে মরবে।

    বিদ‍্যাপতির গলার কাছে একটা দলাপাকানো কষ্ট জমতে লাগলো। এ কষ্টের হাত থেকে তিনি মুক্তি পাবেন কি করে?

    একবার ভাবলেন নিচে নেমে বাগানের গাছগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়াবেন। ওদের শাখায় পাতায় হাত বুলিয়ে দেবেন।

    এমন সময় বাগানের ফাঁকামতো অংশ থেকে কয়েকজনের হাসির শব্দ ভেসে এলো। পুবদিকটাতে ফাঁকা হয়ে যে জায়গাটা পড়ে আছে এখন, ওখানে মরশুমী ফুল লাগানো হয়। আগের গাছগুলো ফুলটুল ফুটিয়ে মরে গেছে। সামনের শীতের শুরুতে আবার নতুন চারা লাগাবে নকুল। আপাতত জায়গাটা ফাঁকাই। ঠিক সেইখানে কয়েকটা ইঁট জড়ো করে তার উপরে ফ্ল‍্যাশ জ্বালিয়ে মোবাইল রাখা আছে তিন চারটে। আলো বেশ ভালোই হয়েছে। সে আলোয় তাস খেলছে ক’জন মানুষ। খেলছে জনা চারেকই বটে। কিন্তু মোবাইলের আলোর ছটা আর গলার শব্দ জানান দিচ্ছে যে উপস্থিত ব‍্যক্তির সংখ্যা অন্তত সাত বা আট।

    সেদিন বিদ‍্যাপতির সাথে কথা পাকা করে পবনরা চলে যাবার দুতিন দিন পর থেকেই প্রতি সন্ধ্যায় কারা যেন বাগানে ঢুকে তাস খেলতে বসে যায়। খেলা চলে মাঝরাত পর্যন্ত। পাড়ার সব্বাই জানে পবনদের দলবল আসে বিদ‍্যাপতির বাগানে। বিদ‍্যাপতি নিজেও জানেন। এখন যেমন পবন আর আশরাফের গলার স্বর চিনতে পারছেন তিনি।

    আসলে এ একটা চাপ তৈরির কৌশল। পবনরা জনগণের মধ্যে কাউকে সেবা করবে বলে টার্গেট করে ফেললে সে টার্গেট লক করতে বেশি সময় খরচ করে না। সেবাপ্রাপক যাতে বেশি নড়াচড়া বা মত বদল করতে না পারে, সেজন্যই পবন সাঙ্গোপাঙ্গোদের পাঠায়। এখন যেমন বিদ‍্যাপতির বাগানে পাঠাচ্ছে প্রতিদিন, বাড়ি বিক্রি হবার আগেই। প্রতিবাদ করতে না পারা মানুষগুলো মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে।

    নিরুপায় বিদ‍্যাপতি দোতলার বারান্দা থেকেই ওদের দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন অন্ধকারে। এই মুহূর্তে তাঁর আর প্রিয় গাছেদের কাছে যাওয়া হবে না।

    ভিতরের ক্ষোভ বিদ‍্যাপতিকে সাহসী করে তুললো। সিদ্ধান্ত নিলেন বাগানে নেমে গিয়ে ওদের মুখোমুখি হবেন। সোজাসুজি জানিয়ে দেবেন তিনি বাড়ি ছাড়বেন না, ওরা যা পারে করে নিক। ফল যে ভালো হবে না, তা তিনি জানেন। কিন্তু তাই বলে ওদের অত‍্যাচার মুখ বুঁজে সহ‍্য করবেন? ওদের সাহস আরো বাড়বে, আরো কতোজনের ক্ষতি যে ওরা করবে কে জানে?
    বিদ‍্যাপতি বারুই তাঁর পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির শরীরে প্রবল শক্তি অনুভব করতে করতে পায়ে চটি গলিয়ে নিলেন। নিচে নেমে পবনদের মুখোমুখি হবেন। আজ রাতেই হয় এসপার, নয় ওসপার হবে। যা ঘটার, তা ঘটুক।

    বাগানে নেমে এসে দু’তিন পা এগোতে না এগোতে বিদ‍্যাপতি আবিষ্কার করলেন তিনি বেশ ভালো দেখতে পাচ্ছেন। দেখতে পাচ্ছেন কারণ পবনরা যেখানটায় বসে আছে, সে জায়গাটা আশ্চর্য নরম নীল আলোয় ভরে উঠেছে। সাতটা ছেলেকে সে আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটু ঠাহর করে দেখে বিদ‍্যাপতি আবিষ্কার করলেন নীল আলোটা আসছে উপরের দিক থেকে। মুখ তুলে আলোর উৎস খুঁজতে গিয়ে ভীষণ চমকে গেলেন বিদ‍্যাপতি।

    মাটি থেকে প্রায় তিনতলা সমান উঁচুতে কাচের মতো জিনিস দিয়ে তৈরি একটা পিরামিডাকৃতির জিনিস ভাসছে। আর তার তলার দিক থেকে নীল আলো স্তম্ভের মতো বেরিয়ে এসে পবনদের সাতজনকে ঘিরে রেখেছে, অনেকটা ছোট কোনো পোকার গায়ে টর্চের আলো পড়লে যেমন দেখতে লাগে, সেইরকম। পবনরা যে যেভাবে বসেছিলো, সে সেইভাবে বসে আছে, নড়ছে না।
    এবার আলোর স্তম্ভটা ছোটো হতে শুরু করলো। মাছধরা ছিপের হুইলে সুতো গোটালে যেমনভাবে সুতোটা মাছসমেত ছিপের দিকে গুটিয়ে যায় ছোটো হতে হতে, তেমনই। কেউ যেন আলোর স্তম্ভটাকে গুটিয়ে নিচ্ছে পিরামিডটার ভেতরে বসে।

    চুম্বকের টানে লোহার টুকরোর শূন‍্যে ওঠা দেখেছেন বিদ‍্যাপতি। এখন তাঁর বিস্ফারিত চোখের সামনে সাতজন নিশ্চল হয়ে থাকা মানুষ মাটি ছেড়ে উঠে যেতে লাগলো নীল আলোটার সাথে একইভাবে।

    বিদ‍্যাপতি দেখছেন, কি ঘটছে তা খুব ভালো বুঝতে পারছেন। বুঝতে পারছেন যে পৃথিবীতে তিনি দ্বিতীয় লেখক যিনি উইলিয়াম বারোজের মতো সমাপতনের মুখোমুখি হচ্ছেন।
    সব মিলিয়ে মিনিট দেড়েকের মতো লাগলো। পবনদের সাতজনকে নিয়ে নীল আলোর স্তম্ভটা ঢুকে পড়লো পিরামিডের ভেতরে। তারপরে একটা ছোট্ট হু-উ-উ-শ শব্দের সাথে যানটা ওপরে উঠে মিলিয়ে গেলো নিঃসীম অন্ধকার আকাশে।

    বিদ‍্যাপতি মুখ ঘুরিয়ে বাড়ির ভেতরে ফিরে আসবার জন‍্য পা বাড়ালেন। এখন তিনি তিনটে বিষয়ে নিশ্চিত। এক, পৃথিবী থেকে পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে এ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকায় খুঁজলে শুধু প্রাণ নয়, উন্নত সভ‍্যতার খোঁজ পাওয়া যাবে। দুই, এ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা আসলে অনেক তারার সমাহার নয়, একটাই মাত্র তারা আছে ওখানে। আর তাকে ঘিরে বসানো আছে অনেকগুলো বিশাল বিশাল রিফ্লেকটর।

    আর তিন, যিনি এই রিফ্লেকটরগুলো বসিয়েছেন, তাঁর সন্তানের নাম কিস্কা।
  • আরও পড়ুন
    শরীরী - Kausik Ghosh
    আরও পড়ুন
    ঘুড়ি - Nirmalya Bachhar
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৮৭২ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৩ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • কৌশিক ঘোষ | ০২ অক্টোবর ২০২১ ২৩:৪৫498991
  • Nirmalya Nag 
    কয়েকজন বন্ধুকে বলেছিলাম এরকম কোইনসিডেন্সের গল্প লিখতে, সেটা 2016 বা '17-র কথা। কেউ লিখলো না। সেই সময়  ক্লাস এইটের ছাত্রী আমার মেয়েকে গল্প বলতে হতো প্রতি রাতে খেতে বসে। বানিয়ে বানিয়ে বলতাম। ওয়ার্মহোল,  রিলেটিভিটি বা গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের ছোঁয়া থাকলে প্লটটাকে খাবার টেবিলে  আধঘণ্টার মধ্যে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সহজ হতো। শেষের উইশ ফুলফিলমেন্ট তাই সচেতন সিদ্ধান্ত বলতে পারেন। কাহিনীর মানও বড়ো জোর সদ‍্য টিন এজারদের পাঠযোগ‍্য বলা যায়।
     
    এটা মেয়েকে বলা গল্পগুলোর  মধ্যে ছিলো। মেয়েকে যেমন যেমন বলেছিলাম, হুবহু তা-ই রেখে দিয়েছি, পাল্টাই নি। সামান্য দুয়েকটা জায়গা ছাড়া। কিছু ডিটেল ভুলে গেছি, মানে মেয়েকে কি বলেছিলাম, তা পুরোপুরি মনে নেই।
     
    নিখাদ আর্টসের ছাত্র সায়েন্স নিয়ে টানাহেঁচড়া করার চেষ্টা করলে ঐরকমই হবে।
  • পাতা :
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন