• খেরোর খাতা

  • এন অথেন্টিক ইন্ডিভিজুয়াল

    Proshanto Kumar লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২৮ বার পঠিত
  • বীরসিংহের সিংহপুরুষ জন্মেছিলেন "এঁড়ে বাছুর" পরিচয়ে। জন্মলগ্নে পিতামহ রামজয় তর্কভুষণ কর্তৃক প্রদত্ত এমন বদ-খেতাব যতই হাস্যোচ্ছলের হোক, বিদ্যাসাগর পিতামহের সে আখ্যার বরখেলাপ করেননি কখনও। এঁড়ে বাছুরের জিদ আর একগুঁয়েমি তাঁর মধ্যে ছিল। "বাঙালির বিষ সাপের বিষ না" এবং ওঝার আজ্ঞা যে ম্যাজিস্ট্রেটের আজ্ঞা নয় যে হুকুম মাত্র নেমে যাবে বলে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে কটাক্ষ করেছেন তাঁর প্রতিবাদ বুঝি বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্ব দিয়ে করা যায়। সেজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, বিশ্বকর্মা চার কোটি বাঙালি তৈরি করতে করতে মাঝে মাঝে দুই একজন মানুষ তৈরি করে ফেলেছেন। বিদ্যাসাগরই তার একজন। কেননা, তিনি বেসিক পার্সোনালিটি নিয়ে জন্মাননি। মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা সমাজের মানুষ সমাজের সবকিছু মেনে নিতে শেখে। এটা বেসিক পার্সোনালিটি। মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে এভারেজ পার্সোনালিটি বলেছেন। বিদ্যাসাগর এই এভারেজ পার্সোনালিটির ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাঁকে ব্যাখ্যা করা যায় সমাজবিজ্ঞানী রালফ লিনটনের ভাষায়। রালফ লিনটন বলেছেন, যখন মানুষ সমাজের আর সবার মতো করেই কথা বলে তখন তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। তখন সে একটা ইউনিট হিসেবে কথা বলে। সেই মানুষই আলাদা যার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব আছে। তিনিই সেই "দি অথেন্টিক ইন্ডিভিজুয়াল"।
     
     বিদ্যাসাগরই ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অথেন্টিক ইন্ডিভিজুয়াল। ইয়াং বেঙ্গল গ্রুপ যখন প্রগতির নামে প্রথা ভাঙছে কিন্তু একই সাথে ইংরেজদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে ভরপুর, ঠিক সে সময়েই দৈহিক কাঠামোর চেয়ে মাথা কিঞ্চিৎ মোটা অপুষ্ট বাঙালি লোকটি বেছে নিয়েছেন সমাজ সংস্কারের পথ। ব্রিটিশরাজ কর্তৃক তিনি বিধবা বিবাহের আইন পাস করিয়ে নিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু ব্রিটিশদের অন্যায়কে মেনে নেননি। সেজন্য দেখা যায় হিন্দু কলেজের প্রিন্সিপাল কার সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলে কার সাহেব টেবিলের ওপর পা তুলেই বিদ্যাসাগরের সাথে কথা বলেন। সুযোগ পেয়ে বিদ্যাসাগর একই কাজ কার সাহেবের সাথে করলে চারিদিকে বিতর্ক শুরু হয়। বিদ্যাসাগর পরবর্তীতে বলেন, টেবিলের ওপর পা তুলে সম্বোধনের সংস্কৃতি আপনাদের কাছে থেকেই শেখা। 
     
    বিদ্যাসাগরের "তালতলার জুতা" কাহিনীটাও বিখ্যাত। এশিয়াটিক সোসাইটিতে বিদ্যসাগরকে নেটিভ জুতা পরে যাওয়ার কারণে খুলে ঢুকতে  বা হাতে করে নিয়ে ঢুকতে বলা হলে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির ভিতরে না ঢুকে বের হয়ে আসেন। পরে ইংলিশ ম্যান পত্রিকায় লেখেন। বিদ্যাসাগরের এই ঘটনা গ্রেট শু ঘটনা বা বাংলায় তালতলার চটি ঘটনা নামে পরিচিত। 
     
    "এই দুর্বল ক্ষুদ্র হৃদয়হীন কর্মহীন দাম্ভিক তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল। কারণ তিনি সর্ববিষয়ে এর  বিপরীত ছিলেন", রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন। আর তাই তিনি বিদ্যসাগরকে দেখেছেন কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার মতো করে। কাকের বাসায় কোকিল যেমন ডিম পাড়ে বিধাতা তেমনি কৌশলে বিদ্যাসাগরকে দিয়ে বাঙালিকে মানুষ করার চেষ্টা করেছে। তবুও, বাঙালিকে মানুষ করা সহজ নয়। এবং এজন্য দেখা যায় শিক্ষিত অশিক্ষিত সবার কাছে থেকে তুমুল অসহযোগিতা। বিদ্যাসাগরের নীতি ছিল তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে। 
     
    বিদ্যাসাগরই ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিউম্যানিস্ট। তিনিই প্রথম নারীবাদী এবং মুক্তমনা। সংস্কারের ধার ধারতেন না। ছিলেন ঈশ্বর ও পরকালে অবিশ্বাসী। পরকাল নিয়ে হাসি তামাশা করতেন প্রায়ই। আর ছিলেন অসামান্য যুক্তিবাদী। তাঁর যুক্তির কাছে হার মেনেছে বারাণসী সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল ব্যালেন্টাইন সাহেব। শিক্ষা কাউন্সিলর ময়েট সাহেব মেনে নিয়েছেন এই একগুঁয়ে লোকটার কথা। সমাজ থেকে অন্ধকার কুসংস্কার দূর করতে তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছেন শিক্ষার গুরুত্ব। তাই শিক্ষাবিস্তারে মেনে নিয়েছেন পাথর বিছানো বন্ধুর পথ। নারীশিক্ষা আর মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাঁর নিঃস্বার্থ অবদান অনস্বীকার্য। 
     
    ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যাঁকে বিনয় ঘোষ দেবতা না, যথার্থ মানুষ, হিউম্যানিস্ট  বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি ছিলেন তাঁর সমকালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের একজন। এই মহান ব্যক্তিটির জন্ম ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০ সাল। জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। 
     
    আহমদ শরীফ যথার্থই বলেছেন, "সেই যে বাংলা গদ্যরীতির "জনক" বলে তাঁর এক খ্যাতি আছে সেই জনকত্বই তাঁর স্থিতি। তিনি নতুন চেতনার জনক, সংস্কারমুক্তির জনক, জীবন-জিজ্ঞাসার জনক, বিদ্রোহের জনক, শিক্ষা-সংস্কারের জনক, সংগ্রামের জনক, ত্যাগ তিতিক্ষার জনক। জনকত্বই তাঁর কৃতি আর কীর্তি। সমকালীন বাংলার সব নতুনেরই জনক ছিলেন। তিনিই ছিলেন "ঈশ্বর"। আর বদরুদ্দিন ওমর আক্ষেপ করে বলেছেন, বাঙালি মুসলমান সমাজে বিদ্যাসাগরের মতো এমন একজন সমাজ-সংস্কারক আসেননি। এই দুঃখ আহমদ শরীফেরও ছিল। 
     
    বিদ্যাসাগর সবচেয়ে বেশি আধুনিক ছিলেন তাঁর শিক্ষাচিন্তায়। তাঁর শিক্ষাচিন্তা দুইশ বছর পরে এসেও যে কতটা প্রাসঙ্গিক তা কল্পনাই করা যায় না। সময় পেলে একদিন তাঁর শিক্ষাচিন্তা নিয়ে পোস্ট করব।
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২৮ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • না | 172.96.162.98 | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৩:০৬498726
  • পোস্ট করতে হবে না। বিদ্যেসাগর নিয়ে এলেবেলে বাবু পোচ্চুর মাল নামিয়েছেন। আপনি ক্ষ্যামা দিন দিকি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন