• খেরোর খাতা

  • ঘুড়ি 

    Atanu Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৮৯ বার পঠিত
  • ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৬৮.. কলকাতা

    আজ বিশ্বকর্মা পূজো

    ভোর চারটেয় ঘুম ভেঙ্গে গেছেজানালের দিকে চেয়ে বসে আছি..কখন ভোরের আলো ফুটবে. হাতে বেশী সময় নেই. স্কুল খোলা..আটটার মধ্যে বেরোতে হবে..তার আগে চান খাওয়া. যত তারাতাড়ি সম্ভব ছাদে গিয়ে আকাশে ঘুড়িটা ওড়াতে হবে

    সারা বছর পয়সা জমাই আজকের দিনটার জন্য.

    কাল বিকেলে কিনলাম ১০টা মাঝারি ঘুরি.. ৫টা বড় ঘুরি আর মাঞ্জা সুতর লাটাই..নিজে মাঞ্জা দিলে ভাল হত যেমন খোকন..বাবলুরা দিল..কিন্তু অত সময় কোথায়.

    আমাদের লেক প্লেসের বাড়ির ছাদটা বেশ বড়. সাত আট জন একসাথে ঘুড়ি ওড়াতে পারে. আসলে এটা আমাদের ছাদ বলাটা ঠিক হবেনা. এটা সবার ছাদ..যে কেউ যখন খুসি আস্তে যেতে পারে. আজ কমকরে দশ জন আসবে. আমার ছাড়া সবার স্কুল ছুটি..এ ভারি অন্যায়

    ভোর সারে পাচটায় ছাদে গিয়ে দেখি আকাশে একটাও ঘুড়ি নেই..না না আছে..আকাশের ঘুমন্ত তারাদের মাঝে একটা নীল ঘুড়ি আকাশের মধ্যে মিশে আছে.একদম স্থির হয়ে..এত দুরে যেন আকাশ ছুয়ে গেছে..

    এটা যার ঘুরি তাকে আমরা সবাই চিনি. ইনি বছরের প্রতিদিন ঘুড়ি ওড়ান..এটা ওনার নেশা. আদি লেক পল্লির দুরগা পূজো মন্ডপের পাশের বাড়িটা ওনার. আমাদের বাড়ি থেকে অন্তত তিনশ মিটার..তাহলে বোঝ ওনার কত সুতো ..বড় হলে যখন রোজগার করব আমিও ওনার মতন অনেক সুতো কিন্তে পারব..একদম আকাশ ছোয়া যাবে. উনি কখন আকাশ থেকে নেমে আমাদের সনগে প্যাচ খেলেননি..হয়ত উনি এসবের উরধে থাকতে চান..

    সকাল সারে সাতটা অবধি আকাশে থাকলাম..চারটে কাটলাম আমার তিনটে কাটা গেল..আসলে লাটাই ধরার কেউ নেই..

    অন্য সময় যেই ছাদে থাকে..তাকেই পাকড়াও করি..কখনো দাদা..কখনো বাবু.(আমার ভাই) .কখন কোনো বন্ধু..যার আজ ঘুড়ি কেনার পয়সা নেই

    একবার কাজের মাসী শাড়ি মেলতে আসল..তাকেই বল্লাম লাটাই ধরতে..সে মাকে নালিশ ঠুকে দিল..

    এর মধ্যে অনেকে এসে গেছে..কত রকমের ঘুড়ি..এক রং..দু রং..পেটকাট্টি..মোম্বাতি..লম্বা লেজ ওলা..শুকনো মুখে নীচে নেমে এলাম..স্কুল তো যেতে হবে

    শুধু শুধু স্কুলে গেলাম..চোখ ক্লাসের জানালা পেরিয়ে আকাশে..কত ঘুড়ি..কত রকমের লড়াই..কেউ নীচ থেকে টানছে..কেউ ওপর থেকে সুতো ছারছে..

    বিকেল চারটায় স্কুল থেকে ফিরে এক ছুটে ছাদে..পুরপোরি মেলা বসে গেছে..অন্তত বার জন ওড়াচ্ছে..আশে পাশে ছাদ ভরতি..ভওকাট্টা আওয়াজে আকাশ মুখর.

    আকাশ ঘুড়িতে ঢেকে গেছে..কোথাও ঘন্টা বাজিয়ে বিজয় ঘষিত হচ্চে..কোথাও বিষন্ন মুখের সারি..বিষাদময়..হাসি কান্নার খেলা ..আকাশ অবাক হোয়ে দেখছে

    ঘুড়ি ওড়ানটা টা আমার ছোটো কাকার কাছে শেখা. মামারাও বরধমানে ঘুড়ি ওড়াত বলে শুনেছি..মশারির চালে ঘুড়ি রাখা হত

    হটাৎ করে অন্ধকার নেমে এল..আজকে যেন একটু তাড়াতাড়ি..সব কিছুরি শেষ আছে..আজকের দিনটাও ফুরিয়ে গেল..আমি আর ঘুড়ি টাকে নামালাম না..সুতোটা ছিড়ে দিলাম. আমার কাছে বেশ কয়েকটা আছে..কারো হয়ত একটাও নেই..সে যদি এটা পেয়ে যায়..তাহলে বেশ হয়

    ঘুড়িটা আস্তে আস্তে আধো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল.

    ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২১, সিঙ্গাপুর

    এখানে সাতটা নাগাদ আলো ফোটে। কেমন যেন মনে হল, আমি কলকাতা তেই আছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো ঘুড়ি দেখা গেল ন। অনেক খূঁজে দেখলাম।

    চা খেয়ে সম্বিত ফিরে এল।

    ছোটবেলা হারিয়ে গেছে, আর ফিরবে না।

    চিন দেশে তিন হাজার বছর আগে প্রথম ঘুড়ি ওড়ানো হয় ।

    এখানে চিন দেশী মানুষেরা ঘুড়ি ওড়ায়। সমুদ্রের ধারে, বলির চরে, অথবা খুব উচু বড়ির ছাদে। নানান ধরনের ঘুড়ি ওড়ায়, যেমন বক্স ঘুড়ি, ড্রাগন ঘুড়ি।

    আমার এগুলি ভাল লাগেনা। একজন একটা ঘুড়ি নিয়ে দৌড়তে থাকে, যতক্ষণ না ঘুড়ি আকাশে ওড়ানো যায়। মনে হয়, ঘুড়ি মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, মানুষ ঘুড়িকে না ।

    তাছাড়া, দুটি ঘুড়ির মধ্যে প্যাচ না হলে, আর মজা কোথায়। লাটাই নেই, মানযা সুতো নেই। এরকম ঘুড়ি ওড়ানোর দরকার কি।

    স্কুল জীবনের পরে আর ঘুড়ি ওড়ায় নি। এখন আপসোস হয়, কেন স্কুল বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি দিতনা। অনেক অনুরোধ করা হয়েছে, কাজ হয়নি।

    স্কুল অনেক দিয়েছে, অনেক কিছু শিখিয়ে, মানুষ করেছে, আজ সেই ভাঙিয়ে, করে খাচ্ছি, না হলে তো, তোলাবাজদের দলে নাম লেখাতে হত।

    তবু বলব, স্কুল কর্তারা আমদের মনের ভেতর ঢুকতে পারেনি, আমদের চোখের জল দেখতে তারা অপরাগ ছিল। কড়া শাসন, কখনো শেষ কথা বলে না।

    এখনও কি স্কুল খোলা থাকে, জানিনা। প্রাক্তনী রা স্কুলের কর্তৃপক্ষর সঙ্গে বসে এটার একটা রফা করুক, অনুরোধ রইল।

    যাই হোক, ফিরে যাই সেই ছোটবেলায়।

    কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, লেক প্লেসের, আদি লেক পল্লির দুর্গা পূজার আয়োজন হচ্ছে।

    পাশের বাড়ির ছাদে, সেই মানুষ একমনে, ধ্যানস্থ। হাতে লাটাই, চোখ ঘুড়ির দিকে, আকাশের দিকে। যুবক থেকে উনি এখন অশীতিপর বৃদ্ধ, তার সারাদিন গল্প আকাশের সঙ্গে। রাতে তারাদের সঙ্গে।

    তারাদের স্নেহের স্নিগ্ধ আলো, তার ঘুড়ির উপর, অন্ধকারে দৃশ্যমান।

    নিচে তাকাতে তার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা করেনা। দুনিয়াটা কেমন বদলে গেল, ছেলের দল আর ঘুড়ি ওড়ায় না, রাস্তায় ক্রিকেট খেলেনা, রবারের বলে ফুটবল খেলে না। অজয় বসু রা আর ধারাবিবরণী দেয় না। পি কে নেই, চুনী নেই, বলরাম নেই, সবাই হারিয়ে গেছে।

    তোলাবাজি নিয়ে মারা মারি। রাজনীতি, ধর্ম মিলেমিশে একাকার।

    আগে বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুরে, তারা ঘুড়ি ওড়াত,

    চন মনে স্কুল পড়ুয়াদের বাড়ির ছাদে লাটাই হাতে দেখা যেত।

    সেই সময় হারিয়ে গেল

    আকাশটা আছে, তারা রা আছে, তাদের নিয়েই

    তার
    বাকি জীবন কেটে যাবে ।

    (অতনু রায়)

     

  • আরও পড়ুন
    ফেরার - JAYASHREE KONAR
    আরও পড়ুন
    বার্ড - Sambaran Sarkar
  • বিভাগ : অন্যান্য | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৮৯ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন