• খেরোর খাতা

  • হাসি-রাগ-আলো 

    Chayan Samaddar লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২১১ বার পঠিত
  • হাসি-রাগ-আলো: পরশুরাম ও কিছু ভাবনা

    To laugh at fate through life’s short span
    Is the prerogative of Man…

    ষোড়শ শতকে হাসির এই ভূমিকার কথা বলেছিলেন ফ্রান্সের রাবলে। আর, এখন পাশ্চাত্যের তত্ত্ববিদরা হাসিকে বলেন, ‘ইভেন্ট’। যে হাসাচ্ছে, আর যে হাসছে, তাদের সম্পর্কের মধ্যে খুঁজে পান বহু মাত্রা ও স্তর। তাঁদের বিচারে, হাসি কখনও নিরাপদতম ব্যক্তির আত্মপ্রকাশের চিহ্ন, কখনও বা আত্মগরিমা-র (যাকে নিজের লেভায়াথান বইতে ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস, গ্লোরি নাম দিয়ে, বিবাদের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন) উদযাপন, আবার কখনও হাসির মধ্যে তাঁরা খুঁজে পান, এমন কিছু উপাদানের সংজ্ঞাতীত অবশেষ যা আমাদের অস্থির করে।

    হাসি নামক ‘ইভেন্ট’টি যে আমাদের ‘ইডিওলজি’-র ভিত্তিকে বিপন্ন করে, একথাও তাত্ত্বিকরা বেশ জোর গলাতেই বলেন। ইডিওলজি কাকে বলে? এটি হলো প্রাতিষ্ঠানিকতা স্বীকৃত সেই দৃষ্টিভঙ্গী যা ক্ষমতাসীনরা আমাদের নিজেদের বলে, আমাদের ভাবাতে চান, এবং যার নিরিখে আমাদের আচার-আচরণ থেকে শুরু করে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চান। অর্থাৎ, ক্ষমতানির্ধারিত, সমাজমান্য, তথাকথিত ‘স্বাভাবিকতা’। এই স্বাভাবিকতা না মানলেই, বা অন্যভাবে বলতে গেলে, একটা গোষ্ঠী যাকে স্বাভাবিক বলছে, তার বিরূদ্ধাচারণ করলেই, ব্যঙ্গভরা হাসি হেসে বিরোধীকে তুচ্ছ করে, স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা একটা সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু, হাসি আসলে দু’ধারি তলোয়ার। যা চলছে, তাকে বেঠিক মনে করেন যাঁরা, তাঁরাও হাস্যরসের সাহায্য নিতে পারেন। বলতে কি, রাজনীতি আর বিনোদনের মাঝে একটা সম্পূর্ণ নতুন রকমের জায়গা গড়ে নিয়ে, হাসি যখন সাহিত্যমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে, তখন সে নতুন ধরনের মনোযোগ প্রত্যাশা করে। তখন সে ইডিওলজিকে প্রশ্ন করে। তাকে নিয়ে রসিকতা করে এবং বহু ক্ষেত্রেই সে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে তীব্র উষ্মা। আরও স্পষ্ট করে বললে - রাগ।

    যখন সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যথা-অসম্মান-গ্লানি স্রষ্টাকে ক্ষতবিক্ষত করে, তখন ক্রোধ-আর্তি-অভিশাপকে এক অদ্ভুত হাসিতে রূপান্তরিত করেন তাঁদের কেউ কেউ। সে হাসি আমাদের কশাঘাত করে – রক্তের মধ্যে চারিয়ে দেয় বিষের জ্বালা।

    এই জাতীয় হাসির ভয়ালতম নমুনা পাওয়া যায় জোনাথন সুইফটের ‘মডেস্ট প্রোপোজাল’-এ। বিনীত প্রস্তাবটির পুরো নাম ছিল - A Modest Proposal For preventing the Children of Poor People From being a Burthen to Their Parents or Country, and For making them Beneficial to the Publick -১৭২৯ সালে আয়ার্ল্যান্ডের শোষিত, দারিদ্রপীড়িত মানুষের প্রতি অকৃত্রিম মমতা আর শোষকের প্রতি এক আকাশ ঘেন্না নিয়ে, সুইফট লেখেন, গরীব বাপ-মা দু’টো পয়সার মুখ দেখতে পারে, যদি তারা নিজেদের সন্তানদের ধনীদের কাছে খাবার হিসেবে বেচে দেয়।

    এবং এই বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কী করা হবে?

    “A child will make two dishes at an entertainment for friends, and when the family dines alone, the fore or hind quarter will make a reasonable dish, and seasoned with a little pepper or salt, will be very good boiled on the fourth day, especially in winter.

    …I grant this food will be somewhat dear, and therefore very proper for landlords, who, as they have already devoured most of the parents, seem to have the best title to the children.”

    ভয়ানক, তাই না? বাচ্চা কেটে বন্ধুদের খাওয়ানো, সেদ্ধ করে নুন-মরিচ দিয়ে খাওয়া! এই খাবার একটু দামী, তাই জমিদারদের উপযুক্ত, কারণ তাঁরা বাচ্চাগুলোর মা-বাবাকেও গলধঃকরণ করেছেন; আর এতে বাচ্চাগুলোরও সদগতি!

    লক্ষ লক্ষ নিরন্ন মানুষের অন্তরের জ্বালায় সুইফটের চণ্ড ক্রোধ এইরকম হাসির চেহারা নিয়েছিল। এর চেয়ে বীভৎস, অমানুষিক হাসি অক্ষরভুবনে আজপর্যন্ত সারা পৃথিবীতে কেউ হাসে নি।

    এবার, আমরা ঘরের দিকে চাইব। একজন মানুষের দিকে, যিনি অত্যাচারীদের পতনের জন্য আয়োজিত এক মহামারণ যজ্ঞের ঋত্বিক হয়েছিলেন। কুঠারধারী পরশুরাম। সমস্যা হলো তিনি পুরাণলোকের অধিবাসী। আর, সেই কথনবিশ্বে ক্রোধের কোনও হাস্যময় বাকপ্রতিরূপের সন্ধান পাওয়া যায় না।

    অতঃপর, দৃষ্টিপাত বঙ্গসাহিত্যলোকের দিকে। সন্ধান পাচ্ছি সেই পরশুরামের যাঁর কয়েকটি রচনায় অন্তত, যে হাসি-রাগের কথা বলছি, তার প্রতিফলন স্থানে স্থানে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, এ কি স্বপ্ন, না মায়া, না মতিভ্রম?

    কারণ, প্রথমত, রাজশেখর বসু একজন 'রসসাহিত্যিক', দ্বিতীয়ত, তাঁর ছদ্মনাম তিনি মোটেই পুরাণের পরশুরামের কথা ভেবে নির্বাচন করেন নি। ১৯২২ সালে এই অভিধা তিনি স্বর্ণকার তারাচাঁদ পরশুরামের নাম থেকে গ্রহণ করেন। এছাড়া, তাঁর প্রথমদিকের রচনাগুলিতে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, “জানা মানুষের চেনা মূর্তিরই এদিকে, ওদিকে একটু রঙের ছোঁয়া দিয়ে, একটুখানি বাঁকা চোখ দিয়ে দেখে, প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বের মধ্যেই যে বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি, eccentricity ও কৌতুকের উপকরণ আছে সেগুলোকে সামান্য বাড়িয়ে পরশুরাম তাঁর অপরূপ সাহিত্যসম্ভারের অর্ঘ্য সাজিয়ে দিয়েছিলেন।"

    ১৩৩৯ সালে প্রসন্ন কৌতুকময় ‘প্রেমচক্র’ লেখার পর, টানা দশ বছর, পরশুরাম কোনও গল্প লেখেননি। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে। চোরা-বাজারী, মুনাফা- শিকারি অধ্যুষিত বাঙলায় চারিদিকে মানুষের হরেকরকম বিকৃতির প্রদর্শনী। সমাজ-সংস্কার-ধর্ম-পরিবার কোনও কিছুই পঙ্কস্নান এড়াতে পারছে না। ওদিকে বিদেশি শাসকের অত্যাচার। ভিতর আর বাইরের অসহ্য যন্ত্রণায় আবার যখন ১৯৪২ সালে কলম ধরলেন রাজশেখর, তখন ‘দশকরণের বানপ্রস্থ’ গল্পে সর্বমানবের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে, সেবাব্রতে মুক্তিসন্ধানের কথা লিখেছিলেন। কিন্তু, ঠিক এর পরের বছর লেখা ‘তৃতীয় দ্যূতসভা’-তে তিনি তাঁর সমনামী ক্রোধ যজ্ঞের ঋত্বিকের সমধর্মী হয়ে উঠলেন। রাজনীতির নোংরামির প্রতি তাঁর রাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল শান্ত যুধিষ্ঠিরের উত্তেজনায় – ‘আমি কোনও কথা শুনতে চাই না, দ্যূত-প্রসঙ্গে আমার ঘৃণা ধরে গেছে। আমরা যুদ্ধ করেই হৃতরাজ্য উদ্ধার করব।’ এখনকার কবির কথা যেন -

    এমনিভাবে থাকতে গেলে শেষ নেই শঙ্কার
    মারের জবাব মার
    বুকের ভিতর অন্ধকারে চমকে ওঠে হাড়
    মারের জবাব মার।

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গ্লানি পরশুরামকে কী পরিমাণ বিচলিত করেছিল তার প্রমাণ ১৯৪৫ এ রচিত 'গামানুষ জাতির কথা'। এই কাহিনিতে প্রথমে সমগ্র মানবজাতির বিনাশ কল্পনার পর ইঁদুর থেকে মিউটেটেড গামানুষ জাতির সৃষ্টি ও বিলোপের কথায় একটা তীব্র রাগ আর ঘেন্না দপ দপ করে। মানুষকে, সুইফট-এর ইয়াহুর মতোই, নোংরা ইঁদুরের চেয়ে বেশি কিছু ভাবছেন না লেখক। বর্ণনা শেষে উপসংহারের তীব্র শ্লেষ যেন ফুটিয়ে তোলে তাঁর ভ্রুকুটিকুটিল মুখমণ্ডল : "মৃতবৎসা বসুন্ধরা একটু জিরিয়ে নেবেন তারপর আবার সসত্ত্বা হবেন। দুরাত্মা আর অকর্মণ্য সন্তানের বিলোপে তাঁর দুঃখ নেই। কাল নিরবধি, পৃথিবীও বিপুলা। তিনি অলসগমনা। দশ বিশ লক্ষ বৎসরে তাঁর তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে না, সুপ্রজাবতী হবার আশায় তিনি বারবার গর্ভধারণ করবেন।"

    ১৯৪৯ সালে ‘রামরাজ্য’ গল্পে পরশুরাম সংবিধানে লেখা জনগণের হিতার্থে, জনগণ কর্তৃক পরিচালিত, জনগণের সরকার কথাটার নির্মম প্যারডি করেছেন – ‘গোহিতায় গোভির্গবাং শাসনম্‌’। গরুর হিতের জন্য, গরু দ্বারা গরু শাসন। মানুষ এখন তাঁর কাছে গবাদি পশু। মানুষ হতে পারলে ভালো, না হলে কামড়াকামড়ি করে মরুক তারা। তাতে নিখিল বিশ্বের কিচ্ছু এসে যাবে না। নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভু। মানুষের সর্বোত্তম কল্পনার প্রতীক পরম পুরুষ কারও পাপ পুণ্যের তোয়াক্কা করেন না। মানুষ গেলে অন্য প্রাণী জন্মাবে।

    গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে কোনও এক সময় রচিত 'গন্ধমাদন বৈঠক' এ প্রায় হুবহু এক কথা : "পরশুরাম বললেন, ... ও সব চলবে না বাপু, আমি এখন বিষ্ণুর কাছে যাচ্ছি। তাঁকে বলব, আর বিলম্ব কেন, কল্কিরূপে অবতীর্ণ হও, ভূভার হরণ কর, পাপীদের নির্মূল করে দাও, অলস, অকর্মণ্য দুর্বলদেরও ধ্বংস করে ফেল, তবেই বসুন্ধরা শান্ত হবেন। আর তোমার যদি অবসর না থাকে তো আমাকে বল, আমিই না হয় আরেকবার অবতীর্ণ হই।" রক্তস্রোতে পৃথিবী ধুইয়ে দেওয়ার কল্পনা যিনি করেন তিনি 'রসসাহিত্যিক'?

    ১৯৫৩ সালে রচিত 'বালখিল্যদলের উৎপত্তি' কাহিনিতে না পড়ে পণ্ডিত হতে চাওয়া, অপদেবতার প্রভাবগ্রস্ত, ত্রিশঙ্কু ও বিশ্বামিত্রের ভজনাকারী, আশ্রম পোড়াতে অগ্রসর বালখিল্যদের রূপকের আড়ালে দেশের কিছুই না জেনে অর্ধপাচ্য বিদেশী মতাদর্শের অন্ধঅনুসরণকারীদের প্রতি পরশুরামের তিক্ত বিদ্রূপ নির্মমতার রূপ নিয়েছে : "ক্রতু একটু চিন্তা করে বললেন, এরা ব্রাহ্মণ সন্তান। অপজাত হলেও অধৃষ্য ও অবধ্য, নতুবা মুখে লবণ দিয়ে এদের ব্যাপাদিত করা যেত।"

    'তিন বিধাতা', 'সিদ্ধিনাথের প্রলাপ', 'নিধিরামের নির্বন্ধ', 'গগন চটি', এরকম আরও বহুরচনার নাম করা যেতে পারে যেখানে পরশুরামের কলম কুঠার হয়ে উঠেছে। ১৯৫০ এ রচিত 'ভীমগীতা' তো বিস্তৃততর আলোচনার দাবী রাখে।

    সে আলোচনার পূর্বে ১৯২৬ সালে রচিত পরশুরামের 'প্রার্থনা' নামক কবিতার অংশবিশেষ একবার পাঠ করা যাক : "যত খুশি দাও ক্ষমা অহিংসা অন্তরে মোর ভরি/ একটি কেবল মনের বাসনা ব'লে রাখি হে শ্রীহরি/ দুর্জন অরি একচড় যদি লাগায় আমারে কভু,/ তিনচড় তারে কশাইয়া দিব মাফ কর মোরে প্রভু।" অর্থাৎ, মারের জবাব মার-এর প্রবণতা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়।

    স্বর্ণকারের নাম ছাড়িয়ে, লেখনীকে খরশান আয়ুধে পরিণত করে, ক্রমে ক্রমে পরশুধারী জামদগ্ন্যেরই সমীপবর্তী যে হচ্ছিলেন 'রসসাহিত্যিক পরশুরাম' সে বিষয়ে আর কোনও সংশয় বোধ করি থাকা উচিত নয়। বস্তুত: রাজশেখরের দৌহিত্রিপুত্র দীপংকর বসু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, "নিজের সম্বন্ধে এই একটিমাত্র বিষয়ে তাঁকে বারবার বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখেছি... এটা অত্যন্ত অপমানকর, 'রসসাহিত্যিক' আবার কী? আমি কি হাঁড়িতে রস ফুটিয়ে তৈরী করি? "

    শ্রী বসু আরও জানিয়েছেন যে, "বহুবার বিশেষতঃ মানবসভ্যতার সমস্ত কুসংস্কার ও অন্যায়ের ক্ষেত্রে আঘাতের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর লেখা নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার রাজ্যে প্রবেশ করেছে।....
    বুঝ যে জন জান সন্ধান।"

    একথা অনস্বীকার্য যে ব্যষ্টি ও সমষ্টির ক্রোধ কোনও কোনও সময় কল্যাণকর রূপ ধারণ করতে পারে। বেদে 'মন্যু' নামক দেবতার স্তুতি করা হয়েছে; মহাভারতে দ্রৌপদী যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেছেন, "কথং মন্যুর্ণ বর্ধতে?" ঐ পাষণ্ডদের বিরুদ্ধে আপনার ক্রোধ কেন বেড়ে উঠছে না? ঠিক এই প্রশ্নই পরশুরাম ভীমকে দিয়ে করিয়েছেন তাঁর 'ভীমগীতা' তে :

    "কৃষ্ণ, তোমার শরীরে কি ক্রোধ বলে কিছুই নেই?" এই কাহিনি পরশুরামের সৃষ্টিবিশ্বে অতি উল্লেখযোগ্য এক স্থান অধিকার করে কারণ এখানে সাহিত্যিক পরশুরাম স্পষ্ট ভাবে এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন যা মহাভারতের অনুবাদক রাজশেখর বসুর পক্ষে করা সম্ভব ছিল না।

    ভীম সরাসরি কৃষ্ণের প্রতিহিংসাপরায়ণতার সঙ্গে সম্পর্কহীন ধর্মযুদ্ধের তত্ত্বটিকেই চ্যালেঞ্জ করেন; "গোবিন্দ, তুমি নিতান্তই হাসালে। কংসকে মেরেছিলে কেন? জরাসন্ধকে মারবার জন্য আমাকে আর অর্জুনকে নিয়ে গিয়েছিলে কেন? রাজসূয় যজ্ঞের সভায় শিশুপালের মুণ্ডচ্ছেদ করেছিলে কেন? তোমার অক্রোধ কোথায় ছিল? আজ রণক্ষেত্রে অর্জুনের অক্রোধ দেখেও তাকে যুদ্ধে উৎসাহ দিলে কেন?" এই কাহিনিতে পরশুরাম নিজের সঙ্গে নিজেই বোঝাপড়ায় আসতে চান বলে মনে হয়। কারণ ভীম যখন বলেন, "যে লোক পরিণাম না ভেবে ক্রোধের বশে শত্রুকে আঘাত করে, সে হঠকারিতার ফলে নিজে মরতে পারে, তার আত্মীয়রাও মরতে পারে, কিন্তু তার স্বজাতির খ্যাতি ও প্রতাপ বেড়ে যায়"; তখনই আমরা বুঝতে পারি পরশুরাম স্মরণ করছেন যে সংস্কৃত ভাষায় সাহস আর bravery সমার্থক নয়। প্লাতো বা আরিস্তোতল যে নির্ভীক ধীরোদাত্ত বীরত্বকে arete বলতেন সেই বস্তুই ল্যাটিন cor এর হাত ধরে ইংরিজিতে হয়েছে courage। Cor শব্দের অর্থ হৃদয়। কিন্তু সাহস বলতে সংস্কৃত ভাষা কোনও মহান হৃদয় বৃত্তিকে বোঝে না। সে যা বোঝে তা হলো Courage এর ঠিক বিপরীতার্থক শব্দ : Rashness। আর তাই পরশুরামের 'ভীমগীতা'য় শেষ কথা কৃষ্ণই বলেন, ভীম নয়: "যে ক্রোধের বশে ধর্মাধর্মের জ্ঞান হারায় না এবং অন্যায়ের যথোচিত প্রতিকার করে, সেই শ্রেষ্ঠ পুরুষ।"

    হাস্যাবৃত ক্রোধ তবে এতক্ষণে তার প্রস্থানভূমি খুঁজে পেল। হৃদয়াবেগ প্রধান ক্রোধ ন্যায় অন্যায় বিচারে অক্ষম। আর সেই ক্রোধের বশবর্তী হয়ে রক্তস্নানের ইচ্ছা জিঘাংসাবৃত্তি হতে পারে কিন্তু ন্যায় বিচার প্রার্থনা নয়। চিত্তনদী উভয়তবাহিনী - বহতি পাপায়, বহতি কল্যাণায় চ। আবেগের নদীকে যে দুদিকেই বওয়ানো যায়, একমাত্র মানুষই যে পারে ক্রোধের বেগ উলটো দিকে বওয়াতে : সেই শিক্ষাই পেলাম 'পরশুরাম' রাজশেখরের কাছ থেকে। মহাভারত অনুবাদকারী ডেকে বললেন, "ন মনুষ্যাৎ শ্রেষ্ঠতর হি কিঞ্চিৎ" : মানুষের চেয়ে বেশী বড়ো আর কিছুই নেই।

    তাহলে, হাসি-রাগ পাঠের স্তর পেরিয়ে যাপনকালে আমরা কী করতে পারি? বহু মহাজনের পদাঙ্ক অনুসরণ ক'রে চারপাশের মোহগ্রস্ত আঁধার পেরিয়ে আলোর উদ্দেশ্যে চলতে পারি। মূঢ়তার অন্ধকারে বন্দী বহুজনতার মধ্যে একাকী। মুহ্যন্তু অন্যে অভিতো জনাসঃ - অপরে থাকুক মোহান্ধকারে - কিন্তু আমি আলোর দিশারি হতে পারি যদি আমি তাই চাই।

    সাহিত্য পাঠের পর, হাসিকে রাগে বদলে যেতে দেখার পর, সতর্ক থাকতে হবে। স -তর্ক ও বটে। নিজেকে বারবার যাচিয়ে নিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, জাগ্রতজনই ঋকমন্ত্রদের কৃপাধন্য : যো জাগায় তম্ ঋচঃ কাময়ন্তে। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো- কে স্মরণ করে গৌরী ধর্মপালের কথা একটু বদলে নিয়ে প্রার্থনা করতে পারি :

    যত্র জ্যোতির্ অজস্রং যস্মিন্ লোকে স্বর্হিতম্।
    তস্মিন মাং দেহি পবমান
    অমৃতে লোকে অক্ষিতে।

    যেখানে নিশিদিন আলোক অফুরান
    যেখানে সূর্য অচল, ঠায় -
    প্রতিষ্ঠা কর আমায় পবমান
    অমৃত অক্ষয় সে চেতনায়।

    এমনি করেই ক্রোধ রূপ নেয় অক্রোধের; ভীমা ভয়ঙ্করী হয়ে ওঠেন জননী বাক্। আর তাঁর ধ্যানমন্ত্রের সন্ধানও শঙ্খ ঘোষ রচিত 'স্লোগান' কবিতাটিতেই পাওয়া যায়:

    কথা কেবল মার খায় না কথার বড়ো ধার
    মারের মধ্যে ছলকে ওঠে শব্দের সংসার।

    এই কথা বা শব্দই হলো সাহিত্য; যা সঙ্গে থাকে। এর চর্চাই ক্রোধকে সংহত করে উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ করে।

    সংস্কৃত সাহস আর ইংরিজি courage এর মধ্যে যে ব্যবধান : সংস্কৃত ক্রোধ আর বাংলা রাগের মধ্যেও ঠিক তাই। কারণ সংস্কৃতে রাগ বলতে ক্রোধের ঠিক বিপরীত অনুভূতিটিকে বোঝায় যার নাম ভালোবাসা। ক্রোধের বশে ধ্বংসস্বরূপা দেবীবন্দনা কারোরই কোনও পরিবর্তন আনতে পারবে না কিন্তু অমৃত , অক্ষয় চেতন লোকে উত্তীর্ণ হ'লে ; নিজের প্রতিহিংসাকামীতাকে দমন করলে হয়তো বা আমি সেই সৃজনবিশ্বের অংশভাক হতে পারব যার মন্ত্রশক্তি কিছু প্রতিজিঘাংসুকে থামাতে পারবে।

    সত্যবাক্য উচ্চারণে সেই বোধ জাগ্রত হয়, মহাভারতকার যাকে বলেন 'অনুক্রোশ'। এ হলো সেই নৈতিক ধর্মবোধ যা প্রকৃতিগত :intrinsic। ঔচিত্য নির্ভর শুভাশুভবুদ্ধি যা মানুষকে মানবতা দেয় তার মূলে থাকে এই অনুক্রোশ। প্রতিকারহীন অ-দণ্ডিত অন্যায় দেখলেও এই বোধ আক্রোশকে শমিত করে। 'ভীমগীতা'কে রূপান্তরিত করে ভাগবত গীতায় যা মানুষকে বুদ্ধিযোগ আশ্রয় করে আসক্তিহীনভাবে ( অর্থাৎ involved না হয়ে) বহুজনহিতায় এমন এক পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রাণিত করে যেখানে বাক্ -সিদ্ধ কোনও কবি প্রতিহিংসক মানবকুলকে নিবৃত্ত করে বলবেন :

    "মারের মুখে মার দাঁড়াবে? শোকের মুখে শোক?
    এই তাহলে উপায়? পথ? পদ্ধতি? সহায়?
    ফিরে যাবার রাস্তা শুধু একদিকেই এগিয়ে যাবে?
    হত্যা থেকে পালটা হত্যায়?
    তোমার মুখ কী করে আমি হাতে ধরব তবে?" ( জয় গোস্বামী)

    ঋণ স্বীকার :
    ১) বেদ ও রবীন্দ্রনাথ - গৌরী ধর্মপাল।
    ২) ভাতকাপড়ের ভাবনা এবং কয়েকটি আটপৌরে দার্শনিক প্রয়াস - অরিন্দম চক্রবর্তী।
    ৩) বাংলা গল্প বিচিত্রা - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
    ৪) In the Event of Laughter : Psychoanalysis, Literature and Comedy - Alfe Bown।
  • আরও পড়ুন
    রণছোড় - Chayan Samaddar
    আরও পড়ুন
    লাফ  - Saswati Basu
  • বিভাগ : অন্যান্য | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২১১ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বপ্নে দেবো | 43.231.242.237 | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৪:৪২498095
  • হুরিবাবা, সুইফট নিয়েও কপচাচ্ছে! আবার ইদিকে পরশুরাম! নাম জুড়ে জুড়ে রামসেতু বানানো কী বাসনা নাকি কারুবাসনা?
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন