• খেরোর খাতা

  • লকডাউনের জানলা 

    Sara Man লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ আগস্ট ২০২১ | ১১৩ বার পঠিত
  • লকডাউনের জানলা মানে আমার জানলা। কোভিড ১৯ এর লকডাউনে বাড়িতে আটকে আছি, আজ দুমাস পেরিয়ে তিন মাসে পড়ল। বাইরে বেরোতে পারছি না বটে, কিন্তু অবাক হয়ে যাচ্ছি, যে আমার বাড়িতে জানলা অনেক বেড়ে গেছে, এতগুলো জানলা আগে কখনও ছিলনা।

    হাওড়ার ঘিঞ্জি গলিতে দোতলার ছোট ফ্ল্যাট। এক চিলতে বারান্দা, জানলার এক্সটেনশন। যে দিকে চাই, নজর আটকে বড় বড় বাড়ি। খুব কষ্ট করে ফালি আকাশ দেখা যায়। দুটো বাড়ির ফাঁক দিয়ে দেখি একটু রাস্তার আভাস। ঘরে রোদের মুখ দেখিনা তাই দিনেও বিদ‍্যুতের আলোয় কাজ চালিয়ে নিই। তিনটে ঘরে জানলা সাকুল্যে চারটি। এতদিন এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি, কারণ দরকার হয়নি। সকাল হলেই নাকে মুখে গুঁজে কলেজে ছুটি। বাড়ি ফিরতে সেই সন্ধ‍্যে। ঘরে রোদ হাওয়া ঢুকেছিল কিনা খোঁজ নিইনি কোনোদিন। ছুটি থাকলে রবীন্দ্রভারতীর দূরশিক্ষার ক্লাসের জন্য সোজা সল্টলেক। নইলে কোনো মেলা, প্রদর্শনী, আমন্ত্রণ, একাডেমির নাটক বা পিভিআরের সিনেমা। বাড়িতে থাকলে কম্পিউটারে লেকচার রেডি, খাতা দেখা আর রোজকার পড়াশোনা। ঘরের কাজ, রান্না এগুলো বেঁচে থাকার উপায়, তাই উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। এসবের মধ্যে বাড়িটা ছিল, বারান্দা আর জানলাগুলোও ছিল। আলাদা করে চোখে পড়ত না। কারণ বাড়িটা ছিল কেবল ঘুমোনোর জায়গা‌।

    এখন আমি রোজ জানলায় আর বারান্দায় যাই। কিছুক্ষণ বসি অথবা দাঁড়িয়ে থাকি স্থির হয়ে, বলা ভালো সুস্থির হয়ে। ছোটবেলার গরমের ছুটির কথা মনে আসে। সেই দিনগুলোর পরে আমার জীবন কখনো এমন সুস্থির ছিলনা।

    পিছনের বাড়িটার পাঁচিলের গায়ে, ছায়া পেয়ে অনেকগুলো ফার্ন গজিয়ে উঠেছে। ওদের গায়ে গায়ে ওটা তো পুঁইশাক মনে হয়। অনেক ছোটবেলায় বসিরহাটের দেশের বাড়িতে পাকা পুঁইমিটুলির চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খেতাম। ভাতটা লাল হয়ে যেত। পরে আর কখনো খাইনি। ওদের পেঁপে গাছটায় কত পেঁপে ধরেছে রে বাবা। সব কি ওরাই খাবে? তেমন আলাপ নেই। থাকলে দুটো চাইতাম। পাশে উঁচু ফ্ল্যাট বাড়িটার সারা গায়ে দেওয়ালের বিভিন্ন জায়গায় গাছ গজিয়ে উঠেছে। বাড়িটাতো বেশি দিন হয়নি! সুন্দর রং, মলিনতার ছাপ পড়েনি। এরা কি কিছু দেখেওনা। আচ্ছা আমাদের বিল্ডিং টায়ও এমন হয়েছে নাকি? আমার সামনেই ওদের দেওয়ালে পাইপের বাঁকে ঝাঁপড়া অশ্বথ্থের চারা।ওখানে বসে খুঁটে খুঁটে কিছু খাচ্ছে একটা সাদা বক। মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে, আবার বসছে। আশ্চর্য! আমি বাড়ি বসে এ তল্লাটে বক কখনো দেখিনি।

    দুটো বিড়ালছানা ডানদিকের বাড়ির পিছনে খেলা করছে। একটা লালে সাদায় মেশানো, অন্যটা ঝিম কালো। ওদের মা এবাড়ি ওবাড়ির পাঁচিলে পাঁচিলে, পাম্পঘরের নিচু ছাদে ঘোরে। বাড়ি বাড়ি অভিযান ও চালায়। বারকতক আমাদের বাড়িও এসেছিল‌। পাখি আছে তো, সাবধান থাকতে হয়। সপ্তা দুয়েক আগে সারা রাত ম‍্যাও ম‍্যাও কান্না। জানলা দিয়ে ঝুঁকে দেখি, ছানা হয়েছে, তাদের নিয়ে বসে আছে। কিন্তু হল টা কী? আজ তো ঝড় জল কিছু নেই। সকালে জানলাম তিনটে ছানার একটা ছানা মরে গিয়েছে। আহা রে, ঐজন‍্যই কাঁদছিল।

    লকডাউনের মধ্যে অনেকেই চলে গেলেন, চুনী গোস্বামী, ইরফান খান, ঋষি কাপুর, আমার নিজের মেসোমশায়। ফোন আর টিভির জানলা দিয়ে দেখলাম, বেরোতে পারলাম না। শুধু ঘরের জানলার সামনে তাকিয়ে রইলাম বাইরে। একচিলতে আকাশে জ্বলজ্বলে অনেক তারা। রাস্তায় গাড়ি নেই, তাই ধোঁয়া ধুলোর পরত গেছে মুছে। এত পরিষ্কার আকাশে কি প্রিয় মানুষদের খুঁজে পাওয়া যাবেনা?

    বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে, আমার শোবার ঘরের জানলা দিয়ে রোদ্দুর পড়ল ঘরে। এল কোথা থেকে? গ্রিলে নাক ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ে দেখি একচিলতে আকাশে হাজার ওয়াটের এল.ই.ডি বাতি হয়ে ঝলমল করছে পূর্ণিমার চাঁদ। হতবাক হয়ে যাই। জীবনে একবার শ্বশুর বাড়ির গ্রামে এক লক্ষ্মী পুজোর রাতে পথ হেঁটেছিলাম এমনই জোছনা মাখা রোদ্দুরে। সে রোদ্দুর শহরের ঘিঞ্জি গলিতে আমার বাড়িতে!!! বিশ্বাস হতে চায়না।

    আজকাল অবিশ্বাস্য অনেক কিছুই ঘটছে। চড়ুই-এর ডাকে ভোর থেকে কান ঝালাপালা। বেরোনোর তাড়া নেই, একটু বেলা করে যে ঘুমিয়ে থাকবো তার জো টি নেই। খেয়াল করে শুনি, দুরকম আওয়াজ আসছে। একটা সাধারণ, আর একটা আরও মিহি একটানা চুঁ চুঁ। একটার পর অন‍্যটা। ঠিক যেন সংলাপ। জানলায় পর্দার আড়ালে আড়ালে তদন্ত চালাই। ব‍্যাপার বুঝে তো আমি থ। মেয়ের আবদারে, কলেজের সামনে শচীনদার কাঠের দোকান থেকে বানিয়ে এনেছিলাম পাখির বাসা। ঘটা করে জানলায় বাঁধা হয়েছিল। এতদিন লাভ কিছু হয়নি। লকডাউনে সেটি বারান্দার মাথায় বাঁধা হল। কর্তা সময় কাটাতে টবে শসার চাষ করছিলেন। সবুজ নরম ডাল, আর বড় বড় পাতা আমাদের বারান্দার গ্রিল ছেয়ে ফেলেছে। কাঠের বাক্সেও এখন পাতার আড়াল। ভরসা পেয়ে এতদিনে চড়ুই দম্পতি সেখানে সংসার পেতেছে। সেই সংসারেই আজ নতুন অতিথি। কাঠের বাক্সটা এতদিন পড়ে আছে। সেখানে নতুন প্রাণ আসবে, আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। বারান্দা থেকে শসা পেড়ে, রায়তা করে, স‍্যালাড করে, লম্বা কেটে নুন মরিচ মাখিয়ে কচমচিয়ে খাবো, একথাই কি ভেবেছি কোনোদিন? চড়ুইছানাদের কলরব আর তদের বাবা মায়ের ব‍্যস্ততা, ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ আসা যাওয়া দেখে কলেজের হৈচৈ এর কথা মনে পড়ে। ক্লাসের সময়ে, কাজের সময়ে হট্টগোলে কত বিরক্ত হয়েছি, আজ সেই হট্টমেলায় মন টানে। ছেলেমেয়েদের সাথে অনলাইনে দেখা হয়। পুরোনো ল‍্যাপটপটা জাদুবলে আজ জানলা হয়ে উঠেছে।

    সপ্তা তিনেক গেল বড় হয়ে চড়ুই ছানাদের ওড়া শিখতে। ওরা যেদিন বাসা ফাঁকা করে উড়ে গেল, তার দুদিন পরেই এল, ভয়ানক উম্পুন ঝড়। ফ্ল‍্যাটের সব দরজা জানলা বন্ধ করেও করা যাচ্ছে না। ঝড়ের ধাক্কায় খুলে যাচ্ছে। হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখা যাচ্ছে না। জলের ঝাপটার তোড়ে বাড়ি ভেসে যাচ্ছে। চার পাশের বাড়ির, দোকানের, গ‍্যারেজের অ্যাসবেস্টস বা টিনের চালা ঘুড়ির মতো উড়ে যাচ্ছে। জানলার কাচ চুরচুর হয়ে ভেঙে পড়ছে। গাছ উল্টে পড়ছে। আমার ঊনপঞ্চাশ বছরের জীবনে নানা জায়গায় অনেক রকম ঝড়, বন‍্যা দেখেছি। এমন ভয়াবহ দেখিনি। কোনোক্রমে দীঘায় শ্বশুর বাড়ি থেকে সব তছনছ আর ধ্বংসের খবর এসেছে। কর্তার চোখে জল। ঝড়ের দাপটে আদরের শসা গাছটা আর বেঁচে নেই।

    আজ এখন টিভি, ফোন, ইন্টারনেট সব জানলা বন্ধ। তবু নিজেকে বলি সব তালারই চাবি থাকে, রাতের পরে দিন থাকে, তাই চাষা মরলেও আশা রাখে। সেই আশাতে ভর করে, মনের জানলা আমি হাট করে খুলে রেখেছি।

    কলমে ড.শারদা মণ্ডল
    ২১ শে মে, ২০২০
  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৭ আগস্ট ২০২১ | ১১৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন