• খেরোর খাতা

  • একজন নীললোহিত

    Espirit of Mahi লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ জুলাই ২০২১ | ২৯৯ বার পঠিত
  • সদ্য স্কুল পরীক্ষা দেওয়া এক ছেলে একবার তাঁর বান্ধবীর উদ্দেশ্যে হঠাৎ একদিন লিখে ফেলল একটি কবিতা। কবিতার নাম 'একটি চিঠি'। কিছু একটা ভেবে ডাক যোগে বিখ্যাত 'দেশ' পত্রিকার অফিসে পাঠিয়ে দিল সেই কবিতা। 


    ১৯৫১ সালের ৩১শে মার্চ দেশ পত্রিকার মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাটি। দেশ পত্রিকার অফিস থেকে সেই ছেলের নামে আসল ভারী একটা খাম। এত ভারী খামের উপরে নিজের নাম লিখা দেখে ঘাবড়ে গেল ছেলেটি। 


    সেই ছেলেটির নাম ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। 


    স্কুল পরীক্ষা দেওয়া এক কিশোরের পক্ষে এমন কবিতা লেখা সম্ভব তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো অনেকের৷ এমনকি যে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে লিখা হয়েছিল কবিতাটি সেও বিশ্বাস করতে চাইল না কবিতাটি সুনীলের লেখা৷ 


    দুরন্ত সুনীল ছেলেবেলায় বেশিরভাগ সময় কাটাতেন বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরে বেড়িয়ে। ছেলেকে ঘরে আটকে রাখার জন্য তার বাবা তাকে কবি টেনিসনের একটি কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বলেছিলেন প্রতিদিন দুইটি কবিতা অনুবাদ করতে৷ কবিতা অনুবাদ করতে করতে একঘেয়েমি চলে এলে সুনীল নিজেই রচনা করেন  'একটি চিঠি' নামের কবিতাটি। এই কবিতার মাধ্যমেই সুনীল সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন৷


    শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রায়ই বলতেন, তাও রক্ষে, সুনীল মোটে একবেলা লেখে, দুবেলা লিখলে সে যে কি দাঁড়াত! 


    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মৃদু হেসে উত্তর দিতেন, তা হলে মদটা খাওয়া হত কখন? 


    ৭৯ বছরের জীবনে মাত্র একবেলা লিখে সুনীল যা রেখে গেছেন তা রবীন্দ্রনাথ সম্ভারের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়৷ 


    ১৯৭২ সালে ইংরেজি এক সাক্ষাৎকারে সুনীল বলেছিলেন, বড্ড বেশি লেখা হয়ে যাচ্ছে। মানিক বাবুর পুতুল নাচের ইতিকথার মত একটা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারলে সব লেখা বন্ধ করে দেব৷ 


    'পুতুল নাচের ইতিকথা' হয়তো লেখা হয়নি সুনীলের। তবুও আমরা তার কলম থেকে পেয়েছি 'সেই সময়', 'প্র‍থম আলো' ও 'পূর্ব পশ্চিম'এর মত সুবৃহৎ ও সুলিখিত উপন্যাস।


    সময়ের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকতে কোনওদিনই ঘড়ি পরতেন না সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। একবার এক আড্ডার আসরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিয়ের সময় পাওয়া সায়মা ঘড়িটি খোয়া যায়৷ পরে পুলিশে রিপোর্ট করতে গিয়ে ঘড়ির নাম বলেছেন কখনও পার্কার, কখনও শেফার্স, কখনও পাইলট!


    বন্ধুদের সাথে নিছক মজার ছলে কলকাতার সাহেবপাড়ার চৌরঙ্গীর মোড়ে একবার ভিক্ষে করতেও নেমেছিলেন সুনীল৷ তখন তরুণ বয়স৷ আড্ডা দিতেন আর ঘুরে বেড়াতেন প্রতিদিন৷ সেসব করতে অর্থের প্রয়োজন৷ সুনীলের এক বন্ধু বলে উঠল ভিক্ষে করলে কেমন হয়? যেই কথা সেই কাজ৷ দাঁড়িয়ে পড়ল তারা রাস্তা মোড়ে। প্রথমে কেউ ভিক্ষে দিতে চায়নি, যার কাছেই যার সে হুড়হুড় করে তাড়িয়ে দেয়৷ তারপর তারা চালাকি করে ইংরেজি বলা শুধু করল৷ সবাই তাজ্জব বনে গেল, এ দেখি ইংরেজি বলা ভিক্ষুক!


    সুনীলের লেখালিখির ভক্ত ছিলেন জীবনসঙ্গীনী স্বাতী৷ যোগাযোগ ছিল চিঠির মাধ্যেম, সেখান থেকে প্রণয়৷ স্বাতীর পরিবারের দিক থেকে বাঁধা থাকলেও সুনীলকে উপেক্ষা করতে পারেনি স্বাতী৷ 


    স্বাতীর সঙ্গে যখন বিয়ের আলোচনা চলছিল তখন মার্গারিটের কথার স্বাতীকে জানিয়েছিল সুনীল৷ বলেছিল তাঁর আর মার্গারিটের গভীর বন্ধুত্বের কথা। সবশুনে স্বাতী বলেছিলেন, শোন বিয়ে আগে যা করেছ করে ফেলছ। সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। বিয়ের পর যেন আর কিছু শুনতে না হয় আমাকে।


    সুনীলের প্রিয় লেখক ছিলেন ফিওদর দস্তয়েভস্কি৷ তাঁর লেখার গভীর ব্যাপ্তিতে বার বার মুগ্ধ হয়েছেন সুনীল। দস্তয়েভস্কি'র লেখা উপন্যাস 'নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড' কে তুলনা করেছেন বেদের সঙ্গে৷ বন্ধুদের ধরে ধরে জিজ্ঞেস করতেন উপন্যাসটি পড়েছিস? পড়িসনি? পড়ে নে। সাহিত্যিক হতে হলে অবশ্যই ওটা লাগবে৷


    কৈশোরে যে কবি টেনিসনের কারণে সুনীলের কবিসত্ত্বার প্রকাশ ঘটে সেই টেনিসনের নামে লিখেছেন একটি গ্রন্থ৷ বইয়ের নাম 'কবি টেনিসন-কে গালাগালি'।


    বিতর্ক আর সমালোচনা কখনো পিছু ছাড়েনি সুনীলের। 'সেই সময়' উপন্যাসে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে সমকামী হিসেবে দেখানোর কারণে আদালত পর্যন্ত দৌঁড়াতে হয় তাকে৷ 'প্রথম আলো' উপন্যাসে একটি প্রত্যক্ষ উক্তিকে কেন্দ্র করে পড়েছিলেন ধর্মান্ধদের রোষানলে। রামায়ণের ভিন্নধর্মী এক ব্যাখা নিয়ে শুরু করেছিলেন উপন্যাস রচনা, শেষ করে যেতে পারেননি৷ নয়তো এই উপন্যাসও বিতর্কের জন্ম দিত তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। 


    সুনীলের জন্মস্থান ছিল বাংলাদেশের মাদারীপুরে। সুনীলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর নিজ গ্রাম কালকিনিতে 'সুনীল মেলা'র আয়োজন করা হয়৷ জীবিত অবস্থায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কয়েকবার এ মেলায় এসেছিলেন। 


    বাংলা সাহিত্যের বিরাট অংশজুড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম মিশে আছে৷ কবিতার মাধ্যমে তার সাহিত্য জগতে আগমন ঘটলেও ঐতিহাসিক ঘরানার লেখক হিসেবে সারাবিশ্বের কাছে তিনি সমাদৃত৷ তবে নিজেকে একজন কবি কিংবা ঔপন্যাসিক নয়, বরং কবিতা লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন তিনি ৷ সুনীলের 'সময় ট্রিলজি' নামে খ্যাত তিন উপন্যাস ( সেই সময়, প্রথম আলো, পূর্ব পশ্চিম) সকলস্তরের পাঠকের কাছে এক বিস্ময়!


    আরও পড়ুন
    ঘুড়ি - Nirmalya Bachhar

  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৪ জুলাই ২০২১ | ২৯৯ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Tirthankar Bhattacharya | ০৫ জুলাই ২০২১ ২১:৪৩495630
  • খুব ভাল লাগার মত

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন