• খেরোর খাতা

  • কেরামতি

    Espirit of Mahi লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ জুলাই ২০২১ | ২৫২ বার পঠিত
  • অদ্রিজা রাগ করে নাক ফুঁলিয়ে রেখেছে৷ 


    সন্ধ্যা সাতটার ট্রেন৷ সে বাপের বাড়ি যাবে৷ সাথে আমাকেও যেতে হবে৷ অফিসে কাজের ছুঁতো দেখিয়ে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শ্বাশুড়ি আম্মা এমনভাবে চেপে ধরল যে না গিয়ে আর উপায় নেই৷ গাঁটছড়া বাঁধা সব হয়ে গেছে৷ একটা লাগেজ আর দুটো বস্তা। বস্তার মধ্যে রাজ্যের আজগুবি জিনিসপত্রে ভরা৷ যেমনঃ কোঁড়া নারকোল, দুটো ২ লিটারের বোতল ভর্তি খাঁটি ছাগীর দুধ, তিনটে কাঁচা কাঁঠাল, দুটো পেঁপে, এইসব আর কি।  


    বিয়ের সময় লোকে যৌতুক নেয়, আমি তো তাও নিইনি৷ শুধু বউটা নিয়ে এসেছিলাম। বউয়ের বদলে সারাজীবন ধরে এতকিছু দিতে হবে বলে একটু রসিকতা করেছিলাম শুধু। তাতেই নাকটা যেন দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে৷ 


    অদ্রিজা মোটে এক বাপের এক মেয়ে৷ কিন্তু ওর জ্যাঠাতো, মাসিতো কিংবা পিসতোতো  ভাইবোনের সংখ্যা যে কত তা আমি বিয়ের ৩ বছর পরে এসেও হিসেবে করে শেষ করতে পারিনি৷ এসব শ্যালক-শ্যালিকাদের জ্বালায় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে টেকাই দায় হয়ে দাঁড়ায়। ও এসে ডাকে, সে এসে হাঁক দেয়, বউয়ের মুখ রাখতে আমাকেও যেতে হয়। আর গেলেই খরচা। 


    প্রতিবারই শ্বশুরবাড়ি থেকে শূন্য পকেটে ফিরতে হয়৷


    ৬টার দিকে বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। আপাতত স্টেশনে একটা বেঞ্চিতে বসে ট্রেনের প্রতীক্ষা করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই। টিকিট আগেই কেটেছিলাম। অদ্রিজা জিনিসপত্রের ব্যাপারে মারাত্মক সংশয়বাদী। বার বার দেখে নিচ্ছে সব ঠিকঠাক আছে কি না। 


    একটু চোখ বুঁজে গিয়েছিল। অদ্রিজা চিৎকার করে উঠল, ওগো শিগরির ওঠো। সর্বনাশ হয়ে গেছে। 


    ধড়মড়িয়ে উঠে বললাম, তোমার আবার এরমধ্যে কে সর্বনাশ করল? সর্বনাশ তো যা হবার আমার হয়েছে৷ 


    অদ্রিজা বলল, হ্যাঁ৷ কতই না তোমার সর্বনাশ করেছি৷ সংসারের জন্য চিনির বদলের মত খেঁটে গেলাম তবুও মিনসের মন পেলাম না৷ 


    বললাম, এত ভণিতা না করে কি হয়েছে তা খুলে বলো দেখি৷ 


    অদ্রিজা বলল, আম আনতে ভুলে গেছি। ছোট কাকার মেয়ে বিন্তি আম খেতে বড্ড ভালোবাসে৷ স্টেশনের বাইরেই দেখলাম আম নিয়ে বসে আছে। যাও না একটু, কেজি পাঁচেক আম নিয়ে এসো। 


    অগত্যা আমাকে স্টেশনের বাইরে আম কিনতে যেতে হলো। স্টেশনের বাইরে সারি সারি আমের দোকান। আমের মৌসুম চলছে, তারপর আমাদের রাজশাহীর পাশের জেলা নাটোর। বৃষ্টির অভাব থাকলেও আমাদের আমের অভাব হয় না কখনো। 


    এক দোকানির কাছে গিয়ে দরদাম জিজ্ঞেস করলাম৷ আম্রপালি ১১০ টাকা কেজি, কালুয়া ৭০ টাকা, ল্যাঙরা ৯০ টাকা আর মোগনভোগ-গোপালভোগ ১৮০ টাকা করে কেজি। মানুষের মধ্যে জাত-পাত, বর্ণপ্রথা আছে কিন্তু আমের মধ্যেও যে এত জেতের ফাতা আছে তা বড়ই বিস্ময়কর। 


    দোকানিরা দাম কমাতে রাজি নয়। আমার মত ক্রেতার তাদের অভাব নেই। এখানে না বিক্রি হলেই আজ রাতেই স্পেশাল ম্যাংগো ট্রেনে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেবে৷ 


    এ দোকান-সে দোকান ঘুরছি। আম পছন্দ হচ্ছে কিন্তু দামে কুলোচ্ছে না। এক দোকানি হাঁক দিল, 


    আরে অতিসদা না? কত্তদিন পর দেখা। এদিকে আসুন। 


    কাছে গিয়ে মুখ খানা দেখেই চিনে ফেললাম। আমাদের রাজশাহী কলেজের দুই ব্যাচ জুনিয়র ছেলে আলতাফ। ছাত্রবস্থায় একসাথে ছাত্র ইউনিয়ন করেছি। লেখাপড়ার সাথে সাথে রাজনীতির পাটও চুকিয়ে ফেলেছি বহু আগে৷ এদের সাথে আর তেমন দেখা নেই। 


    আলতাফের সাথে খানিকক্ষণ কুশলাদি সেরে নিলাম৷ জানলাম তাদের পারিবারিক আমের ব্যবসা৷ খুচরো বিক্রির পাশাপাশি বড় বড় শহরেও চালান দেয়৷ সুযোগ বুঝে ওর কাছেই কথাটা পারলাম৷ 


    বললাম, বুঝলি তো আলতাফ। ছাত্রবস্থায় থাকতে এসব জাত-পাত মানতাম না। বর্ণবাদ প্রথার ঘোর বিরোধী ছিলাম, কত আন্দোলন করেছি এসব নিয়ে। কিন্তু দ্যাখ মানুষ কোনওভাবেই বর্ণবাদের বাইরে যেতে পারেনি৷ 


    সামান্য আম, তাও তাদের মধ্যে বর্ণ বিভেদ! 


    কালুয়া বা ল্যাঙরা বলেই কি শুধু ওদের দাম গোপালভোগ-মোহনভোগদের চেয়ে কম হবে? 


    আলতাফ এতক্ষণ নিঃশব্দে শুনছিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার চোখ অশ্রুসজল। আমার হাত চেপে বলল, দাদা তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। আমি এতদিন কি অন্যায়টাই না করে এসেছি। ছিঃ ছিঃ। তুমি দাঁড়াও, আমি এক্ষুণি আসছি। 


    আলতাফ দুই কর্মচারীকে সাথে নিয়ে ফিরল। তাদের হুকুম করল সব আমের বস্তা থেকে এক কেজি করে আম নিয়ে একসাথে ভালো করে মিশাতে। তারপর এক থলের মধ্যে রেখে আমার হাতে দিয়ে বলল, দাদা এই উপহারটুকু তুমি গ্রহণ করো৷ তুমি আমার ভেতরে সত্যকে জাগিয়ে তুলেছ। এই সামান্য কটা আম আমি তোমাকে উৎসর্গ করলাম৷ 


    আলতাফের হাত থেকে আমের থলেটা নিয়ে তাকে প্রাণভরে আর্শীবাদ করলাম। আলতাফ ট্রেন পর্যন্ত এসে বিদায় দিয়ে গেল।



    আলতাফ যা আম দিয়েছিল তা ওজন করলে অন্তত কেজি দশেক তো হবেই। এদিকে পাঁচ কেজির জায়গায় দশ কেজি আম নিয়ে আসায় গিন্নি তো বেজায় খুশি, ওদিকে পয়সা খরচ না হওয়ায় আমারও খুশি আর ধরে না৷ একেই বলে 'ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি ফলে।'

  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৩ জুলাই ২০২১ | ২৫২ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন