• খেরোর খাতা

  •  রমানাথ রায় সম্পর্কে দু-একটি কথা যা আমি জানি (পঞ্চম ও শেষ পর্ব) 

    ভাষা ভাষা লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ জুন ২০২১ | ২২৫ বার পঠিত


  • আমার স্ত্রীর নাম সত্যবতী। আমার নাম শান্তনু। থুড়ি পরাশর।

    কোনও পূর্বাভাস ছাড়া হঠাৎ-ই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। গাইডের ভাষায় অবশ্য বৃষ্টি পড়ে এখানে বারো মাস, তেমনটাই নাকি সাধারণ পূর্বাভাস। সুতরাং ‘পূর্বাভাস ছাড়া’ কথাটা সাধারণ অর্থে ঠিক নয়। ভেজা ভেজা রাস্তাঘাট, গাছের পাতা থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়া জলের ফোঁটা — চারপাশটাকে কেমন যেন সদ্যস্নাত এক নারী বলে মনে হতে থাকে। অবশ্য এক নারীর চোখে সদ্যস্নাত এক পুরুষই বা নয় কেন?

    আমরা গত রাতে এই ইনিসফ্রি দ্বীপে এসে পৌঁছেছি। ইওরোপে ঢোকার আগে গত এক সপ্তাহ আমাদের প্রথম আফ্রিকা সফরে ইথিওপিয়ার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্রেফ টো টো করে ঘুরে বেরিয়েছি। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ ইথিওপিয়া বেড়াতে যাচ্ছি শুনে অনেকেই বলেছিল প্যাকেজ ট্যুরে যাও, নাহলে পোষাতে পারবে না। তখন রাজি হলাম না ঠিকই, এসে দেখলাম প্রতিটা জিনিস, প্রত্যেক পরিষেবার দামই আকাশছোঁয়া। কিন্তু কিছু করার নেই। কোনও সংস্থার প্যাকেজ ট্যুরেই ইনিসফ্রি দ্বীপটা নেই। অবশ্য থাকার কথাও নয়! কোথায় ইনিসফ্রি দ্বীপ আর কোথায় ইথিওপিয়া! বেশির ভাগ ট্র্যাভেল এজেন্সিই আজকাল পাশাপাশি বড়লোক দেশগুলো — ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, জিবৌতি, এরিট্রয়া একসাথে প্যাকেজে ঘুরিয়ে দেয়। এর নড়চড় করতে গেলেই প্যাকেজ মূল্যও যায় বেড়ে, আবার অন্য অনেক ভোগান্তিও থাকে। তাই আমরা যখন ঠিক করলাম শুধু ইথিওপিয়াই যাব তখন প্যাকেজ ট্যুরের ঝামেলায় আর ঢুকিনি। পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে আর কোনও ল্যান্ডলক্ড কান্ট্রি এত সম্পদশালী হয়নি। আমাদের ইথিওপিয়া ঘুরতে আসার কারণ স্রেফ এইটাই! রহস্যটা কী?

    ফেরার পথে এসেছি লেক আইল অফ ইনিসফ্রি। না, না, এর সাথে ডবলিউ.বি.ইয়েটস বা ‘আই উইল অ্যারাইজ অ্যান্ড গো নাউ, অ্যান্ড গো টু ইনিসফ্রি...’-র কোনও সম্পর্ক নেই। সম্প্রতি ছেলে আর মেয়ে বেশ কয়েকটা গল্প পড়েছে, তাতে নাকি বেশ কয়েকবারই ‘বিয়ে’ বলে একটা ব্যাপারের উল্লেখ আছে। সে বিয়ে নিয়ে লেখা আমরাও পড়েছি। সে বেশ অনেকটাই বড় হওয়ার পর, তুলনামূলকভাবে বড়দের লেখায়। এখন খুবই জনপ্রিয় কী এক লেখক নাকি এসেছে, উদ্দালক না কী নাম, সব বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মাথা খাচ্ছে। তো তাতে বহু যুগ আগে বাংলার খুলনায় খুব ধুমধাম করে হওয়া এক বিয়ের নাকি বিস্তারিত বিবরণ আছে। তাতে নাকি এ-ও লেখা আছে যে ইনিসফ্রি দ্বীপে আস্ত একটা মিউজিয়ামও আছে — ম্যারেজ মিউজিয়াম। সেই থেকে দু’জনই মাথা খেয়ে ফেলছে যে সেই মিউজিয়াম দেখতে যাবে। তো সেই কারণেই প্যাকেজ ট্যুর বাতিল করে ইথিওপিয়া থেকে সোজা এই ইনিসফ্রি।

    আয়ারল্যান্ড এমনিতেই প্রচন্ড ঠাণ্ডা, তার ওপর এই বৃষ্টিটা হওয়ার পর থেকে একেবারে হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কোনোমতে টিকিট কেটেই ঢুকে পড়ি আরামদায়ক চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে। মাত্র কয়েকশো বছর আগে বিয়ে বলে যে এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার ছিল আর আজ তার কোনও অস্তিত্বই নেই, ভাবলে কেমন অবাকই লাগে। এখন এই মিউজিয়ামটা ঘুরে দেখতে দেখতে কত কিছুই না জানতে পারি! শেষ বিয়ে হয়েছিল বত্রিশশো সতেরো (৩২১৭) সালে। চৌঠা মার্চ। আর সেই শেষ বিয়েটা হয়েছিল আমাদের বাংলাতেই। শান্তিনিকেতনে। আর আজ আঠাশে ফেব্রুয়ারি সাঁইত্রিশশো ঊনআশি (৩৭৭৯)। তার মানে প্রায় পাঁচশো বাষট্টি বছর আগে। এর মধ্যেই একরকম হারিয়েই গেছে ব্যাপারটা! অবশ্য পাঁচশো বছর কম কিছু সময়ও নয়! আরে! মিউজিয়ামটার বয়সই তো চারশো এগারো বছর হয়ে গেল! ইদানিং কোনও লেখাপত্রে সচরাচর বিয়ে সংক্রান্ত তেমন কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না। অবশ্য অনেক পুরনো দিনের লেখায় নাকি এই বিষয়ে বিশদে বলা আছে। তবে অত প্রাচীন ভাষা, সেকেলে ভঙ্গি বোঝা, পড়ে ফেলাটা খুবই ঝামেলার। আর সময়সাপেক্ষ। একমাত্র বিশেষজ্ঞরাই পারেন পড়ে ফেলতে। আমাদের মতো সাধারণ লোকের পক্ষে তা একরকম অসম্ভবই। সর্বশেষ বিয়েটা ভারতবর্ষে হয়েছিল বলে কিনা কে জানে, যদিও মিউজিয়ামটা ইওরোপে, তবে নামটা ভারত-ঘেঁষা — পরিণয়-পরিণতি। আর দেশ থেকে এত দূরে সাহেবদের মুখে বিচিত্র ফড়িনয়-ফড়িনতি শুনতে মন্দ লাগে না!

    কত ধরনের যে বিয়ে হত, পড়তে পড়তে অবাক হয়ে যেতে হয়! পড়ে যতটা বোঝা যাচ্ছে, বিয়ে ব্যাপারটার আমদানি তখনকার দিনে করতেই হয়েছিল নিজের সন্তানের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। বিশেষত পুরুষদের দিক থেকে। তারপর একসময় দেখা গেল বিয়ে ব্যাপারটা ক্রমশ একটা ফার্স হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটা অদ্ভুত তথ্য দেওয়া আছে — আঠাশশো বিরাশি (২৮৮২) সালে সারা পৃথিবীতে সাতাশ লক্ষ ষোলো হাজার তেপ্পান্ন খানা বিয়ে হয়েছিল আর মাত্র এগারো বছরের মধ্যে সব ক’টি বিয়েই বিচ্ছেদে শেষ হয়ে যায়। অনেকদিন ধরেই নাকি লেখালেখি হচ্ছিল, বিয়ে বলে ইনস্টিটিউশনটার আর কোনও মানেই হয় না! এর সমস্ত পবিত্রতাই নষ্ট হয়ে গেছে। এর আর কোনও প্রয়োজনই নেই। আবার বিরুদ্ধ মতও ছিল — একেবারে তুলে দেওয়ারই বা কী আছে, যার ইচ্ছে হয় করবে, যাদের মনে হবে দরকার নেই, তারা করবে না! এই নানারকম তর্কবিতর্কর মধ্য দিয়ে যেতে যেতে বিয়ে ব্যাপারটা একেবারে উঠে যায় আরও প্রায় সাড়ে তিনশো বছর পরে মানে ওই বত্রিশশো সতেরো সালে। চৌঠা মার্চ। না উঠে আর উপায়ই বা কী? সেই বছর ওই একটা মাত্রই বিয়ে। তার আগের বছর আটটা, তার আগের বছর ছেচল্লিশটা, তার আগের বছর একটাও নয়! হ্যাঁ হিসেবটা গোটা পৃথিবীরই। সেই বছরই মানে যে বছর প্রথম বিবাহশূন্য গেল, সেই চোদ্দ সালেই মনে করা হয়েছিল, তার আগের বছর, তেরো সালে একই দিনে হওয়া চারটে বিয়েই বোধহয় শেষ! তা হয়নি ঠিকই, তবে মাত্র চার বছরের মধ্যেই যে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে, তাও ঠিক।

    ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে বেশ অনেকটাই সময় লেগে যায়। প্রায় সব আমাদের এখনকারই মতো, শুধু তখন একটা আইনি শীলমোহর থাকত, এখন আর যেটা নেই। মোনোগ্যামি, সিরিয়াল মোনোগ্যামি — মানে একটা ডিভোর্সের পর আর একটা। তারপর পলিগ্যামি — মানে দু’রকমই, পলিজিনি-পলিঅ্যান্ড্রি এরকম আরও কত গুচ্ছের! তার ওপর থার্ড সেক্স ম্যারেজ ধরলে যত ধরনের কম্বিনেশন সম্ভব, তখনও ছিল এখনও আছে; শুধু ম্যারেজটা খসে গেছে, জোড়টা রয়ে গেছে। পড়তে পড়তে মনে হয়, তখন সমাজটা আজকের মতো এতটা খোলামেলা ছিল না। আর তাই এতটা সহজ সরলও ছিল না! বিশেষত বাচ্চাদের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে বিয়ে ছাড়া আর কোনও রাস্তারই খোঁজ পায়নি ওরা। অথচ বিয়ের আগে বাচ্চা তো তখনও হত! কেউ দায়িত্ব নিত, আবার কেউ নিত না। এখন যেহেতু বিয়ে ব্যাপারটাই নেই, সেভাবে দেখলে সব বাচ্চাই তো বিয়ের আগে, বিয়ে ব্যাতিরেকেই আর তাই ব্যাপারটা সেই একই — কেউ দায়িত্ব নেয়, আবার কেউ নেয় না। তবে সেই জন্য বিয়ের ঘেরাটোপে ঢোকার কোনও প্রশ্নই নেই, কারণ বেশির ভাগ জানেই না তার কোনও অস্তিত্ব! অথচ ওই আইনি ব্যাপারটা বাদ দিলে জিনিসটা তো সেই একই। আগে যা ছিল, এখনও তাই! আমাদের ছেলে-মেয়ে তো আমাকে আর আমার সঙ্গীকে সেই বাবা-মা-ই ডাকে! জটিলতা এখনও কিছু কম নেই, তবে ‘বিয়ে’ বলে একটা চাবুক যে একসময় সমাজ-শাসনে কাজে আসত, তাতে আর কাজ হচ্ছে না দেখে সেই চাবুকটাই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। অবশ্য গে-লেসবিয়ান বিয়েতে বাচ্চার কোনও গল্প নেই, বরং একটা স্বীকৃতি হিসেবে তা নিজেরাই আদায় করে নিয়েছিল।

    ইংরিজি গুনগুন, ফিসফিসে ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান-স্প্যানিশ গুঞ্জনের মাঝে হঠাৎ-ই সচকিত হয়ে উঠি — বাংলা চিৎকারে! ছেলে আর মেয়ে। কখন যে এ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে অন্য ঘরে চলে গেছে খেয়ালই করিনি! এখানে আসার উৎসাহ ওদেরই ছিল বেশি, এখন স্বাভাবিক কারণেই খানিক্ষণ ঘোরার পর ওরা বোর হয়ে গেছে। সাধে কি এখানে আসার আগে সত্যবতী বলেছিল — ছেলে-মেয়ের দোহাই দিয়ে যাচ্ছি বটে, তবে আসল আগ্রহ কিন্তু আমাদেরই, নাহলে ছেলে-মেয়ে চাইছে বলে সার্কাস হয়, মেলা হয়, রেস্তোরাঁ হতে পারে, তা বলে এক কথায় এতটা দূর, লেক আইল অফ ইনিসফ্রিতে ‘পরিণয়-পরিণতি’ হয় না। গলার আওয়াজেই মালুম হচ্ছে দু’জনেই দৌড়তে দৌড়তে আসছে আর বেশ উত্তেজিতও। আমাদের দেখতে পেয়েই, দু’জনে একসাথে — মা! বাবা! বাংলা!!

    এতটা বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সত্যিই কোনও ধারণা ছিল না। অনেক কিছুই পড়ে গেছিলাম, সেটা ঠিকই, তবে তাতে বাংলা হরফে বাংলা লেখা নিয়ে কিছু ছিল বলে তো মনে পড়ছে না। ঘরটার নাম — মানস-মানসী। গোটা গোটা বাংলা অক্ষরে লেখা। কিছু কিছু আধুনিক বাংলা লেখা থাকলেও, বেশির ভাগই সেই আদ্যিকালের। ভালো বোঝা যায় না। আমার এক দাদা-স্থানীয় বন্ধু দ্বৈপায়নদা, বাংলা ভাষার এক পণ্ডিত মানুষ, তার কাছ থেকে পুরো লেখাটার মানে বুঝে নেব, এই আশায় সদ্য কেনা রুপিত্রতে একের পর এক লেখাগুলোর ছবি তুলে যাই। দ্বৈপায়নদাকে সেই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা শোনাই। দ্বৈপায়নদা অবাক হয়ে শোনেন।

    শোনার পর বলেন, তোর এই অভিজ্ঞতার কথা কিন্তু এদেশের, বিশেষ করে বাংলার মানুষকে জানানো দরকার।

    আমি বলি, কিন্তু আমি তো সব ভালো করে বুঝতেই পারিনি। সেই কবেকার গল্প, কবেকার ভাষা! ও সব তোমাদের মতো লোকেদের জন্য। ও আমাদের কম্ম নয়!

    দ্বৈপায়নদা কিন্তু লুফে নিলেন চ্যালেঞ্জটা। মাসখানেক বাদে আমায় ডেকে যা দেখালেন, অতটা আমি আশাই করিনি। দু-দুটো আলাদা ভাষ্য তৈরি করেছেন।

    দ্বৈয়াপনদা কোথা থেকে জনৈক ‘ভাষা ভাষা’ ছদ্মনামে কোনও এক অখ্যাত লেখকের দু’হাজার চোদ্দ (২০১৪) সালে ‘একের মধ্যে চার’, এক লেখা ‘রমানাথ রায় সম্পর্কে দু-একটি কথা যা আমি জানি’-র সাথে ‘প্লাস ওয়ান’ জুড়ে এক সাংঘাতিক কাণ্ড করেছেন। তার ‘প্লাস ওয়ান’ মানে পঞ্চম অধ্যায়টা আমার মানে ‘ভাষা ভাষা’-র মানে শান্তনু থুড়ি পরাশরের বয়ানে আমি ইনিসফ্রি থেকে ফিরে দ্বৈপায়নদাকে যা যা বলেছিলাম, তারই হুবহু বিবরণ! দ্বৈপায়নদা দু’হাজার চোদ্দ সালের সেই প্রাচীন যুগের বাংলায় লেখা ওই চারটে লেখা আমায় শুধু বুঝিয়ে দিলেন তাই নয় তার একটা আধুনিক সংস্করণও লিখে ফেললেন।

    তবে এই লেখাটা শেষ পর্যন্ত সাঁইত্রিশশো ঊনআশি না দু’হাজার চোদ্দ কোন সালে লেখা তা নিয়ে একটা ধন্দ রয়েই গেল! সে ধাঁধার সাথেই জড়িয়ে পড়টাও — পড়ছিই বা কবে?

    সে যাই হোক, যে লেখাটি দেখে আমার কন্যা ও পুত্র হৈ চৈ শুরু করে দিয়েছিল সেই লেখাটি দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের দেওয়ালের চতুর্থ লেখা। যদিও গোটা লেখাটাই এখনও অবিকৃতরূপে খুব সহজেই পাওয়া যায়, তবু ওই জাদুঘরে যেভাবে লেখাটা সংরক্ষিত আছে, সেভাবেই এখানে দেওয়া হল। যদিও লেখাটা সংক্ষেপিত, তবুও বলার, এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য বানান-সহ মূল লেখকের। সম্পাদনার চিহ্ন সহই সংরক্ষিত। তবে মূল লেখাটা যিনিই পড়তে চাইবেন, তাঁকে জানানো হচ্ছে যে আমাদের দপ্তরে মানে দ্বৈপায়নদার প্রকাশনা সংস্থায় লেখাটি টিকাসহ পাওয়া যাচ্ছে। তো এবার লেখাটি পড়া যাক।

    ঘর সংসার

    আমার স্ত্রীর নাম অলকা। আমার নাম নরেন্দ্র। ...। আমি সকালে অফিস যাই, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। আমি অলকাকে ভালবাসি, অলকা আমাকে ভালবাসে। আমরা একঘরে একখাটে পাশাপাশি শুই। আমাদের মাথার ওপর একটা পাখা ঘোরে। আমরা মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়াই, সিনেমা দেখি, নেমন্তন্ন খেতে যাই। আমরা সবসময় গল্প করি। বসে বসে গল্প করি, শুয়ে শুয়ে গল্প করি। আমাদের কথা ফুরোয় না।
    ...
    এইভাবে আরো দু’বছর যাওয়ার পর আমাদের একটি পুত্র সন্তান হল। ...। আদর করে ছেলেকে বাবু বাবু করে ডাকতে লাগলাম। ...। বাবু আমাদের মাঝখানে শুয়ে থাকে। ঘুমোবার আগে আমি বাবুর দিকে ফিরে শুই, অলকা বাবুর দিকে ফিরে শোয়। বাবু একপা আমার গায় তুলে দেয়, আর একপা অলকার গায় তুলে দেয়। আমাদের মাথার ওপর পাখা ঘোরে। তার হাওয়া আমাদের তিনজনের গায়ে এসে লাগে। এইভাবেই আমাদের দিন কাটতে লাগল, মাস কাটতে লাগল, বছর কাটতে লাগল। বাবু আমাদের চোখের সামনে বাড়তে লাগল। একদিন এত বড় হয়ে গেল যে, বাবুকে নিয়ে আর শোয়া গেল না। অলকা আর বাবু অন্য ঘরে চলে গেল।
    ...
    বাবু একদিন কলেজ থেকে পাশ করে বেরোল। ...। দু’বছর পরে বাবু একটা ভাল মাইনের চাকরি পেল। ...। বাবুর ... বিয়ে ...। ক’মাস পরে বৌমার সঙ্গে অলকার কথা কাটাকাটি হতে লাগল। ভীষণ অশান্তি হতে লাগল। বাবু একদিন বৌকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আর ফিরল না। ...। অলকা আবার আমার খাটে ফিরে এল। আমরা আবার পাশাপাশি শুতে লাগলাম। আমাদের মাথার ওপর পাখা ঘুরতে লাগল।

    অলকার সঙ্গে বাবুর আজ রাস্তায় দেখা হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। বাবু ভাল আছে? হ্যাঁ, বাবু ভাল আছে। বৌমা ভাল আছে।
    ...
    একদিন অলকা হাসপাতাল থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল আমার নাতি হয়েছে। আমি হাসপাতালে গিনি দিয়ে নাতির মুখ দেখলাম।
    ...
    তিন বছর পরে আমাকে অফিস থেকে অবসর নিতে হল। চারদিক কেমন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকল। আমার আর কিছুই করার রইল না। সোনা বাবুর কাছে থাকে। বাবুকে বলে কয়ে সোনাকে আমার কাছে নিয়ে এলাম। সোনা আমার কাছে থাকতে লাগল। ...।

    আমি সোনাকে একটা স্কুলে ভরতি করে দিলাম। অলকা প্রতিদিন সোনাকে স্কুলে নিয়ে যেতে লাগল, নিয়ে আসতে লাগল। আমি প্রতিদিন বিকেলে সোনাকে নিয়ে পার্কে যেতাম। ... বাড়ি ফিরে সোনা পড়তে বসত। পড়া শেষ হলে আমরা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তাম। সোনা মাঝখানে শুত। আমি সোনার দিকে মুখ করে শুতাম। অলকাও সোনার দিকে মুখ করে শুত। সোনা বাঁ পা আমার গায়ে তুলে দিত। ডান পা অলকার গায়ে তুলে দিত। মাথার ওপর পাখা ঘুরত। আমাদের গায়ে হু হু করে হাওয়া লাগত। ...।

    একদিন সন্ধেবেলা বাবু এসে সোনাকে জোর করে নিয়ে চলে গেল। আমরা কত করে বললাম। বাবু আমাদের কারো কথা শুনল না। আমরা চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। তারপর পাশাপাশি শুয়ে পড়লাম। কেউ কোন কথা বলতে পারলাম না। আমাদের আর কোন কথা নেই। কথা শেষ। মাথার ওপরে শুধু পাখা ঘুরতে লাগল।

    — ঘর সংসার

    গল্পের নামের পরেই ছিল লেখকের নাম। রমানাথ রায়। আমিই শেষে লিখলাম। আর গল্পটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবার গল্পের নামটা অবশ্য ওখানে ছিল না। মূল গল্পেও না। আমিই নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না বরং সত্যি বলতে কি আপনিই বেরিয়ে এল!

    গল্পটার শেষে লেখক সম্পর্কে ওখানে যা লেখা আছে তা অনেকটাই বেশ কাঠ কাঠ। কেমন যেন প্রাণহীন। তবে মিউজিয়ামে এরকম ভাষাতেই সাধারণত পরিচয়লিপি লেখা হয়। মোট বোধহয় ন’টা কি দশটা ভাষায় লেখা পরিচয়পত্র। বাংলা বাদে হিন্দি, ইংরিজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ। আর আমহারিক ও ওরোমো ভাষায়। শেষ দু’টো জিজ্ঞেস করে জেনেছি। মনে হয় আমার অজানা আরও দু’টো কি তিনটে ভাষাতেও ছিল! তবে আর জানা হয়নি ওগুলো রমানাথ রায়কে নিয়েই কিনা! ইংরিজিতে লেখাটা আমার খুবই ভাল লেগেছে। সে যাই হোক, আমার পছন্দ না হলেও ওখানে বাংলায় যা লেখা ছিল, সেটা একবার পড়েই দেখা যাক।

    বিংশ-একবিংশ শতাব্দীর এক বাঙালী লেখক, রমানাথ রায় সারা জীবন ধরে অসংখ্য নর-নারীর জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছেন। অনেক সম্পর্ক অতল খাদে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন। বিরুদ্ধ স্রোতের সাথে লড়াই করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন দু’জন মানুষের চলার পথ। এই সংগ্রহশালা শুধুমাত্র এই কারণে শ্রী রমানাথ রায়কে স্মরণ করছে না যে তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানব-মানবীর প্রেমের পূর্ণতা দিয়েছেন, এই কারণেও মনে রাখছে তিনি সেখানেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি, তাদের বিবাহিত জীবনের সাফল্য, আনন্দ, শোক, একঘেয়েমি, অসহিষ্ণুতা, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদির প্রতিও নজর রেখেছেন। যথাসম্ভব বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর হাত।

    তাঁর দরদি কলমে কোনও অযথা প্রশ্রয় নেই, যেমন তাঁর শ্লেষে নেই কোনও বাড়তি তিক্ততা। তাঁর বর্ণনায় আছে এক অমোঘ নিস্পৃহতা, তবে তা মোটেই উন্নাসিক নয়! নির্বিকার আবার সহানুভূতিশীল! সময় সময় অবাস্তব, তবে কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়! সুসমঞ্জসই। খুঁটিনাটিতে ভরা অতিশোয়াক্তি, অতিরঞ্জনে মোড়া রোজনামচায় জন্ম নিয়েছে এমন এক শৈলী যা থেকে নিজেদের চিনে নিতে কোনও অসুবিধে হয় না। পৌনঃপুনিক বিবরণে তৈরি হয়েছে এমন এক ভাষা যাতে রয়ে গেছে এক নিজস্ব শীলমোহর।

    প্রেম যে সারা জীবন জল-সার-আলো দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, নাহলে বৈচিত্রহীন একঘেয়েমিতে তার মৃত্যু পরোয়ানাই লেখা থাকে, তাই যেন ঠারে ঠারে বলে গেছেন সারা জীবন। সেই হাত, যা তিনি প্রয়োজনমতো, সাধ্যমতো বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর মানসকন্যা-মানসপুত্রদের প্রতি, সেই হৃদয় যা দিয়ে লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাদের সাধারণ, অতিসাধারণ দিনলিপি, সেই মননের স্মরণেই এই ক্ষুদ্র শ্রদ্ধার্ঘ।

    লেখাটা পড়া শেষ হলে আরও একবার গল্পটার দিকে চোখ যায়। ঘর সংসার। শেষটা আরও একবার চোখ বুলিয়ে নিই। পড়া শেষ হতে আমি অলকার দিকে, অলকা নরেন্দ্রর দিকে, থুড়ি আমি সত্যবতীর দিকে, সত্যবতী আমার দিকে তাকায়। আমরাও কি দ্রুত সেই দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঘর-সংসার? যেখানে একমাত্র উল্লেখযোগ্য চলা — মাথার ওপর ঘুরতে থাকা ফ্যান!

    (আর নয়!!!)

    -------------------
  • বিভাগ : অন্যান্য | ২৮ জুন ২০২১ | ২২৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন