• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  ইদের কড়চা  ইদের কড়চা

  • ফেরদৌসের ঈদ

    সুপর্ণা দেব
    ইস্পেশাল | ইদের কড়চা | ১৩ মে ২০২১ | ৮২২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • “আজকাল তোমাকে গফুর চাচার সঙ্গে বেশি দেখি। সন্ধেবেলায় জামা মসজিদের সিঁড়িতে। ওখানেই কাজকম্ম করছ নাকি আজকাল?”
    পথচলতি লোকটা আচমকাই ফেরদৌসকে জিগ্যেস করে। লোকটা ওর মুখ চেনা। কিনারি বাজারে একটা দোকানে কাজ করে।
    “না, তা নয়। এইসময়টা ওর একটু সুবিধে হয় আমি থাকলে, তাই আর কী!” কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ফেরদৌস জবাব দেয়।
    লোকটাও ওর সঙ্গে হেঁটে হেঁটে চলেছে নিগমবোধ ঘাটের দিকে।
    “একে রমজান মাস, তার ওপর গরমটা দেখেছ! জ্বালিয়ে দিচ্ছে সবকিছু”।
    ফেরদৌসের এলোমেলো এক মাথা চুল যেন কাকের বাসা। সে মাথাটা একটু ঝাঁকাল।
    সত্যি গরমে ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছে ইফতারি নানের মত। যেন তন্দুরে সেঁকা হচ্ছে কাবাবের মত।
    নিগমবোধ ঘাট ছাড়িয়ে লোকটা এগিয়ে গেল। যাবার সময় বলে গেল , বেরাদর, দিনকাল নাকি ভাল নয়। কানাঘুষো শুনছি, সিপাইরা নাকি খেপে গেছে। ফেরদৌস হাসে আর বলে, আদার ব্যাপারি জাহাজের খোঁজ রেখে কী করব মিয়াঁ? দু বেলা দুটো রুটি পেলেই বর্তে যাই। ফেরদৌস ঘাটের কিনারে একটা পিপুল গাছের তলায় ঠেস দিয়ে বসে পড়লো।
    মাথার ওপরে সূর্যটা যেন আগুনের গোলা। আগুন বৃষ্টি হচ্ছে যেন। গলা শুকিয়ে কাঠ! একটা শব্দও বের করতে পারবে না সে মুখ দিয়ে। অথচ কথা ভাঙিয়েই তার দিন চলে। সে হল শাহজাহানাবাদের কিসসাগো। মহল্লার অনেকেই তাকে চেনে। জানে। কিনারি বাজারের কাছেই নয়ন খোদাইকরের বাড়ির কাছেই সে থাকে। কোনমতে মাথা গুঁজে, ওই রাতটুকুই। দিনের বেলা মহল্লায় ঘুরে বেড়ায়। টুকরো টাকরা কিসসা শোনাবার ফরমায়েশ জুটে যায়। এইভাবেই চলে আর কী!

    গফুর চাচা বহুদিন হল জামা মসজিদের সিঁড়িতে বসে কাবাব বিক্রি করে। রমজান মাসে কাবাব একটু তরিবৎ করে বানায়। ইফতারের পরেই সে যোগাড় করতে বসে যায়। মাংস কুচি করে কিমা বানায়, পুদিনা কুচি গোলমরিচ বাটা জয়িত্রী জায়ফলের গুঁড়ো মাখিয়ে তাকে মিহিন করে পিষে মাটির হাঁড়িতে ঘি মাখিয়ে রেখে দেয়। দিন আনি দিন খাই মুটে মজুর , দোকানদার, পথ চলতি গেরস্ত এমনকি চাওরি বাজারের তবায়েফরা পর্যন্ত গফুরের কাবাবের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।

    রমজান মাসে বিক্রিবাটায় সে গফুরকে হাতে হাতে সাহায্য করে। পাতায় মুড়ে মুড়ে কাবাব দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বলতে থাকে কিসসা। লোকজন হাঁ করে শুনতে থাকে। তারপর হুঁশ হয়, আরে ইফতারের সময় পেরিয়ে যাবে যে! জলদি কর ভাই, জলদি কর। ইফতারের জন্য হুহু করে বিক্রি হয়ে যায় কাবাব। এতে তার লাভ আছে বইকি! গফুর তাকে বড্ড ভালোবাসে, নিজের ছেলের মতনই। কিন্তু ইফতারের সময় এই বিক্রিতে তার গল্প শোনা খদ্দেরদের উপরি পাওনা। তাই দু চার সিকি তার হাতেও কেউ কেউ গুঁজে দিয়ে যায়। আর গফুর গুছিয়ে খাবার বেঁধে দেয় তাকে। আবার বলে দেয়, কাল আসিস কিন্তু, একটু শীরমল বানিয়ে আনব। আর হালুয়া।
    ফেরদৌসের মনে হয় ঘরে যারা বসে আছে সেখানেও স্বস্তি নেই গরম থেকে।ভিস্তিওয়ালারা চামড়ার মশক থেকে রাস্তায় জল ছড়াচ্ছে। কোঠা হাভেলিতে মেঝে ভিজিয়ে বিছানাতেও জল ছিটনো হচ্ছে। আর সেদিন? কাবাব বিক্রির সময় সে যখন গল্প শোনাচ্ছিল তার মধ্যেই তাকে খোঁচা মেরে কে একজন বলে উঠল
    “কাল আসবি তো! চাওড়ি বাজার। দিলনশী আপার কোঠি! ভুলিস না। ওখানে কাল তোর দাওয়াত।”
    মুখ তো আর দেখতে পায়নি ফেরদৌস। গফুরকে জানিয়েই সে গেল সে দিন সন্ধেবেলা দিলনশী আপার কোঠি।
    আরে জান, আয় আয়। ইফতার কর আর কিসসা শোনা আমাদের। আরে চক বাজারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী আর কিসসা শোনা যায় রে বাপ! নে খা।
    সামনে প্রচুর খাবার। পাতলা ফালি ফালি তরমুজ বরফ জল আর মালাই মিশিয়ে বানিয়েছে তোওফা শরবত। সঙ্গে খেজুর আর আখরোট।
    কোর্মা, হালিম, পোলাউ আর ফিরনি। সুন্দর সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি। পাথরের পাত্রে জল। দুটি গোলাপের পাপড়ি। বেশ লাগলো ফেরদৌসের। তাকে আর এমন আদর যত্ন করে কেই বা খেতে দেয়?
    ফেরদৌস দেখল সেই ঘরে বেশ কয়েকটা নানা বয়সের ছোকরি। রমজান মাসে তাদের নরমসরম পোশাক। পাথরের রেকাবিতে ভিজে জুঁই। কোনো ঘুঙুর বাজছে না। সারেঙ্গি চুপ করে আছে। আর কোয়েল বুলবুলেরা তাকে ঘিরে বসে কিসসা শুনছে। মাথার ওপরে টানা পাখা।ক্যাঁচ কোচ। ক্যাঁচ কোচ। শব্দ উঠছে। ঘর তো ঠান্ডা হচ্ছেই না! বরং গরমের হাওয়ার হিন্দোল রাগ ঘুরপাক খাচ্ছে।
    কী কিসসা শোনাব?
    মোহব্বতের। মোহব্বতের।
    খিলহিলিয়ে হাসি। এ ওর কোলে ঢোলে পড়ে। যেন ফুলের বনে বাতাস বইছে।
    এতো ভালোবেসে ইফতার খাইয়েছে যখন কিসসা তো শোনাতেই হয়।
    ফেরদৌস কিসসা বুনতে শুরু করে। কিসসারগোর অনেক সুবিধে। সবাই তার কাছে খুব স্বচ্ছন্দ। অতটা আবডাল থাকে না।
    সে বলে, রমজান মাসে শোনো বাগ ও বাহার। আমির খুসরো লিখেছিলেন। শোনাই তাহলে।
    কিসসা বলার সময় ফেরদৌস একেবারে অন্য জগতের মানুষ। ঘরের মধ্যে নরম আলোয় ভারী মায়াময় পরিবেশ। ঘন্টা খানেক পরে ফেরদৌস শেষ করে তার গল্প।
    আহা কী কিসসা শোনালে গো, এই গরমে প্রাণ জুড়িয়ে দিলে যে। কী শান্তি কী প্রেম কী সুন্দর গো তোমার গল্প! মনে হচ্ছে যেন এই জগতেই ছিলাম না কেউ !
    ফেরদৌস বলে আমার নামের মানে কী জানো? বেহেস্ত, বাগিচা। আমি কিসসা দিয়ে সেই বাগান বানাই যে! দোয়া কর দু দণ্ডের স্বর্গসুখ দিয়ে যেন তোমাদের মন জুড়াতে পারি।



    জেঠ মাসের গরমে রাতে ঘুম আসে না। নওঘরার জৈন মন্দিরের পাশে খোলা একচিলতে জায়গায় ফেরদৌস ঘুমোনোর চেষ্টা করে। রাত যত ভোরের মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে আকাশ মাটি তত ঠান্ডা হয়। এই সময়ে একটু চোখ লেগে আসে।
    লাহোরি দরওয়াজা থেকে নিগমবোধ ঘাট, যমুনা বয়ে যাচ্ছে শান্ত, শীতল। ভোর হয়ে আসছে। নক্করখানার বাজনা একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে। সব কিছু ছবির মতো স্থির। কিছুক্ষণ আগেই জামা মসজিদের নক্কড় বেজে উঠেছিল। সেহরি শুরু করার জন্য। ভোরের খাওয়া। আজানের ডাক। এরপরেই দিনভোর উপবাস। থিতু হয়ে বসেছে পৃথিবী, আকাশ, জল। শান্ত ভাবে বইছে হাওয়া।
    হঠাৎ অশান্ত খুড়ের শব্দে সচকিত শাহজাহানাবাদ। পুরবি বাগিরা ছুটে আসছে। শহরে ঢোকার সব দরওয়াজা বন্ধ করে দাও, কোতোয়ালি জেগে ওঠো, কিল্লাদার জেগে ওঠো, বন্দুক জেগে ওঠো, কামান জেগে ওঠো।
    না, কিছুতেই পুরবি বাগিদের ঠেকিয়ে রাখা গেলো না। হনুজ দিল্লি দূর অস্ত নয়। তারা শহরে ঢুকে পড়েছে।
    ফেরদৌস যখন বেহেশ্তের বাগিচায় ঘুমে অচেতন, বাদশা সলামতের ঝরোখার নিচে জমা হল একদল বিদ্রোহী সিপাহি।
    “বাদশা সলামত, সারা রাত আমরা মেরঠে গোরা ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করেছি। আর কাকভোরে বেরিয়ে এসেছি দিল্লির পথে। তিরিশ কোশ পথ উজিয়ে আপনার দরজায় এসেছি। বাদশা সলামত, আমাদের মাথায় হাত রাখুন, আমাদের ন্যায় বিচার দিন। খিলাফাত খুদা কা, মুল্ক বাদশা কা, হুকুম কোম্পানি কা। আজ এই কথাকে বদলে দিন, হুজুর। হুকুম আজ থেকে বাদশা কা।”
    বাদশা সলামত উঠে দাঁড়ালেন।
    “শোনো ভাই! কে আমাকে বাদশা ডাকছে হে! আমি একটা কাঙাল ভিখিরি মাত্র। কোনো রকমে একটা সুফিজীবন বয়ে নিয়ে চলেছি। বাদশারা তো সব কোন কালেই চলে গেছেন! যারা আমার পূর্ব পুরুষ দের সেবা করত তারা সবাই এখন কেউকেটা। এখন এখানে ব্রিটিশ রেসিডেন্টের হুকুমতে রয়েছি। আমার কোন টাকাকড়ি নেই, কোনো সেপাই সামন্ত নেই। আমি ভাই তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারবো না। তার চেয়ে তোমরা বরং রেসিডেন্ট সাহেবের সঙ্গে মিটমাট করে নাও। আমি মাঝখানে থাকবো। শান্তি ফিরিয়ে আনো। এইসব জেহাদ করা ভালো কথা নয়”।
    রেসিডেন্ট সাহেবের মধ্যস্থতায় কোন কাজই হলনা। হুজুগ বা গুজব উঠেছিল দিন কয়েক আগেই। গোরু শুয়োরের চর্বি মেশানো এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ দাঁতে কাটা নিয়ে ধর্ম জিহাদ শুরু হয়ে গেছে দেশের পুব প্রান্তে।

    কিনারি বাজারে বেচাকেনার ভিড়। সকাল থেকেই। ফলের বাজার তরমুজ আঙুর বেদানা খেজুর, শুকনো ফলের পাহাড়, শোহন হালুয়া, সেমুই, সব বিশাল বিশাল ঢিবি বানিয়ে বিক্রি হচ্ছে। চারদিকে হাঁক ডাক। সূর্য ঝাঁঝালো হবার আগে যা যা কেনার কিনে দোর দেবে গৃহস্থ। ফেরদৌস বাজারের দিকে হাঁটা দিল। একটু বেলা হলে গফুর চাচার কাছে যাবে। কিছু কিনে নিয়ে যাবে চাচার জন্য, মাটিয়া মহলের শাহি টুকরা। আগে থেকে বলে রাখতে হবে। নইলে সব শেষ হয়ে যাবে।
    হঠাৎ বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে হকচকিয়ে গেল ফেরদৌস। চোখে যেন ধাঁধাঁ লেগে গেল তার। মহল্লার বুক চিড়ে চোখে খুন, বুকে খুন, মাথায় খুন চাপা পাঁচ জন সওয়ার পাঁচ পাঁচটা খোলা তলোয়ার উঁচিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল ফেরদৌসের সুমুখ দিয়ে। হাওয়ায় উড়ছে তাদের লম্বা দাড়ি আর চুল।
    ফিসফিসিয়ে সবাই বলছে পুরবি বাগির দল, শহরে ঢুকেছে কাকভোরে।
    কেল্লার কাছাকাছি এসে ফেরদৌস দেখল, পাঞ্জাবি মুসলমানের কাপড়ের দোকান, দিস্তে দিস্তে নয়নসুখ কাপড়, এখান থেকেই কাপড় যায় কেল্লার মধ্যে, বেগম, শাহজাদা, শাহজাদিদের জন্য। সেই দোকান দাউদাউ করে জ্বলছে। গাছতলায় জমায়েত হয়েছে অজস্র পুরবি সেপাই। তার সঙ্গে জুটেছে শহরের লুঠমারের দল।
    একে গরম, তার ওপর রমজান, রোজার মাস। তার ওপর এই আচমকা বেপরোয়া তাণ্ডব। যারা রোজা রেখেছিল ভয়ানক অসুবিধের মধ্যে পড়ে গেল তারা।
    শাহজাহানাবাদ বা দিল্লির অবস্থা তখন চরম। লুটপাট আর লুটপাট। চলছে এক কুৎসিত মোচ্ছব। “মাল এ মুফত, দিল এ বেরাহাম “চুরির মাল দেদার ওড়াও।” লুটপাটের সঙ্গে চলছে খুন, এন্তার খুন।
    দিল্লির রেসিডেন্ট ও পাদ্রিকে বুলেটের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন করে দিল সিপাহিরা। হাসপাতাল ভেঙে চুরমার করে দিল।শহর ময় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো এই দু’জনের মৃত্যু সংবাদ। এই সম্পূর্ণ নৈরাজ্যের সুযোগ নিল যত চোর, জোচ্চোর গুন্ডা, ছিনতাইকারী, যত বদমাইশের দল লুট পাট, মার দাঙ্গা শুরু করে দিল। নিগম বোধ দরওয়াজা, লাহোরি দরওয়াজা, কলকাত্তা দরওয়াজা সর্বত্র পুরবি সওয়ার দের একটাই আওয়াজ, একটাই চিৎকার “কোথায়, কোথায়, কোথায় সব ফিরিঙ্গিরা?”




    সারা শহর ভয়ের চাদরে ঢেকে আছে। ফিরিঙ্গিদের কার্যত হটিয়ে দিয়ে এ এক অরাজকতার অত্যচার শুরু হয়েছে ।
    ফেরদৌসের পৃথিবীটা হঠাৎ ছোট হয়ে গেল। ভদ্র পরিবারের কেউ আর পথ ঘাটে বেরোয় না। বন্ধ হয়ে গেছে গফুরচাচার কাবাব বিক্রি। থেমে গেছে খুশিয়াল ইফতার। রমজানের পরবে লোকের দুর্দশার আর শেষ নেই।
    শহর কব্জা করল পুরবি সিপাহিরা। শুরু হল আন্ধের নগরি চৌপাট রাজা। বুদ্ধুদের রাজত্বে শয়তানরা রাজত্ব করে। কোনো শাসন শৃঙ্খলা নেই। ফিরে আসুক শান্তি, এটাই একমাত্র প্রার্থনা, সকলের। এরই মধ্যে দোকান, বাড়িঘর, ব্যাঙ্ক লুট করে সিপাহি এবং শহরের যত বিচ্ছুর হাতে প্রচুর পয়সা।
    ব্রিটিশ রেসিডেন্সিও হাত গুটিয়ে বসে নেই। সিপাহিদের এই জোট ভাঙার জন্য সেই ধর্ম নামের তাসটির চাল এবারে আবার লাগালো তারা। ফিরিঙ্গিদের রগরগে ইস্তেহারের পরেই দিল্লির উলেমারা বের করল রদ এ ইস্তেহার এ নাসারা অর্থাৎ খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ইস্তাহার।
    বৃদ্ধ বাদশা সলামতের গভীর দীর্ঘ নিঃশ্বাসে বাষ্পের মতো বেরিয়ে আসে গজল , “বাত করনি মুঝে মুশকিল কভি অ্যায়সি তো না থী /জ্যায়সি অব হ্যাঁয় তেরি মেহফিল কভি অ্যায়সি তো না থী /লে গয়া ছিন কে কৌন আজ তেরা সবর ফরার /বে করারি মুঝে অ্যায় দিল কভি অ্যায় সি তো না থী”।
    মুখের ভাষা কে যেন কেড়ে নিয়েছে, সবুর করার মত সময় কে ছিনিয়ে নিল? হে আমার হৃদয়, এমন উদ্বেগ কী আগে কখনো হয়েছে তোমার?



    কুলসুম জামানি বেগম, বাদশা বাহাদুর শাহ জাফরের মেয়ে। তিনি শুনেছিলেন বাদশা সলামত বিড়বিড় করে বলছেন, হা ঈশ্বর! হিন্দু মুসলমান আমার সন্তান। ওদের নিরাপদে রেখো। ফিরিঙ্গিদের হাতে আমার বেইজ্জতির মাশুল যেন ওদের দিতে না হয়।
    কেল্লার বড় দেউড়িতে নক্কর বেজে উঠছে। শাহি ফরমান! শাহি ফরমান!
    হিন্দু মুসলমান জোট বেঁধে আংরেজদের সঙ্গে লড়াই কর। শাহি ফরমান!
    মৌলবি আর পণ্ডিতদের মধ্যে বিভেদ আনার কাজ খোলাখুলি শুরু হয়ে গেছিল তখন।একে রমজান মাস। সামনেই ঈদ। প্রত্যক্ষদর্শী জাহির দেহলভি লিখেছিলেন ,হিন্দুদের ভড়কানি দিয়ে বলানো হল শহর থেকে সব কসাইগুলোকে বিদায় করতে হবে। ইংরেজ রাজ হুকুম দিল সব কসাইদের দোকান একেবারে শহরের বাইরে থাকবে। শহরের ভেতরে নয়।
    ফেরদৌস দেখল রাতারাতি শহরের ভোল বদলে গেছে। সব দোকানের ঝাঁপ ফেলা। গফুর মিয়াঁ বন্ধ করে দিয়েছে তার কাবাবের পশরা। জিগ্যেস করলেও কেউ কথা কইতে চায় না।
    কসাইরা বৌ বাচ্চা পোঁটলা পুটলি নিয়ে নদীর ধার ঘেঁসে চলেছে। দলে দলে।
    নদীর ধারে বাদশার ঝরোখা দেখা যায়।
    কোথায় যাব জাঁহাপনা, কোথায় যাব আমরা?
    বাদশা তখখুনি আদেশ দিলেন নদীর ধারে ওই হতভাগারা যেখানে বসে আছে আমার তাঁবু লাগাও সেখানে।
    লাগানো হল তাঁবু।
    রেসিডেন্ট সাহেব ছুটে এসে বলে একী করছেন হুজুর? গোটা শহর তো আপনার কাছে এসে যাবে। সামলাবো কেমন করে?
    বাদশা সলামত বললেন আমি কী করব? আমার প্রজারা বাড়িঘর ছেড়ে মাঠেঘাটে এসে দাঁড়িয়েছে, তাই আমিও এসেছি। নখ থেকে কি নখের মাংস আলাদা করা যায়? আজ কসাইদের ধরেছেন, কাল আবার অন্য কাউকে ধরবেন আপনারা। দেখতে দেখতে শহর উজাড় হয়ে যাবে।
    বেগতিক দেখে রেসিডেন্ট তার আদেশ তুলে নিলেন।
    অশান্ত বাদশা বাহাদুর ফরমান জারি করলেন ঈদের উৎসবে কোনো গোরু কাটা চলবে না। যে এই ফরমান মানবে না, সে পাবে কঠিন শাস্তি। ফিরিঙ্গিরা সঙ্গে সঙ্গে লোকজনকে ভড়কানোর চেষ্টা করতে কোনো কসুর করলো না। তারা লুকিয়ে লুকিয়ে গোপনে গোরু মারার ব্যবস্থা করল, যাতে একটা ভয়ানক দাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়া যায়! পয়সা ছড়ালে চোরাগোপ্তা কাজে বাধা কোথায়?
    দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছে ফিরিঙ্গিরা, এই বুঝি এলো দাঙ্গার খবর! তাহলে ঈদের দিনে শ্যাম্পেনের বোতল খুলেই তারা এই দাঙ্গা কোন্দল উপভোগ করবেন! বিকেল পর্যন্ত কোনো খবর এলো না। উপরন্তু তারা শুনল এক দঙ্গল হিন্দু মুসলমান, গোরা সিপাই আর অফিসারদের ওপর চড়াও হয়ে বেশ কয়েকজনকে মেরেও ফেলেছে। কীথ ইয়ং এবং অন্যান্য ইংরেজ অফিসারেরা তাদের ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে লিখেছিলেন, নিজেদের মধ্যে লড়াই দাঙ্গা তো দূরেরকথা আমাদের ওপর কী ভয়ানক ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল শাহজাহানাবাদের মানুষ! জামা মসজিদে প্রার্থনার আজানে মিশে গেল বিষ্ণু মন্দিরের ঘন্টা। আর বারবার হিন্দু মুসলমান জোট সমস্ত বাধা উপড়িয়ে এগিয়ে চলছিল!
    ইংরাজরা তখনো একটা কথা জানতে পারে নি। সেটা হল,
    বাদশা সলামতের পক্ষে আরো ঘোষণা করা হয়েছিল, ঈদের আগে, ঈদ চলাকালীন এবং ঈদের পরে কেউ যদি গোরু, বাছুর, মোষ, ষাঁড় গোপনে নিজের বাড়িতেও বলি দেয়, তাকে ধরেই নেওয়া হবে যে সে বাদশার শত্রু। এবং এই ধরনের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয় তবে দেওয়া হবে মৃত্যুদণ্ড।
    এই ফরমানটি যাতে আরো মজবুত করে জারি করা হয় তাই বাদশা আরো হুকুম দিলেন বিশেষ করে ব্যাবসায়ীদের, শহরে গোরু মোষ ঢোকা বারণ। শুধু তাই নয় কোতোয়ালিগুলোকে বলা হল মুসলমানদের ঘরে কতগুলো করে গোরু রাখা আছে তার হিশেব নিতে এবং ঈদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওইসব গাই বাছুরদের কোতোয়ালিতে এনে রাখতে হবে। দিল্লির কোতোয়াল মুবারক শাহ্‌র নামে এই আদেশ দেওয়া হল। তাকে এই বিষয়ে কী কী করতে হবে আদেশটিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বলে দেওয়া হল। বাদশা সলামত যে কতটা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন এই ফরমান তার প্রমাণ। কিন্তু বলাই বাহুল্য অনেকেই ঘ্যান ঘ্যান শুরু করল। কতদূরে বাড়ি, সেখান থেকে গাইগরু কোতোয়ালিতে আনা কী চাট্টিখানি কথা!
    তাহলে মুচালেখা লিখে দাও দায়িত্ব নিয়ে। অনেকে তাই করল। ঘরের গোরু বাছুরের হিশেব দিয়ে মুচালেখা লিখে দিল। বাদশা বাহাদুর শাহ জাফর এবং সেনা প্রধান বখত খান মন প্রাণ দিয়ে হিন্দু মুসলমান জোট রক্ষা করতে চেষ্টা করতে লাগলেন।
    শুধুমাত্র সাময়িকভাবেই নয় বাদশা এই ফরমানকে জারি রাখতেই চেয়েছিলেন। মাংস ব্যাবসায়ীরা পরে ধীরেধীরে ছাগল, ভেড়ার মাংস বিক্রি করা শুরু করে।
    তিক্ত বিরক্ত ক্ষমতাহীন বাদশা তার কবিতায় উগড়ে দিয়েছেন সেই সময়ের জ্বালা,
    হা ঈশ্বর, শত্রুরা সব আজ মরুক! ইংরেজরা আর তাদের যত সঙ্গীরা মরুক আজ।
    আজ শত্রুর কোরবানিতে, ও জাফর, ঈদের কোরবানি দিই চলো!



    কিসসাগো ফেরদৌসের সামনে তখন দুনিয়ার রঙ বদলে যাচ্ছে। উদ্ভ্রান্তের মত পথে পথে ঘোরে সে।
    বল্লিমারো মহল্লার গলি কাসিম জানের সামনে একদিন গিয়েছিল এমনিই। সে পথে এখন আর ঢোকা যায় না। পথ বন্ধ!
    কেমন আছেন মির্জা গালিব সাহাব? ফেরদৌস তার বড় ভক্ত! শায়েরি ছাড়াও তার হাভেলিতে দাস্তানগোই এর আসর বসত। সে এক এলাহি ব্যাপার! বেশিরভাগ আমির হামজার ঝলমলে দাস্তান। কোনো শাগিরদের হাত ধরে টুক করে হাভেলিতে ঢুকে এক কোণে ভিজে বেড়ালের মত ঘাপটি মেরে আসর শুনত! কোথায় গেল সেসব দিন? কোথায় সেই ঈদের রঙ, সেই সব নতুন বেলোয়ারি চুড়ির আর জরি সলমার দুপাট্টার গল্প !
    ফেরদৌসের কী হয়েছিল শেষ পর্যন্ত আমরা জানি না। কারণ শাহজাহানাবাদ ঘেরাও করে হত্যালীলা চালিয়েছিল ইংরেজরা। বাদশা সলামতকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল রেঙ্গুনে। মোঘল পরিবারের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল দিল্লির জমি। ফেরদৌস সেই হাঙ্গামায় মারা পড়েছিল কী না জানা যায় নি। এক তরুণ কিসসাগোর অপূর্ণ স্বপ্ন, রমজান মাসের তপ্ত দিনগুলোতে, ইফতারের সাজানো খাবারে, ঈদের প্রার্থনায় গুলমোহর অমলতাসের রঙে ফিরে ফিরে আসে।
    কিসসাগোদের মৃত্যু হয় না! আবহমানতায় বেঁচে থাকে তারা। স্বপ্নের বাগিচায় পারিজাত ফুটিয়ে তোলে আগামী দিনের জন্য! ফেরদৌস না হয়ে অন্য কেউ হয়তো বা!
    “বাজিচা এ ইতফাল হ্যাঁয় দুনিয়া মিরে আগে।
    হোতা হ্যাঁয় শব এ রোজ তমাশা মিরে আগে।।”
    এ জগত শিশুদের খেলার ময়দান,
    রাতদিন তামাশা চলছে এখানে।
    ( মির্জা গালিব)



    তথ্য: দাস্তান এ গদর, জাহির দেহলভি



    অলংকরণ- মনোনীতা কাঁড়ার
  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ১৩ মে ২০২১ | ৮২২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • রৌহিন | ১৪ মে ২০২১ ১৪:২১105954
  • অসামান্য লেখনী 

  • | ১৪ মে ২০২১ ১৪:২৪105956
  • কি ভাল কি ভাল। 

  • স্বাতী রায় | 117.194.39.20 | ১৪ মে ২০২১ ১৫:৩৪105962
  • অনবদ্য। 

  • Dipak Das | ১৪ মে ২০২১ ১৭:০৯105969
  • ভাল লাগল। আবার।

  • সাগর চক্রবর্তী | 115.187.56.171 | ১৪ মে ২০২১ ২৩:০৫105984
  • অসাধারণ বললেও কম বলা হয়।

  • Sikha Ghosh Roy chaudhuri | 2405:201:8001:9048:3c3f:d477:de96:5e90 | ১৫ মে ২০২১ ০০:০৭105986
  • আজকের দিনে বড়ো প্রাসঙ্গিক।লেখনী তে বড়ো মায়া।খুব ভালো।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন