• বুলবুলভাজা  অন্যান্য

  • আশা রাখো। বললেন, শঙ্খ ঘোষ।।

    ইমানুল হক
    অন্যান্য | ২২ এপ্রিল ২০২১ | ১৬১১ বার পঠিত | ৩ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • #
    শূন্যতা কোন অনৈশ্বরিক পথ নির্দেশ করে? জানি না।
    শূন্যতার নির্মাণ বা বিনির্মাণ হয়?
    এই মুহূর্তে ভাবতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু সকলই শূন্য মনে হয় শূন্য মনে হয়। প্রার্থনা নেই, নাহলে বলতাম, সকল সময়। শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে ফোন করতে আজ সাহস করি নি।
    যদি যা শুনছি, তা সত্য হয়ে যায়।
    সইতে পারা যাবে?
    ফোন করি সোমেশ চট্টোপাধ্যায় ও ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়কে। এদিকে ফোনের পর ফোন এসে যাচ্ছে। উত্তর দিতে পারছি না। কান্নায় বুজে আসছে গলা। জেনে গেছি খবর।
    তবু যদি মিথ্যা সংবাদ জানি। অপেক্ষায় থাকি ত্রিদিবদা ও সোমেশদার।
    না।
    শূন্যতার ভিতর আরো শূন্যতার জন্ম দিয়ে চলে গেছেন শঙ্খ ঘোষ। অনন্ত যাত্রায়।
    আমার মতো বহু মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবক।
    পিতৃসম।
    আমি পুত্রের মতো ভালোবাসা ও প্রশ্রয় পেয়েছি তাঁর।
    অনেকেই আওয়াজ দিত, আমরা বললে না, ইমানুল বললে হ্যাঁ।
    কথা বলতে না চাওয়া মানুষটি কথা বলতেন আমাদের সভায়।
    আমাদের সভা মানে তো ফুটপাথ রাস্তার ধার।
    হলেও একবার বলেছেন, ২০১২ এর ফেব্রুয়ারি বিধাননগর সরকারি কলেজে 'রবীন্দ্রনাথ ও সমকাল' বিষয়ে।
    ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে গোটা কলেজ জুড়ে আলপনা আঁকা বুঁকি মুগ্ধ করেছিল তাঁকে।

    অনেকেই তাঁকে মনে রাখবেন একজন মহত্তম কবি হিসেবে, কেউ মনে রাখবেন বিশিষ্ট গদ্যকার, নাট্যকার, ছোটদের লেখক, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে -- অথবা সবগুলো নিয়েই; আমার কাছে এইসব গুণের পাশাপাশি তিনি একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও দার্শনিক।
    ২০০২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আমি তাঁর সম্পর্কে ব্যবহার করি, 'বাংলার বিবেক' শব্দটি। অশোক মিত্র সম্পর্কে বলেছিলাম, 'কিংবদন্তি প্রতিবাদী চিন্তক' আর শঙ্খ ঘোষ সম্পর্কে বাংলার বিবেক।
    স্যার একটু রাগ করতেন এতে। বলতেন, এভাবে বলো না।
    ২০০৭ এ এই শব্দবন্ধ খুব জনপ্রিয় হয়।
    এতে স্যারের ওপর মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। ফলে, আমি কম বলতে থাকি এই শব্দবন্ধ।

    তবে, আমি যে-কোনো সমস্যায় তাঁর দ্বারস্থ হয়েছি। ১৯৯২ এ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর তাঁর লেখা নিয়েছি। আর ২০০২ এ গুজরাট গণহত্যার সময় তিনি পথে নেমেছেন। অর্থ সংগ্রহ করেছেন। সাংবাদিক বিশ্বজিৎ রায় ওরফে মধুদা ও আমি স্যারের বাড়ি যাই। বাংলার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সভা করি তাঁর বাড়িতে দেবেশ রায়, সৌরীন ভট্টাচার্য, জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ছিলেন। গড়ে ওঠে গুজরাট সংহতি সমিতি। অন্তত ৪০ বার আমরা পথে পথে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করেছি।
    এর মধ্যে ৩৩ টিতে স্যার সরাসরি উপস্থিত থেকেছেন। ধর্মতলা, রাজাবাজার, রিপন স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট,শ্যামবাজার কোথায় নয়?
    এক লাখ ৩৩ হাজার টাকার খুচরো, ৫ পয়সা থেকে এক টাকা দু টাকা ও পাঁচ টাকার মুদ্রা গুনেছেন হাত লাগিয়ে।
    ১৫০ র বেশি কৌটা রাখা হতো তাঁর বাড়িতে। ব্যানার ফেস্টুন আমার ঘরে কৌটো স্যারের কাছে। খুচরোকে টাকায় রূপান্তরিত করার অনেকটা দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন।
    ভাবীকাল হয়তো বিশ্বাস করতেই চাইবে না।

    বাস কন্ডাক্টর আর রেশন ডিলারের কাছে পয়সা দিয়ে নোট নেওয়ার তদারকি করছেন শঙ্খ ঘোষ।
    ২০০৯ এ আয়লা ত্রাণে অশোক মিত্রের সঙ্গে রাস্তায় নেমে ত্রাণ সংগ্রহের পাশাপাশি গেছেন সুন্দরবনের দুর্গম অঞ্চলে। খেয়েছেন যৌথ রান্নাঘরে। কেনাকাটায় তদারকি করেছেন। কোষাধ্যক্ষ অভীক মজুমদারের পাশাপাশি হিসেব সামলেছেন।
    ১৯৯৯ থেকে রবীন্দ্র সদনে আমরা একটা পাঠশালা চালাতাম। ২০১৬ তে মানিকতলা খালপাড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে শুরু হয় পাঠশালা। ২০ জন নিয়ে শুরু করে আজ ২২০ জন।
    ২০১৬তেই বিশিষ্ট আইনজীবী একরামুল বারি ও বিকাশ ভট্টাচার্যের সহায়তায় পাঠশালার বাচ্চাদের নতুন পোশাক দিই। ১৫ আগস্ট সেটা বাচ্চাদের হাতে তুলে দেন শঙ্খ ঘোষ।
    ২০১৮ এর ২৩ সেপ্টেম্বর আমরা মানিকতলা খালপাড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটা ফুটপাথের বইঘর বা গ্রন্থাগার নির্মাণ করি।
    স্যারকে বললাম, যাবেন স্যার?
    শঙ্খ ঘোষ রাজি হলেন।
    এলেন। শুধু এলেন না ব্যতিক্রমীভাবে বললেন। ১০-১১ বছর বয়সে পাকশিতে গ্রন্থাগার নির্মাণের স্মৃতি তুলে ধরলেন।
    ২০২১ ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ। স্যারের জন্মদিন। আমরা পাঠশালার ১৫০ বাচ্চা নিয়ে স্যারের বাড়ি গেলাম।
    ভেবেছিলাম নীচে থেকে ঘুরে চলে আসবো।
    স্যার বললেন, তা কী করে হয়?
    সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ১০ ফুট দূরত্ব রেখে শিল্পী তীর্থর পরিচালনায় ছেলেমেয়েরা গাইল, জন্মদিন শুভ জন্মদিন/ শঙ্খ ঘোষের জন্মদিন।
    এ নিয়ে একটু হইচই কেউ কেউ করেন। কিন্তু স্যার,স্যারের স্ত্রী আমাদের প্রশ্রয় দেন।
    বড়ো মেয়ে মিঠিদি ও বড়ো জামাই সোমেশ্বরদা ছোটোদের মিষ্টি খেতে টাকা দিলেন। স্যারও। সেদিন সমর নাগের বাগানবাড়িতে চড়ুইভাতি। সেখানে সমরদা মাছ মাংসের সঙ্গে পায়েস খাওয়ালেন স্যারের জন্মদিন উপলক্ষে।

    ২০২০তে প্রথম স্যারের জন্মদিন স্যারের বাড়ির বাইরে পালন করা হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কলকাতা বইমেলায়।
    বইমেলার দুই কর্ণধার ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় ও সুধাংশু শেখর দের সঙ্গে কথা বলে স্যারের অনুমতি নিয়ে লিটল ম্যাগাজিনের পাশে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মঞ্চে শঙ্খ ঘোষের কবিতা ও লেখা পাঠ করে পালন হলো জন্মদিন।
    সুধাংশুদা স্যারের লেখা 'জন্মদিন' কবিতাটি পড়লেন। বললেন, ত্রিদিবদা। পড়লেন কবিতাও।

    #
    আমি লেখালেখি করবো বলে কলকাতায় এসেছিলাম। কিন্তু বেশি জড়িয়ে পড়েছি সাংগঠনিক কাজে সমাজসেবায়।
    অন্য অনেকেই বকাবকি করতেন। করেন।
    স্যার বলতেন, এটাও একটা বড়ো কাজ।
    থেমো না।
    দোলের দিন গেলাম। আমি একাই যেতাম দোলের দিন।
    অনির্বাণ ভট্টাচার্যের লেখা শুভদীপ গুহের সুরে, 'আমি অন্য কোথাও যাবো না' গানের সুর ও কথা শুনে খুশি।
    শেষে আসার সময় মাথায় হাত রাখলেন।
    আর একটু আগে বলেছিলেন, আশা রাখো। আশা।
  • বিভাগ : অন্যান্য | ২২ এপ্রিল ২০২১ | ১৬১১ বার পঠিত | ৩ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
স্বগগ - aftab hossain
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:a00c:e240:8286:f741 | ২২ এপ্রিল ২০২১ ০২:৩৭105004
  • বাংলার বিবেক। এই একটিই মানুষ ছিলেন, যার দিকে তাকিয়েছি সারা জীবন, যে কোন সঙ্কট কালে , শঙ্খ ঘোষ কী বলছেন 

  • বিপ্লব রহমান | ২৩ এপ্রিল ২০২১ ০৮:০০105036
  • "অমর কে আর মারবে কে রে?" 


    গভীর আবেগের লেখাটি যেন হঠাৎ ফুরিয়ে গেল! 


    শংখ কথন আরও পড়তে চাই। আরও বড় করে লিখবেন? সম্ভব হলে ধারাবাহিক লিখুন। দাবি জানাই  ❤️

  • manimoy sengupta | ২৩ এপ্রিল ২০২১ ১৭:১২105062
  • কবির মৃত্যু হয়না। 

  • Mayukh Datta | ২৪ এপ্রিল ২০২১ ১০:২৭105096
  • শ্রদ্ধা...

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন