আচ্ছা আমরা কি একটু রাস্তা পেতে পারি না, রাস্তার ওপর কোন হক নেই আমাদের? জানি রাস্তা কারো একার নয়, জানি কেউ কারোকে রাস্তা ছেড়ে দেয় না । অথচ যখন এ অঞ্চলের সবেধন নীলমণি একমাত্র রোগাভোগা রাস্তাটা বালি সুড়কি লোহার ছড় ইত্যাদি নির্মাণ সামগ্রীতে দুই তৃতীয়াংশ ঢেকে যায়, দৈত্য দানবের মত ট্রাকগুলো আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে রাস্তায় পেটের ময়লা খালি করে, হাজার হর্ণ দেওয়া সত্ত্বেও একটু অবজ্ঞার দৃষ্টিতে চাওয়া ছাড়া তেমন পাত্তা দেয় না , তখন মনে হয় রাস্তা প্রোমোটারের, আমার নয়। আজকাল কিছু লিখতে ভয় করে এই বুঝি ট্রোলিং শুরু হল। তাই বলি, গাড়ি থাকলেই সিনেমার ভিলেন বা ভ্যাম্প - সেই ব্যাপারটা আজকাল কিন্তু আর চলে না! দশ বছরের পুরোনো হাচব্যাক , রাক্ষসের মত তেল খায়- নেহাত করোনার ভয়ে তাকে নিয়ে অফিস আসা। বয়স্কা মা আছে, নিজের বয়সও তো মেঘে মেঘে কম হল না । অসুখে পড়লে আই সি ইউ তে ঢোকার মত পকেটের জোর নেই। এবং অবৈধ পার্কিং বা ট্রাফিক নিয়ম ভেঙে গাড়ি চালানোর জন্য যা শাস্তি প্রাপ্য, সে যারা করে তাদের পাওয়া উচিত, তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। তো যা বলছিলাম। রোজ সকালে বিনীত ভাবে অপেক্ষা করি কখন ট্রাকদের প্রাত্যকৃত্য শেষ হবে। তারপর কেউ দয়া পরবশ হয়ে একটু ঘাড় বেঁকিয়ে দাঁড়ায় , আমি কোনমতে স্টিয়ারিং কাটিয়ে বেরিয়ে যাই যতক্ষণ না আরেকটি নির্ণীয়মান আবাসন সামনে আসছে। এরপর আসে অটোস্ট্যান্ড। সরু লিকপিকে রাস্তাটা তার খোঁদল গর্ত নিয়ে এগিয়ে গেছে
সামনে। দুধারে ঢালাও বাজার। তেরপলের খোপগুলো উপচে সে বাজারের দেহকান্ড রাস্তার ওপর বিস্তৃত বিছিয়ে গেছে । দুদিক দিয়ে বাস থেকে শুরু করে ঠেলা ভ্যান , সাইকেল, মহিষ সব স্বচ্ছন্দে চড়ে বেড়াচ্ছে। ঠিক সবচেয়ে ব্যস্ত ও সবচেয়ে সংকীর্ণ যে অংশ তার একদিকএ অটোস্ট্যান্ড। স্ট্যান্ডের পাশে গর্বিত মালিক। এক ইঞ্চি সরানো যাবে না সে লাইন, সে ঘন্টা দুয়েকের জ্যাম হলেও না। ওখানে গাড়ি অবধারিত গোলকধাঁধায় পড়ে, উল্টো দিক থেকে অতিকায় বাস ও দুটো ছোটাহাতির দাপটে। নির্বিকার অটোর মালিক আমাকে ডিমন্সট্রেশন দেয় যে স্টিয়ারিংটা ঠিক কোন দিকে কত দিগ্রি ঘোরালে দুফুটের পরিসরে চারফুটের গাড়ি বার করা যায়! এরমধ্যে দুপাশে দাঁড়ানো মনোযোগী বাজারুদের একজনের সাইকেলের হ্যান্ডেলে টোকা লাগে, সাইকেল উলটে যায়। েকেবারে ভারসাম্যের অঙ্কের মত তিনি সামনে ঝুঁকে পড়েন, পপাত চ মমার চ হওয়ার আগেই এক সদাশয় সহ বাজারু তাঁকে ধরে ফেলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কিন্তু অত কি কপাল করে এসেছি যে বাঁচব! ভদ্রলোক আমার বাবা না হোক কাকার বয়সী। তিনি বোধকরি জীবনের অনেক অবরুদ্ধ রাগ, বঞ্চনা আর হতাশার ঝিমিঝিমানিতে হঠাত ক্ষেপে গিয়ে আমার জানলার কাঁচ চেপে ধরে, প্যাসেঞ্জারের দরজা খুলে নামিয়ে বেধড়ক ধোলাই দিতে চান ( মেয়েছেলের এইজন্যে গাড়ি চালাতে নেই, হাত পাকে নি , গাড়ি চালাতে এসেছে। গাড়ি আছে বলে মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করে না ইত্যাদি...)। অন্যরা কেউ কেউ মজা দেখে, কেউ বা আবার থামাতে চায়, বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যে অফিসে লেট হয়ে গেছে। ওদিক থেকে আসা বাসও আটকে গেছে, সজোরে হর্ণ বাজায়, গোটা কয়েক বাইক এই সুযোগে অগল বগল দিয়ে সামনে এসে আর এগোতে পারে না, রাস্তা আরো জটিল করে। আমার কাকার বয়সী ভদ্রলোক এমনসব বাক্যবৃষ্টি করেন যে জীববিজ্ঞানের বা সমাজবিজ্ঞানের কোন মাস্টারমশাই থাকলে আঁতকে উঠতেন, এই সব অসম্ভব সম্পর্ক বা প্রজনন প্রক্রিয়ার হদিশ কোন পাঠ্যপুস্তকে আছে! এরপর কিছু স্থিতধী জনতার হস্তক্ষেপে মহিষের পিঠে হাত বুলিয়ে, বাজারবাবুর ছাতা মুড়ে, সাইকেল ওদিকে ঘুরিয়ে, দোকানের সামনে রাস্তায় রাখা গোটাকয়েক প্লাসটিক টুল ভেতরে তুলে কোনমতে রাস্তা পরিস্কার করে। সাইকেলে টোকা খাওয়া বাজারকাকু বলেন - "নেহাত মেয়েছেলে বলে আজ ছেড়ে দিলাম, নয়তো থাবড়ে দাঁত ফেলে দিতাম।" (ঠিক এই ভাষাই ব্যাবহার করেছিলেন, আমি বানাচ্ছি না।) গাড়ি স্টার্ট করি মাথা নিচু করে, বাকি জনতা চোখের ভাষায় ওঁর এই মহানুভবতার প্রশংসা করতে করতে যে যার গাড়ি স্টার্ট করে। এই পুরো নাটকে অটোচালকরা কিন্এতু নিজের জায়গা ছেড়ে এক ইঞ্চিও কেউ নড়েন নি, অখন্ড মনোযোগে দেখে চলেছিল আর পক্ষে বিপক্ষে নিজস্ব মতামত দিয়ে চলেছিলেন। জানিনা দুঃখ পেলেন কিনা তাঁরা - নাটকটা শেষ হয়ে গেল বড্ড তাড়াতাড়ি। কে জানে অটোস্ট্যান্ডটা পাশেরই একটা গলিতে, যেখানে গাড়ি চলাচল
অপেক্ষাকৃত কম সেখানে কেন তুলে আনা যায় না! যাত্রীর অভাব হবে না কিন্তু , শুধু মেন রোড জ্যাম হবে না। নিশ্চয় কোন প্রকৃত কারণ আছে, যেটা প্রাজ্ঞ লোকেরা জানেন, আমি জানিনা।
গাড়ি এগিয়ে চলে। পথে রাস্তাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্যারাজ করা প্রাইভেট বাস - তেলের খরচ চালিয়ে আর বাস চলছে না। তার পাশএ যেটুকু ক্ষত বিক্ষত পথ পড়ে আছে , সেখান দিয়ে সাঁসাঁ বেরিয়ে যাচ্ছে বাহাদুর বাইকচালকের দল - আজকাল দেখি হেডলাইট ওদের জ্বালানোই থাকে। মানে সবসময় "রাস্তা ছাড়ো, নইলে" হুমকি। এসব সামলে সুমলে এবার রাস্তা চলে গেছে ফ্লাইওভারের পাশ দিয়ে - তিনশ মিটার পথ।
অভিজাত অঞ্চলের প্রশস্ত রাস্তায় পড়ার জন্য। রাস্তা না বলে আমাদের কলেজ জীবনের ভাষায় একে গলতা বলা শ্রেয়। পুরো পথটাই ভাঙাচোরা, দুটো গাড়ি এদিক ওদিক যেতে পারে না। চালকরা নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া করে নেয়, একপক্ষ অপেক্ষা করে ওদিকের গাড়িগুলো বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। তা মিলে মিশে চলছিল মন্দ নয়, মাঝে মাঝে একটু আধটু ঝগড়া ঝাঁটি করে, কেটে যাচ্ছিল দিন। সময়ের সঙ্গে একদিক ঘেঁষে পরপর খাবারের দোকান মাথা তুলছিল, সেও সামলে নিচ্ছিলাম। হঠাতই এক ফার্নিচারের দোকান সে রাস্তার এক তৃতীয়াংশ (অন)অধিকার করে ইঁটের দেওয়াল তুলে ফেলল।
প্রায় ব্লক হয়ে গেল রাস্তা। ঐ তিনশ মিটার পথটায় আবার বাইকে উড্ডীন কপোত কপোতী ফ্লাইওভারের তলায় দাঁড়িয়ে গল্পগাছা করে। নিরেট ইঁটের দেওয়ালের পাল্লায় পড়ে তাদের সে জায়গা হাতছাড়া। তা বলে প্রেম তো আর বাধা মানবে না - ঐ রাস্তারই ধার ঘেঁষে বাইক থামিয়ে তারা নত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে - "আমি যেন বলি আর তুমি যেন শোনো " ভঙ্গিতে। হর্ণ দিলে তাদের রোষকষায়িত এমন ভাবে তাকায় - মনে করিয়ে দেয় " মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং"। তারপর বাইকের হ্যান্ডেলটা "আধ ইঞ্চির কুড়ি ভাগের একভাগ" বাঁকিয়ে পথ ছেড়ে দেয়। তাই তো রাস্তা তো ওদেরও। কলকাতা শহরে প্রেমটাই বা করবে কোথায়! তাহলে রাস্তা হল বালি, সুড়কি, লোহার, রাস্তা প্রোমোটারের, রাস্তা অটো, বাস, ট্রাক, ভ্যান, মহিষ, সাইকেল, হকার দাদার , বাজারকাকুর, রাস্তা, রাস্তা মিটিং মিছিল, পথসভার, - তা এদের সবাইকে দিয়ে থুয়ে আমার ভাগে একটু রাস্তা পড়বে না? মানে আমার গাড়িটা একটু চালাতাম আর কি!
Sucharita Bonthapally and Madhumita Mitra
4 comments
 
Like
 
 
 
Comment
 
 
Share
 

4 comments

 
 
  •  
    কোন এলাকার কথা বলছো গো?
    • Like
       
    • Reply
    • 19 m
     
  •  
    কলকাতার উপকণ্ঠ
    • Like
       
    • Reply
    • 18 m
     
  •  
     
    উফফফ নিদারুণ এক ছবি আঁকলে</li><a name='comments'></a><li id=০৭ এপ্রিল ২০২১ | ৩৫ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*: