• বুলবুলভাজা  পড়াবই  সীমানা ছাড়িয়ে

  • সাঁজোয়া গাড়ির মতো মন নিয়ে আমাদের দিন শুরু হয়

    হিন্দোল ভট্টাচার্য
    পড়াবই | সীমানা ছাড়িয়ে | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৪৯১ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কার্ল মিকেল। জার্মানির সাহিত্যিক। কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক। শৈশব-কৈশোর কেটেছে নাৎসি দল ও হিটলারের উত্থান ও শাসনকাল দেখে। দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা—নিজের শহর ড্রেসডেনের বোমারু বিমান-হামলায় গুঁড়িয়ে যাওয়া। যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বে দেখেছেন পূর্ব জার্মানিতে দমবন্ধ-করা সোভিয়েত-রাশিয়া সমর্থিত কমিউনিস্ট শাসন। তাঁর কবিতা পড়লেন ও জার্মান থেকে তরজমা করলেন কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য



    কার্ল মিকেল। ১৯৩৫-২০০০

    ১৯৩৫ সালে ড্রেসডেনে জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে তিনি জার্মানিতেই কাটান। যুদ্ধের পর পূর্ব জার্মানিতে ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত তিনি অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৮-তে তিনি একটি পত্রিকার অর্থনীতি সংক্রান্ত বিষয়ের সম্পাদক হন। ১৯৫৯ থেকে ৬৩ পর্যন্ত তিনি একটি শিল্প সংক্রান্ত পত্রিকার সম্পাদনা করেন। হিটলার জমানার ফ্যাসিবাদের পর তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন সোভিয়েত শাসিত পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট শাসনও। পূর্ব জার্মানিতে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরেই তিনি সেই সময়কার শাসকদের কুনজরে পড়েন। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় পশ্চিম জার্মানিতে। হিটলার শাসনের সময়কার জার্মানির চেয়েও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পূর্ব জার্মানির ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়েই তিনি লিখে গেছেন দুটি দেশেই। তাঁর কবিতা নিয়ে পশ্চিম জার্মানির কবিরা ছিলেন উল্লসিত। বের্লিন দেয়াল ভাঙার পর জার্মানিতে তিনি অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর কবিতার মধ্যে সমসাময়িক অ্যান্টিপোয়েট্রির ছায়া পাওয়া যায়। ২০০০ সালের ২০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।

    জার্মান নারী ১৯৪৬

    হয়তো এটা মজার বা একদমই মজার নয়
    আমার মন বলল, সে ছিল উপযুক্ত পুরুষ
    জঙ্গলের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে সে গাছেদের সঙ্গে কথা বলত,—
    কিন্তু সেগুলো কথা ছিল না, ছিল হুমকি
    বলত, ‘আমি তোমাদের কেটে কেটে আসবাব বানিয়ে ছাড়ব’
    সে ছিল কাঠের মিস্ত্রী, কমিউনিস্ট, বেকার।
    বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত একটা রান্নাঘরের মধ্যে
    তুমি যদি একটু সুন্দর নারী হও, তাহলেই তাকে আর থামাবে কার সাধ্য
    যখন সে আমাকে নিতে এসেছিল, তখন মালকিন এমনই বলেছিলেন
    তার পর হিটলার, মালকিন বললেন, হিটলার শব্দের মানেই হল যুদ্ধ
    এখানেও কোনও শিশুর অস্তিত্ব ছিল না, হত্যা করার জন্য
    আমার কোনও শিশুর দরকার ছিল না, মালকিনের একটি মেয়ে ছিল।
    তার পর যুদ্ধ শুরু হল। এ এক অন্য যুদ্ধ
    রাশিয়ায় যুদ্ধবন্দীদের বেঁচে থাকার যুদ্ধ, নতুন ভাবে শিক্ষা দেওয়া
    গাছগুলো কাটতে কাটতে যখন বনসাই হয়ে গেছে
    কেউ কেউ চেয়ার, টেবিল, খাট
    তখন কেউ বলল, গাছে পাতা নেই, আমাদের কেউ চুমু খায় না।

    ভাঙা বাড়ি

    তুমি ইতিহাসের কথা বললে, আমি দেখলাম একটি খসে পড়া স্তম্ভ
    হুমকির সুরে কথা বলতে বলতে যেন ঝড় স্থির হয়ে গেছে
    দেওয়ালে গুলির দাগ, সমাধির উপরে পচা ফুল
    যেন গোধূলির রঙ তোমার মুখের উপর এসে পড়েছে
    আমরা কেউ দরজা পেরিয়ে মাঠে নামতে পারি না
    এর দায় তোমার নয়, এই দ্যাখো পেট ফুলে গেছে তিমি মাছের
    আকাশ থেকে খসে পড়ছে পাখি, যারা একদিন ধূসর ধোঁয়ার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল
    সাঁজোয়া গাড়ির মতো মন নিয়ে আমাদের দিন শুরু হয়

    ড্রাগন

    আমাদের দেওয়ালগুলো আমাদের তৈরি করা নয়
    যদি তৈরি করা হত, কবে সেই দেওয়াল ভেঙে পড়ে যেত
    পঞ্চাশ বছর ধরে একটি ড্রাগন আছে আমাদের মধ্যে
    এত লোভ, এত জিভ
    লকলকে খুনী এক, আমাদের মধ্যে
    এসেছে বন্দুকবেশে, এসেছে আদর করে, চেনে বেঁধে নিতে
    তাকে যতই আদর করবে, তুমি হয়ে উঠবে তার পোষা চাকুরিজীবী
    আবহসঙ্গীত বাজবে,
    যেন হত্যার আগের রাতে
    স্বাধীনতার বিউগল।

    ভালবাসার স্মৃতিস্তম্ভ

    এইখানে সমাধি ছিল, আলোর মধ্যে, ছায়ার মধ্যে
    ঘোড়ার গায়ের গন্ধের মতো
    ভালবাসা ছিল
    তোমার চোখের মধ্যে যেদিন বেয়নেট ঢুকে গেল
    প্রতিজ্ঞা করেছিলাম
    আমি প্রতিশোধ নেব
    আজ দেখো, কেমন প্রার্থনা করছি
    আর সৈন্যরা এসে
    আমার বুকে এঁকে দিয়ে যাচ্ছে
    ক্রুশ

    আমরা ভাল আছি

    আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো
    আমরা ভাল আছি
    আলো আসছে
    অন্ধকার আসছে
    বৃষ্টি আসছে
    এমনকি বোমাও
    যুদ্ধবিমানও
    সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে
    এই তো বেঁচে আছ তুমি
    আমিও
    একবুক মৃত গন্ধ টেনে নিতে নিতে
    বলছি
    আমার পরিচয় দাও
    আমার আয়না দাও
    আমার ভালবাসা দাও
    আমার দেশ দাও
    আমরা ভাল আছি
    এখনও
    কাঁদতে পারছি তোমার জন্য

    স্বীকারোক্তি

    এত কিছু সহ্য করার ক্ষমতা কোথা থেকে আসে মানুষের?
    খিদে ও যৌনতা থেকে?
    ভালবাসা থেকে?
    নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস থেকে?
    আশা থেকে?
    স্বপ্ন থেকে?
    এত কিছু মেনে নেওয়ার ক্ষমতা কোথা থেকে আসে মানুষের?
    সমাধির দিকে তাকাতে তাকাতে
    এক পাগল প্রশ্ন করেছিল।
    আমি শুনেছিলাম মাত্র। আর কিছু করিনি, বিশ্বাস করুন কমরেড!



    মার্ক মিকেলের কিছু কবিতা পড়া যেতে পারে এই বইটিতে


    বইটি অনলাইনে কেনা যেতে পারে এখানে—https://www.amazon.in/German-Poetry-1910-75-Michael-Hamburger/dp/0856351628



    গ্রাফিক্স: মনোনীতা কাঁড়ার

    এই বিভাগের লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে 'পড়াবই'এর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন।
  • বিভাগ : পড়াবই | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৪৯১ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পার্থজিৎ চন্দ | 2402:3a80:1af6:f6fa:0:64:e724:9a01 | ০১ মার্চ ২০২১ ১৮:৩৪103128
  • হিন্দোলের লেখাটি অসাধারণ। জার্মান কবিতার উপর একটি বড় কাজ প্রকাশিত হোক, হিন্দোলের। দ্রুত

  • সৌভিক গুহসরকার | 42.110.133.159 | ০২ মার্চ ২০২১ ০৭:৫৮103133
  • চমৎকার অনুবাদ। এই কবির কবিতা এই প্রথমবার পড়ছি। ঋদ্ধ হলুম। খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

  • V Majumder | ০৩ মার্চ ২০২১ ১২:৫৮103154
  • অসাধারণ অনুবাদ! 


    কবির সাথে দারুণভাবেই পরিচয় হলো। 

  • মিহির রক্ষিত | 2401:4900:314c:5db4:d98d:5c39:3eb7:c560 | ০৪ মার্চ ২০২১ ২২:২৯103165
  • অসাধারণ, অসাধারণ এবং অসাধারণ। অনুবাদ সমেত বইটি পেতে চাই। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন