• টইপত্তর  আলোচনা   স্বাস্থ্য

  • ক্লিনিকাল ট্রায়ালের রিপোর্ট কি করে পড়তে হয় 

    অরিন
    আলোচনা | স্বাস্থ্য | ২০ জানুয়ারি ২০২১ | ৫৪৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • আজকাল করোনাভাইরাসের সুবাদে বহু "এপিডেমিওলজির" বা তাতে ব্যবহৃত বাক্যসমূহ জনসাধারণ জেনেছেন। খবরের কাগজগুলোতেও লেখালিখি হয়। তবে আমি লক্ষ করেছি অনেকের এই সব নিয়ে বহু ভুলভ্রান্তি রয়েছে, যার জন্য নানারকমের উল্টোপাল্টা কথাবার্তা দেখি। তাই কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করব।  খুব টেকনিকাল নয়, যতটা অঙ্ক ইত্যাদি বাদ দিয়ে সহজভাবে লেখা যায় আর কি। 


    প্রথম, ক্লিনিকাল ট্রায়াল জিনিসটা কি এবং কিভাবে পড়তে হয়? 


    আজকাল কোভিড ভ্যাকসিনের কল্যাণে অনৈকেই ক্লিনিকাল ট্রায়াল, এক দুই তিন ফেজ প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করছেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ফেজ মানে, একেবারে শুরুতে জন্তু জানোয়ারের ওপর পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয় যে আদৌ ওষুধটি জৈবগতভাবে কাজ করে কি করে না, কি কি গোলযমাল, এইসব। তারপর, সীমিত সংখ্যক মানুষের ওপর পরীক্ষা করে দেখতে হয় (ফেজ ২), এবং তারও পরে জনসমষ্টির মধ্যে পরীক্ষা করে দেখতে হয় যে কি রকম কাজ হচ্ছে। এতেও শেষ হয় না, বাজারে আসার পর নজরদারীর পরীক্ষা চলে। 


    তা, আমার বক্তব্য এই যে, যখন পারবেন, মূল গবেষণাটির রিপোর্ট টা পড়বেন, শুধু খবরের কাগজ বা সোস্যাল মিডিয়ার আলোচনার ওপরে ভরসা করবেন না। কি কি দেখবেন? 


    ১) কিভাবে মানুষদের পরীক্ষা তে নিয়োগ করা হয়েছিল


    ২) কিভাবে নিদান এবং প্লেসিবো বিতরণ করা হয়েছিল


    ৩) কিভাবে "end point" মাপা হয়েছিল


    ৪) আপনি যে জনসমষ্টির কথা ভাবছেন তাদের সঙ্গে যারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের কতটা তফাৎ


    পরবর্তী অংশতে এই চারটে বিষয় নিয়ে লিখব। 


    তবে তার মধ্যে আপনাদের প্রশ্ন ও মন্তব্য পাবার অপেক্ষায় রইলাম। 

আরও পড়ুন
এঁরা  - pradip kumar dey
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • anandaB | 50.125.255.229 | ২০ জানুয়ারি ২০২১ ০৭:৪৪733540
  • আগ্রহ নিয়ে পড়ার ইচ্ছে রয়েছে , আপাতত একটা প্রশ্ন 


    এই যে বিভিন্ন ট্রায়াল ফেজ এ পার্টিসিপেন্ট সিলেকশন হয় এটা কিসের ভিত্তিতে? ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতায় মাঝে মাঝে দু একটা নতুন ড্রাগ এর ট্রায়াল এ যোগ দেবার জন্য ইমেইল পেয়েছি , কিন্তু তা সংখ্যায় অতি নগণ্য (মানে গত দশ বছরে হয়তো একবার বা দুবার) ।...তো যে বা যাঁরা এই টার্গেট অডিয়েন্স সিলেক্ট করেন (খুব সম্ভবত একটা কমিটি ফর্ম করা হয়) তাঁরা কিভাবে ঠিক করেন অমুক কে ডাকা হবে বা হবে না ? নাকি পুরোটাই রান্ডম সিলেকশন ?


    যদি অলরেডি এই টপিক টা কভার করার প্ল্যান থাকে তাহলে আলাদা করে উত্তর না দিলেও চলবে

  • বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত | 2405:201:8008:c03c:69f2:231f:41a9:df94 | ২০ জানুয়ারি ২০২১ ১২:৫৭733541
  • খুব জরুরি টপিক, অনেক ধন্যবাদ,‌দাদা।

  • dc | 2405:201:e010:503c:89cc:c50b:1797:b2b0 | ২০ জানুয়ারি ২০২১ ১৩:৩৮733542
  • অসাধারন টপিক, আর আমার মতে খুব জরুরী। তবে অরিনবাবু যেহেতু রিসার্চ পেপার পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন, তাই আমার মনে হয় দুয়েকটা স্ট্যাটিসটিক্স এর টার্ম জেনে নেওয়া জরুরি, কারন এগুলো বেশীর ভাগ রিসার্চ পেপারে থাকে। 


    প্রথমে যেটা মনে এলো, তা হলো স্ট্যাটিসটিকাল সিগনিফিক্যান্স বনাম ক্লিনিকাল সিগনিফিক্যান্স। অর্থাত কিনা একটা নতুন ওষুধ এর রেজাল্ট স্রেফ চান্সের ভিত্তিতে পাওয়ার সম্ভাবনা ৫% বা তারও কম, তাহলে সেটা স্ট্যাটিসটিকালি সিগনিফিকান্ট। কিন্তু শুধু এটুকু হলেই ক্লিনিকালি সিগনিফিকান্ট বলা যাবে না - তার জন্য ওষুধের কাজ এতোটাই হতে হবে যে ক্লিনিকাল প্র‌্যাক্টিসে হেরফের ঘটাতে সক্ষম। এর সাথে যে টার্মটা ব্যবহার করা হয়, সেটা হলো এফেক্ট সাইজ। অর্থাত নতুন ওষুধ বা নতুন যে প্রসেস বার হলো, সেটা ঠিক কতোটা কার্যকরী, কতোটা চেঞ্জ হচ্ছে বা কতোদিনের জন্য হচ্ছে ইত্যাদি। সাধারন্ত এফেক্ট আইজ বেশী হলে ক্লিনিকালি সিগনিফিক্যান্ট হয়। 


    আর একটা টার্ম খুব ব্যবহার করা হয়, কনফিডেন্স ইন্টারভাল ( সাধারনত ৯৫% কনফিডেন্স ইন্টারভাল )।  এটার মানে হলো, আপনি একটা স্যাম্পেল নিয়ে তার একটা গড় বার করলেন (একে বলে স্ট্যাটিসটিক, খেয়াল করবেন, শেষে s নেই)। তার থেকে পপুলেশানের একই জিনিসের একটা এস্টিমেট চান (একে বলে প্যারামিটার)। তো আপনি যদি এরকম অনেকগুলো স্যাম্পেল নিতেই থাকেন, আর সেগুলোর প্রত্যেকটার স্ট্যাটিসটিক বার করতে থাকেন, তাহলে একটা রেঞ্জ পাবেন আর এই স্যাম্পেলগুলোর ৯৫% ক্ষেত্রে প্যারামিটার এই রেঞ্জের মধ্যে থাকবে। তার মানে কনফিডেন্স ইন্টারভাল কিন্তু প্রোবাবিলিটি না, একটা রেঞ্জ যার মধ্যে পপুলেশান প্যারামিটার পাওয়া যেতে পারে। 


    এরপর রিস্ক রেশিও বা রিলেটিভ রিস্ক। এটার একটা ফর্মুলা আছে, তবে এমনিতে ব্যাপারটা হলো, ধরুন আপনি একটা গ্রুপে ট্রিটমেন্ট করলেন আর আরেকটা গ্রুপে কিছু করলেন না (কন্ট্রোল গ্রুপ)। এবার ট্রিটমেন্ট গ্রুপে অসুহ হওয়ার সম্ভাবনা, আর কন্ট্রোল গ্রুপে অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা, এই দুয়ের রেশিও হলো রিস্ক রেশিও। এটার একটা বেসিয়ান ইন্টারপ্রেটেশান আছে, চাইলে পড়ে নিতে পারেন।  


    এরকম আরও কয়েকটা টার্ম এপিডেমিওলজিতে বা যেকোন রিসার্চ পেপারেই ব্যবহার করা হয়, সময় করে লিখবো। 

  • অরিন | ২১ জানুয়ারি ২০২১ ০৩:৪৪733547
  • anandab, বোধি, ও dc, আপনাদের ধন্যবাদ টপিকটিকে শুরু করে দেওয়ার জন্য | 


    anandab, আপনার প্রশ্ন দিয়েই শুরু করা যাক, "এই যে বিভিন্ন ট্রায়াল ফেজ এ পার্টিসিপেন্ট সিলেকশন হয় এটা কিসের ভিত্তিতে?"


    প্রশ্নটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করে নেওয়া যাক: 


    (১) এই যে বিভিন্ন ধরণের ট্রায়াল ফেজ, এতে কাদের নেওয়া হবে সেটি আদৌ কি করে ঠিক করা হয়?


    (২) কতজনকে নেওয়া হবে কি হিসেবে স্থির করা হয়?


    (৩) কে নতুন ওষুধ / ভ্যাকসিন ইত্যাদি পাবেন আর কে প্লেসিবো পাবেন, সেইটেই বা কি করে স্থির করা হয়?


    ফেজ ১ ট্রায়ালের অর্থ যখন ওষুধ তৈরী করা হল, তার পরে সেই ওষুধ শরীরে কেমন কাজ করবে, শরীর সেই ওষুধটির ওপর কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে, রক্তচলাচল কিভাবে ওষুধটিকে শরীরের বিভিন্ন অংশে বিতরণ করবে, ইত্যাদি নানান রকমের ব্যাপার দেখা হয়। অবশ্য এই ব্যাপারগুলো দেখতে গেলে সুস্থ মানুষ চাই, এবং অল্প সংখ্যক মানুষের ওপরে সেই সমস্ত পরীক্ষা করা হয়। 


    ফেজ ২ ট্রায়াল করতে গেলে ফেজ ১ ট্রায়াল করে যখন দেখা গেল যে পরীক্ষার ওষুধটি নিরাপদ এবং ওষুধটি কিভাবে কাজ করছে বোঝা যাচ্ছে, তখন দ্বিতীয় দফার ট্রায়াল শুরু করা হয়। এবার দেখা হয় একরকমের কিছু মানুষ, যাঁদের অসুখ রয়েছে (বা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের সময় যাঁদের অসুখ নেই, সুস্থ মানুষ), তাঁদের দু-ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়| একদল পরীক্ষার ওষুধ পাবেন, আরেক দল ওষুধের বদলে প্লেসিবো পাবেন | তবে সব সময় যে প্লেসিবো দেওয়া হবে তা নয়, অনেক সময় প্রচলিত ওষুধও দেওয়া হয় (এসব ক্ষেত্রে পরীক্ষার ওষুধটি প্রচলিত ওষুধের বা নিদানের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে) | যাঁদের দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের সকলকেই খুব নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে চিহ্নিত করা হয় | এর অর্থ হল এঁদের ওপর প্রয়োগ করে হয়ত ওষুধটির ভাল মন্দ দেখা যাবে, তবে যেহেতু এই মানুষেরা খুব সীমিত একটি গোষ্ঠীভুক্ত, এঁদের ওপর প্রয়োগের ভিত্তিতে এইটা বলা যাবে না  যে সর্বসাধারণের মধ্যে যখন ওষুধটি প্রয়োগ করা হবে, তখন তার কি প্রভাব / প্রতিক্রিয়া হবে। 


    সেইজন্য ফেজ ৩ দফার ট্রায়াল করতে হয়, যেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বা সর্বসাধারণের মধ্যে ওষুধের কি প্রভাব দেখে নিতে হয় (এখানে ওষুধ আর ভ্যাকসিন বা অন্য ধরণের "intervention" বা বাংলায় নিদান যাকে বলে, সমার্থক বলে ধরে নিতে হবে ) | যেহেতু এবার সর্বসাধারণের মধ্যে পরীক্ষা করে দেখার ব্যাপার রয়েছে, এখানে সমাজের যতটা সম্ভব বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়, জাতিগত পরিচয়, সব যেন সর্বসাধারণের মধ্যে যেমন ধরুন দেশের সেনসাসে যেমনভাবে দেখতে পাওয়া যায়, তেমন হয় | অতএব, একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে যে এই ধরণের ট্রায়ালে বহু মানুষকে নিতে হবে, যত রকমের বৈচিত্র্য সম্ভব ধরতে হবে, ইত্যাদি |


    তবে এর মধ্যেও একটা ব্যাপার থাকে। ওষুধ তো সবাই পেতে পারেন না (মানে যাঁদের প্রয়োজন নেই, তাঁরা খামোকা ওষুধ পাবেন কেন?), ভ্যাকসিনও তাই | ফেজ ২ আর ৩ এর পরীক্ষা যাঁদের ওপর করা হয়, তাঁরা যেন প্রকৃতপক্ষে সেই নিদান থেকে উপকার পেতে পারেন, অন্যথা তাঁদের নিয়ে লাভ নেই | যেমন, মনে করুন, একটি ওষুধ কোম্পানী ডায়বিটিস নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন ওষুধ আবিষ্কার করেছে | সেই ওষুধ বাজারে ছাড়ার আগে পরীক্ষা করার জন্য তারা যখন কাদের ওপর পরীক্ষা করা হবে স্থির করে, তখন সুস্থ সবল মানুষদের কেবল ফেজ ১ এই বাছবে। ফেজ ২ আর ৩ এর জন্য তাদের এমন সব ডায়াবিটিসের রুগীদের নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে যাদের মোটেই ঠিকমতন ডায়াবিটিস কন্ট্রোল হচ্ছে না, তবে না এই নতুন ওষুধের প্রভাব বুঝতে পারা যাবে। 


    আবার করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের কথা ভেবে দেখুন। পরীক্ষা যদি করতে হয় তো ১৬ বছরের কমবয়সীদের ওপর পরীক্ষা করে বিশেষ লাভ নেই, কারণ সেই বয়সের ছেলেমেয়েদের করোনাভাইরাসের অসুখ সেরকম ভাবে হয় না, বরং ১৬ বছরের ওপর, এবং বিশেষ করে ৫০-৫৫ বছর বয়েসের মানুষদের ওপর পরীক্ষা করে নেওয়া সুবিধাজনক যে ভ্যাকসিন দেবার পর তাঁদের মধ্যে কতজন নিরাপদ থাকতে পারবেন ও তাঁদের রোগের ঠিক মতন প্রতিষেধন হল | এই ব্যাপারটি জানলে তারপর জনসাধারণের মধ্যে নিরাপদে ও ঠিকমতন ভ্যাকসিনটি কাজ করবে বলে মনে করা হবে। তা না হলে, যদি ভ্যাকসিনটি ফেজ ২ আর ৩ এর সময় শিশু বা অল্পবয়েসের ছেলেমেয়েদের ওপর পরীক্ষা করে দেখা যায়, যাদের এমনিতেই করোনাভাইরাস সংক্রমণ কম, সেক্ষেত্রে মনে হতে পারে যে ভ্যাকসিনটি বুঝি দিব্যি কাজ করছে, কিন্তু যেইমাত্র সর্বসাধারণের মধ্যে নিয়ে আসা হবে দেখা যাবে ভ্যাকসিনটি হয়ত কাজ নাও করতে পারে। অতএব,  যে অসুখটিকে নিরাময় বা প্রতিষেধনের কথা ভাবা হচ্ছে তার গতিপ্রকৃতি  বিচার করা ভ্যাকসিন গবেষণা বা ক্লিনিকাল ট্রায়ালে  অবশ্যকর্তব্য | 


    এর পরে আপনি ভাবতে পারেন যে যাঁদের নেওয়া হবে, তাঁদের কোথায় পাওয়া যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়, তবে বিচার্য | আমরা এই সিরিজে পরে বায়াস বা একদেশদর্শিতা নিয়ে যখন লিখব, তখন দেখব কেন এই ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ, এখন সংক্ষেপে কাজ সারার জন্য লিখি যে, নানান জায়গা থেকে এঁদের পাওয়া যেতে পারে, নির্ভর করবে কি ধরণের নিদান নিয়ে ট্রায়াল করছেন। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে সমাজের সর্বত্র থেকে যতজন মানুষ পাওয়া যায়, ততই ভাল, তাই দেখবেন ইন্টারনেট / ওয়েবে অ্যাড দেওয়া হয়, (আপনাদের মনে থাকতে পারে যে গত বছর হাইড্রকসিক্লোরোকুইন নিয়ে ট্রায়াল দেবার সময় ফেসবুক থেকে ট্রায়ালের জনগণ জোগাড় করা হয়েছিল) | অনেক সময়  ইনসিওরেন্স  কোমপানীর সূত্রে মানুষকে আমন্ত্রণ করা হয়, কখনো কখনো হয়ত Mall বা Supermarket এ বিজ্ঞাপণ দেখে থাকবেন। কখনো কখনো ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপণ দেওয়া হয়, রেডিওতে বিজ্ঞাপণ দেওয়া হয়, হাসপাতালের নোটিস বোর্ডে বিজ্ঞাপণ দেওয়া হয় অনেক সময়ে, ডাক্তারের ক্লিনিকে অপেক্ষা করার ঘরটিতে অনেক সময় নোটিস দেওয়া থাকে। আবার বহু কোম্পানী রয়েছে যারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অংশ নিতে ইচ্ছুক বলে ডাটাবেস তৈরী করে রাখে, সময়মত ট্রায়াল যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেন। 


    এখন সবাইকে যে নেওয়া হবে তা নয়, সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। 


    ক'জনকে নিয়ে ট্রায়াল হবে সেটি কি করে স্থির করা হয়? এই ব্যাপারটি মূলত স্ট্যাটিসটিকসের বিষয়, তবে সংক্ষেপে কতজনকে নিয়ে ট্রায়াল দেওয়া হবে সেটি দেখতে গেলে দুটি বিষয়ের দিকে মন দিতে হয়। এক, ওষুধ / নিদান প্রয়োগ করে "কি দেখতে চান" (ইং: outcome), এবং নিদান না পড়লে শতকরা কত জন লোকের অসুখ হবে | যেমন ধরুন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের পরীক্ষায় ট্রায়ালিস্টরা দেখতে চাইছিলেন যে ভ্যাকসিন যদি না দেওয়া হয়, তাহলে জনসমাজে কতজন মানুষের ভ্যাকসিন না পাওয়া অবস্থায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। এঁরা সিডিসি'র করোনাভাইরাস ডাটা ট্র্যাকার বিচার করে স্থির করেছিলেন যে যদি ভ্যাকসিন না থাকে, তাহলে গড়ে ১০০০ জনে ১৩ জন লোকের প্রতি সপ্তাহে নতুন করে করোনাভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। 


    দুই, নিদানটির উপযোগিতা কতটা (ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে একে বলা হয় ভ্যাকসিন এফিকেসি, অর্থাৎ ভ্যাকসিন দিলে কতটা প্রতিরোধ করা যায়, এর একটি সহজ ফরমুলা হল এইরকম:


    ভ্যাকসিন এফিকেসি = (ভ্যাকসিন পাননি এমন কতজন আক্রান্ত - ভ্যাকসিন পেয়েছেন কতজন আক্রান্ত ) / ভ্যাকসিন পাননি এমন কতজন আক্রান্ত


    এর  মধ্যে ( ভ্যাকসিন পেয়েছেন কতজন আক্রান্ত / ভ্যাকসিন পাননি এমন কতজন আক্রান্ত ) এই যে সংখ্যা তাকে "Relative Risk" বা বাংলায় ধরুন তুলনামূলক রিস্ক বলা হয়। যেমন, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে ফাইজার  কোমপানী ভ্যাকসিন এফিকেসি ৬০% ধরেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাধারণভাবে কোভিডের ক্ষেত্রে স্থির করেছেন ভ্যাকসিন যেন অন্তত ৫০% এফিকেসি দেখায়, নাহলে ছাড়পত্র পাওয়া যাবে না। 


    এই দুটি বিষয়ই প্রধান, তাছাড়া আরো কয়েকটি সংখ্যাতাত্ত্বিক বিষয় বিবেচনা করে মোট কতজনকে নিয়ে ট্রায়াল দেওয়া যাবে, (শুধু ভ্যাকসিন নয়, সব রকমের নিদানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য), এই অঙ্কগুলো নির্ধারিত হয়। উৎসাহী পাঠকরা ওয়েব  ঘেঁটে দেখতে পারেন যে নানান রকমের গণক পাওয়া যায়, আমি ক্লিনিক্যালক নামে গণকের  একটা উদাহরণ দিলাম |


    এই করে স্থির করা হয় মোট কতজনকে নিয়ে গবেষণা হবে। করোনাভাইরাসের ফেজ ২/৩ ট্রায়ালের বর্ণনা দিতে গিয়ে ফাইজার কোমপানী যেমন লিখেছে যে তাদের নানান অঙ্কের ভিত্তিতে তারা স্থির করেছে প্রায় ৪৪, ০০০ লোক লাগবে (সূত্র: https://pfe-pfizercom-d8-prod.s3.amazonaws.com/2020-11/C4591001_Clinical_Protocol_Nov2020.pdf  )


    এই সংখ্যা স্থির করার পরে দেখা গেল কারা ট্রায়ালে আসবেন, এবং সর্বমোট কতজনকে নিয়ে ট্রায়াল দেওয়া হবে। এর পরে, ট্রায়ালের যদি দুটি "বাহু" থাকে, (ইং: Arm), তাহলে একেক পক্ষে কতজন কে নিয়ে করতে হবে, সেটিও বোঝা যাচ্ছে, যে মোট যতজনকে নিয়ে করতে হবে তার অর্ধেক একেক "বাহুতে" দিতে হবে (এখন ব্যাপারটা এখানে অতি সরলীকরণ হয়ে গেল, এর আসল সংখ্যাতাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো সাংঘাতিক জটিল, এবারে প্রাথমিক বোঝানোর  এইটুকুই এই লেখার জন্য থাক, জটিল ব্যাপারগুলো, বা অন্যান্য ট্রায়াল ডিজাইন নিয়ে লিখতে গেলে এখানে মহাভারত হয়ে যাবে, লেখা এগোন দুষ্কর, :-) ) |  তা সেটা কি করে স্থির করতে হবে? তার মানে, ব্যাপারটি এমন ভাবে করতে হবে যেন কোথাও কোন পক্ষপাতিত্ত্ব না থাকে। না হলে মুশকিল। 


    মনে করুন, আপনি উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পারে এমন একটি ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। পরীক্ষা করে দেখানোর সময় বা ট্রায়ালের সময় আপনি আপনার ওষুধ দিলেন এমন সব মানুষদের যাদের রক্তচাপ বেশী কিন্তু এমনিতে ওষুধ নিলে কমতির দিকে থাকে, আর তুলনা করার জন্য এমন সব রুগীদের নিলেন যাদের রক্তচাপ বরাবরই আপনার ওষুধ নেওয়া লোকেদের তুলনায় অনেকটাই বেশী |  এর পর যদি আপনি দেখাতে সক্ষম হন যে রক্তচাপ কমল আপনার ওষুধের জেরে, তাহলে সেটা ঠিক হবে না, কারণ দু-পক্ষ ঠিক এক রকম ছিল না। এই ব্যাপারগুলো, যাতে উভয়পক্ষ, যাঁরা ওষুধ বা ভ্যাকসিন পেলেন আর যাঁরা পেলেন না, তাঁরা যাতে একরকম থাকেন তার জন্য রান্ডম নম্বরের টেবিলের সাহায্য নিয়ে একদলকে ওষুধ আর আরেকদলকে প্লেসিবো বা অন্য নিদান দেওয়া হয়ে থাকে। তবে  এতে আরো একটা ব্যাপার আছে। ট্রায়াল এমনভাবে করলে ভালো যাতে কে কে ওষুধ পাচ্ছেন আর কে অন্য নিদান বা প্লেসিবো পাচ্ছেন, সেটি যেন পরীক্ষা যাঁদের ওপর করা হচ্ছে তাঁরা, না যাঁরা পরীক্ষা করছেন তাঁরা, দু-পক্ষই না জানতে পারেন। এই ব্যাপারটিকে চিকিৎসার বা ট্রায়ালের পরিভাষায় বলা হয় "উভয় পক্ষ অন্ধ" (ইং: double blind) | সেটা না হলে সম্পূ্র্ণ সততা রক্ষা সম্ভব নাও হতে পারে। আরেক ধরণের ট্রায়াল, তার নাম open label trial, সেখানে উভয় তরফ (যাঁদের  ওপর পরীক্ষা হচ্ছে, আর যাঁরা পরীক্ষা করছেন) জানতে পারেন কে কি পেলেন। এই যে রান্ডম নম্বর মেনে একদল ওষুধ পেলেন, আর আরেক দল অন্য নিদান পেলেন, এই ব্যাপারটি যে ধরণের পরীক্ষায় হয়, তার নাম "Randomised controlled trial" | রাণ্ডম নম্বর টেবিলের সাহায্যে দু পক্ষকে অন্ধকারে রেখে ওষুধ ও প্লেসিবো বা চলতি নিদান দানের ভিত্তিতে যে ট্রায়াল, সেই ট্রায়ালই সর্বোচ্চ বিবেচিত হয়। 


    আপাতত এই পর্বে এইটুকুই | সবে শুরু হল। এর পর আমরা কয়েকটি ট্রায়াল দেখব এবং দেখব তাতে এই যে কথাগুলো লিখলাম কতটা মেনে সে সব ট্রায়াল করা হয়েছে। যখন ট্রায়ালের রিপোর্ট পড়বেন, তখন খেয়াল রাখবেন যে কাদের নিয়ে ট্রায়াল করা হয়েছে, কতজনকে বাছা হয়েছে সে সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে কি না, এবং কিভাবে যাদের নিয়ে ট্রায়াল দেওয়া হল, তাদের কে কোন "বাহুতে" রয়েছেন  কিভাবে স্থির করা হল। শুধু রান্ডম নম্বরের ভিত্তিতে হয়েছে বলাটাই যথেষ্ট নয়, আসলে তাই করা হয়েছে কিনা সেটিও দেখে নিতে হয়। 


    প্রশ্ন এবং মন্তব্য চলুক। তারপর পরবর্তী অধ্যায় শুরু করব।


     

  • অরিন | ২১ জানুয়ারি ২০২১ ০৩:৪৮733548
  • ফাইজারের কোভিডের ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে কতজনকে নেওয়া হবে তার হিসেব,

  • anandaB | 50.125.255.229 | ২১ জানুয়ারি ২০২১ ০৭:৪৫733549
  • ধন্যবাদ অরিন , খুব ভালো লিখেছেন ।....আর একটু ভালো করে পড়ে নতুন কোনো প্রশ্ন থাকলে করবো 


    ততদিন চোখ রাখছি এই টপিক এ :)

  • অরিন | ২২ জানুয়ারি ২০২১ ০২:১৯733553
  • anandab, আপনার উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্যের জন্য অজস্র ধন্যবাদ। 


    গতকালের লেখার পরে আজকে দুটো রিপোর্ট দিয়ে শুরু করব কি করে এই লেখাগুলো পড়লে মোটামুটি দ্রুত কিন্তু সহজভাবে এদের বক্তব্যগুলো বোঝা যাবে | সাধারণত রানডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়ালকে অনেকে "স্বর্ণমান" বলে ধরে নেন, এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। 


    যাইহোক, প্রশ্ন এবং কমেন্টের অপেক্ষায় রইলাম। 

  • অরিন | ২২ জানুয়ারি ২০২১ ১৫:৩৫733558
  • ফাইজারের ভ্যাকসিন ট্রায়ালের রিপোর্ট টি দিয়ে শুরু করা যাক। একে বিশ্লেষণ করে দেখি | লেখাটি এইখানে পাবেন:

    https://www.nejm.org/doi/pdf/10.1056/NEJMoa2034577?articleTools=true

     

    (এটি পিডিএফ), সারসংক্ষেপটি এইরকম:

     

     

    সারসংক্ষেপটি পড়লে এক লপ্তে প্রচুর কথা এঁরা বলেছেন দেখুন:

     

    এক, এটি অনেকগুলো দেশের ট্রায়াল (multinational), 

    দুই, যাঁরা ভ্যাকসিন পাননি তাঁরা অন্তত এমন কিছু পাননি যাতে কোভিডের থেকে রক্ষা পাওয়া যায় (তাই প্লেসিবো, যে কথার মানেআমি খুশী করি!”)

    তিন, যাঁরা গবেষণা করেছেন তাঁরা জানতেন না কারা ভ্যাকসিন পেয়েছেন আর কারা পান নি (তাই অবজারভার ব্লাইনডেড)

    চার, এই ট্রায়ালের ভিত্তিতে স্থির করা হবে ভ্যাকসিন দেবার অনুমতি দেওয়া হবে না হবে না (তাই পিভটাল)

    পাঁচ, এটি একটি এফিকেসি ট্রায়াল, মানে খুব নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ট্রায়ালটি করা হচ্ছে, আসলে জনসমাজে কি হতে পারে কে জানে! (এই ব্যাপারটি সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য)

    ছয়, এঁরা রানডম নম্বরের সাহায্যে স্থির করেছিলেন কে ভ্যাকসিন পাবেন আর কে পাবেন না (তাই কি? পরে আমরা দেখব) |

    সাত, এখানে ১৬ বছর বয়েসের উর্দ্ধে যাদের বয়স, কেবল তাদেরই নেওয়া হয়েছে। (তার মানে ১৬ বছরের নীচে যাদের বয়স তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের কি প্রভাব আমরা জানি না অন্তত এই গবেষণা থেকে বোঝা যাবে না)

    আট, ভ্যাকসিনটি স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে তৈরী করা হয়েছে। 

    নয়,তেতাল্লিশ হাজার সাড়ে পাঁচশো লোককে প্রথমে নিযুক্ত করা হয়েছিল, শেষ অবধি ১০০ জন বাদে ইনজেকশন নিয়েছিলেন (বাকী একশো জনের কি হল?)

    দশ, ভ্যাকসিন যাঁরা নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে জন, আর যাঁরা নেননি বা দেওয়া হয়নি তাঁদের মধ্যে ১৬২ জনের কোভিড ধরা পড়েছিল দ্বিতীয় ডোজ নেবার অন্তত সাত দিন পর (মানে কোভিড থেকে রক্ষা পেতে গেলে অন্তত দুটি ডোজ পড়তে হবে, তবে বোঝা যাবে!), অতএব (১৬২ - )  / ১৬২ মানে ৯৫% রক্ষা পাওয়া যাবে, তার মধ্যেও, এই গবেষণা যদি ১০০ বার করা যায়, তাহলে ভ্যাকসিন নিলে কোভিড থেকে বাঁচবার চানস ৯০ থেকে ৯৭%

     

    এইটুকু পড়লে বোঝা যাচ্ছে যে ফাইজারের ভ্যাকসিন মোটামুটি নিরাপদ এবং কাজের।

    অনেকে হয়ত এইটুকু পড়েই খুশী, তবে আমরা বলব আরো একটু এগিয়ে পুরো লেখাটা পড়ার | 

    কেন?

    কারণ কতগুলো ব্যাপার এঁরা সারসংক্ষেপে বলেননি যার জন্য পুরো লেখাটা পড়া চাই। যেমন,

    এক, কোন কোন দেশের লোক ট্রায়ালটিতে অংশ গ্রহণ করেছিলেন? (সেটি জানলে বোঝা যাবে যে এই ট্রায়ালে বিশেষ করে কোন দেশের মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)

    দুই, প্লেসিবো মানে কি দেওয়া হয়েছিল? (জানার দরকার আছে কি? আছে, কারণ তাহলে বোঝা যাবে যে সত্যি সত্যি কতটা উপকার হয়েছে)

    তিন, রানডম মানে ঠিক কিভাবে করা হয়েছিল? (না হলে আমরা জানব কি করে যে সত্যি ওরা রানডম ট্রায়াল করেছিল কি না)

    চার, কে কবে কিভাবে আক্রান্ত হল?

     

    তার পরেও যে কথাটা আমাদের আলোচনার বিষয়, সেটি এই যে, ট্রায়ালের ফলে যে তথ্য পাওয়া গেল, তাকে কিভাবে পর্যালোচনা করব? তা আমার কোন কাজে লাগবে?

     

    এর পরের বার পর্যায়ক্রমে সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব,  রিপোরটের একেকটি অংশ ধরে | 

  • অরিন | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ০৮:১৬733562
  • অ্যাবস্ট্র্যাকট পড়তে গিয়ে দেখা গেল, একসঙ্গে অনেক কিছু জানা হয়ে গেল। তবে পড়তে গেলে এর পর সোজা চলুন এদের মেথড সেকশনটায় যাই | দেখা যাক, এঁরা কি করে এইসব সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, তারপর না হয় এদের রেজাল্টের ব্যাপারটা দেখা যাবে | 


    গোটা পেপারটি এইখানে: https://www.nejm.org/doi/full/10.1056/NEJMoa2034577


    যে প্রশ্নগুলো দিয়ে শুরু করেছিলাম, এক এক করে দেখা যাক |


    "কোন কোন দেশের লোক ট্রায়ালটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন? "


    নাহ, এ প্রশ্নের উত্তর মেথডস সেকশনে নেই  (আছে রেজাল্টের সেকশনে, আমরা এর পর তার পর্যালোচনা করব) |


    যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের কি করে পাওয়া গেল? তাতে এঁরা বলছেন,


    "With the use of an interactive Web-based system, participants in the trial were randomly assigned in a 1:1 ratio to receive 30 μg of BNT162b2 (0.3 ml volume per dose) or saline placebo. Participants received two injections, 21 days apart, of either BNT162b2 or placebo, delivered in the deltoid muscle. Site staff who were responsible for safety evaluation and were unaware of group assignments observed participants for 30 minutes after vaccination for any acute reactions."


    এতে করে একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে যে, আপনার যদি ইন্টারনেট ও ওয়েব চালু থাকে, তবেই আপনি এই ট্রায়ালে অংশ নিতে পারবেন। তার মানে ধরুন যাদের ওয়েব একসেস নেই, সেইসব মানুষের ক্ষেত্রে এই ট্রায়াল থেকে যা জানা গেল সেটি খাটবে কি? প্রশ্নটা উঠবে কারণ যাদের ধরুণ ওয়েব একসেস নেই, তাদের মধ্যে অনেকে গরীব, অনেকে নানান কারণে এই সুযোগ সুবিধা পান না। তৃতীয় বিশ্বে বহু লোকের ওয়েব একসেস নেই, আপনি যদি হুবহু এই ট্রায়াল নিজের দেশে হাতে কলমে করে দেখতে চান, আপনি বহু লোককে নিতে পারবেন না। একটা ব্যাপার নজর করে দেখুন, তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে, তাছাড়া ভারতে বা ভারতীয় উপমহাদেশে কিন্তু এই ভ্যাকসিনটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। যাই হোক, এগোনো যাক। 


    যাঁরা ভ্যাকসিন পেলেন না, তাঁরা বাহুতে নুন জল পেলেন | 


    ভ্যাকসিন যদি সত্যি সত্যি কাজে দেয়, তাহলে নৈতিকতার একটা প্রশ্ন উঠবে যে, এই মানুষগুলোকে কত দ্রুত ভ্যাকসিন দেবার বন্দোবস্ত করতে হবে , তাঁদের কাছ থেকে ভ্যাকসিন সরিয়ে রাখা চলবে না। তবে তার থেকেও বড় কথা যদি গবেষণা চলাকালীন মানুষের বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দেয় তখন কি হবে? তার বন্দোবস্ত এঁরা রেখেছেন যে সেক্ষেত্রে ট্রায়াল বন্ধ করে দেয়া হবে যদি দেখা যায় যে ৫% বেশী লোকের সাংঘাতিক রকম লক্ষণ দেখা দিচ্ছে |


    এঁরা  যে লিখেছেন রাণ্ডম নম্বর মেনে ভ্যাকসিন বনাম নুন-জল দিয়েছেন, কি ধরণের রাণ্ডম নম্বর মেনে? দেখা যাচ্ছে এঁদের গবেষণার বর্ণনায় সে কথাও লেখা নেই | তাহলে কি সত্যি সত্যি রানডম নম্বর মানা হয়েছিল? আমরা জানি না (তাতে কোন অসুবিধে হয়েছিল কি না, পরে দেখব) | 


    এখন এই ব্যাপারগুলো আপৎকালীন গবেষণায় এক রকম করে বিচার্য, অন্যরকম অবস্থায় তার অন্য ব্যাপার। পরে আমরা গ্রেড নামে একটি গবেষণা বিচার করার ব্যাপার দেখব, তখন আরেকটু বিশদে এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে। 


    যে কথাটা লিখে এবারের মত আলোচনা শেষ করব সেটি এই যে, ধরুন কেউ বুঝতে পারলেন বা সন্দেহ করলেন যে তিনি নুন জল পেয়েছেন, তখন জেদ ধরলেন যে তাঁকে টিকা দিতে হবে, _এবং_ টিকা পেলেন, তখন কি হবে? গবেষকরা জানাচ্ছেন যে সেক্ষেত্রে এমন ভাবে ডাটা বিশ্লেষণ করতে হবে যেখানে প্রথমে যে যা পেয়েছিল সেভাবেই ডাটা বিশ্লেষণ করতে হবে। একে বলে "intention to treat" | ট্রায়াল পড়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে গবেষকরা intention to treat অবলম্বন করেছেন কি না (কি কারণ এর পরের বার দেখব) | তা এঁরা কি করেছিলেন?


    "The modified intention-to-treat (mITT) efficacy population includes all age groups 12 years of age or older (43,355 persons; 100 participants who were 12 to 15 years of age contributed to person-time years but included no cases)."


    তো মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে  যে দু-একটা জায়গা বাদে গবেষণাটি নিয়ম মাফিকই করা হয়েছিল।


    রেজাল্ট পড়ার ব্যাপারটি এর পর।


    প্রশ্ন? মন্তব্য?

  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ০৯:৫৭733565
  • আজকেই পড়লাম। খুব ভালো লেখা হচ্ছে। সহজ বাংলায় এই রকম লেখা আরো বার হওয়া দরকার। পুস্তিকার মতো ছাপিয়ে বার করতে পারলে আরো ভালো।

  • anandaB | 50.125.255.229 | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ১০:০৮733566
  • কন্টেন্ট নয় , এই লেখাটির স্ট্রাকচার নিয়ে একটা কথা মনে হলো 


    একটা ব্লগ এর আকারে লেখাটার বিভিন্ন পর্ব থাকলে ফলো করতে সুবিধা হতো , এখন যেটা হচ্ছে এই লিনিয়ার /সিরিয়ালইজড ব্যাপারটায় কোনটা লেখার অংশ আর কোনটা কমেন্ট একটু ঘেঁটে যাচ্ছে 

  • dc | 2405:201:e010:501b:18ee:7431:f3f8:906f | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ১০:২৬733567
  • "এতে করে একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে যে, আপনার যদি ইন্টারনেট ও ওয়েব চালু থাকে, তবেই আপনি এই ট্রায়ালে অংশ নিতে পারবেন। তার মানে ধরুন যাদের ওয়েব একসেস নেই, সেইসব মানুষের ক্ষেত্রে এই ট্রায়াল থেকে যা জানা গেল সেটি খাটবে কি"


    খুব ভালো অবসার্ভেশান। ​​​​​​​এর ​​​​​​​থেকে ​​​​​​​জানা ​​​​​​​যাচ্ছে সিলেকশান ​​​​​​​বায়াস ​​​​​​​ছিলো, ​​​​​​​বা ​​​​​​​বলা ​​​​​​​যায় ​​​​​​​যে ​​​​​​​এক্সটার্নাল ​​​​​​​ভ্যালিডিটি ​​​​​​​বা জেনারাইজেবিলিটি ​​​​​​​নেই। ​​​​​​​এই ​​​​​​​গবেষণার ​​​​​​​ফল ​​​​​​​একটি ​​​​​​​বিশেষ সোশিও-ইকোনমিক ​​​​​​​গ্রুপের ​​​​​​​জন্য। লেখকরা ​​​​​​​নিজেরাও ​​​​​​​কিছুটা ​​​​​​​অয়াড্রেস ​​​​​​​করেছেনঃ This report does not address the prevention of Covid-19 in other populations, such as younger adolescents, children, and pregnant women


    "যে কথাটা লিখে এবারের মত আলোচনা শেষ করব সেটি এই যে, ধরুন কেউ বুঝতে পারলেন বা সন্দেহ করলেন যে তিনি নুন জল পেয়েছেন, তখন জেদ ধরলেন যে তাঁকে টিকা দিতে হবে, _এবং_ টিকা পেলেন, তখন কি হবে?"


    এক্ষেত্রে ​​​​​​​কিন্তু ​​​​​​​পেপারে ​​​​​​​লেখা ​​​​​​​আছে, Site staff who were responsible for safety evaluation and were unaware of group assignments observed participants for 30 minutes after vaccination for any acute reactions. অর্থাত ডাবল ব্লাইন্ড, যা কিনা আরসিটির প্রোটোকল মেনে করা হয়েছে। 


    আমার ​​​​​​​একটা ​​​​​​​কথা ​​​​​​​মনে ​​​​​​​হলো, ​​​​​​​লেখকরা ​​​​​​​কোনরকম ​​​​​​​কনফাউন্ডিং ​​​​​​​ফ্যাক্টর নিয়ে ​​​​​​​আলোচনা ​​​​​​​করেন ​​​​​​​নি, যা ​​​​​​​আমার ​​​​​​​মতে ​​​​​​​এই ​​​​​​​কোভিড ​​​​​​​এর ​​​​​​​ক্ষেত্রে ​​​​​​​বিশেষ ​​​​​​​গুরুতঅপূর্ণ। ​​​​​​​হয়তো ওনাদের স্যাম্পেলে ​​​​​​​কোন ​​​​​​​কো-মর্বিডিটি ইত্যাদি ​​​​​​​ছিলো ​​​​​​​না, ​​​​​​​যদিও ​​​​​​​সেকথা ​​​​​​​লেখা ​​​​​​​নেই। ​​​​​​​অরিন ​​​​​​​বাবুর ​​​​​​​কি ​​​​​​​মনে ​​​​​​​হয়? ​​​​​​​

  • অরিন | 161.65.237.26 | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ১৫:০৩733569
  • অভ্যু, খুব ভাল লাগল।অজস্র ধন্যবাদ।


    ananadab, ঠিক বলেছেন, এটাকে ব্লগে নিয়ে যাওয়াই ভাল।


    dc, randomized control trial এর ডিজাইনের এইটাই বড় পয়েন্ট যে কনফাউন্ডিং ভ্যারিয়েবল আলাদা করে কনট্রোল করতে হয় না। 

  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ২১:৫৩733571
  • আমার কাজ মূলতঃ ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্যাটিসটিকস নিয়ে, বায়োস্ট্যাট বা এপিডেমিওলজি নিয়ে জ্ঞান নেই বললেই হয়। আমাদের একটা ফাণ্ডামেন্টাল প্রিন্সিপল হল block what you can, randomize what you cannot। র‌্যান্ডমাইজেশনের প্রধান কাজই হল লার্কিং ভেরিয়েবলকে সমঝে রাখা।

  • dc | 2405:201:e010:501b:18ee:7431:f3f8:906f | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ২৩:৫৫733572
  • অরিন আর অভ্যু ঠিক বলেছেন, মাই ব্যাড :-)

  • অরিন | ২৪ জানুয়ারি ২০২১ ০৩:৫০733573
  • এবারে রেজাল্টের সেকশনটি দেখে নেওয়া যাক। তবে সেখানে যাবার আগে অভ্যু আর dc কে অজস্র ধন্যবাদ, আলোচনাটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য, যার জন্য ডিসির লেখা দুটি অবজার্ভেশন দিয়ে রেজাল্ট পড়ার পর্বটা শুরু করছি।


    ডিসি'র প্রথম observation, 


    "এক্ষেত্রে কিন্তু ​​​​​​​পেপারে ​​​​​​​লেখা ​​​​​​​আছে, Site staff who were responsible for safety evaluation and were unaware of group assignments observed participants for 30 minutes after vaccination for any acute reactions. অর্থাত ডাবল ব্লাইন্ড, যা কিনা আরসিটির প্রোটোকল মেনে করা হয়েছে। "


    সত্যি তো! ট্রায়াল যদি ডাবল ব্লাইনড হয়, দু-দলই যদি কে কি পেলেন আর দিলেন এই ব্যাপারে "কানা" হন, তাহলে কেউ জেদ ধরে যদি বলেন আমার ওষুধ চাই, তাহলে সেটা কি করে সম্ভব? 


    ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয়, বরং অনেকটা রেস্তোঁরায় খেতে যাওয়ার মতন। ধরুন, রেস্তোঁরায় খেতে গেছেন, গিয়ে ওয়েটারকে চুপি চুপি বললেন আমাদের পাশের টেবিলে ভদ্রলোক যে খাবারটা খাচ্ছেন, ওইটা আমার চাই, ব্যাপারটা সেইরকম। ট্রায়ালে যিনি ধরুন প্লেসিবো পেয়েছেন তিনি সত্যি সত্যি জানেন না প্লেসিবো পেয়েছেন  কিনা, কিন্তু ধরুণ ভেবে নিলেন। নিয়ে পরের ডোজটা নেবার সময় জেদ ধরে বসলেন যে তিনি যে সিকুয়েনস বা যে প্রোটোকলে এর পর যা পাবেন, তার উল্টো জিনিসটি তাঁর চাই | এখন  এথিকস (বা রিসার্চের নীতি অনুযায়ী), যিনি অংশগ্রহণকারী, তাঁর একটি অগ্রাধিকার থাকে, কাজেই যিনি ম্যানেজার, তিনি জোর জবরদস্তি করে প্রোটোকল অনুসরণ করতে পারেন না, অংশগ্রহণকারীর দাবী অনুযায়ী উল্টো জিনিসটি দিতেই হয়। এখন এটি গবেষণার শুরুতে হতে পারে (মানে রানডমাইজ করার ঠিক পরে), বা অন্য যেকোন সময় হতে পারে। 


    এইবারে হল মুশকিল। কারণ অংশগ্রহণকারী যে শিডিউলে নথিবদ্ধ ছিলেন, সেইটা রক্ষা করা গেল না,  কারণ তিনি দল পাল্টে অন্য দলে চলে এলেন। তা এরকম হলে যখন ডাটা বিশ্লেষণ করা হবে, প্রোটোকল অনুযায়ী কে কোন দলে শেষ অবধি চলে গেলেন সেইভাবে করলে ঠিকমতন বিশ্লেষণ করা যাবে না (যদিও তারও একটা ভূমিকা আছে, আপাতত  লেখাটাকে সোজাসাপটা রাখার জন্য আর জটিল করছি না), তাই যে যা প্রথমে পেয়েছিলেন, সেই মত analysis করা হয়। এতে হয়ত analysis একটু conservative হতে পারে, তাহলেও ওষুধের কার্যকারিতা বুঝতে করতেই হয়। 


    এর পর ডিসি'র দ্বিতীয় পয়েন্টটার এবং অভ্যুর, আমার, আর ডিসি'র "ঠিক বলেছেন" এর সূত্র ধরে রেজাল্টের বিশ্লেষণ করা যাক। :-)

  • অরিন | ২৪ জানুয়ারি ২০২১ ০৭:৪৯733574
  • যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম ডিসি লিখেছেন 


    "আমার একটা ​​​​​​​কথা ​​​​​​​মনে ​​​​​​​হলো, ​​​​​​​লেখকরা ​​​​​​​কোনরকম ​​​​​​​কনফাউন্ডিং ​​​​​​​ফ্যাক্টর নিয়ে ​​​​​​​আলোচনা ​​​​​​​করেন ​​​​​​​নি, যা ​​​​​​​আমার ​​​​​​​মতে ​​​​​​​এই ​​​​​​​কোভিড ​​​​​​​এর ​​​​​​​ক্ষেত্রে ​​​​​​​বিশেষ ​​​​​​​গুরুতঅপূর্ণ। "


    এই মন্তব্যটি এক্ষেত্রে সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ | কনফাউন্ডিং ব্যাপারটি একটু দেখে নেওয়া যাক | 


    মনে করুন কোথাও ভ্যাকসিন নিয়ে স্টাডি করা হচ্ছে  এবং রানডম নম্বর দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের ভাগ করা হচ্ছে না। এও দেখা গেল যে ভ্যাকসিন প্রাপকদের মধ্যে বেশীর ভাগ মানুষ যুবক-যুবতী, আর নুন-জল প্রাপকদের মধ্যে বেশীর ভাগ বয়স্ক। পরীক্ষার শেষে দেখা গেল যে ভ্যাকসিন যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে কোভিডের সংক্রমণের হার কম। এ থেকে কি নিশ্চিত হওয়া যায় যে ভ্যাকসিনের সত্যি কাজ করেছে কি না?


    সেটি বুঝতে গেলে নীচের ব্যাপারটি বিবেচনা করুন:


    নীচের সমীকরণটি বিবেচনা করুন


    ভ্যাকসিন <---  বয়স (কনফাউনডিং ফ্যাকটর)  -----> কোভিড


    সমীকরণটির বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে যে যেহেতু অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সীরা ভ্যাকসিন পেয়েছেন, তাই বয়সের হিসেবে একটি তারতম্য রয়েছে | আবার আমরা এও জানি যে অল্পবয়সীদের মধ্যে কোভিডের সংক্রমণ কম। কাজেই এই গবেষণা থেকে এটা বোঝা সম্ভব নয় যে অল্প বয়স না ভ্যাকসিন, সংক্রমণ কমে আসার জন্য কোনটি দায়ী | বয়স এক্ষেত্রে "কনফাউন্ডিং" হিসেবে কাজ করবে। 


    কনফাউন্ডিং-এর প্রভাব অনেক রকমভাবে মিটিয়ে দেওয়া যায়, তার মধ্যে রান্ডম নম্বর ধরে কে ওষুধ পেলেন আর কে প্লেসিবো পেলেন অন্যতম | সেটা না হলে যেটিকে কনফাউন্ডিং বলে মনে করা হচ্ছে, তাকে ডাটা বিশ্লেষণের সময় "কন্ট্রোল" করতে হয় | যেমন ধরুণ আলাদা করে যুবকদের আর বয়স্কদের নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখতে হয় যে কোন গ্রুপে কেমন সংক্রমণ হল, তারপর দুটি গ্রুপকে স্ট্যাটিসটিকালি জুড়ে দেওয়া হয় (সে সব ব্যাপার আমাদের এই লেখার আওতার বাইরে) | 


    সত্যি সত্যি রানডম ভাবে কে ভ্যাকসিন আর কে প্লেসিবো পেলেন বুঝবেন কি করে? 


    এর জন্য আর্টিকেলটির ১ নম্বর টেবিলটি দেখুন (প্রায় সব রানডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়ালের রিপোর্টের ১ নম্বর টেবিলটিতে এই তথ্য থাকবে):


    দেখুন:


    ১) পুরুষ এবং মহিলা, এক রকমের ভাগাভাগি


    ২) জাতের রঙ (সাদা/কালো/বাদামী), ওষুধ আর প্লেসিবোর মধ্যে সমানভাবে বন্টন করা হয়েছে,  (আমরা জানি যে জাতি বিশেষে কোভিডের প্রকোপ বেশী কম, সাদাদের মধ্যে অনেকটাই বেশী)


    আরো দেখুন,


    স্টাডি করা হয়েছে মূলত আমেরিকা, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা আর আরজেনটিনার লোকেদের ওপরে | স্বভাবতই আপনি ভাবতে পারেন, অন্য দেশের লোকেদের ওপর, ধরুণ এশিয়া কি ইউরোপের লোকেদের ব্যাপারে আমরা এই রিসার্চ থেকে কি ভাবতে পারি? বা ধরুন আফ্রিকা মহাদেশের অন্যান্য দেশের লোকেদের বেলাতেই বা এই ভ্যাকসিনের প্রভাব নিয়ে কি ভাবতে পারি? এই স্টাডির রেজাল্ট কি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? এই প্রশ্নগুলো তোলা যুক্তিসঙ্গত | 


    তবে এই যে দেখছেন ওষুধ আর প্লেসিবোতে প্রায় একরকমের আড়াআড়ি ভাগ, এই ব্যাপারটা আপনাকে জানাচ্ছে যে এঁরা ঠিকমতন রানডমাইজ করেছিলেন। এই ধরণের স্টাডি পড়তে গেলে এই ব্যাপারটি খেয়ালে রাখবেন|


    এগোন যাক। 


    এ ভ্যাকসিন যে সত্যি কাজে দিয়েছে এরা জানছে কি করে? 


    এবার আরেকটি ছবি দেখুন,



    এবার দেখুন, ওষুধ যে কাজ করেছে তার স্বপক্ষে প্রমাণ কি? প্রায় সমস্ত এই ধরণের স্টাডিতে  এমন একটি টেবিল দেখতে পাবেন। এরা যে বলছে ৯৫% ভ্যাকসিন এফিকেসি, এর মানে কি?


    ১) যে সমস্ত অংশগ্রহণকারীর কোভিডের কোন লক্ষণ কখনোই ছিল না (যাদের লক্ষণ ছিল তাদের নিয়েও ডাটা দেওয়া আছে, মূল আর্টিকেলটি পড়লে দেখবেন, সেটা বরং নিজেরা দেখে নিন), দ্বিতীয় দফার ডোজ পড়ার ৭ দিন পরে তাদের মধ্যে যাঁরা ভ্যাকসিন পেয়েছিলেন, ৮ জনের কোভিড ধরা পড়েছে। আর যাঁরা নুন-জল পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ১৬২ জনের কোভিড ধরা পড়েছে। 


    তার মানে, যতজনকে নিয়ে স্টাডি করা হয়েছে সময়ের হিসেবে, ভ্যাকসিন না পড়লে ২২ লাখ ২২, ০০০ জন-সময়ে (জন-সময় আবার কি মশাই?), ১৬২ জনের কোভিড হতই | এখানে জন-সময় (person-time) বিষয়টি নিয়ে একটু লেখা যাক। মনে করুন, আপনি ১০০ জন লোককে নিয়ে কোন একটি অসুখের ব্যাপারে ১ বছর ধরে গবেষণা করছেন, এবং দেখতে চাইছেন এই ১০০ জনের মধ্যে কতজনের অসুখটি করে। ১০০ জন  * ১ বছর এই ব্যাপারটিকে বলে ১০০ জন-সময় বলা হচ্ছে | ধরুণ আপনি যদি ১০ জন লোককে নিয়ে ১০ বছর ধরে স্টাডি করতেন, তাহলেও এক ব্যাপার হত। 


    তার মানে,


    ১০০০ জন-সময় = ১০০০ জন * ১ বছর = ১০০ জন * ১০ বছর = ১০ জন * ১০০ বছর , এগুলো সব সমান ভাবে ধরতে হবে। 


    সেই রকম এঁরা পরীক্ষার প্রতি বাহুতে সাড়ে সতেরো হাজার লোককে এমন অঙ্কের হিসেবে ধরেছেন যেন বছরে ২২ লাখের ওপর লোককে নিয়ে পরীক্ষা করছেন। তো তাদের মধ্যে এক দিকে ১৬২ জনের (যাঁরা নুন-জল পেয়েছেন) আর অন্যদিকে ৮ জনের (যাঁরা ভ্যাকসিন পেয়েছেন) কোভিড ধরা পড়েছে।


    তার মানে ভ্যাকসিন না পেলে ১৬২ জনের কোভিড হতই, ভ্যাকসিন (১৬২ - ৮) = ১৫৪ জনকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এইটা হচ্ছে ভ্যাকসিনের কামাল ("কামাল" == efficacy) | শতকরা হিসেবে ১৫৪ / ১৬২ = ৯৫% | 


    সে না হয় বোঝা গেল। কিন্তু ক্রেডিবল ইনটারভ্যাল বলে যে জিনিসটা যেখানে দেখাচ্ছে ৯০.৩ থেকে ৯৭.৬ %,  সেটি কি? 


    এবার মনে করুন এই যে ভ্যাকসিন ট্রায়াল, এটি ১ বার, ২ বার, তিন বার, এইরকম করে ১০০ বার করে দেখা হল। এবারে যেমন ৯৫% ভ্যাকসিনের কামাল দেখা গেল। অন্যান্য বার কি দেখা যেতে পারে? এই ৯০ আর ৯৭ নম্বরটা জানাচ্ছে যে অমন করে ১০০ বার যদি পরীক্ষা করা যেত, তাহলে ১০০ র মধ্যে ৯৫ বার  দেখা যেত ভ্যাকসিন ৯০ শতাংশ থেকে ৯৭ শতাংশ বাঁচিয়ে দিতে পারে। 


    এ তো ভারি ভাল খবর।


    কি হলে বলা হত ভ্যাকসিন কাজ করেনি? ০ শতাংশ?


    তা কেন?


    দেখুন শেষের কলামে ভ্যাকসিন এফিকেসি ৩০ শতাংশ লেখা আছে? মানে যদি দেখতেন এবারের বার ৯৫% বাঁচিয়েছে বটে কিন্তু ব্র্যাকেটের মধ্যে (২৫% - ৯৭%) দেখা যাচ্ছে, তখন সন্দেহ হত যে সত্যি এ ভ্যাকসিন কাজ করে তো?


    আপনি ভাববেন এই ৩০% সংখ্যাটি কোথা থেকে এল? স্মরণ করুন ডিসি'র প্রথম পোস্টে "ক্লিনিকাল এফিকেসি"র কথাটি | অর্থাৎ ডাক্তারি বা জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে বিচার করলে "কতটা" তফাৎ হলে পরে আমরা বলতে পারব যে ভ্যাকসিন বা ওষুধ কাজ করেছে? এটির বিচার জটিল, চিকিৎসক / জনস্বাস্থ্যবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করে একে স্থির করা হয়। 


    এখন এইটি এক রকমের ভ্যাকসিন যে কাজ করেছে তার পরিমাপ | এরকম আরো অনেক পরিমাপ রয়েছে। 


    আপাতত এইটুকুই থাক। 


    প্রশ্ন, মন্তব্য আসুক!


    পড়তে থাকুন, :-) 

  • অরিন | ২৫ জানুয়ারি ২০২১ ০৩:৫৩733576
  • এর পর দেখা যাক ভারতের কোভাক্সিন  নিয়ে যে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে, তাকে কি করে বিশ্লেষণ করা যায় । মূল লেখাটি এইখানে পাবেন,


    https://www.thelancet.com/journals/laninf/article/PIIS1473-3099(20)30942-7/fulltext


    লেখাটি পর্যায়ক্রমে আসুন পড়ে  দেখা যাক । 


    শুরু করার আগে  যা যা প্রশ্ন জমে আছে আর যা মন্তব্য করার করুন প্লিজ । 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
    • কি, কেন, ইত্যাদি
    • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
    • আমাদের কথা
    • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
    • বুলবুলভাজা
    • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
    • হরিদাস পালেরা
    • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
    • টইপত্তর
    • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
    • ভাটিয়া৯
    • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
    যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন