• খেরোর খাতা

  • গল্পঃ  স্বয়ম্বরসভায় যখন সমস্ত হৃদয় শুধু ভূকম্পপ্রবণ হয়ে আছে - ভাষা ভাষা

    ভাসা ভাসা লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ৩৭৭ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • নাঃ! এবারও হল না!

    অশোকদা যখন একের পর এক, কে কোন চরিত্রে বলে যাচ্ছে আর ওরটা পার করে আরও খানিক এগিয়ে গেছে, তখন অনেকদিন বাদে পার্থর সহদেবদার মুখটা মনে পড়ে গেল। সহদেবদা ওদের বাড়িতে দুধ দিত। শুধু ওদের বাড়ি কেন, বস্তুত ওদের পাড়ার বেশির ভাগ বাড়িতেই ভোরবেলা মানে সহদেবদা। বড়দের ভাষায় সহদেব গোয়ালার একচেটিয়া মৌরসিপাট্টা। অবশ্য পুরুষানুক্রম সম্পর্কে কেউই তেমন নিশ্চত নয়। হাতে বালতি। তাতে দুধ আর ছোট্ট একটা অ্যালুমিনিয়ামের মগ। এসেই দুউউউউধ-এর এক নিজস্ব হাঁকে আকর্ণবিস্তৃত হাসি, প্রথম দর্শনেই। ছড়িয়ে যেত এক থেকে অনেকে, মিশে যেত ভোরের আলোয়। তখন পার্থ খুবই ছোট। বয়স ছয়-সাতের মধ্যেই হবে! বাবার সাথে কয়েকবার গেছেও সহদেবদার খাটালে। কেন যেতে হয়েছিল, তার মানে সহদেবদা সেই দিনগুলোয় নিশ্চয়ই কোনও কারণে আসতে পারেনি, সেসব অবশ্য কিছু মনে নেই, তবে গিয়েছিল যে সেটা মনে আছে। মাত্র কয়েকবারই তো গেছে, তবুও পরিষ্কার চোখের সামনে ভাসে সহদেবদার সেই খাটাল। কবে থেকে যে বন্ধ হয়ে গেল সহদেবদার সেই যাতায়াত মনে নেই। তারপরই কি হরিণঘাটার দুধ চলে এল? পাড়ার মধ্যেই তারজালি দেওয়া খাঁচায়? মনে নেই। হবে বোধহয়! একদিন পার্থর হাতেও চলে এল লোহার ঝাঁকা আর তাতে বোতলবন্দি দুধ। সে অন্য কথা। প্রসঙ্গক্রম।

    অবশ্য সহদেবদার কথায় কানের প্রসঙ্গ না উঠলে কিছুই বলা হয় না। আর কান টানলে তবে না মাথা! মাত্র একটা বৈশিষ্ট্য দিয়ে চেনাতে বললে, প্রায় সবাই সহদেবদার কানের উল্লেখই করবে। সহদেবদার কানের ভেতর থেকে একটা মাংস পিণ্ড, দেখতে অনেকটা কানেরই মতো, বাইরে বেরিয়ে এসে এমনভাবে হেলিক্স-অ্যান্টিহেলিক্সের উপর থিতু হয়ে ছিল, মনে হত বাঁ-কানটা বুঝি ঠিক একটা নয়, একটার ওপর আরেকটা দু'টো কান দিয়ে তৈরি। আর কানের লতিটা স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বাই ছিল নাকি ওপরের ওই ডবল হেলিক্সের জন্য মনে হত ঠিক নিশ্চিত নয় তবে একটু বেশি লম্বাটে যে লাগত তাতে কোনও ভুল নেই! কী একটা ব্যাপার ছিল সহদেবদার, মুখজোড়া হাসির জন্যই হবে সম্ভবত, অতশত ব্যাপারেও কেউ কিন্তু ভয় পেত না। বরং বাচ্চারা সবাই পছন্দই করত সহদেবদাকে। তবে কথা কিন্তু এ-ও নয়। এ-ও যাকে বলে ওই প্রসঙ্গক্রম।

    প্রত্যেকবার একই জিনিস ঘটে তাও যে কেন পার্থ বারবার আশা করে — না, এবার বোধহয় অন্যরকম কিছু হবে, সেটা পার্থই ভাল জানে। এবার শুরুতে কিন্তু পার্থ সত্যিই ভেবেছিল, ব্যাক স্টেজে লোকজন বিশেষ থাকে না, তাতে বেশ অসুবিধাই হয়, এবার ও ব্যাক স্টেজই সামলাবে। তারপর একসময় যে কখন একটা ভাল রোলের আশায় হেদিয়ে গেছে, নিজেই বুঝতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল? অশোকদাকে কখনও বলেছিল বলে তো মনে পড়ছে না আর কোনোদিনই বা অশোকদা ওর মনের কথা পড়তে পারে যে এবারই পড়ে নিল? তাও এটাই তো আর ওর চূড়ান্ত মনের কথা ছিল না! গোড়ার দিকে ভেবেছিল ঠিকই, তবে শেষ অবধি ভাবনাটা সম্পূর্ণ বদলেও তো গিয়েছিল। এটা তো তাহলে মনের কথা পড়াও হল না। শেষ পর্যন্ত তাহলে দাঁড়ালটা কী? ব্যাক স্টেজের দায়িত্ব ঠিকই এসে পড়ল। সাথে জুড়ে গেল কনিষ্ঠ পাণ্ডবের ভূমিকা।

    পার্থ দেখেছে প্রতিবার এমনটাই হয়। অনেক মিটিং, অনেক টালবাহানা, টানাপোড়েনও বলা যায়, প্রচুর রিহার্সাল, অবিরাম রগড়ারগড়ি, শেষে সব উৎসাহে জল ঢেলে মৃত সৈনিক কী ভিড়ের দৃশ্যে অসহায় ভিড়ে যাওয়া। একেবারে যে অন্যরকম কিছু হয়নি তা নয়, একবার বিকাশদার লেখা একটা নাটকে, অশোকদাই পরিচালক, দিয়েছিল তো ভীমের পার্ট, ডায়লগও ছিল প্রচুর আর একটা মাত্র দৃশ্য ছাড়া সবকটাতেই সরব উপস্থিতি। হ্যাঁ একটা ব্যাপার ছিল, তখন বয়স দশ-এগারো হবে বোধহয়! ওই সময়টা বছর দু-তিনেকই হবে ভীষণ মোটা হয়ে গিয়েছিল পার্থ। এতটাই যে বন্ধুরা এমনকী ওকে ময়রা, হালুইকর এইসব বলে খেপাত। তারপর একদিন দুম করে লম্বা হয়ে গেল আর সব মেদ খসে আগলি ডাকলিং হয়ে উঠল ছিপছিপে সোয়ান। তবে মেদ খসার ঘটনা তো বছর খানেক কী দেড়েক পরে। সেবার বরং দিনে দিনে খসে পড়তে থাকল ওর জন্য নির্ধারিত একের পর এক ডায়লগ। আসল দিন মানে দ্য ডি ডে-তে দেখা গেল দৃশ্যের কোনও কাটছাঁট হল না ঠিকই, তবে ওর প্রায় যাবতীয় সংলাপ বলছে অর্জুন নয়তো যুধিষ্ঠির। ভীম থুড়ি পার্থর জন্য পড়ে রইল অযথা কিছু হুঙ্কার সাথে গদার বাঁই বাঁই বা উল্টোটা, গদা সহযোগে বৃথা হুঙ্কার।

    আরও একবার, তখন ক্লাস ইলেভেন সম্ভবত, সেবার পুজোয় পার্থ মা-বাবার সাথে সিমলা যাবে বলে নাটকে নেই। তা বলে রিহার্সালে কামাই নেই। বন্ধুরা পড়াশুনো না করে রিহার্সাল দেবে আর ও বাড়িতে বসে পড়াশুনো করবে, তা তো আর হতে পারে না! আর লোডশেডিং-এর সময় কে কবে ঘরে বসে থেকেছে? তবে লম্ফ বা হ্যারিকেনের আলোয় পড়শুনো না হলেও ক্লাব ঘরে, ওই স্বল্প আলোতেই অশোকদা বসে বসে দিব্যি সংলাপ বলার তালিম দিত। সিমলা থেকে ফিরে শুনল সেবার অষ্টমীর দিন ঝড়-বৃষ্টিতে এমন অবস্থা হয়েছিল যে প্যান্ডেলের কথা না তোলাই ভাল, পাশের বস্তির প্রায় সব ঝুপড়ি আর কাছাকাছি উদ্বাস্তু কলোনির দরমার বেড়া দেওয়া ঘরগুলো ভেঙে পড়ে সে এক সাংঘাতিক বিপর্যয়। সুতরাং নাটকের কোনও প্রশ্ন ওঠে না। ওঠেও নি। ঠিক হল ডিসেম্বর মাসে অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর হবে। পার্থদের মতো কয়েকজনের অবশ্য হাফ-ইয়ার্লির পর। ক্লাস ইলেভেনে উঠে ওরা পামর-অতিরিক্ত হয়ে গেছে। নিজেদের আর আপামরের একজন ভাবতে পারে না। তখন আবার ধ্রুব বাড়ির সাথে বেড়াতে যাচ্ছে। এবার ধ্রুবর রোলটা জুটে গেল পার্থর। চরিত্র বড় না হলেও গুরুত্বপূর্ণ। একবার বাধা পড়লে বোধহয় তার মুক্তি সহজে ঘটে না। পরীক্ষা শেষে দিন দশেকের রিহার্সালে যা দাঁড়াল, তা অশোকদার মোটেই পছন্দ হল না। শেষে নম নম করে শ্রুতি নাটকের মতো কিছু একটা হল। বলাই বাহুল্য প্রায় কিছুই হল না। বরং শ্রুতি নাটকের প্রভূত অপমানই হল।

    সব অর্থেই ও যে নিতান্তই সাধারণ সেটা ওর থেকে বেশি আর কেউ জানে না। হয়তো ওর চার পাশের নব্বই শতাংশ ছেলেই সাধারণ কিন্তু পার্থ দেখেছে তবু সবার মধ্যেই কোনও না কোনও একটা ব্যাপার আছে – কেউ ভাল খেলে, কেউ ভাল গান করে, কেউ দারুণ আঁকে, কেউ খুব ভাল কথা বলে, আবৃত্তি-নাটক, ডিবেট-তাৎক্ষনিক বক্তৃতা, কিছু না কিছু ভাল করেই। খুব বড় কিছু নয়, আবার একেবারে ফেলনাও নয়। নিজের ক্ষেত্রে সেরকম কিছুই খুঁজে পায় না, পার্থ। সব বিষয়েই ও প্রায় নিশ্চিত লাস্ট। সে অ্যানুয়াল স্পোর্টসের দৌড়নোই হোক বা ক্লাসের পরীক্ষা। সবার শেষে আসার এক অদ্ভুত দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছে পার্থ।

    প্রত্যেকবার অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্টের পর, বাবার একটা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা। তার সাথে জুড়ে এর তার সাথে তুলনা। সঞ্জীবকে দেখ, জীবনে কোনোদিন সেকেন্ড হয়নি। সেবার ক্লাসে লাস্ট হওয়া, পার্থর মুখে প্রায় চলেই এসেছিল, আমিও জীবনে কোনোদিন সেকেন্ড হইনি, সেটা আবার বলার মতো কথা হল নাকি! অবশ্য বলে যে উঠতে পারেনি সেটাও বলা বাহুল্যই। বাবাকে বোঝানো যায় না, মা-র সাথে তবু কথা বলা যায়। কেউ ফার্স্ট হলে কেউ না কেউ লাস্ট তো হবেই। এটা তো অঙ্কের নিয়ম! আই.আই.টি., বা মেডিকেল কলেজ, কিংবা প্রেসিডেন্সি বা যাদবপুরে যারা পড়ছে তাদের মধ্যেও তো কলেজের পরীক্ষায় কেউ না কেউ লাস্ট হচ্ছে। মা বড়জোর বলবে, তবু প্রত্যেকবার লাস্টটা তোকেই হতে হবে? সেটা অবশ্য একটা কথা বটে! সেই লাস্টটা যে ওকেই হতে হবে এমন কোনও দিব্যি দেওয়া নেই। তবে পাকেচক্রে তাই হয়ে যায়! মোদ্দা ব্যাপারটা এই — ওদের তিরিশ জনের ক্লাসে প্রত্যেকবারই ও হয় তিরিশতমই নয় উনত্রিশ কিংবা আঠাশ। ওই উনিশ বিশ আর কী! আর যেবার একটু ভাল সেবারও বড়জোর তিপ্পান্ন, সমগোত্রীয়রা যখন বাহান্ন। তারাপদ রায় একবার অঙ্কে শূন্য পেলে তার রাঙা পিসিমা নাকি তার বাবাকে বলেছিলেন, একেবারে কিছুই যে পায়নি তা তো নয়, শূন্য তো পেয়েছে, সেরকম কোনও পরম স্নেহশীলা রাঙা পিসিমা পার্থর নেই যে বাবাকে বুঝিয়ে বলবে একেবারে কিছুই যে হয়নি তা তো নয়, লাস্ট তো হয়েছে আর শুনে বাবা মিইয়ে যাবে!

    তো যে কথা হচ্ছিল লাস্ট হওয়টা, পার্থর একরকম ভবিতব্য। আজকাল এইসব কথার কোনও মানে নেই কেউ বুঝবেও না, তবু অধুনা বিস্মৃত, তবে একদা বহুব্যবহৃত অ্যাগ্রিগেটে ষাট শতাংশে ফার্স্ট ডিভিশন, কোনও বিষয়ে একশোয় আশির বেশি পেলে লেটার, অ্যাগ্রিগেটে পঁচাত্তর শতাংশ পেলে স্টার মার্কস ধরনের কিছু বিজাতীয় শব্দ ছিল। এখন তো এই গণ্ডি না পেরোলে তবেই খবর হয়! মাধ্যমিকে অবশ্য পার্থ ক্লাসের মধ্যে অল্পের জন্য লাস্ট হল না। আঠাশ-তিরিশের সঙ্গী অনিমেষ সে দায়িত্বটা নিল। এমন সময়ই শুনল কে যেন বলছে, কোনও লেটার না পেয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে যাওয়াদের মধ্যে পার্থ লাস্ট। সেটা আবার কী? তাহলে অনিমেষ? লেটার পেয়ে ফার্স্ট ডিভিশনদের মধ্যে লাস্ট। অঙ্ক আর সংস্কৃত দু-দুটো বিষয়ে লেটার পেয়েও অষ্টম আশ্চর্য কাণ্ড অ্যাগ্রিগেটে প্রদীপ আর পার্থ দু’জনের চেয়েই কম। আরও একটা আশ্চর্য, নবমও বলা যায়, কোনও কথা নেই বার্তা নেই সাধারণত কুড়ি থেকে সাতাশের মধ্যে থাকে এমন তিনজন সেকেন্ড ডিভিশন। মানে ওরা যেরকমটা ভেবেছিল, অনিমেষ একেবারে লাস্ট নয়! পার্থ-প্রদীপ-অনিমেষদের যদিও সেসব নিয়ে কোনও হেলদোল নেই, তবে লেটার না পাওয়া ফার্স্ট ডিভিশনদের মধ্যে লাস্ট কিংবা লেটার পাওয়া ফার্স্ট ডিভিশনদের মধ্যে লাস্ট জাতীয় ক্যাটেগোরিতে বেশ বিহ্বলই হয়ে পড়েছিল ওরা। অনেকদিন বাদে একবার টিভিতে একটা ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে দেখতে পার্থ শুনেছিল, নরেন্দ্র হিরওয়ানিকে ব্যাট করতে নামতে দেখে হর্ষ ভোগলের উদ্দেশে ইয়ান চ্যাপেলের প্রশ্ন, হিরওয়ানি ব্যাটসম্যান হিসেবে কেমন, তাতে হর্ষ ভোগলের জবাব ছিল, যদি পৃথিবীর সব এগারো নম্বর ব্যাটসম্যানদের নিয়ে একটা টিম হয়, তবে সেই টিমেও হিরওয়ানি এগারো নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবেই ব্যাট করতে নামবে। অল্প কথায় এর থেকে ভাল ব্যাখ্যা আর হয় না! তবে ভেবে দেখলে ওর ক্লাসের বন্ধুরা সেই কবেই তো এরকম সব ক্যাটেগোরি বানিয়ে ফেলেছিল।

    ওই ‘কোনোমতের’ সীমানায় অনন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পার্থর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকমটাই হয়ে গিয়েছিল। শুধু টিকে থাকা। সবেতেই আছে, কিন্তু কোথাও-ই তেমন গুরুত্ব নেই। অর্জুন হওয়ার সাধ থাকলে বড়জোর নকুল বা সহদেব। ওদিকে আবার এমনকী ভরত-ও নয় যে চটি-জুতো যাই হোক মাথায় নিয়ে অন্তত একটা দৃশ্যে থাকবে, জুটবে সেই শত্রুঘ্ন। সুমিত্রারই ভাল করে ধারণা নেই যার সম্পর্কে। নাটক ভালবাসে, পাড়ার নাটকে থাকবে সবই ঠিক, তবে এবার নিজেকে নিশ্চিত বুঝিয়ে ফেলেছিল — নো রোল, ওনলি ব্যাক স্টেজ।

    যত গন্ডগোল করল অশোকদা আর বিকাশদা। দু’জনে মিলে নাটক লিখল। সবাই প্রায় বড় হয়ে গেছে, কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে জমিয়ে হবে নাটক আর সে নাটক নিয়ে কম্পিটিশনেও নামা হবে। ব্যস। অবিচার, বঞ্চনা, ক্ষোভ, যুদ্ধ বিরোধী মতামত, নারী স্বাধীনতা জাতীয় ভারী ভারী বিষয়ের ওপর লেখা হল নাটক। প্রেক্ষাপটে মহাভারত। নাচে গানে জমিয়ে হবে নাটক। অতীতে যত নাটক হয়েছে, তাতে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ভাগ সবসময় অতটা স্পষ্ট ছিল না। তিন-চারটে নির্দিষ্ট চরিত্র বাদে আর যে যে চরিত্রে মেয়েরা অভিনয় করেছে, সেগুলা ছেলেরা করলেও নাটকের কোনও ইতর বিশেষ হত না। প্রধান কিছু চরিত্র বাদ দিলে উল্টোদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রেও তাই, মেয়েরাও করে দিতে পারত। এক নাটকটা পরিচিত গণ্ডির মধ্যে না হলে। সীতার চরিত্রে কোনও ছেলে বা কোনও মেয়ে কোনোদিন রাম হয়নি। যত বড় হতে থাকে নাটক বদলাতে থাকে, তখন থেকে চরিত্ররা ক্রমশ নির্দিষ্টভাবে নারী-পুরুষে ভাগ হতে থাকে। আর সেবারের নাটকটা অশোকদা-বিকাশদার কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল যে তা আর শুধু পাড়ার নাটক রইল না। বাইরে থেকেও কুশীলব আসতে থাকল।

    এখানেই গল্পের মোড়-ঘোরা ব্যাপার হল। পুরুষ চরিত্রের কথা আপাতত বাদ দিয়ে বলা যাক, পাড়ার মেয়েদের মধ্যে বড় চরিত্র বলতে শুধু অন্তরা। গান্ধারী। কুন্তী, দ্রৌপদী আর সুভদ্রা বাইরের। এতেই সবার উৎসাহ বেড়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গেল। পাড়ার মেয়েদের বাদ দিলে মেয়ে-সঙ্গ আর তখন কোথায়? হ্যাঁ কলেজে ঢুকে ‘ওনলি বয়েজ’ তকমাটা খানিক গেছে বটে তবে অনেক কলেজেই তখনও সকাল ছেলেদের তো আরও-সকাল, ভোর মেয়েদের। ওই শুধু আসা-যাওয়ার মাঝে। তার ওপর শর্মিষ্ঠা (কুন্তী), কাবেরী (দ্রৌপদী) ব্রেবোর্ন আর সুপর্ণা (সুভদ্রা) বেথুন। আশুতোষ, বিদ্যাসাগর তথা তামাম বঙ্গবাসী স্বভাবতই অভিভূত হয়ে পড়ে।

    পার্থরও যে ব্যাক স্টেজ আরও পিছিয়ে গিয়ে একসময় কোনও একটা চরিত্রের দিকে ধেয়ে গিয়েছিল তাও এই কারণেই। ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর, শকুনি, যুধিষ্ঠির যাদের বেশি পরিমাণে কঠিন কঠিন সংস্কৃত ঘেঁষা সংলাপ আছে তাদের বেশির ভাগই বাইরের। পাড়ার ছেলেরাও আছে। কৃষ্ণ, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, ভীম, অর্জুন, দুর্যোধন, দুঃশাসনরা তো পাড়ারই। আর ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো — সহদেব।

    পাক্কা ছ’মাসের রিহার্সালের পর নাটক নেমেছিল। এর মধ্যে নাটক, বিষয়বস্তু-সংলাপ-দৃশ্য যেমন বদলে বদলে গেছে, তেমনই বদলেছে নেপথ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা আর তার ঘনঘটা। ব্ল্যাসফেমি-অয়দিপাস-ইনসেস্ট প্রভৃতি ভাবনামালার অনুষঙ্গ যদি সরিয়ে রাখা যায়, তবে যা দেখা গেল গান্ধারীর আশেপাশে ভিড় জমাল ভীষ্ম, ন্যায্যত ধৃতরাষ্ট্র, শকুনি, তেমনই কুন্তীর ব্যাপারে খানিক বেশিই দায়িত্বপূর্ণ হয়ে উঠল বিদুর, যুধিষ্ঠির, কর্ণ আর ওদিকে দ্রৌপদীর দেখভাল করার জন্য সদা ব্যস্ত কৃষ্ণ, অর্জুন, দুর্যোধন আর সুভদ্রার ঘনিষ্ঠতায় মরিয়া হয়ে উঠল দ্রোণাচার্য, ভীম, দুঃশাসনেরা। বলাই বাহুল্য এইসব ব্যাপারে গোড়ার দিকে প্রচুর ওভারল্যাপ থাকে। চোরাস্রোত ক্রমাগত বইতেই থাকে। থিতু না হওয়া পর্যন্ত কিছু পরিষ্কার হয় না। তবে নিশ্চিত যে আরও একটা বলা-বাহুল্য, সহদেব এসবের কাছাকাছি ঘেঁষতেই পারে না। আর কারও সাথেই তেমন বন্ধুত্ব হওয়ার সুযোগ না ঘটায় নির্দিষ্ট কোনও পছন্দ বা মোহঘোর কোনোটাই তৈরি হয় না! রিহার্সালেও বেশির ভাগ সময় যুধিষ্ঠির কিংবা অর্জুনের ল্যাঙবোট আর তাছাড়া ওর রিহার্সালের সময় কুন্তী-দ্রৌপদী–সুভদ্রারা কেউই প্রায় থাকে না। হয় তখনও আসেনি নয়তো চলে গেছে। চোখে পড়ার বা চোখে পড়ানোর কোনও সুযোগই নেই। ক্কচিৎ-কদাচিৎ ওর অভিনয়, ওদের কেউ দেখেছে। এক হিসেবে ভালই হয়েছে। সহদেব হওয়ার যে অসহায়ত্ব তা ওদের কারোর মনে তেমন রেখাপাত করেনি।

    অভিনয়-চরিত্র-রোমান্স কোথাও সুবিধে না করতে পেরে নাকি এমনিই পার্থ মনে মনে নিজেকে পরিচালকের আসনে বসাতে শুরু করে। অশোকদা ওর কাছে বরাবরই হিরো, শুধু কোনও নাটক শুরু হওয়ার সময়টায় আশানুরূপ চরিত্র না পেয়ে, তীব্র অভিমানেই একটা ক্ষোভ জমে উঠত, তারপর একদিন সব কেটেও যেত — তো অশোকদার মতো হওয়ার নেশাটা আবার চেপে বসে। তারপর ভাবে নাটকের পরিচালক অভিনয় জানে না বা করে না এমন কখনও হয়? সিনেমার পরিচালকরা হয়তো নিজে অভিনয় করে না, তবে জানে না তা তো নয়! নিশ্চয়ই জানে, না হলে এতজনকে এক সুরে গাঁথা, চালানো, নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে বিকাশদা? পার্থ লিখবে। বিকাশদাও ঠিক সে অর্থে অভিনয় জানে না, অথচ একের পর এক নাটক লেখে তো! আর খারাপ তো লেখে না। নাটক সম্পর্কে ধারণা একেবারে পরিষ্কার। তবে বিকাশদার যা লেখাপড়া, সেসব ভাবতে গেলে পার্থকে একবার ঢোঁক গিলতেই হয়।

    তবে শুরু তো একটা কোথাও থেকে করতেই হয়! সহদেব দিয়েই শুরু করা যাক! ভাবে পার্থ। পাড়ার বন্ধুদের কিছু বলে না, স্কুলের যাদের সাথে যোগাযোগ আছে বা কলেজের বন্ধুদের বলে, তবে সহদেব সম্বন্ধে দু-একটি কথা ও নিজে যা জানে তার থেকে বেশি খুব একটা কিছুই এগোয় না। সেই মাদ্রী-অশ্বিনী ভাতৃদ্বয়। ঘুরে ফিরে ওই ক’টা কথাই আসে আর যে একটু বেশি মনে করতে পারে সে শকুনি-বধ। তবে সপ্তদশ না অষ্টাদশ দিনে, সেটা অনেকেরই গুলিয়ে যায়। আর একটা কথা অবশ্য জনা দুয়েক বলেছিল, অজ্ঞাতবাসের সময় বিরাট রাজার গোশালার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল সহদেবের। এটাও আবছা মনে ছিল পার্থর। সহদেবদা।

    পার্থ বোঝে যা কিছু করতে হবে নিজেকেই। রামকৃষ্ণ মিশনের মেম্বারশিপ নিয়ে নেয় আর কলেজ লাইব্রেরি তো আছেই, তার থেকেও বেশি আছে কলেজ স্ট্রিট ফুটপাথের সুনীলদা-তড়িৎদা। দ্বিধাহীন বন্ধুত্ব আর বাঁধনছাড়া প্রশ্রয়ে হাত-পা ছোড়া নেহাত কম হয় না। ন্যাশানাল লাইব্রেরির কার্ডও হয়ে যায়, তবে খুব প্রয়োজন না পড়লে যাওয়া হয় না।

    লেখাপড়া তো পার্থ বিশেষ কোনদিনই করেনি, মানে ওই স্কুলের সিলেবাসের কথা বাদ দিলে! তাও তো বলতে গেলে নম নম করে, যৎসামান্যই! তো এইসব এইদিক সেইদিক পড়াশুনো করতে গিয়ে দেখে এর একটা অদ্ভুত নেশা আছে আর কেমন কোনও একটা বই বা লেখার সূত্রে পৌঁছে যাচ্ছে আরেক কোনও জগতে যার কোনও সন্ধান ওর কাছে আদৌ ছিল না। বাংলা বইয়ে সাধারণত কোনও বিবলিওগ্রাফি থাকে না, মানে তখনও থাকত না, তবুও দৃশ্য-অদৃশ্য সূত্র কিছু থেকেই যেত, তার হাত ধরে কত নতুন জিনিসের সাথে পরিচয় ঘটে গেল! অবশ্য এ ক্ষেত্রে কলেজ স্ট্রিট এবং বিভিন্ন কলেজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নতুন হওয়া বন্ধুরাও অকৃপণ এগিয়ে দিয়েছে। লিটিল ম্যাগাজিন নামে একটা বিরাট দুনিয়া তো পায়ে পায়ে এগিয়ে এল ঠিক তখনই। মোট কথা সহদেবের ভেতর ঢুকতে গিয়ে পার্থ ঝাঁপ দিল মহাসমুদ্রে। মহাভারতেও।

    লক্ষ্মণ-শত্রুঘ্ন, বালি-সুগ্রীব, জটায়ু-সম্পাতি, লব-কুশ, কৃপা-কৃপি, দ্রৌপদি-ধৃষ্টদ্যুম্ন রামায়ণ-মহাভারত মিলিয়ে একের পর এক যমজদের মধ্য থেকে পার্থ একসময় খুঁজে পায় নকুল আর সহদেবকে। দেবতার সাথে — সহদেব। অনেকে আবার সহস্র দেবতার সমানও বলেছেন। বরটা ছিল কুন্তীর জন্য বরাদ্দ, লজ্জার মাথা খেয়ে মাদ্রীর আব্দার ভায়া পাণ্ডু, কুন্তীর কাছে পৌঁছলে, ট্রান্সফার অফ পাওয়ারে মাদ্রী অশ্বিনীভাতৃদ্বয়ের কাছ থেকে উপহার পান নকুল আর সহদেব। ওদের দু’জনকে আশ্বিনেয়ও বলা হয়। পার্থ বুঝতে পারে নিছক সামান্য একটা চরিত্র হলেও ক্রমশ ও সহদেবের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।

    এমনিতে যা গুণাবলী তাতে মনে হবে সহদেবেরই নায়ক হওয়ার কথা। হয় না যে, মনে হয় সৃষ্টিকর্তা খানিক গড়ে অন্য আরও গুরুতর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায়। বিনয়ী, লাজুক, গুণী মানুষটার নানা দক্ষতার জন্য জোটে ‘মহারথী’ উপাধি। বিভিন্ন বর্ণনায় তিনি নায়কোচিত, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী। প্রজ্ঞায়, বুদ্ধিতে ও বাকবৈদগ্ধে তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। এর পর নায়ক হওয়ার জন্য আর কী লাগে? তবু সহদেব ঠিক নায়ক নন। নায়ক কিন্তু প্রধান নন।

    সহদেব ত্রিকালজ্ঞ। ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সব বিষয়েই সমান জ্ঞান। এতটাই যে যুধিষ্ঠির দেবগুরু বৃহস্পতির সাথে তাঁর জ্ঞানের তুলনা করেছেন। বস্তুত যুধিষ্ঠির মনে করতেন, সহদেব বৃহস্পতির চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান। সহদেবের নীতিশাস্ত্র শিক্ষা অবশ্য সেই বৃহস্পতির কাছেই। আবার সহদেবকে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের অবতারও মনে করা হয়! বেদেও অসাধারণ ব্যুৎপত্তি। আরও অনেক বিষয়েই, বইয়ের ভাষায় বললে চিকিৎশাস্ত্র, অশ্বারোহন, গবাদি পশু-চিকিৎসা, রাজনীতি, সমাজনীতি হেনবিদ্যা নেই যাতে সহদেবকে পারদর্শী বা চৌকস বলা যাবে না। আর এই ভাইটিই ছিলেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের ব্যক্তিগত সচিব।

    পুরাণ বিচিত্র সব কাণ্ডর এক আজব কারখানা। পাণ্ডু একবার তাঁর ছেলেদের বলেছিলেন, উনি মারা যাওয়ার পর ছেলেরা যেন তাঁর মৃত মাংস ভক্ষণ করে, তাতে তাদের জ্ঞানবৃদ্ধি হবে। সেই সময় উপস্থিত হলে যতই পিতৃআজ্ঞা হোক, স্বভাবতই দ্বিধাবোধে কেউ এগোয় না, এমন সময় সহদেব দেখলেন, বাবার শরীরে পিঁপড়ে ধরে যাচ্ছে আর কয়েকটা পিঁপড়ে মিলে একটা মাংসখণ্ড খুবলে নিয়ে চলেছে। সহদেব আর থাকতে পারলেন না, ওই মাংসখণ্ড তুলে মুখে দিলেন আর সাথে সাথে ঘটে গেল বিস্ফোরক এক যাদু, অত্যাশ্চর্য এক ঘটনা। মহাভারতের একের পর এক ঘটনা, অতীত আর ভবিষ্যত উভয়ই উন্মোচিত হতে লাগল সহদেবের সামনে। একমাত্র সহদেবই আগে থেকে জানত ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে থাকা সব কাহিনি মায় পাশা খেলা থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পুরোটাই। অবশ্য সে কথা প্রকাশ করায় বাধা ছিল, জানাজানি হয়ে গেলে অভিশাপ ছিল, সেক্ষেত্রে মাথা চৌচির হয়ে মাটিতে লুটোবে। আবার মহাভারত তো আর একটাই নয়, আরেক ভাষ্যে পাণ্ডু শুধু সহদেবকেই বলে গিয়েছিলেন আর ঠিক শরীরের মাংস নয় মাথার ঘিলু।

    সহদেব অনেকটা বিদুরের মতো, বেশি কথা বলতেন না, নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া মুখ খুলতেন না, তবে যখন দরকার হত কৃষ্ণ থেকে যুধিষ্ঠির, সবাই ওঁরই পরামর্শ নিতেন। অবশ্য সব পরামর্শই যে মানা হত তা নয়, যেমন সহদেব বিরাট রাজাকে পাণ্ডব বাহিনীর সেনাপতি করতে চেয়েছিলেন কিন্তু যুধিষ্ঠির আর অর্জুনের পছন্দে সেনাপতি হয়েছিলেন দ্রুপদ-পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন।

    এদিকে সন্ধিপ্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার সময়, কৃষ্ণ সহদেবেরই পরামর্শ চেয়েছিলেন, প্রথমে সহদেব বলেছিলেন, কৃষ্ণের মতামতই ওঁর মতামত। কিন্তু কৃষ্ণ নির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে — যুধিষ্ঠির যখন পাঁচটা গ্রাম পেলেই খুশী, কোন পাঁচটা গ্রাম চাওয়া যায়, তখন সহদেব ইন্দ্রপ্রস্থ, পানিপ্রস্থ, শোনপ্রস্থ, তিলপ্রস্থ আর বাহকপ্রস্থ-এর নাম করেছিলেন, কারণ ভবিষ্যৎ জেনে ফেলা ব্যতিরেকেও ততদিনে সহদেব নিশ্চিত, যুদ্ধ ছাড়া এই সমস্যার কোনও সমাধান নেই আর হস্তিনাপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওই পাঁচটা গ্রাম দিয়ে দিতে দুর্যোধন কখনই রাজি হবে না এবং সন্ধিপ্রস্তাব বাতিল হবেই। আর অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে যুদ্ধ।

    অশোকদা যে কোথায় ঢোকাবেন, তাঁর ভাবনাসূত্র, দেয়ার ইজ নো সাচ থিঙ অ্যাজ আ হোলি ওয়ার, বুঝতে পারে না, পার্থ।

    আবার একবার কৃষ্ণ সহদেবের কাছে জানতে চাইলেন, যুদ্ধ থামাবার কোনও রাস্তা আছে কিনা। সহদেব বেশ হাজির-জবাবের মতো বলেছিলেন, কৃষ্ণকে বেঁধে বন্দী করে, পাণ্ডব আর কৌরবদের বনে পাঠিয়ে, কর্ণকে রাজা করে দিলে যুদ্ধ থামানো যেতে পারে। কৃষ্ণ তাঁকে বেঁধে ফেলতে বললে সহদেব তাঁকে শিশুরূপে ধ্যান করে বেঁধে ফেলেন। কৃষ্ণ নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে উদ্ধার পাওয়ার আশায় সহদেবকে দিব্যদৃষ্টি দেন এবং সহদেবও তাঁর বন্ধন খুলে দেন। পার্থ ভাবে সহদেবের সমাধানটা নেহাত মন্দ ছিল না। তবে নিশ্চিত সমাধানের জন্য মহাকাব্য নয়। তবু এখানে যেন খানিকটা সুযোগ আছে অশোকদার। তাহলে অবশ্য সহদেবকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে! পার্থ যদি বলেও অশোকদা কি সে সুযোগ নেবেন? নাকি অন্য কোনও ভাবনা আছে অশোকদা-বিকাশদার!

    পড়তে পড়তে পার্থ দেখে এতদিন ও একটা মূল কাঠামো ধরে মহাভারতের কাহিনিটা জানত, কিন্তু ব্যাপারটা অত সরল নয়! বহু শাখা-প্রশাখায় নানা ভাবনায় মহাকাব্যটা হাজার-হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে গোটা উপমহাদেশ জুড়ে। কোথাও স্থানীয় গল্প, স্থানীয় বাস্তবতা নিয়ে মিশে গেছে মূল কাহিনির সাথে। নদী থেকে যেমন উপনদী আবার উপনদী জুড়ে জুড়েও নদীর গল্প তৈরি হয়েছে, তারপর তো সব মিলেমিশে একসাথে ঝাঁপ মহাসমুদ্রে।

    বিভিন্নতা যেমন আছে, কিছু কিছু ব্যাপারে তেমন সর্বজনগ্রাহ্যতাও আছে।

    যেমন সহদেবের সততার কথা। সর্ববিদিত। এমনকী কখন যুদ্ধ শুরু করলে কৌরবরা যুদ্ধে জয়ী হবে, শকুনির পরামর্শে দুর্যোধন সহদেবের কাছে তা জানতে এলে, শত্রুকেও সঠিক সময়টা বলে দেন। কৃষ্ণ অবশ্য চন্দ্র ও সূর্যকে এই ধরাধাম, পৃথিবীতে নেমে আসতে বাধ্য করে তিনজনকে একই জায়গায় জড়ো করে অকাল গ্রহণের উপক্রমে সময়টা গুলিয়ে দেন।

    তা বলে সহদেবের ক্ষত্রিয় গুণ, শৌর্য-বীর্য কিছু কম ছিল তা মোটেও নয়! অন্য সকলের মতো ধনুর্বান তো ছিলেনই, অসিচালনা, তরোয়াল যুদ্ধে সবচেয়ে দক্ষ ছিলেন। ইন্দ্রপস্থের সম্রাট হওয়ার পর যুধিষ্ঠির যখন রাজসূয় যজ্ঞ করেছিলেন তখন ভীষ্মের পরামর্শে দাক্ষিণাত্য জয়ে সহদেবকে পাঠান, কারণ দাক্ষিণাত্যের রাজারা অসিযুদ্ধে সবিশেষ কুশলী। এছাড়া কুড়াল-লড়াই, লাঠি-যুদ্ধেও সমান পারদর্শী ছিলেন। আর যুদ্ধ যখন করতেন তখন হয়ে উঠতেন ভয়ঙ্কর!

    আর যার খলবুদ্ধিতে দ্যুতক্রীড়া, যে খেলায় হেরে পাণ্ডবদের রাজ্যপাট হারানো, বারো বছরের বনবাস, এক বছরের অজ্ঞাতবাস, সেই ধুরন্ধর শকুনিকে হত্যার শপথ তো সহদেবেরই, সেই পাশাখেলার মঞ্চেই এবং সে শপথ রেখেও ছিলেন পুত্র উলুকা সহ শকুনিকে হত্যা করে।

    এই যে এলেবলে ধরে নিয়ে ওকে সহদেবের রোল দেওয়া, সহদেব সম্পর্কে এতকিছু জানে এরা? ‘এরা’ বলতে? অশোকদা-বিকাশদা? নিজের ভাবনায় নিজেই চমকে ওঠে পার্থ। এই দু’দিন হল কিছু লেখাপড়া করছে পার্থ, আর তাতেই এত? মহাপ্রস্থানের পথে সহদেবের মৃত্যুর কারণ ভীম জিজ্ঞেস করলে, যুধিষ্ঠির জবাবে বলেছিলেন, এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে সহদেব সবার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ছিল, কিন্তু সহদেবের অপরিসীম জ্ঞানের অহঙ্কারই তার মৃত্যুর কারণ। এই প্রতিভাবনায় নিজের ভেতর গুটিয়ে যেতে থাকে পার্থ।

    এটা যেমন একটা ভুল ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল পার্থকে তবে এটা তো ঠিক, শুধু এই নাটক বলে নয়, সব নাটক-সিনেমাতেই সহদেবের মতো চরিত্রকে খাটো চোখে দেখে, ‘এক্সট্রা’-র মতোই ব্যবহার করা হয়! তা বলে কি সেই ‘এক্সট্রা’-র গুরুত্ব কম? এমনকী ওই যে যত হিন্দি সিনেমার নাচ, নায়ক-নায়িকার পেছনে একশজন নাচছে, একজনও যদি বেতালে নাচে, ভেস্তে যাবে না সব? একটা বড় অর্কেস্ট্রা? ঐকতান? শ’খানেক লোক দশ-বারোটা ইনস্ট্রুমেন্ট বাজাচ্ছে। হয়তো ভায়োলিনই বাজাচ্ছে জনা তিরিশেক। সেখানে একজনও বেসুরো বাজালে চলবে? কোরাস গাওয়া হলে তুমি না গেয়ে চুপ করে থাকতে পারো, দেখা গেলে বিসদৃশ হবে কিন্তু শোনায় কোনও ক্ষতি হবে না, উল্টোটায়, মানে তুমি গাইলে অথচ বেসুরো, কান থাকলে কোরাসেও তা শ্রুতিকটুই লাগবে। এই সব ব্যাপারে ‘এক্সট্রা’ শব্দটা কেমন অপমানজনকই মনে হয়। তবে সেটা ‘এক্সট্রা’ হিসেবে ভুক্তভোগীর ভাবনা না সাধারণ একজনের ঠিক ধরতে পারে না, পার্থ।

    এটা ঠিকই পাঁচের এক ভাগ হিসেবেই সহদেব দ্রৌপদীকে পেয়েছিলেন, কিন্তু এ-ও তো ঠিক পূর্বজন্মে দ্রৌপদী মানে নলয়নী শিবের কাছে বর চেয়েছিলেন যেন আগামী জন্মে জগতের শ্রেষ্ঠ মেধাবী মানুষটার সাথে ওঁর বিয়ে হয় আর তাতেই তো পরজন্মে সহদেব। তাহলে? আবার এটাও ঠিক সহদেব নিজের মাসতুতো বোন বিজয়াকে নিজের পছন্দেই বিয়ে করেছিলেন। তবে...

    তখন থেকে কী ভাবছ বলো তো? ছেলের অভিনয়টা তো দেখো! এত ভাল অভিনয় করছে ছেলেটা আর তুমি দেখছই না! থেকে থেকেই শুধু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছ! আরও একটু ঘন হয়ে এসে কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে কাবেরী। সেই বুক ধড়ফড় করা দিনগুলোতে যে দ্রৌপদীর চরিত্রে অভিনয় করেছিল।
    --------------------------
  • বিভাগ : অন্যান্য | ২৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ৩৭৭ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Swapnasree Roy | ০৪ এপ্রিল ২০২১ ১৩:৫৪104476
  • দারুণ খুব ভালো লাগলো 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন