• বুলবুলভাজা  পড়াবই  কৃতী-স্বীকৃতি

  • সহজে বলতে পারেন, তা মোটেই সহজ নয়

    কেতকী দত্ত
    পড়াবই | কৃতী-স্বীকৃতি | ১৮ অক্টোবর ২০২০ | ৩৫৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • নোবেল পুরস্কার ২০২০ — সাহিত্য
    লুইজ গ্লিক। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন। নবীনদের অনেকেরই মনে হয়েছে তাঁর কবিতা স্রেফ নিজের অনুভূতির সোজাসাপটা বিবরণ। আবার অনেকের কাছেই এই কঠিন সময়ের পক্ষে বেমানান ভাবে ‘অরাজনৈতিক’। কিন্তু তাঁর কবিতার পরতে পরতে রয়েছে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা, ছিন্নভিন্ন প্রেমজ্বরের কথা, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির দীর্ঘশ্বাস, রয়েছে নিছক অস্তিত্বজনিত হতাশাও। সাহিত্য থেকে তিনি পৌঁছে যান গভীর দর্শনে। লিখছেন ইংরেজি ভাষার কবি ও অধ্যাপক কেতকী দত্ত


    এবছর নোবেল পুরস্কার পেয়ে সারা বিশ্বের সাহিত্যমহলে সাড়া জাগিয়েছেন লুইজ গ্লিক। পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে আসা কোনো নতুন ঘটনা নয়, বহু বহু পুরস্কার লাভ করেছেন এই কবি।

    উইলিয়াম ব্লেকের ‘দ্য লিট্‌ল ব্ল্যাক বয়’ পড়তে ভালোলাগত, স্টেজ-কাঁপানো অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এক সময়ে, কবিতা লিখতে ভালোলাগত সেই কোন্‌ শৈশব থেকেই। বাবা-মা দুজনেই শিক্ষানুরাগী ছিলেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসেন খুব গ্লিক, ‘young minds’-এর মধ্যে অনুপ্রেরণা খুঁজে পান তিনি। মনখারাপের সময় কবিতার পরিবর্তে কিন্তু উপন্যাস পাঠই তাঁর সঙ্গী। জীবন-জিজ্ঞাসা, দর্শন, একাকিত্ব, সম্পর্ক তাঁর কবিতায় বারবার ঘুরে ফিরে আসে। ছন্দে লিখতে ভালোবাসেন না গ্লিক, পৃথিবীর নৃত্যে ছন্দ তো কবেই হারিয়ে গিয়েছে।



    লুইজ গ্লিকের ‘দ্য গার্ডেন’ কবিতাটির ‘দৃশ্য-পাঠ’। শিল্পী মেগান ফ্যারেল (সম্পূর্ণ কবিতাটি এই আলোচনার শেষে পড়ুন)

    ১৯৪৩-এ লুইজ গ্লিকের জন্ম নিউ ইয়র্ক শহরে, বেড়ে ওঠা ছবির মতো শহর লং আইল্যান্ডে। পড়াশোনা সারা লরেন্স কলেজে ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা যাত্রাপথের প্রথম নিবেদন ‘Firstborn’ (1968) সাড়া ফেলে কবিতাপ্রেমীদের মধ্যে তার নির্মেদ নির্মাণের জন্য, সরল কথনের জন্য, ‘একা’ কথনের অসহায়তার জন্যও বা। কবি Robert Hass বলেছেন, “She is one of the purest and most accomplished lyric poets now writing.” নোবেল কমিটির মতে, “She has been awarded Nobel Prize in Literature for her unmistakable poetic voice that with austere beauty makes individual existence universal.” তাঁর ১২ টি কবিতা সংকলন রয়েছে যার মধ্যে ‘Faithful and Virtuous Night; (2014) জিতে নিয়েছে National Book Award এবং ‘Poems 1962-2012’ জয় করে Los Angeles Times Book Prize। প্রবন্ধসমগ্র ‘American Originality’ (2017) সাড়া ফেলেছে জনমানসে।

    লুইজ গ্লিকের প্রথম দিকের কবিতাগুলিতে রয়েছে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা, ছিন্নভিন্ন প্রেমজ্বরের কথা, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির দীর্ঘশ্বাস, রয়েছে নিছক অস্তিত্বজনিত হতাশাও (existential despair)। সমালোচক Helen Vendler অনেকটা Ronald Barthes-এর ‘Death of the Author’ লেখাটি মনে-করিয়ে-দেওয়া সুরে বলছেন ‘The House on the Marshland’-এর (1973) কথায় “Glück’s cryptic narratives invite our participation: we must, according to the case, fill out the story, substitute ourselves for the fictive personages… later, I think … we read the poem, instead, as a truth complete within its own terms, reflecting some one of the innumerable configurations into which experience falls.”

    একের পর এক কবিতা সংকলনের প্রকাশ ঘটে, প্রশংসাও আসে ঝুলি ভরিয়ে। ‘The Garden’ (1976), Descending Figure (1988), Ararat (1990) এবং পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত ‘The Wild Irish’ (1992)। ভাষার মারপ্যাঁচ, চিত্রকল্পের আধিক্য, সবকিছু বর্জিত গ্লিকের কবিতা বড়ো বেশি সোজাসুজি, বড়ো বেশি সাধারণের বোধগম্য। আমাদের কবি বলেছেন, যথার্থই, “সহজ কথা যায় না বলা সহজে”। গ্লিক তাঁর কবিতায় সহজে বলতে পারেন, তা মোটেই সহজ নয়।

    লুইজ গ্লিকের কবিতা নিয়ে স্বল্প পরিসরেই আলোচনা করব। কিন্তু তার আগে কিছু কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করছি। বিদেশের (ইংল্যান্ডের) একটি নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-র জুন মাসেকবিতা নিয়ে সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলোচনার সুযোগ মিলে যায় হঠাৎই। লুইজ গ্লিকের কবিতা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মন্তব্যও শুনলাম মন দিয়ে। তাদের মনে হয়েছে, গ্লিকের কবিতায় যেন শুধু অনুভূতিগুলোর এক বিবরণ রয়েছে সোজাসাপটা, যা কখনোই ‘কবিতা’ হয়ে ওঠেনি সার্থক ভাবে। শব্দের বিন্যাস এমনকি অনুভূতিগুলোর প্রকাশেও নবায়ণ প্রয়োজন ছিল। Emily Dickinson-এর প্রসঙ্গের অবতারণা করে বলে এক সপ্রতিভ ছাত্রী, “She also talked about her feelings, her emotions, but in a poetic manner with the help of images, symbols. But Glück hardly makes use of symbols or images in her poems. She states her feelings straight from her heart, that’s it.’’

    আমি সত্যি বলছি, এই ধরনের সমালোচনা আশা করিনি। আমার মনে হয়, গ্লিক হয়তো কোনো কিছুর আড়াল খোঁজেননি। তাতে দোষের কী? তাদেরই মধ্যে একজন বলে ওঠে, “But I like the way Glück makes use of myth in her poems, eg, myth of Persephone”।

    এবার আমার মনে হয় আমাদের ভাবা উচিত গ্লিকের কবিতা আমরা তাহলে কীভাবে আস্বাদন করব? আমার এক সাহিত্যপ্রেমী বন্ধু যিনি নিজেও সাহিত্য রচনা করেন, দূরভাষ-আলোচনায় আমরা দুজনেই একমত হই যে, গ্লিকের কবিতা apolitical বা অরাজনৈতিক। তাই বোধ হয় এই উত্তাল সময়ে, এই অসুস্থ সময়ে তাঁর কবিতা হয়তো শান্ত শীতল দিঘির মতো।
    এবার আসুন গ্লিকের কবিতা নিয়ে কিছু কথা বলি। প্রথমেই আসি ‘Averno’ কবিতাটিতে। যে কবিতাটিতে দর্শন ও সাহিত্য মিলেমিশে একাকার। Averno রোমের নেপল্‌স্‌ শহরের একটি আগ্নেয়গিরি-গহ্বর, যা একটি হ্রদের আকার নেয়, সেই প্রাচীনকালেই। প্রাচীন রোমে এ হ্রদকে বলা হত ‘নরকের প্রবেশদ্বার’:

    Averno
    You die when your spirit dies.
    Otherwise, you live.
    You may not do a good job of it, but you go on —
    something you have no choice about.
    When I tell this to my children
    they pay no attention.
    The old people, they think —
    This is what they always do:
    Talk about things no one can see
    to cover up all the brain cells They’re losing.

    It is terrible to be alone.
    I don’t mean to live alone —
    to be alone, where no one hears you.
    I remember the word for chair.
    I want to say—I’m just not interested anymore.
    I wake up thinking
    You have to prepare.
    Soon the spirit will give up—
    all the chairs in the world won’t help you.

    কবিতাটির পরতে পরতে রয়েছে দর্শন। রূপক হিসাবে ‘chair’ শব্দটিকে ধরা যায়। একাকিত্ব, জীবন-দর্শনের কবিতা। “একাকিত্ব মানে একা বাঁচা নয়, একা মানে যখন কেউ শোনারও থাকে না।”

    কঠোর নিদান জীবনপথের।

    ‘Aboriginal Landscape’ কবিতাটিতে জীবন ও মরণের মাঝে বহু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন কবি। আশ্চর্যজনক ভাবে ওখানে যে ট্রেনটি কবি আবিষ্কার করেন, যার কন্ডাক্টর দাঁড়িয়ে আছে থেমে-থাকা ট্রেনটির দরজায়, সে যেন বড়ো রহস্যময়তায় ভরা। সে বলে,

    “This is my house, he said
    The city—the city is where I disappear.”

    ফেরার পথ নেই। এটিই তার গৃহকোণ। শহরে তার অনাবাস।

    বড়ো মনে পড়ে গেল Emily Dickinson-এর ‘Because I could not stop for death’ কবিতাটি। সেখানে অনন্ত যাত্রাপথের গাড়িটি তাকে ও যুগাতীত (Eternity)-কে সঙ্গে নিয়ে চলতে চলতে হঠাৎই একটা স্থানে থেমে যায়। End of the world বা আরও গভীর দর্শন মতে, End of human existence বলছেন Dickinson,

    We passed before a House that seemed
    A Swelling of the Ground.
    The Roof was scarcely visible,
    The Cornice—in the Ground—
    Since then 'tis centuries, and yet
    Feels shorter than the day
    I first surmised the Horses’ Heads
    Were toward eternity.
    (Because I could not Stop to Death)

    কোথায় যেন গ্লিক এই কবিতার সুরেই গেয়েছেন।

    পরিশেষে বলি, লুইজ গ্লিকের কবিতা হালকা পাল্লার ওজন সংবলিত। হয়তো এজন্যই Italo Calvino, প্রখ্যাত সাহিত্যিক তাঁর ‘Six Memos for the Next Millennium’ (1980) বইটিতে ‘Lightness’ শীর্ষক একটি অধ্যায়ে বলছেন, “Literature is an existential function, the search for ‘lightness’ as a reaction to the weight of living.” (P. 32)

    এভাবেই ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসে’ লুইজ গ্লিক মেতে থাকুন আরও অনেক বছর, কবিতার সঙ্গে।
    --
    The Garden
    Louise Glück

    I couldn’t do it again,
    I can hardly bear to look at it—
    in the garden, in light rain
    the young couple planting
    a row of peas, as though
    no one has ever done this before,
    the great difficulties have never as yet
    been faced and solved—
    They cannot see themselves,
    in fresh dirt, starting up
    without perspective,
    the hills behind them pale green,
    clouded with flowers—
    She wants to stop;
    he wants to get to the end,
    to stay with the thing—
    Look at her, touching his cheek
    to make a truce, her fingers
    cool with spring rain;
    in thin grass, bursts of purple crocus—
    even here, even at the beginning of love,
    her hand leaving his face makes
    an image of departure
    and they think
    they are free to overlook
    this sadness.

    --
    লুইজ গ্লিকের একাধিক কবিতা শুনুন তাঁর নিজের কণ্ঠে (প্রথম ন-মিনিট তাঁর কবিতার মুখবন্ধ করেছেন মার্কিন কবি পিটার স্ট্রেকফাস)
  • বিভাগ : পড়াবই | ১৮ অক্টোবর ২০২০ | ৩৫৩ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন