• খেরোর খাতা

  • আবসালোম, আবসালোম! -- উইলিয়াম ফকনার (১৯৩৬)

    সায়ন্তন চৌধুরী লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৮৭ বার পঠিত
  • ৪.৫/৫ (২ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ১)

    রোদ প্রায় পড়ে এসেছে। সেপ্টেম্বর, ১৯০৯; এক ভ্যাপসা ক্লান্তিকর মরা বিকেলে বুড়ি মিস রোজা কোল্ডফিল্ড বসে আছেন সেই ঘরটাতে যেটাকে তাঁর বাবা 'অফিস' বলতেন। ঘরটায় বেশি আলো ঢোকেনা, হাওয়া চলাচল করে না; তেতাল্লিশটি গ্রীষ্ম ধরে জানলার পর্দাগুলো টানা রয়েছে, কেননা যখন তিনি ছোট ছিলেন, কেউ, আমরা জানিনা কে, তাঁকে বলেছিল আলো আর বাতাস ঘরকে আরো গরম করে তোলে, এবং ছায়া সবসময় শীতলতর হয়। অন্ধকার শীতল ছায়া, অতীতের ছায়া এই সাদার্ন গথিকে বারবার ফিরে আসবে, কারণ যেখানে মিস কোল্ডফিল্ড বসে আছেন, সেই জায়গাটা আসলে একটা ধ্বংসস্তূপ — জেফারসন, মিসিসিপি; সিভিল ওয়ার-পরবর্তী সাউথ। তাঁর সামনে বসে রয়েছে একটি বছর আঠেরোর ছেলে, কোয়েন্টিন। তাকে মিস কোল্ডফিল্ড ডেকে পাঠিয়েছেন, সে জানেনা কেন; তার অনুমান বুড়োমানুষ রোজা পুরোনো দিনের হাবিজাবি গল্প শোনাতে চান। ঘরের জানলা বেয়ে উইস্টারিয়া লতা উঠে এসেছে, ফুল ধরেছে তাতে, চড়াই পাখিরা খেলা করছে; মিস কোল্ডফিল্ডের পরনে কালো পোশাক। তেতাল্লিশ বছর ধরে তিনি এই পোশাক পরে আসছেন; কার জন্যে এই শোকপালন? 'whether for sister, father or nothusband none knew'; এভাবেই শুরু হয় ফকনারের এই আশ্চর্য উপন্যাস। দ্বিতীয় দীর্ঘ লাইনটির মাঝামাঝি এসে, যেটি প্রথম প্যারাগ্রাফের শেষ লাইনও বটে, আমাদের সামনে রাখা হয় এই শব্দটি: নটহাজব্যান্ড। এর অর্থ বোধগম্য হয়না; প্রথম চ্যাপটারে প্রায় কিছুই বোঝা যায়না, কেবল মিস রোজা কোল্ডফিল্ড আর কোয়েন্টিন — এইদুটি চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়; আর আমরা পাই কোয়েন্টিনের বাবাকে অর্থাৎ মিস্টার কম্পসন। কোয়েন্টিন যখন তার বাবাকে জিগ্যেস করে যে, মিস কোল্ডফিল্ড হঠাৎ তাকে ডেকে গল্প শোনাতে চান কেন, মিস্টার কম্পসন বলেন: "Years ago we in the South made our women into ladies. Then the War came and made the ladies into ghosts. So what else can we do, being gentlemen, but listen to them being ghosts?" ক্রমে বোঝা যাবে তিনিও, মিস কোল্ডফিল্ডের মতই একজন ন্যারেটর, কিন্তু তিনি সিভিল ওয়ার-পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ। অর্থাৎ এইভাবে ফকনার দুটি স্বরকে স্থাপন করেন সিভিল ওয়ারের আগে এবং পরে; এঁরা দুজনেই যে ঘটনাগুলি বর্ণনা করবেন, সেগুলির কেন্দ্রে থাকবে একটি প্রায়-কিংবদন্তী চরিত্র: থমাস সাটপেন।

     

    ২)

    ১৮৩৩ সালে থমাস সাটপেন তার দাসদের নিয়ে এবং একজন আর্কিটেক্টকে সঙ্গে করে এসে পৌঁছায় জেফারসনে। তার অতীত সম্পর্কে কেউ কিছু জানেনা; অন্ততঃ মিস কোল্ডফিল্ড তেমনটাই বলেন। সাটপেনকে তিনি বর্ণনা করেন একজন দানব হিসেবে এবং সাটপেনের মতো লোকেরাই, মিস কোল্ডফিল্ডের মতে, গৃহযুদ্ধে সাউথের পরাজয়ের জন্যে দায়ী। ক্রমশ আমরা বুঝতে পারি মিস কোল্ডফিল্ড একজন 'আনরিলায়েবল ন্যারেটর'; যা কিছু তিনি বলছেন, তার কতটা সত্যি আর কতটা ঘৃণার কারণে অতিরঞ্জিত, তা ফকনার বুঝতে দেননা। জেফারসনে ১০০ বর্গমাইল জমিতে সাটপেন একটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, একটা প্ল্যানটেশন, যাকে পরে সাটপেন'স হান্ড্রেড বলা হবে; সে বিয়ে করে স্থানীয় মিস্টার কোল্ডফিল্ডের মেয়ে এলেন কোল্ডফিল্ডকে। এলেন রোজার দিদি, কিন্তু অনেকটা বড়; এলেনের দুই সন্তান হেনরি (১৮৩৯) এবং জুডিথ (১৮৪১) জন্মানোর পরে রোজা জন্মায় (১৮৪৫)। টোয়েনের মতোই ফকনার তাঁর উপন্যাসে জোড়ায় জোড়ায় বিপরীতমুখী চরিত্র সৃষ্টি করেন। তাই আমরা দেখি নিষ্ঠুর আবেগহীন সাটপেনের বিপরীতে রোম্যান্টিক কোল্ডফিল্ড পরিবারকে। জুডিথের মধ্যে সাটপেনের ছাপ লক্ষ্য করা যায়, কারণ চার্চে যাবার সময় কোচোয়ান উর্দ্ধশ্বাসে গাড়ি ছোটালে সে মজা পায়; অন্যদিকে হেনরি যেন কোল্ডফিল্ডের ছাঁচে গড়া। সাটপেন তার দাসদের সঙ্গে রাতে কুস্তিতে অংশ নিত; কুস্তি মানে সেখানে প্রতিযোগীরা পরস্পরের চোখ গেলে দিতেও ছাড়ত না। একদিন রাতে হেনরি যখন এই নিষ্ঠুর দৃশ্য দ্যাখে, সে বমি করতে শুরু করে। অন্যদিকে, একইসময় জুডিথ লুকিয়ে লক্ষ্য করে এই লড়াই এবং সে বেশ উপভোগ করে। প্রথম চ্যাপটারে আমরা বিভিন্ন ঘটনার কিছু কিছু আভাস পাই মাত্র; একটি ঘটনার আভাস আমাদের সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে এবং পরে বুঝতে পারি সেটিই এই জটিল উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ঘটনা: ১৮৬৫ সালে জুডিথের সাথে যার বিয়ে হবার কথা ছিল, তাকে হেনরি খুন করে পালায়। অথচ সেই ছেলেটি হেনরির এত বন্ধু ছিল যে মিস কোল্ডফিল্ড ঘটনাটাকে 'almost fratricide' আখ্যা দেন। ফকনার, তাঁর দুরূহ এবং ননলিনিয়ার গদ্যভঙ্গীর মাধ্যমে শুধু যে পাঠককে নকশার অসম্পূর্ণ অংশগুলি কল্পনা করে নিতে বাধ্য করেন তাই নয়, উপন্যাসের একজন মুখ্য চরিত্রকেও তিনি অন্ধকারে রেখে দিতে পারেন। মিস কোল্ডফিল্ড, যিনি এতবছর ধরে সাটপেন'স হান্ড্রেডের এত ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন, তিনি এই দীর্ঘ উপন্যাসটিতে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত উপস্থিত থেকেও জানবেন না যে, হেনরি সত্যিই তার ভাইকে খুন করেছিল, ঠিক যেমন বাইবেলে আবসালোম খুন করেছিল তার বড়ো ভাইকে; অথবা সিভিল ওয়ার, সেও তো 'fratricide'।

     

    ৩)

    ফকনারের এই উপন্যাস পড়লে আমাদের কোনো কোনো জায়গা হঠাৎ চেনা ঠেকতে পারে; কারণ এখান থেকেই গার্সিয়া মার্কেজের 'একশ বছরের নিঃসঙ্গতা' অনেকখানি অনুপ্রাণিত। যেমন, কর্নেল সাটপেন সাউথের হয়ে লড়তে যান সিভিল ওয়ারে; তাঁর বন্ধুস্থানীয় লোকটি হচ্ছে কোয়েন্টিনের দাদু অর্থাৎ মিস্টার কম্পসনের বাবা। এখানে চট করে জেরিনালদো মার্কেজ (নামটা ভুল লিখলাম?) ও তাঁর নাতির কথা মনে পড়ে যেতে পারে। যাই হোক, যেটা বলতে চাই, মার্কেজের ক্ষেত্রে যা অনুপস্থিত, তা হল লেখকের নিজের তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব। ফকনার তাঁর সমস্ত জীবন এই দ্বন্দ্বের ছায়ায় কাটিয়েছেন এবং সাউথ আজও বেরোতে পারেনি এই অন্ধকার অতীত থেকে; এত বছর পরেও সিভিল ওয়ারের স্মৃতি আমেরিকার গায়ে দগদগে ঘায়ের মতো লেপ্টে রয়েছে। ফকনার, তাঁর তুলনায় মার্কেজ বা অন্য লেখকদের পুতুলের মতো ক্ষুদ্র দেখায়, কারণ তিনি একজন লেখক হিসেবে আমাদের ইতিহাসের এতটাই ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে পারেন যে আমরা সহজ কোনো পথ দেখতে পাইনা। বাল্ডউইন 'ফকনার অ্যান্ড ডিসেগ্রিগেশন' প্রবন্ধে ফকনারের তীব্র সমালোচনা করেছেন, কারণ সত্যিই ফকনারের অবস্থান আমাদের কোনো সমাধানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়না; বরং একটা প্রশ্ন তোলে যে, আমেরিকা নামক এক্সপেরিমেন্টটি, মানুষের সভ্যতায় যেটা হয়তো ক্রুরতম এক্সপেরিমেন্ট, সেটা সফল হওয়া কি আদৌ সম্ভব? কোথাও গিয়ে এই উপন্যাসটি আর শুধু সাদার্ন গথিক থাকে না, সমগ্র আমেরিকার ইতিহাসকে প্রতিফলিত করতে শুরু করে। ঠিক পরস্পরের মুখোমুখি কতকগুলো আয়নাকে ফকনার বসিয়ে দেন; আমরা প্রতিচ্ছবি দেখি, তার কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে, বিচারের ভার আমাদের হাতে ফকনার ছেড়ে দেন। হয়তো এটাই সত্যি যে একটা দেশ, যার গোড়ায় রয়েছে খুন আর লুটপাটের ইতিহাস, সেটিই যখন শ্রেষ্ঠতম ভূখন্ড হয়ে ওঠে, তখন অনেকগুলি জটিলতা তৈরি হয়। সিভিল ওয়ার-পরবর্তী সাউথের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে হয়তো ফকনার সেদিকেই আমাদের দৃষ্টিনিক্ষেপ করতে বলেন: '… the South would realize that it was now paying the price for having erected its economic edifice not on the rock of stern morality but on the shifting sands of opportunism and moral brigandage.'

     

    [পরে আরও যোগ করব।]

  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৮৭ বার পঠিত
  • ৪.৫/৫ (২ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 14.139.196.11 | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪:৫২97847
  • chaluk.

  • | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:২১97852
  • পড়ছি। 

  • | ০১ অক্টোবর ২০২০ ১৫:৪৯97895
  • তুলি 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন